Untitled Document
কার্তিক সংখ্যা ১৪১৭
মূলপাতা শিরোনাম বটতলা পঞ্জিকা প্রদর্শনী
ফলবতী গাছ ও গুড গভর্নেন্সের হাঁচি
- শুভ কিবরিয়া
 


জীবন এখন কেমন কাটছে? এই প্রশ্ন জিজ্ঞেস করলে বন্ধু-বান্ধব, স্বজন-আত্মীয় প্রায় সবারই একই কথা
চলছে। তবে ভালো নয়।
কেন ভালো নয়, আপনার ঘরে কি খাবার নেই? পরনে কাপড় নেই? মার্কেটিং করার মতো টাকা নেই?
না, এসব কিছুই নয়।
তবে কেন ভালো নেই?

ভাই, এই দেশে কি ভালো থাকা যায়?
যানজট, বাজে আবহাওয়া, রাজনীতির দুর্দশা আর গভর্নেন্স এর যা অবস্থা। পরের জেনারেশন যে কি করে এখানে থাকবে তার উপায় জানা নেই। ভালো হতো কানাডা, অস্ট্রেলিয়াতে অভিবাসন নিলে!
এসব হতচ্ছাড়া অসুখী মানুষদের দেখলেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সর্বসাম্প্রতিক একটা কথা আজকাল খুব মনে পড়ে। কথাটি তিনি বলেছেন দলের এক মিটিং-এ।
দলের মন্ত্রীত্ব না পাওয়া অসুখী নেতারা দলের কার্যনির্বাহী বৈঠকে অভিযোগ আনছিলেন বিস্তর। তারা বলেছেন, ছাত্রলীগ-যুবলীগের কর্মকাণ্ডে জনগণ অতিষ্ঠ। নয়া আওয়ামী লীগাররা দলের বদনাম করছেন। নেত্রী ব্যবস্থা নিন।
নেতাদের এসব অভিযোগ শুনে প্রধানমন্ত্রী, যিনি আওয়ামীলীগেরও সভানেত্রী, তিনি বললেন, অধৈর্য্য হবেন না। ফলবতী গাছেই মানুষ ঢিল দেয়।
কথাটা যুতসই। বাংলাদেশ এখন ফলবতী গাছ। প্রধানমন্ত্রীর পুরো কথাটি শোনা যাক

‘নেতাকর্মীদের সম্পর্কে সমালোচনা শুনে অধৈর্য হলে চলবে না। আমরা কাউকেই ছাড় দিচ্ছি না। দেশ চালাতে গেলে আলোচনা-সমালোচনা থাকবেই। ফলবতী গাছেই মানুষ ঢিল দেয়। আমরা জনগণের কাজ করে যাচ্ছি, জনগণের প্রত্যাশা আমরা পূরণ করবই। অপরাধী যেই হোক তাকে আইনের আওতায় আসতেই হবে।
আমরা ক্ষমতায় আসার আগে কেউ চিন্তাই করতে পারেনি বঙ্গবন্ধুর হত্যার বিচার হবে, বিচারের রায় কার্যকর হবে। আমাদের দেশে কিছু মানুষ আছেন যারা সব সময়ই অখুশি থাকেন। যাদের ভোটার নেই, জনসমর্থন নেই
অথচ ক্ষমতায় যাওয়ার খায়েশ আছে। তাই নানা ষড়যন্ত্র চলছে। সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। জনগণ অনেক প্রত্যাশা নিয়ে আমাদের ভোট দিয়েছে। সেই প্রত্যাশা আমাদের পূরণ করতে হবে।’
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা (সূত্র : জনকণ্ঠ, ১০-১০-২০১০)।

