Untitled Document
কার্তিক সংখ্যা ১৪১৭
মূলপাতা শিরোনাম বটতলা পঞ্জিকা প্রদর্শনী
আমি একজন মানুষঃ রণজিৎ বাওয়ালীর জীবনী
- লিঠু মণ্ডল

(পূর্ব প্রকাশের পর)

সংগ্রামী জীবনঃ

ধোপাদি গ্রামের রফিক নামে একজনের সাথে তিনি গরু চড়াতে যেতেন। এভাবে তাদের ভিতর সখ্য গড়ে ওঠে। রফিক বামপন্থী চিন্তাধারার সাথে পরিচিত ছিলেন। রফিকের সাথে থাকতে থাকতেই রনজিৎ বাওয়ালী বাম চিন্তাধারার দিকে ঝুঁকে পড়েন। রফিকের কথাবার্তা, চিন্তাভাবনা তার ভাল লাগলে শুরু করে। পাশাপাশি রফিকের কাছ থেকে বিভিন্ন রাজনৈতিক বই নিয়ে তিনি পড়তে শুরু করেন। রাজনীতির বই ছাড়াও বামপন্থী চিন্তার গল্প, উপন্যাস ও নাটক পড়তেন। এসমস্ত বই তার ভাবনা চিন্তা বিকাশে অনেক সহায়ক ভূমিকা রাখে। শোষিতদের উপরে শোষকদের শোষণ দেখে তিনি প্রতিবাদী হয়ে উঠতে শুরু করলেন। সূচনা হলো তার সংগ্রামী জীবনের। একপর্যায়ে তিনি বন্ধু রফিকের সাথে নকশাল পার্টিতে যোগ দেন। সেসময়ে তার বয়স আনুমানিক ১৬/১৭। তিনি পার্টির কাজে সরাসরি যুক্ত হন। শ্রমজীবী মানুষদেরকে সংগঠিত করেছেন, তাদের অধিকার আদায়ের জন্য মাঠে ময়দানে মিটিং-মিছিল করেছেন। সারাদিন কাজ করতেন। রাতে কিছুটা সময় বিশ্রাম। তারপর আবার কাজে নেমে পড়েছেন। সেসময়ে তিনি নকশালীদের সাথে কাজ করতেন এই দেশটাকে স্বাধীন করতে, খেতে না পাওয়া মানুষের পেটে অন্ন জোটাতে, পরনের একটুকরো কাপড় জোটাতে। খেয়ে না খেয়ে, রাতের পর রাত ঘুমিয়ে না ঘুমিয়ে- এভাবেই মানুষের মুক্তির সংগ্রাম করতে গিয়ে নিরলস ত্যাগ-পরিশ্রম করে গেছেন ষাটের দশক জুড়ে।


