Untitled Document
কার্তিক সংখ্যা ১৪১৭
মূলপাতা শিরোনাম বটতলা পঞ্জিকা প্রদর্শনী
এন. জি.
-সামিও শীশ
 

পড়ন্ত বিকেল। সূর্যের আলোর তেজ কমে আসছে, পেরুচ্ছে গোধূলি সময়। এই সময় রাস্তার পাশে গাড়ি থামাতে বললেন হামিদ সাহেব। ক্যামেরাম্যান, সাউন্ড রেকর্ডিস্টকে সাথে আসতে বলেন। ক্যামেরাম্যান একটু অবাক আর বিরক্তও। একে সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনি  গেছে, তারপর এত কম আলোতে ছবি ভাল আসবে না - প্রডিউসার হামিদ সাহেব যদি এই সামান্য টেকনিকাল বিষয়টুকুও না বুঝতে পারেন তবে চলবে কিভাবে? নন টেকনিকাল মানুষের সাথে কাজ করার এই হচ্ছে সমস্যা।
হামিদ সাহেব শ্যুটিং ইউনিটের কয়েকজনকে নিয়ে একটা ভঙ্গুর, অন্ধকার ঘর খুঁজে বের করলেন। জীর্ণ ঘরটির সামনে দাঁড়ালেন তিনি।

আজ থেকে অনেক বছর আগেও একবার একজন এখানে দাঁড়িয়েছিলেন। তবে তখন অন্ধকার ছিল আরও বেশি। অনেক বছর আগের সেই রাতের কথা বলার আগে আজকে সকালের ঘটনা একটু বলা যাক।

ক্যামেরা, ট্রাইপড, রিফ্লেক্টর, সাউন্ড রেকর্ডার, বুমস্টিক একে একে সব নামানো হচ্ছে, ইউনিটের সবার মাঝে ছুটাছুটি বেড়ে গেছে, চারপাশে বেশ একটু সাড়া পড়ে গেছে, ভিড় বাড়ছে। আউটডোর শ্যুটিং এর সময় ভীড়ের দৃশ্য তাদের জন্য খুবই স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু গ্রামবাসীর জন্য এটি এক মহা চাঞ্চল্যকর ঘটনা। বিভিন্ন বয়সের মানুষ গোল করে দাঁড়িয়ে আছে, দাঁড়িয়ে আয়োজন দেখছে। প্রোডাকশনের ছেলেরা দৌড়াচ্ছে, ডিরেক্টর ক্যামেরাম্যানের সাথে কথা বলছেন, ক্যামেরার সহযোগীরা রিফ্লেক্টর নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, আরেকজন কাঁধ থেকে ট্রাইপড নামিয়ে তাতে ক্যামেরা বসিয়ে হোয়াইট ব্যালেন্স করছে। কানে হেড ফোন পরে সাউন্ড রেকর্ডিস্ট বসেছেন, তার সহকারী বুমস্টিক ধরছে। উপস্থাপিকা মুখে হালকা মেকআপ নিচ্ছেন, আর একটু পর পর আয়নায় মুখ দেখছেন।
সারি করে একদল মহিলা বসে আছেন। মুক্তিযুদ্ধে তাদের অভিজ্ঞতা, স্বজন হারানোর বেদনা, অবদান এইসব বিষয় নিয়ে ইন্টারভিউ শুট করা হবে। পুরো ইউনিট এখন অনুষ্ঠান তৈরির জন্য রেডি, ক্যামেরা অন করা হয়েছে, বুমস্টিক ধরা হয়েছে। প্রথমে এস্টাবলিশ বা মাস্টারশট নেয়া হচ্ছে।
মাটিতে পাতা মাদুরে মাঝ-বুড়ো বয়সের বেশ কয়েকজন মহিলা বসে আছেন, তাদের কারো স্বামী, কারো পুত্র যুদ্ধে শহীদ হয়েছেন। লং শট নেবার পর এখন ট্র্যাক করে কয়েক এ্যাঙ্গেলে শট নেয়া

 

হচ্ছে। মহিলাদের মাঝে কেউ চোখ বড় করে, কেউ আবার আঁচল মুখে কামড়ে আছেন, আবার একজন একেবারে ভাবলেশহীন মুখ করে বসে আছেন। এস্টাবলিশ শট নেয়া শেষ হল।

