Untitled Document
অগ্রহায়ণ সংখ্যা ১৪১৭
মূলপাতা শিরোনাম বটতলা পঞ্জিকা প্রদর্শনী
বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল
- মার্জিয়া লিপি
 
 
(পূর্ব প্রকাশের পর)

অষ্টম  অধ্যায়
সুন্দরবনের জীব বৈচিত্র্য ও পরিবেশ সংরক্ষণ

ভূমিকাঃ
বাংলাদেশের মোট আয়তনের ৪ দশমিক ২ শতাংশ এবং দেশের মোট বনভূমির ৪৪ শতাংশ জুড়ে দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের সুন্দরবন। স্থানীয়ভাবে বাদাবন হিসেবে পরিচিত পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বনকে  ১৯৯৭ সালের ৬ ডিসেম্বর ইউনেস্কো ঐতিহ্য হিসেবে ঘোষণা করে। বাংলাদেশ ১৯৯২ সালের ২১ মে সুন্দরবনকে দেশের প্রথম “রামসার এলাকা” হিসেবে ঘোষণা করে।

সম্প্রতি সুন্দরবন (২১ জুলাই ২০০৯) পৃথিবীর প্রাকৃতিক সপ্তাচর্য তালিকায় নির্বাচিত হয়েছে। “বিশ্ব ঐতিহ্য” “রামসার এলাকা” সংরক্ষিত বনভূমি বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ অরণ্য প্রাকৃতিক সপ্তাচর্য সুন্দরবন ।

সুন্দরবন বাংলাদেশের জাতীয় সংরক্ষিত বন। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাংশে খুলনা, জেলার কয়রা, দাকোপ, সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর এবং বাগেরহাট জেলার মংলা, মোড়েলগঞ্জ থানা নিয়ে গড়ে উঠেছে প্রাকৃতিক    সৌন্দর্যের লীলাভূমি পৃথিবী বিখ্যাত এই সুন্দরবন । সুন্দরবনের মোট আয়তন ৫ লক্ষ ৭৭ হাজার ২৮৫ হেক্টর অথবা ১০ হাজার বর্গ কিলোমিটার এর মধ্যে বাংলাদেশ অংশে রয়েছে ৫ হাজার ৮ শত বর্গ কিলোমিটার। বন এলাকার আয়তন ৪ লক্ষ ১ হাজার ৬ শত হেক্টর, নদী ও খাল ১ লক্ষ ৭৫ হাজার ৬৮৫ হেক্টর। অর্থাৎ বনের প্রায় ৭০ শতাংশ স্থলভাগ এবং ৩০ শতাংশ জলভাগ। সুন্দরবনের আনুমানিক ৬৫ শতাংশ বাংলাদেশ অংশে ও ভারতীয় অংশে ৩৫ শতাংশ। মোট ৭৫টি কম্পার্টমেন্টের মধ্যে ৫৫টি বাংলাদেশে ও ২০টি ভারতীয় অংশে পড়েছে।

সুন্দরবনের উত্তরে খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা জেলা এবং বসতি অঞ্চল, দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর, পূর্ব দিকে বলেশ্বর নদী এবং পশ্চিমে হরিণভাঙ্গা, রায়মঙ্গল, -- কালিন্দী নদী।

বাংলাদেশের সুন্দরবন ৮৯ ডিগ্রী পূর্ব দ্রাঘিমাংশ থেকে ৮৯ ডিগ্রী ৫৫ মিনিট পূর্ব দ্রাঘিমাংশ এবং ২১ডিগ্রী ৩০ মিনিট উত্তর অক্ষাংশ থেকে ২২ ডিগ্রী ৩০ মিনিট উত্তর অক্ষাংশ পর্যন্ত বিস্তৃত।

বনটি সমুদ্র  পৃষ্ঠ থেকে ০.৯১ মিটার থেকে আরম্ভ করে  ২.১১ মিটার পর্যন্ত উচ্চতায় অবস্থিত।

ক) মাটির বিশেষত্ব ঃ সুন্দরবনের সালফার ও নাইট্রোজেন সমৃদ্ধ মাটি উচ্চতর  ম্যানগ্রোভ প্রজাতির জন্য সহায়ক। মাটি অম্লীয় এবং ক্ষারীয় পলিমুক্ত দোআঁশ। মাটির পিএইচ এর মাত্রা ৫.৪ মতে ৭.৮ এর মধ্যে।

সুন্দরবনকে ম্যানগ্রোভ শব্দটি পর্তুগীজ  থেকে  এসেছে, যার অর্থ স্বতন্ত্র গাছ।  ইংরেজীতে  ঝোপ বা ঝাড়  বোঝাতে শব্দটি ব্যবহৃত হয়। ম্যানগ্রোভকে বাংলায় স্রোতজ বা গরান জাতীয় বন বলা হয়।

