Untitled Document
কার্তিক সংখ্যা ১৪১৭
মূলপাতা শিরোনাম বটতলা পঞ্জিকা প্রদর্শনী

গরমের ছুটিতে নেড়ুদা (ও টুটুন)
- রজত শুভ্র বন্দোপাধ্যায়
 

অবশেষে ক্লাস এইটের হাফ-ইয়ার্লি পরীক্ষা শেষ হল, আমাদের তখন বেশ কয়েকদিন ছুটি। তারই মধ্যে একদিন বিকেলে বাপ্পার ডাকে সাড়া দিয়ে আমরা কজন এসে জমায়েত হয়েছি যতিন দাস রোডে দীপুদের বাড়ির রোয়াকে – আমরা বলতে বাপ্পা, লাট্টু, গদাই, দীপু, আমি এবং অবশ্যই নেড়ুদা।

দীপুর বাবা-মা যাত্রা থিয়েটার করতেন, হই হই করে জীবন কাটাতেন, আর আমাদের সক্কলকে খুব স্নেহ করতেন। দীপুর বাবা সুব্রত সেন শর্মা সেকালের পরিচিত অভিনেতা, বহু বাংলা ছবিতেও অভিনয় করেছেন, যেমন মানিক বাবুর ‘নায়ক’ ছবিতে তিনি শর্মিলা ঠাকুরের দাদা হয়েছিলেন। তবে তাঁর সব থেকে বড় গুণ ছিল, তাঁর বাড়ির রোয়াকে বসে আড্ডা মারলে তিনি (অন্যান্য বড়দের মত) আমাদের একটুও বকতেন না। আর দীপুর মা? উফ্‌! কি বলব, ভাল ভাল জলখাবার বানিয়ে আমাদের খাওয়ানোই যেন মাসীমার জীবনের একমাত্র কাজ!

দীপুদের তিন চার বাড়ি পরেই প্রবালদের বাড়ি। প্রবাল আমাদের স্কুলে ক্লাস এইটেই পড়ত, তবে অন্য সেকশনে। প্রবালের বাবা প্রলয়বাবু সে যুগের নামকরা সাংবাদিক -  ভীষণ রাগী মানুষ! প্রবালকে নাকি খুব পেটাতেন! (অবশ্য প্রবাল এমনই ছেলে যে অনেকেই ওর ওপর রেগে থাকত - আমারও ওকে মাঝে মাঝে পেটাতে ইচ্ছে করত, তবে সাহস পেতুম না!) কিছুদিন আগেই প্রলয়বাবু নাকি নেড়ুদাকে দীপুদের রোয়াকে বসে বিড়ি টানতে দেখে বিশ্রীভাবে বকেছিলেন – পরে নাকি দীপুর মা-বাবাকেও লেক্‌চার দিয়েছিলেন, কেন তাঁরা এসব ‘লোফার’কে এত প্রশ্রয় দেন।

যাই হোক, আমরা তো সেদিন রোয়াকে বসে গপ্প করছি, এমন সময় হঠাৎ দেখি হেলতে দুলতে টুটুন আসছে! টুটুন ছিল এক অদ্ভূত ছেলে – খুবই ভালমানুষ গোছের, বয়েসে নাকি নেড়ুদার থেকেও এক বছরের বড়। সে সবাইকে ‘তুমি’ বলত, ক্লাসের বন্ধুদেরও, কখনও কখনও আবার বড়দেরও! সে ছিল খানিক ‘স্লো’ গোছের, ফলে বার বার ফেল করে সেও তখন আমাদের সঙ্গেই পড়ে, প্রবালদের সেকশনে। ক্লাস এইটেই তার তখন মুখ ভরা দাড়ি গোঁফের আভাস, ভারিক্কি চেহারা আর বেজায় মোটা গলা। 

টুটুনকে দেখে নেড়ুদা ভীষণ খুশি – যতই হোক বহু বছরের পরিচয় তো! বলল, ‘কিরে টুটুন, এখানে হঠাৎ কি করছিস?” টুটুন এক দৃষ্টে নেড়ুদার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল, তারপর হেঁড়ে গলায় বলল, “মা বলে দিয়েছে তোমার সঙ্গে বেশী না মিশতে, বুদ্ধি বাড়াবার মন্ত্র বলে তুমি যেগুলো আমাকে শিখিয়েছিলে সেগুলো আসলে খুব বিচ্ছিরি কথা।”

নেড়ুদা নির্বিকার, বলল, “ঠিক বলেছেন মাসীমা। একদম বেশী মিশিস না, একটু একটু মিশবি। তা, হঠাৎ এপাড়ায়, কি ব্যাপার রে?” একটু একটু মেশার কথায় টুটুন যেন কিছুটা আশ্বস্ত হল, অল্প হেসে বলল, “প্রবালের কাছে এসেছি, একটা বই নেব। কোনটা যেন ওর বাড়ি?” আমি দেখিয়ে দিলুম, “ওই যে হলুদ রঙের তিনতলা বাড়িটা, ওরা থাকে দু’তলায়।” টুটুন জিজ্ঞেস করল, “দু’তলায় উঠতে হবে? কোন দিকে সিঁড়ি?”