এখন ক্যামেরা ট্র্যাক থেকে উঠিয়ে অন্যদিকে বসানো হবে। কাজে সাহায্য করছে স্থানীয় সাংস্কৃতিক সংগঠনের কর্মীরা, তাদের উৎসাহ খুবই বেশি। তাদের মাঝের একজনের চোখ পড়ল ভাবলেশহীন মহিলার প্রতি। তিনি তাড়াতাড়ি করে পরিচালকের কাছে তথ্য ফাঁস করলেন যে মহিলাটির কেউ যুদ্ধে শহীদ হননি।
পরিচালক খুবই রেগে গেছেন। এতগুলো শট এন.জি. হবে। সমস্ত খাটাখাটনি বরবাদ। সময় নষ্ট হল, মেজাজ খিঁচড়ে যাচ্ছে।
তারপর স্থানীয় কর্মীরা মহিলাটিকে সরিয়ে দিলেন, তিনিও কোনো উচ্চবাচ্য না করে উঠে হাঁটা দিলেন। শেষ পর্যন্ত প্রচুর খাটাখাটনির পর বিকালবেলা শুটিং প্যাক আপ হল। কাজটা ভালই হয়েছে। অনেক মর্মান্তিক ঘটনার কথা এসেছে - ছেলে যুদ্ধে গেছে, ফিরেনি, তার লাশ কোথায় জানা যায় নি; বিয়ের তিনমাস পর স্বামী যুদ্ধে গেছেন, ফিরেছেন পঙ্গু হয়ে এবং ফিরবার কয়েক মাস পর যন্ত্রণাকাতর অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন; এক মায়ের চার ছেলে ও একমাত্র মেয়ের জামাই মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছেন; গুলির শব্দে কেঁদে ওঠা ছমাসের শিশুর কান্নার আওয়াজ চাপা দিতে মা বুকে চেপে ধরে রেখেছিলেন, কিছু পরে মা বুঝতে পারেন শিশুর দম বন্ধ হয়ে গেছে।

কাজ শেষে দুমাইক্রোবাস বোঝাই পুরো ইউনিট ক্রু ফিরে যাচ্ছে, গাড়ি ছুটছে। ছুটতে ছুটতে হঠাৎ পথের ধারের একটা বাড়ির কাছে গাড়িটি যখন থামল, তখন সূর্য ডুবে চারদিক অন্ধকার। হামিদ সাহেব নামলেন, ঘরের দরজার সামনে উঠানে দাঁড়ালেন।
একটু আগে বলা হয়েছিল, আজ থেকে অনেক বছর আগে এমনি এক বেলা শেষের অন্ধকারে একজন এই বাড়ির দরজার সামনের উঠানে দাঁড়িয়েছিলেন। সেই কথায় আসার আগে আরও কিছু ছিটেফোঁটা কথা শোনা যাক।

এই উঠোনে এক সময় ঘাস ছিল, এর উপর দিয়ে মুরগির বাচ্চা কুটুর কুটুর করতো। তাদের সাথে ঘুরঘুর করত লাল ফ্রক পরা ছোট্ট একটি মেয়ে। মেয়েটি কখনও খিলখিল করে হাসত, কখনও আবার উ উ করে কাঁদত। এই উঠোনেই গোল হয়ে হামাগুড়ি দিতে দিতেই কোনো একসময় হাঁটতে শিখল, এ উঠোনেই তার হাঁটা, কখনও দৌঁড়, ছুটোছুটি। এই করে করেই কাটে দিন শেষে সপ্তাহ, সপ্তাহ শেষে মাস, মাস শেষে বছর।
কয়েক বছর পর একদিন কাঁদতে কাঁদতে উঠোন ছেড়ে সে চলে যায় আরেক বাড়িতে। পরনে লাল শাড়ি, কপালে লাল টিপ। তিক্ত কটু কথা, কখনও চড়-থাপ্পড় খেয়ে সময় কেটে যায়। ফুঁপিয়ে নিঃশব্দে কাঁদে। কিন্তু কোনো রা করে না।
কাঁদতে কাঁদতে সময় কেটে যায়, এর ফাঁকে তার কোলে সুতীব্র চিৎকার করে আসে এক পুত্র। দুতিন বছর কেটে যায়, দেখা যায় এই পুত্র মায়ের মতো কেবল পুরোপুরি চুপই নয়, বাড়তি আছে কানে না শোনা।  বোবা-কালা সন্তান জন্ম দেবার অপরাধে স্বামী পরিত্যক্তা হয়ে শিশুটিকে কোলে নিয়ে আবার এই উঠোনে ফিরে আসতে হয় তাকে।

