Untitled Document
অগ্রহায়ণ সংখ্যা ১৪১৭
মূলপাতা শিরোনাম বটতলা পঞ্জিকা প্রদর্শনী

ধ্রুপদী থেকে
(মুহম্মদ খসরু সম্পাদিত পত্রিকা)
বইয়ের জন্য ছবি, ছবির জন্য বই?
- রণেশ দাশ গুপ্ত
নাজিম হিকমতের কাব্যনাট্যের ভিত্তিতে তৈরি শিরি ফরহাদ ছবিটি যখন (সম্ভবত) পূর্ব পাকিস্তানের একটি প্রেক্ষাগৃহে দেখানো হয়েছিল, তখন দর্শকদের অনেকের মনেই জেগেছিল একাধিক প্রশ্ন। আজও সেসব প্রশ্ন সেদিনকার দর্শকদের মনে থাকার কথা। মূল প্রশ্ন সম্ভবত এইযে, বুলগেরিয়াতে নির্মিত এ ছবিটির চলচ্চিত্রকাররা চিত্রনাট্য রচনার সময় মূল বই থেকে কতটা সরে গিয়েছিলেন? আবার নাজিম হিকমতের তত্ত্বাবধানে ছবিটি তৈরি হওয়াতে এবং তার কবিতার পংক্তি দিয়ে সমস্ত চিত্র কাহিনীটি মালার মতো গাঁথা থাকায় এ প্রশ্ন নিরন্তর মনে জেগেছে যে, নাজিম হিকমতই কি বর্তমান সমাজবিপ্লবের দুনিয়ার ছাঁচে পুরানো রাজকীয় দুনিয়ার শিরী ফরহাদের কাহিনীর রূপান্তর ঘটিয়ে চলচ্চিত্রকারদের হাতে তুলে দিয়েছিলেন পরিবর্তনের চাবিকাঠি?


 এ ধরনের প্রশ্ন মনে জাগার কারণ এই যে, আলোচ্য ছবিটিতে ফরহাদ পানি কেটে নিয়ে এল তৃষ্ণার্ত জনপদে, আর শিরী সুতা কেটে দিনের পর দিন, বছরের পর বছর কাটিয়ে দিল ফরহাদের প্রতীক্ষায়। জয় হলো প্রেম আর মেহনতের। কালজয়ী প্রেম আর মেহনতের সামনে মৃত্যুর কোনো সুযোগই ঘটলো না থাবা বসাবার। শেষের মিলনের দৃশ্যটাও ছিল আতিশয্যহীন, প্রশান্ত, স্নিগ্ধ। দুর্বার যৌবনের অধিকারী ফরহাদ আর সুস্মিতা কিন্তু অনমনীয়া শিরীর প্রথম দিকের সাক্ষাতকারগুলিতে তারুণ্যের  উদগ্র উচ্ছ্বাস ছিল, সব শেষের সাক্ষাতকারগুলিতে দেখা গেল তার রূপান্তর ঘটেছে। দুটি আত্মা এসে যেন পরস্পরের হাত ধরল সচেতন সমঝোতায়, জনগণের আত্মীয়তা কল্যাণে উৎসর্গীকৃত হয়ে। পূর্ব পাকিস্তানে যেখানে শিরী-ফরহাদের বিয়োগান্তক কহিনী  প্রচলিত এবং ফরহাদের যেখানে দুধের নহর আনার কথা রাজপ্রাসাদে, সেখানে মিলনান্তক কাহিনী এবং জনগণের জন্য নদীর মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে আসার সংগ্রাম কিছুটা বিভ্রান্তির সৃষ্টি করেছে বৈ কি! প্রশ্ন জেগেছে, সমাজতন্ত্রী দেশ বুলগেরিয়াতে ছবি তৈরি হয়েছে বলেই কি চিত্রনাট্যের এই কাঠামো? অথবা হিকমতের মূল কাব্যই কি এর জন্য দায়ী? অথবা তুরস্কে প্রচলিত শিরী-ফরহাদের কাহিনীটা কি এ ধরনের? অথবা চিত্রনাট্য রচয়িতারা কি দেশে দেশে কাব্য, উপন্যাস, ছোটগল্প এবং নাটককে এইভাবে ভেঙ্গে ভেঙ্গে গড়েন?

