Untitled Document
কার্তিক সংখ্যা ১৪১৭
মূলপাতা শিরোনাম বটতলা পঞ্জিকা প্রদর্শনী
৩৯ বছর
- মুরাদুল ইসলাম
  ট্রেনিং নেয়া শেষ হলে ক্যাপ্টেনের নির্দেশে আমাকে সুত্রাপুর আসতে হয়।১৯৭১ সালের মে মাসের কথা।খুব সম্ভব মে মাসের শেষের দিক। সুত্রাপুরে যুদ্ধ পরিচালনার দায়িত্বে যিনি ছিলেন তিনি সম্মুখ যুদ্ধে শহীদ হয়েছেন।তাই এখানকার যুদ্ধ পরিচালনার দায়িত্ব দিয়ে আমাকে পাঠানো হয়েছে।যেদিন সুত্রাপুর আসি সেদিন সন্ধ্যায় প্রথম লোকমান হোসেনের সাথে আমার কথা হয়।



আপনার নাম লোকমান?

--জ্বি| আমি লোকমান হোসেন।বাড়ি সুলতানপুর।

আপনি কতদিন হল এখানে আছেন?

--যুদ্ধ শুরু হবার পর থেকেই আছি।

আপনার পরিবার কি দেশে?

--জ্বি।সুলতানপুরেই আছে।আর্মি গেছে কিন্তু ক্ষতি করে নাই আল্লার শুকরিয়া।

আপনার শরীরের অবস্থা এখন কেমন?

--ভাল স্যার।আমি শরীরে বল পাই।জলিল স্যার(এখানকার প্রাক্তন প্রধান জলিল আহমদ) খামখাই আমাকে বসিয়ে রাখত।আপনি আসছেন এখন আমারে একটা সুযোগ দিয়া দেখেন।আমি আগের মত যুদ্ধ করতে পারব।

আমি লোকমান হোসেনের সঙ্গে কথা বলছিলাম।চারপাশে দলের অন্য মুক্তিযুদ্ধারা ছিল।পরে এদের কাছ থেকেই লোকমান হোসেনের পুরো কাহিনী শুনলাম।লোকমান প্রথম থেকেই দলের সাথে আছে।একটা অপারেশনে সুলতানপুর থেকে সে সঙ্গী হয়।প্রথমদিকে মুক্তিযুদ্ধাদের সামান্য টুকটাক কাজ করে দিত।তারপর জলিল আহমদ ট্রেনিং দিয়ে তাকে কয়েকটা অপারেশনে নিয়ে যান।কিন্তু এখন সে মারাত্বক কুষ্ঠ রোগে আক্রান্ত। সুত্রাপুর যুদ্ধের অন্যতম দুর্যোগপূর্ন এলাকা।হরহামেশাই এদিকটায় পাকিস্তানিদের সাথে সংঘর্ষ হয়।তাই দলে এরকম একজন রোগীর চিকিrসা অত্যন্ত দূরূহ।এখানে প্রায় একটা জংলামত জায়গায় ফেলে যাওয়া এক গৃহস্থ বাড়িতে আমরা আছি।পাকিস্তানিরা এখানে আমাদের অবস্থানের কথা এখনো টের পায় নি।এখানেই কেন্দ্র করে তাই আশপাশে অপারেশন পাঠানো হচ্ছে।কয়েকজন খুব কমবয়সী ছেলেকে দেখলাম।মনে হয় সদ্য ভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছে।তাদের কাছ থেকে জানলাম আগের ক্যাপ্টেন জলিল আহমেদ লোকমানকে নিয়ে চিন্তিত ছিলেন। কারন কুষ্ঠ ছোঁয়াচে রোগ।একজন থেকে আরেকজনে ছড়িয়ে যায়।আর লোকমান হোসেনের  অবস্থা এমন যে হাসপাতালে নিলেও ভাল হবে কিনা বলা যায় না।আশপাশে কাছাকাছি কোন হাসপাতালও নেই।পাকিস্তানি মিলিটারিদের চোখ ফাঁকি দিয়ে দূরের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া সম্ভব না কোনমতেই।