পিঁপড়াকে তাড়া করে, ধুলোবালিতে খালি পায়ে ছুটে চলে আর বনে-বাদাড়ে লতা-পাতা-ঘাসের সাথে ঘুরে ঘুরে একা একা একটি ছেলে বেড়ে ওঠে। খুব ক্ষুধার জ্বালা হলে মাঝে মাঝে ই ই... করে চিৎকার করে, এর বাইরে ছেলেটি কোনো কথা বলে না। বলা না বলার বৈশিষ্ট্যই এই ছেলেটিকে একটি আলাদা পরিচয় দিয়েছে, এই পরিচয়ের কারণেই হয়তো কেমন কেমন করে যেন ছেলেটির নাম হয়ে গেছে বলাই। 
বলাইয়ের সারাটি দিন কাটে গাছ-গাছাড়া-আগাছা ঘেঁটে, ঘাসে ঘাসে পা ফেলে, ফড়িংকে তাড়া করে। দিন কাটতে থাকে, সে বড় হতে থাকে, সেইসাথে তার গণ্ডিও বাড়ে। ঘরের উঠোন ছেড়ে বাড়ির চারপাশ, তারপর আরেকটু দূরে পুকুর পেরিয়ে জঙ্গলাকে নিয়ে বলাইয়ের ভুবন গড়ে ওঠে।
সেইসময় সর্বত্র মেতেছিল মিছিলে, মুখরিত ছিল শ্লোগানে। সবাই যখন আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে মুক্তির আওয়াজ তোলে আর সেই গর্জন ছড়িয়ে পড়ে সবার কানে, তোলপাড় তোলে সবার মনে। শুধু একজন ছাড়া যে শ্লোগান শোনেও না, দেয়ও না, এমনকি জানেও না।
মিলিটারি আসছে, মিলিটারি আসছে - বার্তা রটে গেল দিকে দিকে। ভয়াবহ আতংকের সময়, মুঠোর মধ্যে জান নিয়ে সবাই ছুটে পালাচ্ছে, প্রচণ্ড ধুলা উড়িয়ে গর্জন করতে করতে ছুটে আসছে ট্যাঙ্ক। চারদিকে আগুন লাগাতে লাগাতে আসছে আর্মি। মিলিটারি... মিলিটারি... এই আর্ত চিৎকারের সাথে মিশছে পুরো গ্রামের কান্নার আওয়াজ।
শুধু বলাই কোন আওয়াজ শুনতে পারছে না। সে আপন মনে গাছ, লতা, পাতার জগতে ঘুরে  বেড়াচ্ছে। ঘাসে ঘাসে পা ফেলছে, কখনও বসে, কখনও ঝুঁকে বসে দেখছে দুটি সবুজ ঘাসে ডগার মধ্যে

 

একটি সাদা ফুল, তার উপর একটি ফড়িং উড়ে বসেছে - বলাই চোখ বড় করে, মুখ হা করে  দেখে। ফড়িংটি আবার উড়ে যায়, বলাইও সেই ফড়িংটির খোঁজে ছুটে বেড়ায়।
মরণ কামড়ের ছোবল থেকে প্রাণটুকু বাঁচাতে সবাই দিগি¦দিক শূন্য হয়ে ছুটে চলছে, - কান্না আর ভয় মেশানো চিৎকার আর একইসাথে অসহায়, আতঙ্কিত মুখ নিয়ে অনিশ্চিত দিকে ছুটছে। মানুষ পালাবার দৃশ্য দূর থেকে দেখলে মনে হয় মহাপ্লাবনের স্রোত। এই স্রোতের বিপরীত যাত্রী শুধু একজন -  বলাইয়ের মা।
জঙ্গলার মাঝে বসে আছে বলাই। বলাইয়ের মা তাকে খুঁজে  বেড়ান - যদিও ভাল করেই জানেন ডাক দিয়ে লাভ নেই - তবুও দুএকবার বলাইয়ের নাম ধরে ডেকে ওঠেন, ডাকতে ডাকতে জঙ্গলার দিকে এগিয়ে যান। বলাই আপন মনে বসে আছে, একটা গিরগিটি গাছ বেয়ে উঠছে - চোখ বড় বড় করে তা-ই দেখছে ।