আসলো সত্তুরের দশক। শুরু হলো মুক্তিযুদ্ধ। হরিদাসকাঠি ও এর আশেপাশের গ্রাম থেকে দুর্বৃত্ত মানুষেরা এসে শুরু করলো গ্রাম লুটপাট। রনজিৎ গ্রামবসীদেরকে নিয়ে রুখে দাঁড়ালেন। লুটপাট কিছুটা কমলো। কিন্তু এরপরেই দেখা গেল মধুপুর ও ভুলবাড়িয়ার কিছু দুর্বৃত্ত একত্রিত হয়ে আবার তাদের উপর অত্যাচার শুরু করলো।এবারেও রনজিৎ বাওয়ালীরা রুখে দাঁড়ালেন। দুর্বৃত্তরা পিছু হটে গেল। এরপর এলো বিহারীরা। এবারেও বাঁধলো লড়াই। রফিক, আলী, রনজিৎ সহ গ্রামবাসীরা আক্রমণকারীদেরকে ঘিরে ধরলো। গ্রামবাসীর প্রতিরোধের মুখে ওরা পিছু হটলো। নিহত হলো তিনজন আক্রমণকারী। এটি একাত্তুরের শুরুর দিককার ঘটনা। ২৫ মার্চের পরপর। এরপর ব্যাপকভাবে শুরু হলো লুটপাট, গণহত্যা, জ্বালাও-পোড়াও, নির্যাতন। হিন্দু জনগোষ্ঠী সহ সাধারণ মানুষেরা পালিয়ে যেতে শুরু করলো। নকশালীদের সাথে থেকে রনজিৎ চেষ্টা করলেন প্রতিরোধ গড়ে তুলতে। কিন্তু একটা সময় পর এসে পরিবার পরিজন নিয়ে তিনিও ভারতে চলে যান। দেশ স্বাধীন হবার পর দেশে ফিরে এসে আবার নকশালীদের সাথে কাজ শুরু করেন। মুজিব বাহিনীর সাথে নকশালরা একমত হতে পারলেন না। মুজিব বাহিনী তাদের দলের লোকজনকে ধরে মেরে ফেলতে লাগলো। যারা বেঁচে ছিলেন তারা অনেক কষ্টে অনেকের সাথে হাত মিলিয়ে, কিছুটা কৌশল করে বেঁচে ছিলেন। এভাবেই পার হলো সত্তুরের দশক।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর জড়িত হলেন সার ও খাজনার আন্দোলনে। তখন বোরো মৌসুম। সারের দাম চড়া। কৃষকের দুঃখ-দুর্দশার শেষ নাই। রনজিৎ বাওয়ালী ভাবলেন সারের দাম কমাতে হবে, খাজনা মাফ করতে হবে। যেমন ভাবা তেমন কাজ। শুরু করলেন মিটিং, গ্রামে গ্রামে মিটিং করে লোক জড়ো করা, মিছিল করা, টিওনো-ডিসি অফিসে স্মারকলিপি দেয়া, অফিস ঘেরাও। একবার এক অফিসার তার কাছে গমের বীজ থাকা সত্ত্বেও তা দিতে রাজি হয়নি। অথচ ঐ গমের বীজ কৃষকেরাই গোডাউনে ঢুকিয়েছে। সে বীজ কৃষি অফিসার দেবে না। এ সময় বাওয়ালী এলাকার লোকজন সহ কৃষি অফিসারকে ঘেরাও করে, ধোলাই দিয়ে টিওনো এর কাছে নিয়ে আসে। অবশেষে কৃষকেরা সেই বীজ পায়।

 সেসময়ে বিএডিসি এর মাধ্যমে সরকার সার দিত। কিন্তু সে সার কৃষকেরা ঠিক মতো পেত না। সারে  ভেজাল থাকতো। ফলে কৃষকেরা তাদের প্রত্যাশা মাফিক ফলন পেত না। কৃষকদের সংগঠিত করে রনজিৎ বাওয়ালী শুরু করলেন সার বীজের আন্দোলন।

এরপরেই তিনি শুরু করলেন কৃষিঋণ মওকুফের আন্দোলন। যুক্ত হলেন বন্ধু আলি আর নুরুজ্জামান। ভবদহ একটি পানি অধ্যুষিত এলাকা। কৃষিজমি বছরের বেশিরভাগ সময় জলের নিচে নিমজ্জিত থাকায় ঠিকমতো ফসলাদি না হওয়ায় কৃষকেরা ঋণ শোধ করবে কোথা থেকে? দুবেলা খাবারই জোটে না- খেতে হয় আধপেটা ন্যাল (শাপলার ডাঁটা), শালুক। আর ঋণ শোধ করা! তারা গ্রামের লোকজনদেরকে ডাকলেন, বললেন সব কথা। রনজিৎ বাওয়ালির কন্ঠে তাদেরই কথা। সবাই মিলে গেলেন কৃষি ব্যাংকের মহাপরিচালকের কাছে। লাভ তেমন কিছু হলোনা। ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসলেন তারা। এদিকে আন্দোলন তীব্র থেকে তীব্রতর হলো। হলো আন্দোলনের বিজয়। ৫০০০ টাকা পর্যন্ত কৃষকদের ঋণ মওকুফ হলো। সঙ্গে জলসেঁচার জন্য পেলেন  স্যালোমেশিন।          


 (চলবে)  
     
Untitled Document
Total Visitor : 709944
সাপলুডু মূলপাতা | মতামত Contact : shapludu@gmail.com
Copyright © Life Bangladesh Developed and Maintained By :