য সকল বৈশিষ্ট্য নিয়ে ম্যানগ্রোভ বন জন্মে তা হল ঃ

      সমুদ্র উপকূলে যেখানে জোয়ার-ভাটায় প্লাবিত হয়।
      যে সকল নিচু ও সমতল জায়গা বা চরে সমুদ্রের লবণ ও নদীর মিষ্টি পানির   
স্রোত বয়ে যায়।
      মাটি কর্দমাক্ত ও সমতল
      যে সব খাঁড়ি বা মোহনায় সমুদ্র তরঙ্গের ক্ষুব্ধতা ও বাতাসের প্রাবল্য কম
      যেখানে জলবায়ু উষ্ণ ও আর্দ্র সেখানেই পাড় বেঁধে জন্ম নেয় ম্যানগ্রোভ।

খ) উদ্ভিদ ঃ সুন্দরবনে মোট ৩৩০ প্রজাতির উদ্ভিদ রয়েছে। সুন্দরী গাছের আধিক্যের জন্য অনেকেই বলে থাকে এই জোয়ার-ভাটার বনভূমির নাম সুন্দরবন।  এছাড়া গেওয়া, কেওড়া, বাইন, পশুর, গরান, গোলপাতা, হেতাল, আমুড়, সিংড়া প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য গাছপালা ও ঘাসপাতার নাম। এক সময় এ বনে প্রচুর নল জন্মাত। লম্বা, ফাঁপা, চিকন বাঁশের  মতো উদ্ভিদটির চাহিদা ছিলো প্রচুর। এখন বনে নল বাগান বা  ঝোপ ক্বচিৎ দেখা যায়।

সুন্দরবনে গাছের আগের মতে বৃদ্ধি হচ্ছে না। সুন্দরী গাছ আগামরা রোগে আক্রান্ত। বাংলাদেশ মহাকাশ গবেষণা ও দূর অনুধাবন প্রতিষ্ঠানের গবেষণা পত্রে (১৯৯৩) দেখা যায়, সুন্দরীগাছ গত ৫০ বছর ধরে টপডাইং বা আগামরা রোগে আক্রান্ত।

এখানকার পরিবেশ অন্যান্য বনাঞ্চল থেকে  স্বতন্ত্র। এখানকার পানি অল্প লবণাক্ত অর্থাৎ মিঠা পানি ও সমুদ্রের লবণাক্ত পানির মিশ্রণ ঘটে এ অঞ্চলে। এ বন জোয়ার ভাটার প্রভাবে  প্লাবিত হয়। ফলে  বনের মাটি লবণাক্ত, কর্দমাক্ত ও পলিজ এবং তার ভেতরে অক্সিজেনের অভাব থাকে। তাই এখানকার উদ্ভিদের অভিযোজন অনন্য এবং বিশেষ ধরনের  হয়ে থাকে। যেমনঃ অনেক বৃক্ষের স্বাভাবিক মূল ছাড়াও মাটির উপরে অসংখ্য শ্বাসমূল তৈরী হয় । অনেক বৃক্ষে ফল গাছে থাকতেই বীজের অংকুরোদগম ঘটে। চারা যথেষ্ট বড় ও ভারী হলে ভাটার সময় কাদামাটির মধ্যে খাড়াভাবে পড়ে গেঁথে যায় যাতে জোয়ারের সময় ভেসে না যায়। যেমন ঃ সুন্দরী বৃক্ষ। অনেক গাছের পাতার বৈশিষ্ট্য মরু উদ্ভিদের মত হয়। মাটি নরম  বলে অনেক গাছের ঠেসমূল হয়, যেমনঃ কেয়া গাছ।

সুন্দরবনের গাছপালা চির সবুজ। লবণাক্ততার তারতম্যের কারনে এ বনাঞ্চলে বিভিন্ন ধরনের গাছপালা বিভিন্ন এলাকায় দেখা যায় যেমনঃ

ক) উত্তরাংশে কম লবণাক্ত অঞ্চল।
খ) মাঝে অপেক্ষকৃত বেশী এবং মাঝারি লবণাক্ত এলাকা
গ) সমুদ্রের কাছাকাছি বেশী লবণাক্ত অঞ্চল।

 