প্রচণ্ড শব্দ করে, চারপাশ ধুলা ছড়াতে ছড়াতে একটার পর একটা মিলিটারি জিপ আর ট্রাক আসছে। বলাইয়ের মা দূর থেকে গর্জন শুনতে পারছেন আর জোরে দৌড় লাগালেন, ছুটে বলাইকে ধরলেন। বলাইকে নিয়ে আরও গভীর জঙ্গলের দিকে ছুটছেন, রাস্তার মধ্যে কাঁটা ঝোপ। বলাই উ, উ করছে, পায়ে কাঁটা বিঁধবার যন্ত্রণা হচ্ছে। কাঁটাগুলো পায়ের পাতা ফুঁড়ে অনেকটা ভিতরে ঢুকে গেছে। বলাইয়ের মা এই অবস্থাতেও বলাইকে ছেঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছেন, এক দণ্ড দাঁড়িয়ে পায়ে ফুটা কাঁটাগুলো বের করার সময় নেই।  বলাই যন্ত্রণায় কুঁকড়াচ্ছে। ভাগ্যিস বলাই কথা বলতে পারে না - নইলে এই সময় চিৎকার করে কিছু বললে পরিণতি কী হত তা ভাবলেও শিউড়ে উঠতে হয়।
বিকেলের রোদ কমে আসছে, চারপাশ অন্ধকার হয়েছে, আর কোথাও কোনো শব্দ নেই। পুরো খালি গ্রামে দুজন মানুষ - বলাই আর তার মা। বলাইকে নিয়ে তার মা ঘরে ফিরেছেন। বলাইয়ের পা থেকে গলগলিয়ে রক্ত ঝরছে। পা থেকে গলগলিয়ে পড়া রক্ত উঠোনের মাঝে লাল রঙের সারি এঁকে দিয়েছে।
বলাইয়ের মা হারিকেনের আলোয় বলাইয়ের পায়ে ফোটা কাঁটাগুলো বের করছেন। পায়ের পাতায় শুধু না, গোড়ালিতেও ফুটেছে কাঁটা। পায়ের পাতা আর গোড়ালির মাঝে অনেকটুকু ফুটো হয়ে গেছে। হাঁটু আর পায়ের চামড়ার জায়গায় জায়গায় ছিলা, রক্ত গড়াচ্ছে।
যন্ত্রণার উপশম হয় নি, কিন্তু কুঁকড়াতে, কুঁকড়াতে শেষ পর্যন্ত কাতরাবার শক্তিটুকুও নিঃশেষিত। ঘরের চারপাশ আরও বেশি নিথর, নিশ্চুপ হলো। নিঃশব্দ সময়ে বলাইয়ের মা শুনতে পেলেন দরজার বাইরে থেকে কাতরাবার আওয়াজ ভেসে আসছে। বলাইয়ের মা দরজা খুললেন।
বাইরে নিকষকালো অন্ধকার। ঘরের ভিতর থেকে আসা আবছা হারিকেনের আলোতে বলাইয়ের মা বুঝেন দরজার সামনে কেউ একজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। বলাইয়ের মা ঘর থেকে বেরুলেন।  দেখেন একজন  ছেলে দাঁড়িয়ে আছে, বলাইয়ের মা আরও কাছে যান। ছেলেটির পা গড়িয়ে রক্ত পড়ছে। বলাইয়ের মা ছেলেটিকে ঘরের ভিতর নিয়ে আসেন।
হারিকেনের আলোতে দেখেন ছেলেটির বয়স বলাইয়ের কাছাকাছি হবে, তারও পা গড়িয়েও রক্ত ঝরছে, তবে এর হাতে একটি বন্দুকের মতো অস্ত্র আছে। বলাইয়ের মা তাকে আস্তে করে কিছু জিজ্ঞাসা করতে যাচ্ছিলেন, এমনি সময় বাইরে থেকে কার যেন গলা শুনতে পান।
ঘরের উঠানে দুইজন মিলিটারি দাঁড়িয়েছে। রক্ত দেখে দেখে ট্র্যাক করতে করতে তারা এই ঘরের কাছে চলে এসেছে। বলাইয়ের মা আবার ঘর থেকে বের হলেন।
দুইটা মিলিটারি জোয়ান ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে। ঘরে কোন ছেলে এসেছে কি না জানতে চাইলে, বলাইয়ের মা হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়েন। মিলিটারি জোয়ান দুইটা ঘরের ভিতরে আসে।