নাজিম হিকমতের কবিতার দিকে যাদের ঝোঁক আছে তারা নিশ্চয়ই এতসব প্রশ্নের মধ্যে যান নি কিংবা যেতেও চাইবেন না। ছবিটির গায়ে যখন নাজিম হিকমতের দুটি দুটি করে পংক্তি অংকিত হচ্ছিল, তখন তারই দিকে নজর পড়েছিল বেশি। মনে হয়েছে, ছবি অনেক দেখবো তবে এই কবিতার পংক্তিগুলো পড়ার সুযোগ হয়তো জীবনে হবে না। কিন্তু এইভাবে দেখাটাকে সাধারণ নিয়মের মধ্যে ফেলা ঠিক হবে না। চিত্রনাট্য রচয়িতারা জানেন যে, পড়া বই এর ছবি দেখতে বসলেও বই আর ছবির মধ্যে মিল আর অমিল বার করার জন্য দর্শকদের মনে একটা তৃতীয় নেত্র কাজ করতে থাকে। কিন্তু তাঁরা একথাও জানেন এবং বিশ্বাস করেন যে, বই পড়ে যারা ছবি দেখতে আসেন  তাঁদের সংখ্যা মুষ্টিমেয়। সুতরাং শেক্সপীয়রের নাটক থেকে শুরু করে শরৎচন্দ্রের উপন্যাসও চিত্রনাট্য রচয়িতাদের হাতে পড়লে        খোলনালচে পাল্টে যায়। এখানে ব্যাপারটা শুধু পুনর্বিন্যাসে নিবদ্ধ থাকে না, অনেক নতুনতর সংমিশ্রণ ঘটে যায়। অপুর সংসার ছবি দেখতে দেখতে বার বার আমরা যারা অপরাজিত উপন্যাস পড়েছি তাদের মনে হয়েছে, অপর্ণার মৃত্যু সংবাদ শুনে অপুর যে প্রতিক্রিয়া ছবিতে রয়েছে সেরকম কিছু তো উপন্যাসে নেই। কিন্তু চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায় জানেন বৃহত্তর দুনিয়ার যে দর্শকমণ্ডলী অপুর সংসার দেখবেন, তাঁদের অপরিমেয় অধিকাংশই এ প্রশ্ন করবেন না। সুতরাং ছবির জন্যই গল্প, গল্পের জন্য ছবি নয়। শিরী ফরহাদের মতো কাহিনীর ক্ষেত্রে চিত্রনাট্য রচয়িতা কিংবা চলচ্চিত্রকারকে অতিরিক্ত ঝুঁকি নিতে হয়।

নাজিম হিকমতের মূল কাব্যে কি আছে তা জানবার চেষ্টা আপাতত : স্থগিত রেখে ছবির জন্য গল্প কিংবা গল্পের জন্য ছবির প্রশ্নটাই সংক্ষেপে যাচাই করে দেখা যেতে পারে। যদিও আইজেনস্টাইন তাঁর চলচ্চিত্রের ‘আঙ্গিক ও চলচ্চিত্র বোধ’ নামক নিবন্ধগুলোতে বারংবার দেখাতে চেষ্টা করেছেন যে, ঘটনা বিন্যাসের মধ্য দিয়ে শিল্পের স্রষ্টা ও গ্রহীতার মধ্যে যোগস্থাপনের ব্যাপারে সাহিত্য কিংবা চিত্রশিল্পের সঙ্গে চলচ্চিত্রের নিগূঢ় ঐক্য আছে, তবুও তাঁকেও দেখা গেছে চিত্রনাট্য লেখার সময় উপন্যাসকে নতুন করে সাজিয়ে নিয়েছেন। সুতরাং, ‘গল্পের জন্য ছবি’র থেকে অর্থাৎ বই সে যতোই বিখ্যাত হোক না কেন, চিত্রনাট্যের প্রয়োজনের কাছে তার অনেক অংশই গৌণ। বার্ণাড শ’র মতো আত্মসচেতন লেখককেও তাঁর পিগম্যালিয়ন ছবি তৈরির সময় চলচ্চিত্রের প্রয়োজনের সঙ্গে আপোষ করতে হয়েছে। ডি, এইচ, লরেন্সের সানস এ্রান্ড লাভারস  ছবিটি লেখকের মৃত্যুর পরে তৈরি হয়েছে বলেই রক্ষা। হেমিংওয়ে তো তাঁর একটা চিত্ররূপ দেখতে দেখতে হঠাৎ উঠে প্রেক্ষাগৃহ থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন। প্রথম দিকে যখন প্রায় চল্লিশ বছর আগে চলচ্চিত্রকারেরা উপন্যাসের সর্বস্বত্ব কিনে নিয়ে ছবি করতে শুরু করেনÑ বিশেষ করে হলিউডে, তখন বইগুলোতে প্রাধান্য দেয়া হতো সম্ভবত লেখকদের বই বিক্রিতে রাজি করানোর জন্য। কিন্তু পরবর্তীতে চলচ্চিত্রের প্রয়োজন প্রাধান্য বিস্তার করেছে। ‘ফেয়ারওয়েল টু আর্মস’ উপন্যাসের চলচ্চিত্র রূপ দেয়া হয়েছে দুবার। প্রথমবারে  ছবিটি অনেক বেশি গ্রন্থানুগ, দ্বিতীয়বারের ছবিটিতে চলচ্চিত্রের অভিব্যক্তিবাদী দৃষ্টিভঙ্গি উপন্যাসের চরিত্রগুলোর উপর ফেলতে চেষ্টা করেছে নতুন নতুন আলো। লেখক বেঁচে থাকলে এইসব ছবির টুকরো দেখে থাকলে বিব্রত বোধ করবেন,  এতে আর আশ্চর্যের কি আছে? শরৎচন্দ্রের গৃহদাহ  উপন্যাস যারা দেখেছেন, তাঁরা নিশ্চয়ই লক্ষ্য করেছেন প্রথম দৃশ্যে পালকী থেকে প্রথমে অচলার পা জোড়া নামে এবং তাতে দেখা যায় হিলওয়ালা জুতো। শরৎচন্দ্রকে কি এ দৃশ্য চমকে দেয়নি?