জীবজন্তু ঃ

 বৃহত্তম এই ম্যানগ্রোভ একদিকে যেমন স্থলজ জীববৈচিত্র্য ভরপুর তেমনি অন্যদিকে জলজ প্রাণবৈচিত্র্যেও সমৃদ্ধশালী। সুন্দরবন একটি অতুলনীয় ভূখণ্ড যেখানে বাঘ ও অন্যান্য প্রাণী তথা কুমীর, হরিণ, বানর প্রভৃতি একে অপরের নির্ভর করে অপূর্ব বৈশিষ্ট্যে বসবাস করছে। এ বনের বাস্তুসংস্থান কঠিন প্রকৃতির কিন্তু সহনীয়, পারস্পরিক নির্ভরশীল। এ পর্যন্ত ৪২৫ টি বণ্যপ্রানী প্রজাতি সনাক্ত করা হয়েছে এর মধ্যে ৪৯টি  স্তন্যপায়ী, ৩১৫টি পাখি, ৫৩টি সরীসৃপ এবং ৮টি উভচর প্রজাতি।

রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার, চিত্রল হরিণ, বানর, বন্য শূকর, গুইসাপ, ভোদর, অজগর, কুমির প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য বন্যপ্রাণী। বিশ্ব সম্পদ প্রতিবেদন এর এক সূত্রে জানা যায়, সুন্দরবনে বর্তমানে ৩০০-৩৫০ টি রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার, ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ হরিণ, ২০-২৫ হাজার বন্য শূকর, ৪০-৫০ হাজার বনের, ২০-২৫ হাজার উদবিড়াল আছে। ইলিশ, ভেটকি, টেংরা, পারসে, দাতনে, মেদ, পাংগাস, ভাংগান, চিত্রা, উল্লেখযোগ্য মাছ। গলদা, বাগদা, চাকা হরিণা প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য চিংড়ি।

বর্তমানে সুন্দরবনে ৩ প্রজাতির উভচর, ১৪ প্রজাতির পাখি এবং ৫  প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী বিলুপ্ত প্রায়। এ বনের  বিলুপ্ত প্রাণীরা হলো ছোট প্রজাতির এক শিঙ্গা গল্গার, বুনোমহিষ, মার্বেল বিড়াল, বারোশিঙ্গা প্রভৃতি স্তন্যপায়ী প্রাণী, বড় মদনটাক, বেঙ্গল ফ্লোরিক্যান, রাজ শকুন, ময়ূর প্রভৃতি  জগদ্বিখ্যাত রয়েল বেঙ্গল টাইগার, চিত্রল হরিণ, কুমির সুন্দরবনের ঐতিহ্য।

পরিবেশগত সমস্যা ঃ

সুন্দরবন এখন পরিবেশ বিপর্যয়ে রুগ্ন। লক্ষ লক্ষ সুন্দরী গাছ আগামরা  রোগে আক্রান্ত হয়েছে। সেই সঙ্গে গরান, কেওড়া, বাইন, ধুন্দল গাছের অবস্থাও প্রায় এক রকম।

সূত্র মতে, সুন্দরবনের ৯ ও ১০ নম্বর কম্পার্টমেন্টের কাগাখাল, বগাখাল;  ২১ ও ২২ নম্বর কম্পার্টমেন্টের হাড়বাড়ীয়া খাল ও চরাপুটিয়া খাল, ১৫ নম্বর কম্পার্টমেন্টের সিন্দুর কৌটা খাল প্রায় শুকিয়ে গেছে। পূর্ণিমা-অমাবস্যায় সামান্য পানি আসে। বনের ৩০-৩১ কম্পার্টমেন্টের সীমানাবর্তী জোংরা খালেরও একই দশা। ২৯-৩০ কম্পার্টমেন্টের সীমানা মরা পশুর ঝাপসী খাল প্রায় ভরাট। এখানকার পদ্মাবতি খাল ভরাট হয়ে গেছে।  উপরন্তু ছোটখাট খালগুলোর চিহ্ন নেই। ভরাট হয়ে গেছে খাল সংযোগকারী বিভিন্ন ভারানি। সূত্রমতে গড়াই, মধুমতি, বলেশ্বর ধারায় মিষ্টি পানি সুন্দরবনের পূর্বাঞ্চল দিয়ে আসতো। এটাই প্রধানধারা। উজানে গঙ্গা  নদীতে প্রতিবেশী দেশ ভারত ফারাক্কা বাঁধ দেওয়ায় এ ধারাটি একদম নেই বললেই চলে। অবশ্য সাম্প্রতিককালে গড়াই  নদী পুনর্খনন চলছে। কপোতাক্ষ, ইছামতি, রায়মঙ্গলের একটি ক্ষীণধারা পশ্চিম প্রান্তে ছিলো। বর্তমানে মোটেও টিকে নেই। এ সব কারণে সুন্দর বনাঞ্চলের আন্তঃনদী প্রবাহ  মারাত্মক ব্যাহত হয়েছে।