২.
ফলবতী গাছ নিয়ে আছেন প্রধানমন্ত্রী। তাই হয়ত একটা বিদঘুটে আইন বানিয়েছেন বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে। টেন্ডার ছাড়া রেন্টাল
কুইকরেন্টাল নানা নামে বিদ্যুৎ কেন্দ্র বানিয়েই চলেছেন তিনি। যদিও লোড শেডিং কমছে না ।
দ্রুত বিদ্যুৎ বানাতে যেয়ে যেসব কাজ হচ্ছে তা যাতে দায়মুক্তি পায় তাই নতুন একটা বিল সম্প্রতি পাশ করেছেন সংসদে। নাম দিয়েছেন ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন, ২০১০’।
দুষ্টজনেরা বলছেন এই বিশেষ বিল আদতে দায়মুক্তির আইন। সামরিক সরকার যেমন সমন জারি করে দায়মুক্তির আইন বানাতেন এও ঠিক তেমনি। আইনটির বিশেষ দিকগুলো দেখা যাক:-

‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন, ২০১০’-এর
উল্লেখযোগ্য অংশ

৬। পরিকল্পনা বা প্রস্তাবের প্রচার (২) উপ-ধারা (১) এ যাহা কিছুই থাকুক না কেন, বিদ্যুৎ, জ্বালানী ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত মন্ত্রীর সম্মতি গ্রহণক্রমে যে কোন ক্রয়, বিনিয়োগ পরিকল্পনা বা প্রস্তাব ধারা ৫-এ বর্ণিত প্রক্রিয়াকরণ কমিটি সীমিত সংখ্যক অথবা একক কোন প্রতিষ্ঠানের সহিত যোগাযোগ ও দরকষাকষির মাধ্যমে উক্ত কাজের জন্য মনোনীত করিয়া ধারা ৭-এ বর্ণিত পদ্ধতি অনুসরণে অর্থনৈতিক বিষয় বা সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে প্রেরণের পদক্ষেপ গ্রহণ করিবে।
৯। আদালত, ইত্যাদির এখতিয়ার রহিতকরণ।––এই আইনের অধীনকৃত, বা কৃত বলিয়া বিবেচিত কোন কার্য, গৃহীত কোন ব্যবস্থা, প্রদত্ত কোন আদেশ বা নির্দেশের বৈধতা সম্পর্কে কোন আদালতের নিকট প্রশ্ন উত্থাপন করা যাইবে না।
১০। সরল বিশ্বাসে কৃত কাজকর্ম রক্ষণ।––এই আইন বা তদধীন প্রণীত বিধি, সাধারণ বা বিশেষ আদেশের অধীন দায়িত্ব পালনকালে সরল বিশ্বাসে কৃত, বা কৃত বলিয়া বিবেচিত কোন কার্যের জন্য কোন কর্মকর্তা বা কর্মচারীর বিরুদ্ধে দেওয়ানী বা ফৌজদারী মামলা বা অন্য কোন প্রকার আইনগত কার্যধারা গ্রহণ করা যাইবে না।
১৪। এই আইনের অধীন গৃহীত কাজের হেফাজত।––এই আইনের মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়া সত্ত্বেও, এই আইনের অধীনকৃত কাজকর্ম বা গৃহীত ব্যবস্থা এমনভাবে অব্যাহত থাকিবে ও পরিচালিত হইবে যেন এই আইনের মেয়াদ উত্তীর্ণ হয় নাই ।

৩.
এই আইনটি নিয়ে নানা কথা উঠেছে। সুযোগ বুঝে বিরোধী দলও দু’চার কথা বলেছেন। তার যুতসই জবাব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা । তার চেলাপেলারাও কম যাননি । তাদের কথা একটু শুনি


