Untitled Document
অগ্রহায়ণ সংখ্যা ১৪১৭
মূলপাতা শিরোনাম বটতলা পঞ্জিকা প্রদর্শনী
তপ্ত ভাতে নুন জোটে না,
পান্তা ভাতে ঘি...
- শুভ কিবরিয়া
 


বাঙালির স্বভাব নিয়ে রচিত হয়েছে তার প্রবাদ প্রবচন। বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাস চেতনার গৌরব যে কত ফাঁপা এবং দুর্বল, তা তার বলা-চলা, নড়ন-চড়ন দেখলেই বোঝা যায়। বাংলা ভাষার প্রবাদে কেন এমন কথা চালু যে, ‘খেতে পেলে শুতে চায়’? - তার মানে কি?  বাঙালির জীবনের লক্ষ্যই কি শুয়ে পড়া?
সে কেবলই কি খোঁজে উপলক্ষ্য?
হয়ত খেতে চাওয়াটা তার উপলক্ষ্য। লক্ষ্য হচ্ছে শুয়ে পড়া, নেতিয়ে যাওয়া।
কিছু বাঙালি প্রবাদ শোনা যাক :--

১) ‘যে কুকুর ঘেউ ঘেউ করে সে কুকুর কামড়ায় না।’
- অকেজো লোকই মুখে বেশি আস্ফালন করে।
২) ‘মনে করি, করী করি, হয় হয় হয় না।’
- উচ্চ আশা আছে; কিন্তু সামান্য আশাও পূর্ণ হয় না।
৩) ‘বউ উঠতে ঠাঁই পায় না, উঠান জোড়া দাসী।’
- প্রকৃত কাজের ব্যবস্থা নাই; কেবল অপ্রয়োজনীয় কাজের আড়ম্বরে পূর্ণ।
৪) ‘নিজের ভাই ভাত পায় না, শালীর তরে মোন্ডা।’
- ঘরের লোককেই প্রথমে সাহায্য করা উচিত।
৫) ‘ঊনো ভাতে দুনো বল, অতি ভাতে রসাতল।’
- পরিমিত ভোজনে বল বাড়ে, অতি ভোজনে শরীরে রোগ জন্মে।
৬) ‘আসল ঘরে মশাল নেই, ঢেঁকি শালে চাঁদোয়া।’
- যেখানে অনেক লোক সমবেত হবে সেখানে আলো জ্বালাবার ক্ষমতা নাই, আবার বড়াই করে।
৭) ‘আপন হাত জগন্নাথ, পরের হাত এঁটো পাত।’
- নিজের সবটাই ভালো, অন্যের সবই খারাপ।
৮) ‘আনারস বলে কাঁঠাল ভাই, তুমি বড় খসখসে।’
- নিজের দোষ না দেখে অপরের দোষ খোঁজা।

২.
আজ এসব প্রবাদ, উপমা মনে পড়ছে বাংলাদেশের রাজনীতির দিকে চেয়ে। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় নিয়ে ভোট চেয়েছিলেন শেখ হাসিনা। মানুষ তার কথায় বিশ্বাস  করেছিল। মানুষ ভেবেছিল, শেখ হাসিনা যা বলছেন, ভোট পেলেই তাই-ই করবেন। এখন তার কথার ধরন দেখুন।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলছেন-

ক.
‘বিরোধী দলীয় নেত্রী ম্যাট্রিক পরীক্ষায় অংশ নিয়ে শুধু উর্দু আর অঙ্কে পাস করেছেন। তাঁর ছেলে স্কুল কলেজ পর্যায়ে বহিষ্কৃত হয়েছে। একজন স্বশিক্ষিত আর অন্যজন বহিষ্কৃত, এমন নেতৃত্ব বাংলার মানুষ চায় না।’ - শেখ হাসিনা, (প্রথম আলো ॥ ৮ নভেম্বর ২০১০)

খ.
‘বেগম খালেদা জিয়া গভীর রাতে গুলশানের অফিসে বসে করেন কি? তার রাতে অফিস করার উদ্দেশ্য কি? একটি পত্রিকায় দেখলাম বেগম খালেদা জিয়া তার গাড়িতে করে গুলশানের অফিস থেকে সাকা চৌধুরীকে ক্যান্টনমেন্টের বাসায় নিয়ে গেছেন। কী কারণে সাকা চৌধুরীকে বাসায় নিয়ে গিয়েছিলেন?’ - শেখ হাসিনা (বাংলাদেশ প্রতিদিন ॥ ৬ নভেম্বর ২০১০)

       গ.
‘বেগম খালেদা জিয়া ক্ষমতায় আসার আগে সভা-সমাবেশে বলতেন এরশাদ তার স্বামীর হত্যার সঙ্গে জড়িত। তিনি নিজের স্বামীর হত্যাকারীর কাছ থেকে দুটি বাড়িসহ আরও সুযোগ-সুবিধা কী করে নিতে পারেন? এর মাজেজা কি?’ - শেখ হাসিনা,(৬ নভেম্বর ২০১০ ॥ বাংলাদেশ প্রতিদিন)

 

ঘ.
‘খাম্বা বসানোর নামে যারা হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট করেছে, বিদ্যুৎ সমস্যা নিয়ে তাদের মুখে সমালোচনা মানায় না।’ - শেখ হাসিনা,(প্রথম আলো ॥ ৮ নভেম্বর ২০১০)

 