প্রমথেশ বড়–য়া চলচ্চিত্রকার হিসাবে দর্শকের কাছে শিক্ষিতা স্ত্রীর সম্বন্ধে ধারণা দিতে চেষ্টা করেছিলেন এইভাবেই। কিন্তু শরৎচন্দ্র কি ঠিক তাই চেয়েছিলেন? কিন্তু উপায় কি? এইতো চলচ্চিত্রের ধারা। ছবির জন্য বই, বই এর জন্য ছবি নয়।
কিন্তু এ কথার কি এই অর্থ এইযে, চলচ্চিত্রের জন্যই চলচ্চিত্র? শিল্পকলার জন্যই শিল্পকলা? অবশ্যই তা নয়। চলচ্চিত্রের অগ্রসরমান ধারা জীবন-প্রবাহের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলেছে জীবনকে প্রতিফলিত করে, জীবনকে প্রবাহিত করে। মানব মানবীকে জীবনের পথে এগিয়ে দেবার জন্যই শিল্পকলা তথা চলচ্চিত্র নিরন্তর বিকশিত হয়ে চলেছে। ইতালীয় ওপন্যাসিক আলবার্তো মোরেভিয়ার তাগিদে চলচ্চিত্র ও উপন্যাসের উভয়কেই হতে হয়েছে সত্যের সন্ধানী। আমরা এক পা এগিয়ে সংজ্ঞাটাকে বলতে পারি সত্যের জন্য সংগ্রামী। এটা নিছক ঔচিত্যের ব্যাপার নয়। এটাই চলচ্চিত্রের ইতিহাস। ছবির জন্য বই এর তাগিদ নিছক রূপসৃষ্টির তাগিদ নয়। একথা যারা বুঝতে পারবে না, তারা চিরায়ত সাহিত্যকে জীবন্ত করে তুলতে পারবে তাদের ছায়াচিত্রে, রূপকথাকেও পারবে না প্রাণবন্ত করে তুলতে। বিপ্লবীর শতাব্দীর মর্মবাণীকে যে স্পন্দিত করে তুলতে হচ্ছে শেক্সপীয়রের হ্যামলেট- এ কিংবা তলস্তয়ের আনা কারেনিনা তে এটা ইতিহাসের তাগিদ। বই আর ছবি পর্দার উপর সার্থক হয়েও খাপে খাপে যদি না বসে তবে তার মূল কারণ এই বিপ্লবাত্মক প্রয়োজনের রসায়নের তাগিদ। খামখেয়ালীতেও বনিবনা না হতে পারে, কিন্তু সেটা অপ্রধান প্রয়াস, নিতান্ত অস্থায়ী। একথা মনে রেখে চলচ্চিত্রকারকে ইতিহাসের গতিধারার দিকে চোখ রাখতে হয়।                                                   

প্রাপ্তিসূত্রঃ মুহম্মদ খসরু সম্পাদিত বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সংসদ এর পত্রিকা ধ্র“পদী থেকে সংগৃহীত।
     
Untitled Document

পটল ফুল
Total Visitor : 709184
সাপলুডু মূলপাতা | মতামত Contact : shapludu@gmail.com
Copyright © Life Bangladesh Developed and Maintained By :