ক.
‘আমরা ক্ষমতায় থাকতে ৪৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ রেখে গিয়েছিলাম। বিএনপির পাঁচ বছর ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দুই বছর পর এসে আমরা পেয়েছি মাত্র ৩২০০ মেগাওয়াট। এ সময়ের মধ্যে চাহিদা বাড়লেও বিদ্যুৎ উৎপাদন কমেছে। আমরা ক্ষমতায় আসার পর এক হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ গ্রিডে যুক্ত হয়েছে। আগামী ছয় মাসের মধ্যে ৩৫৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের জন্য চুক্তি হবে। দ্রুত যাতে বিদ্যুৎকেন্দ্র করা যায়, সে জন্য নতুন বিল পাস করা হয়েছে। বিরোধী দল এটির বিরোধিতা করছে। তারা বলছে, এটা সংবিধানবিরোধী। সংবিধানের কোথায় লেখা আছে, এ ধরনের আইন করা যাবে না, সেটি আমাকে দেখিয়ে দিন। বরং সংবিধানে লেখা আছে, মানুষের মৌলিক অধিকার পূরণ করার কথা। আমাদের নিয়ত ভালো। আমাদের কাজ করতে দিন। দেখবেন, মানুষের সমস্যা দূর হয়ে যাবে। আমরা বিদ্যুৎ উৎপাদন করলে মানুষ কষ্ট থেকে মুক্তি পাবে, এটা বোধহয় তাদের সহ্য হচ্ছে না (সূত্র : কালের কণ্ঠ, ৭-১০-২০১০)।’
সংসদের সর্বশেষ অধিবেশনে বক্তব্যকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ।

খ.
‘বিদ্যুতের চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন এখন নেই। আর প্রচলিত নিয়ম মেনে এই ঘাটতি চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয়। তাই প্রচলিত নিয়ম ভেঙে আমরা বিদ্যুৎ উৎপাদন করার সিদ্ধান্ত নিচ্ছি। ফলে মানুষের মনে কিছু সন্দেহ থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। যুদ্ধে জয়ী হলে মানুষ তাকে বিজয়ী ঘোষণা করে। কিভাবে বিজয় অর্জিত হয়েছে সেটা বিষয় নয়। তাই আমি বলব মানুষ বিদ্যুৎ বোঝে পদ্ধতি বুঝতে চায় না। তাই আমরা উদ্যোগ নিচ্ছি। ঞযবৎব রং হড়ঃযরহম ভধরৎ ধহফ ভড়ঁষ রহ ধিৎ ধহফ ঢ়ড়ষরঃরপং. আমরা উড়পঃৎরহব ড়ভ হবপবংংরঃু অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিচ্ছি। দুর্নীতির সন্দেহ অমূলক নয়। আবার দুর্নীতি নাও হতে পারে। অর্থাৎ ৫০-৫০। তাই বলব আমাদেরকে কাজ করতে দিন। তারপর বলুন আমরা কি করেছি। চড়ষরঃরপং মড় রহ ধ ুরমলধপ.
সোজা পথে রাজনীতি হয় না। মাঝেমধ্যে আঁকাবাঁকা করতে হয়। তাছাড়া দুর্নীতি হচ্ছে কি হচ্ছে না সেটা দেখাশোনা করার দায়িত্বও আমাদের আছে। এতে উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ আছে বলে মনে করি না। তাছাড়া এই আইনটা করা হচ্ছে মাত্র দুই বছরের জন্য। এবং প্রচলিত আইনকে রহিত না করে। তবে মানুষের আশঙ্কা সম্পর্কে আমি বলব ঘড় ৎরংশ হড় মধরহ.( সূত্র : সাপ্তাহিক, বর্ষ ৩, সংখ্যা ২২, ১০-১০-২০১০)।’
মেজর জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ সুবিদ আলী ভূঁইয়া
সভাপতি, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি

৪.
এসব তো অনেক হলো। রিস্ক নিয়ে গেইন করুক প্রধানমন্ত্রী ও তার দল। আমরা বরং গুড গভর্নেন্সের পুরনো কথা শুনি। সমাজতান্ত্রিক আমলে এই সুশাসন ছিল রাজনৈতিক বিবেচনা। হালে তা এনজিওদের সম্পত্তি। বিদেশি টাকায় পাঁচতারা হোটেলে বাংলাদেশের এনজিওসমাজ এখন দেদারছে গুড গভনের্ন্সের বাণী শোনাচ্ছে। আমরা পুরনো আমলে ফিরে যাই।
একটা কৌতুক বলি। কৌতুকটি সমাজতান্ত্রিক রাশিয়ার শাসক ব্রেজনেভ (১৯৬৪
১৯৮২) আমলের। সমাজতান্ত্রিক শাসনে ততদিনে পার্টিতন্ত্র জেঁকে বসেছে। দুঃশাসন ভেতরে ভেতরে বিষিয়ে তুলছে জনগণকে। তবুও নেতাদের হুঁশ নেই। চলছে আইন বানানো। চলছে অতিকথনের শাসন। কৌতুকটি সেই শাসনামলের