ঘরের ভিতরে ঘুটঘুটে অন্ধকার। ছেলেটি বুঝতে পারছে ঘরের ভিতর মিলিটারিরা আসছে। ঘরের মহিলাটি তাকে ধরিয়ে দিচ্ছে, হঠাৎ মনে হলো ধরা দেবার আগে অন্ততঃ এদের সাথে শেষ লড়াইটা করতে হবে। ছেলেটি চৌকির নিচে অস্ত্র নিয়ে ঢুকল।
বলাইয়ের মা আর দুই মিলিটারি জোয়ান ঘরের ভিতর ঢুকল। বলাইয়ের মায়ের হাতে হারিকেন। হারিকেনটি দিয়ে তিনি ঘরের দেয়ালে আলো ফেলছেন। ঘরের দেয়ালে একটা আয়না, ঘরের একপাশে হাঁড়ি পাতিল পড়ে আছে। তিনি হারিকেনটি ঘুরাচ্ছেন। হারিকেনের আলো তিনি বলাইয়ের উপর ফেললেন, বলাইকে দেখিয়ে দেন। মিলিটারি দুইজন দেখে ছেলেটির পা থেকে গলগলিয়ে রক্ত ঝরছে। বুঝে যে তাদের ছোড়া গুলিটি ঠিকই পায়ে লেগেছে। তারা বলাইয়ের ঘাড় ধরে টেনে তোলে। বলাইয়ের মা দেখেন ফুটা হয়ে যাওয়া পা থেকে গলগলিয়ে রক্ত ঝরছে আর সেই পায়ের পাতার উপর বুট দিয়ে চাপা দিচ্ছে জোয়ান ছেলে দুইটি, বলাইয়ের ঘাড় ধরে কোমরে বন্দুকের বাট দিয়ে বাড়ি দিতে দিতে ঘর থেকে বের করে নিয়ে গেল। তার সাথে বেয়নেট দিয়ে শরীরের নানা জায়গায় খোঁচাচ্ছে। বলাই আগের চেয়েও জোরে জোরে উ.. উ.. করছে।

 

এই অন্ধকার রাতও এক সময় শেষ হয়। এই উঠোনে ছড়ানো ছিটানো রক্তের কণাগুলো দিনের রোদে ধীরে ধীরে শুকিয়ে যায়, এক সময় বৃষ্টি নেমে তাকে ধুয়ে মুছে দেয়।
সেই রাত শেষে আসে ভোর, ধাপে ধাপে আসে পড়ন্ত বিকেলটি। আবার সেই উঠোনে একজন মানুষ দাঁড়ান। ঘরের ভেতর থেকে একজন মহিলা বেরিয়ে আসেন, এ মহিলার জন্যে আজ শুটিংয়ের অনেক শট এন.জি. হয়েছে। হামিদ সাহেব ক্যামেরাম্যানকে ক্যামেরা সারাক্ষণ অন রাখতে বলেছেন। সাউন্ড রেকর্ডিস্টকেও সারাক্ষণ প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। হামিদ সাহেব কিছুক্ষণ চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন, তারপর তাকে জিজ্ঞাসা করেন, আপনার মনে পড়ে ঐ রাতের কথা। একটা ছেলে এসেছিল আপনার ঘরে, পায়ে গুলি। আপনি আমার জীবন বাঁচিয়েছিলেন।
মহিলা চুপ করে আছেন। চারদিক দেখছেন। ক্যামেরাম্যান ফ্রেম ঠিক করে ফেলেছে, সাউন্ডের ছেলেটি বুমস্টিক ধরে আছে। মহিলাটি অন্যদিকে মুখ ঘুরালেন।
হামিদ সাহেব আবার বললেন, আপনি একটু ঐ রাতটির কথা বলবেন?
মহিলা নির্বিকার। মুখ ঘুরিয়ে খুব আস্তে বিড়বিড় করে অন্যদিকে হাঁটতে হাঁটতে ফ্রেমের বাইরে চলে গেছেন, খুব আস্তে একটা কথা বললেন, এতো আস্তে যে বুমস্টিক দিয়েও কথাটি রেকর্ড করা গেল না। যদি রেকর্ড হত তবে শোনা যেত কথাটি হচ্ছে,ভুইলা গেছি।’
     
Untitled Document
Total Visitor : 709329
সাপলুডু মূলপাতা | মতামত Contact : shapludu@gmail.com
Copyright © Life Bangladesh Developed and Maintained By :