ওমনি নেড়ুদা বলল, “সিঁড়ির কি দরকার, খামোকা ওপরে যাবি কেন? ওই বারান্দার তলায় দাঁড়িয়ে ওকে ডাক না, ও নেমে আসবে। তবে হ্যাঁ, ওর বাড়ির নাম কিন্তু প্রবাল নয়, প্রলয়”। টুটুন তো অবাক (আমরাও!) কিছুক্ষণ ফ্যাল ফ্যাল করে নেড়ুদার দিকে তাকিয়ে টুটুন বলল, “প্রলয়? কেন?” নেড়ুদা বলল, “কেন মানে? আরে! ওটা ওর ডাক নাম! তোর ডাক নাম নেই? যা, যা, ওই বারান্দার সামনে গিয়ে প্রলয় প্রলয় বলে ডাক, বাড়িতেই আছে, চলে আসবে।”

টুটুন ধীরে ধীরে প্রবালদের বারান্দার সামনে গিয়ে সেই বিখ্যাত অজিতেশ মার্কা গলায় ডাকতে লাগল, “প্রলয়, প্রলয়, প্র-ল-য়!” কিছুক্ষণ বাদেই দেখি প্রলয়বাবু দু’তলার বারান্দায় বেরিয়ে এলেন, “কে? কে? কে” বলতে বলতে, আর ওদিকের জানালায় দেখি প্রবাল পর্দা সরিয়ে উঁকি মারছে আর প্রাণপনে হাত নাড়ছে! কিন্ত টুটুনের সেদিকে ভ্রুক্ষেপই নেই, ভারি গলায় বলল, “মেসোমশাই, প্রলয় আছে?”

প্রলয়বাবু ভয়ানক চটে গিয়ে বললেন, “প্রলয় আছে মানে? ফাজলামো হচ্ছে আমার সঙ্গে? জ্যাঠা ছেলে কোথাকার! কে তুমি?”

এবার টুটুনও খানিকটা চটে গিয়ে বলল, “আমি টুটুন, আমার একটা বই আছে প্রলয়ের কাছে, ওকে ডেকে দাও না তাড়াতাড়ি।”

প্রলয়বাবু তো শুনে প্রায় ফেটে পড়লেন, চিৎকার করে বললেন, “মস্করা মারছো আমার সঙ্গে, তুমি তো দেখছি ভয়ানক বেয়াদপ ছোকরা! যাও, চলে যাও এখান থেকে, এক্ষুণি যাও!”

প্রলয়বাবুর সেই হুঙ্কার শুনে টুটুন যেন কিরকম থতমত খেয়ে গেল, তবে সেও ঘাবড়াবার পাত্র নয়, বার দুয়েক ঢোঁক গিলেই মাথা উঁচিয়ে হেঁড়ে গলায় ডাকতে লাগল, “প্র-ল-য়, প্রলয়, এই প্রলয়...”   

ততক্ষণে দেখি গুটি গুটি পায়ে প্রবাল বারান্দায় বেরিয়ে এসেছে। মিন মিন করে বাবাকে বলল, “ঠিক আছে, ঠিক আছে, আমার কাছে এসেছে।” ওমনি প্রলয়বাবু ঠাস্‌ করে প্রবালের গালে একটা থাপ্পড় মেরে চিবোতে চিবোতে বললেন, “তোমার কাছে এসেছে মানে?” (ঠাস্‌!) “তোমার কাছে এসেছে তো আমাকে ডাকছে কেন? (ঠাস্‌!) “ওরকম চেচাঁচ্ছেই বা কেন ষাঁড়ের মত?” (ঠাস্‌! ঠাস্‌! ঠাস্‌!) বলে গজ গজ করতে করতে ভেতরে চলে গেলেন। প্রবাল তখন ওপরে দু’গালে হাত বোলাচ্ছে, আর তলা থেকে টুটুন গম্ভীর ভাবে বলে চলেছে, “এই প্রলয়, আমার বইটা দেবে না? দাও না! এই প্রলয়, আমার বইটা দেবে না? প্রলয়? প্রলয়?”

দীপুদের বাড়ির ভিতর থেকে হঠাৎ শুনি মাসীমার গলা, “হ্যাঁরে! তোরা চা-জলখাবার খাবি না? আয়, আয়, ভেতরে আয়!”

[এরপর, যতদূর জানি, প্রবাল আর কখনও কারোর বই নেয় নি!]
     
Untitled Document
Total Visitor : 709956
সাপলুডু মূলপাতা | মতামত Contact : shapludu@gmail.com
Copyright © Life Bangladesh Developed and Maintained By :