‘ব্যাপক প্রোপাগাণ্ডা সত্ত্বেও কিছু লোক গির্জায় যাওয়া বন্ধ করছে না দেখে ব্রেঝনেভের দুশ্চিন্তার অন্ত নেই। অনেক পদক্ষেপ ব্যর্থ হয়ে গেছে তার। একবার বিদেশ ভ্রমণের প্রাক্কালে তিনি কোসিগিনকে এ ব্যাপারে চূড়ান্ত পদক্ষেপ নেয়ার নির্দেশ দিয়ে গেলেন। বিদেশ থেকে ফিরে এসে ব্রেঝনেভ হতবাক। একজন লোকও গির্জায় যায় না। এই অসম্ভব কাজটি এত অনায়াসে কী করে করা সম্ভব হলো, তা কোসিগিনকে জিজ্ঞেস করতেই তিনি বললেন :

তেমন বেশি কিছু করিনি, শুধু গির্জাগুলোয় যিশুখ্রিস্টের ছবি সরিয়ে আপনার ছবি টাঙিয়ে দিয়েছি।’
৫.

আরো দুটি কৌতুক সংগ্রহ করেছি। তাই বা বাদ রাখি কেন।
শুনুন

ক.
দাদিকে নাতির প্রশ্ন :

লেনিন কি ভালো ছিলেন?

হ্যাঁ, খুব ভালো ছিলেন।

আর স্তালিন ছিলেন খুব খারাপ, তাই না?

হ্যাঁ।

আর ক্রুশ্চেভ কেমন?

এখনো জানি না। মরুক আগে, তারপর জানা যাবে।

খ.
যৌথ খামারে জুতো সরবরাহ এসেছে মাত্র একজোড়া। তা কাকে দেয়া হবে, সে বিষয়ে মিটিং বসেছে। বক্তৃতা দিচ্ছেন যৌথ খামারের ডিরেক্টর :

আমি প্রস্তাব করছি, জুতোজোড়া আমাকে দিয়ে দেয়া হোক। এই প্রস্তাবের পক্ষে যারা, তারা চুপচাপ বসে থাকুন। আর সোভিয়েত শাসনব্যবস্থার বিপক্ষে যাঁরা, তারা হাত তুলুন।

৫.
আবার বাংলাদেশেই ফিরে আসি।

শেখ হাসিনার আমল এবং তার উপদেষ্টাদের উক্তি শুনি।
বুঝবেন গুড গভর্নেন্স কাকে বলে!
‘দলের পরীক্ষিত কর্মীরাই যাতে চাকরি পায়, সে জন্য আমি মোটামুটি একটা সিস্টেম করেছি। আমি তো আমার অফিসারকে বলে দেব, আমার লোককে চাকরি দিতে হবে। ... তিনজনের মধ্যে দলের ছেলেটি যদি সবচেয়ে খারাপও করে সে ক্ষেত্রেও যেন দলের বাইরে কেউ নিয়োগ না পায়। আমি সবাইকে বলি, যদি কিছু নিতে হয়, নিজের কর্মীদের কাছ থেকেই নিতে।’

ডা. সৈয়দ মোদাচ্ছের আলী
উপদেষ্টা, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়
[সূত্র : প্রথম আলো, ২১-৯-২০১০, পৃষ্ঠা-২৪]

পুনশ্চ: রাশিয়া থেকে বাংলাদেশ ,কিছু কি বদলাচ্ছে !!!!

     
Untitled Document
Total Visitor : 709045
সাপলুডু মূলপাতা | মতামত Contact : shapludu@gmail.com
Copyright © Life Bangladesh Developed and Maintained By :