পরদিন সকালের দিকে সবাইকে যুদ্ধের ব্রিফিং দিয়ে আমি গেলাম লোকমান হোসেনের ঘরে।তাকে আলাদা একটা ছোট ঘর দেয়া হয়েছে।লোকমান হোসেন শোয়া অবস্থায় ছিল,আমাকে দেখে উঠার চেষ্টা করল।কিন্তু উঠতে পারল না।দিনের আলোয় আমি দেখলাম ওর সমস্ত শরীর পচে গেছে।স্থানে স্থানে ক্ষতের মত দেখা যাচ্ছে।দুর্গন্ধ ও আসছে মনে হচ্ছে।এ অবস্থায় শরীরে পোকা লেগে যাবার কথা,হয়ত কাঁথায় ঢাকা নিচের অংশে লেগেছে। আমি নিজেকে যতটুকু পারা যায় সামলে নিয়ে বললাম, লোকমান সাহেব কেমন আছেন?

ক্ষীণ স্বরে কিন্তু মুখে হাসি ফুটিয়ে লোকমান হুসেন বলল, ভাল স্যার।

আমি একটু শক্ত হয়ে বললাম,আপনি কি জানেন আপনার কুষ্ঠ হয়েছে?

-জ্বি, জানি স্যার।কুষ্ঠ ভাল হয়।আমাদের সুলতানপুরের আবুলের মার ভাল হইছে।
লোকমান হোসেনের আশাবাদী চোখদুটো চকচক করে উঠল।আমি তার চোখের দিকে চেয়ে রইলাম।লোকমান হোসেন আবার বলতে লাগল,দেশ স্বাধীন হইব স্যার।আমার ছেলেরে স্কুলে ভর্তি করব,পড়ালেখা শিখাব।আমার অনেক দিনের স্বপ্ন ।কুষ্ঠ ভাল হয় স্যার,আপনে খালি একবার আমারে হাসপাতালে নিয়া যান।রাতের বেলা নিয়া যাইতে পারবেন।

 
লোকমান হোসেনের কথার উত্তর দেয়ার মত ক্ষমতা আমার ছিল না। শুধু চেয়ে দেখলাম লোকমান হোসেনের দুই চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে দুই ফোঁটা অশ্রু।

এটাই ১৯৭১ সালে লোকমান হোসেনের সাথে আমার শেষ দেখা। ঐদিন উপর থেকে নির্দেশ আসে "কয়লা নিয়ে আস "।যুদ্ধের সময় যেসব গোপন বার্তা ব্যবহার করা হত এটি তার একটি।এর অর্থ তোমার দল নিয়ে বর্তমান ঘাঁটি থেকে সরে আস।হয়ত পাকিস্তানিরা আমাদের অবস্থানের কথা জেনে গিয়েছিল তাই এই নির্দেশ।যাবার সময় লোকমান হোসেনকে নিয়ে যাওয়া সম্ভব না।তাই অনেকে শেষবারের মত তাকে দেখে আসল।আমি আর যেতে সাহস পাই নি।তবে আসার সময় শুনতে পেয়েছি লোকমান হোসেনের ঘর থেকে কান্নার শব্দ আসছে।


এখন ২০১০ সাল।স্বাধীন বাঙলাদেশ।মুক্ত বাতাস।মুক্ত বাতাসে শত প্রানের স্পন্দন। এ প্রানের স্পন্দন লক্ষকোটি বাঙালীর।এই মুক্ত বাতাসে নিঃস্বাস নিতে পারে নি কত মুক্তিযোদ্ধা।তাদেরও স্বপ্ন ছিল এই রূপসী বাংলার শিশিরে ধোয়া নরম ঘাসে স্বাধীন ভেসে একবার হেটে যাবার- এই আম জাম কাঠালের ছায়াঘেরা বাংলার দীঘির স্বচ্ছ কাল জল ছুঁয়ে আসা বাতাসে স্বাধীনভাবে  একবার নিঃশ্বাস নেবার। এরকম স্বপ্নই ছিল মৃত্যুপথযাত্রী লোকমানের চোখে।লোকমান কি আজো বেঁচে আছে- না কি অন্ধকার ঘরে আর্তচিৎকার করতে করতে পাড়ি দিয়েছে অসীমের উদ্দেশ্যে, এসব কথা ভাবতে ভাবতে আজ ৩৯ বছর পর আমার চোখ জলে ভরে উঠে।
     
Untitled Document
Total Visitor : 708425
সাপলুডু মূলপাতা | মতামত Contact : shapludu@gmail.com
Copyright © Life Bangladesh Developed and Maintained By :