৩.
দ্রব্যমূল্য ভীষণভাবে বাড়ছে। যে সব জিনিসের দাম বাড়ার কথা না তাও লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। চাল, তেল, নুন, পেঁয়াজ, মরিচ, সবজি প্রত্যেকটি জিনিসের দাম এত বাড়ছে যে মানুষ অসহ্য হয়ে উঠছে। বাজারে গেলেই এর তাপ টের পাওয়া যাবে।
খোলা ট্রাকে কম দামের চালের দোকানে মানুষের লাইন দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে।
অথচ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম কমানোর ব্যাপারে সরকারের কোনো উদ্যোগ নেই।
সরকার নিছক হাত-পা গুটিয়ে বসে আছে। ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ বা টিসিবিকে কার্যকর করতে ব্যর্থ হয়েছে সরকার।
ব্যবসায়ীদের হাতে বাজার ছেড়ে দিয়ে এখন তাদের প্রতিদিন ধর্মোপদেশ শোনাচ্ছে মন্ত্রীরা।
দ্রব্যমূল্য বাড়ছে, আর সরকারের মন্ত্রীদের কথাবার্তা শুনুন। দেখুন কি ছরি তাদের কথাবার্তার !!
ক.
‘আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার পাশাপাশি দেশের মানুষের আয় বাড়ার কারণে চালের দাম বেড়েছে।’ - আব্দুর রাজ্জাক
খাদ্য ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রী, (১০ নভেম্বর ২০১০ ॥ কালের কণ্ঠ)
খ.
‘দেশের অধিক জনসংখ্যা, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি ও আন্তর্জাতিক বাজারে দ্রব্যমূল্য বাড়ার জন্য দেশের ভেতরে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখা যাচ্ছে না।’ - আব্দুর রাজ্জাক
খাদ্য ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রী, (২০ অক্টোবর ২০১০ ॥ সমকাল)
গ.
‘দ্রব্যমূল্যের অস্বাভাবিক বৃদ্ধির কারণে সাধারণ মানুষের কাছে ব্যবসায়ীদের আজ কোনো গুরুত্ব নেই। অতি মুনাফালোভী ও মজুদদার হিসেবে গালি শুনতে হয় তাদের। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে ব্যবসায়ীদের নিজের উদ্যোগ নিতে হবে।’ - লে. কর্নেল (অব.) ফারুক খান ,বাণিজ্যমন্ত্রী

 (২৮ অক্টোবর ২০১০ ॥ সমকাল)

 

              মন্ত্রীদের এসব বিচ্ছিরি কথার বিপরীতে দ্রব্যমূল্য বাড়ার বিষয়ে মত রেখেছেন কনজুমার্স এ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক এ্যাডভোকেট হুমায়ুন কবীর ভূঁইয়া। তিনি বলেছেন, ‘দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে সরকারের যথাযথ বাজার পর্যবেক্ষণ ও তদারকি নেই। ফলে মুনাফা লোভী ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট তৈরি করে দ্রব্যমূল্য বাড়িয়ে দিচ্ছেন। অথচ কৃষক উৎপাদিত শস্যের ন্যায্য দাম পাচ্ছে না। ভোক্তাদেরও বেশি দামে পণ্য কিনতে হচ্ছে।’ (১০ নভেম্বর, ২০১০ ॥ কালের কণ্ঠ)

 

৪.
প্রধানমন্ত্রী আর তার মন্ত্রীদের কথা তো শুনলাম। এবার শুনি সরকারি আমলাদের কথা ।
প্রধানমন্ত্রীর নিজের জেলা গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলায় ন্যাশনাল সার্ভিসে চাকরি দেয়ার সময় নিজেদের লোক যথেষ্ট জায়গা না পাওয়ায় ক্ষেপেছে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা। তারা চড়াও হয় স্থানীয় যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার ওপর। তাকে মারধোর করার পর তারা ভাঙচুর চালায় স্থানীয় উপজেলা অফিসার্স আবাসিক এলাকার কোয়ার্টারগুলোতে। এই ভাঙচুর শেষ হওয়ার পর সেখানে আসেন স্থানীয় উপজেলা কর্মকর্তা (ইউএনও) সুভাষ চন্দ্র বিশ্বাস। এবার তার বয়ানে চোখ রাখি-‘সরকারি জানমালের ওপর হামলা বরদাশ্ত করা হবে না। হামলা হলে হাতের বদলে হাত, দাঁতের বদলে দাঁত ও চোখের বদলে চোখ তুলে নেয়া হবে। আমার অফিসে কেউ এই ঘটনা ঘটালে সে যে দলেরই হোক, তার ঠ্যাং ভেঙে দিতাম।’ (প্রথম আলো ॥ ৭ নভেম্বর ২০১০)

৫.
পাঠক আমার নিজের কিছু বলার নাই। শুধু এটুকু বলি, প্রধানমন্ত্রী, দেশের সমস্যার দিকে নজর দিলে ভালো করবেন। রাত-বিরাতে কে কোথায় যায় সেসব শুনে গরীব জনগণের লাভ কি?
আমরা বরং বিএনপি মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ারের পাল্টা প্রশ্ন শুনতে পারি- ‘প্রধানমন্ত্রী কখন কোথায় যান সে প্রশ্ন তো আমরা করি না।’(৮ নভেম্বর ২০১০ ॥ বাংলাদেশ প্রতিদিন)

পুনশ্চ : বাঙালির প্রবাদে ফিরি। একটা প্রবাদে আছে না ‘কেঁচো খুড়তে সাপ...।’


   

                

     
Untitled Document

পটল ফুল
Total Visitor : 708652
সাপলুডু মূলপাতা | মতামত Contact : shapludu@gmail.com
Copyright © Life Bangladesh Developed and Maintained By :