ম্যানগ্রোভ সিলভি কালচার ডিপার্টমেন্টের গবেষণায় টপ ডায়িং এর কারণ সম্পর্কে  জানা যায়, বনাঞ্চলে নোনা পানির আধিক্য, অত্যধিক পলি জমায় ম্যানগ্রোভের শ্বাসক্রিয়ার জন্য প্রয়োজনীয় শ্বাসমূলের স্বাভাবিক ক্রিয়ায় ব্যাঘাত, বনের জমিতে “হিউমাস” এর পরিমান কমে যাওয়া প্রভৃতি।

বিশ্ব ঐতিহ্যঃ

ওয়াল্ড হেরিটেজ কমিটির ১৯৯৭ সালের ৬ই ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত ৭৯৮ তম অধিবেশনে সুন্দরবনকে হ্যারিটেজ সাইট বা বিশ্বসম্পদ হিসাবে স্বীকৃত হয়েছে। হিরনপয়েন্ট সংলগ্ন নীলকমলে “বিশ্ব ঐতিহ্য” ফলক উন্মোচন করা হয়েছে। পৃথিবীতে যে নতুন ৪৬টি বিশ্ব ঐতিহ্য স্থানকে চিহ্নিত ও ঘোষণা দেওয়া হয়েছে সুন্দরবন তার অন্যতম  প্রাকৃতিক সপ্তাচার্য নির্বাচন প্রক্রিয়ায় উত্তীর্ণ ২৮ টি স্থানের মধ্যে সুন্দরবন - বিশ্বের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলকে “অফিসিয়ালে ফাইনালিস্ট ক্যান্ডিডেট” হিসাবে ঘোষনা করা হয়েছে যার মাধ্যমে বিশ্বের বিষ্ময়কর প্রাকৃতিক লীলাক্ষেত্র সুন্দরবনের গুরুত্বকে বিশ্বের দরবারে পুনঃ প্রতিষ্ঠিত করেন।

অর্থনৈতিক গুরুত্ব ঃ

১৯৯৬-৯৭ অর্থ বছরে সুন্দরবন থেকে ১১ কোটি ৫ লক্ষ ৯২ হাজার ৪শত ৪৯ টাকার এবং ১৯৯৫-৯৬ অর্থ বছরে প্রায় ২০ কোটি টাকার রাজস্ব আয় হয়। শুধু তাই নয়, এই বনের কাঠ, মধু, গোলপাতা, মাছ, কাঁকড়া, চিংড়ি, চিংড়ির পোনা, নানা প্রকার সম্পদের উপর হাজার হাজার বাওয়াল, মৌয়াল ও জেলেদের জীবন ও জীবিকা  নির্ভর করে। এক পরিসংখ্যানে দেখা যায় প্রতিদিন গড়ে ৫৪ হাজার মানুষ সুন্দরবনে যায় যার মধ্যে প্রায় ১০ হাজার জেলে এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত মধু সংগ্রহের মৌসুম। বছরে প্রায় ৫ হাজার মৌয়াল আনুমানিক ২০০ মেট্রিক টন মধু সংগ্রহ করে। সুন্দরবনের বনজ সম্পদ আহরণ নিষিদ্ধ হলেও গোলপাতা, গেওয়া ও আগামরা সুন্দরী কাঠ বছরের বিভিন্ন সময়ে আহরণ করে সরকার বন বিভাগের মাধ্যমে নিলামে বিক্রয় করে।

শতবছর ধরে শাসকদের কাছে সুন্দরবন ছিল রাজস্ব আদায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। এই বিষয়টি গুরুত্ব প্রায় ১৬৫৮ খ্রিষ্টাব্দে মোঘল সাম্রাজ্যের রাজপুত্র মোহাম্মদ সুজার সময়। সে সময় সরকার “মুরাদখানা” অথবা ‘‘জেরাদখানা” নামে সুন্দরবনকে উল্লেখ করে রাজস্ব সংগ্রহের ব্যবস্থা করে। ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনামলে বিষয়টি অনেকদিন পর আবার গুরুত্ব পায়।

১৭৭০ সালে কালেক্টর জেনারেল ব্লাড রাসেলের সময় সুন্দরবন অঞ্চলে আবাদী জমি তৈরী করে রাজস্ব আদায়ের বিষয়টি আবার সামনে চলে আসে। পরবর্তীতে যশোরের জজ ও ম্যাজিস্ট্রেট টিলম্যান হেঙ্কেল ১৭৮৩ সালে সুন্দরবনের সীমানা চিহ্নিত করেন। হেঙ্কেল প্রণীত নীতিমালা অনুযায়ী সুন্দরবনের দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর, পূর্বে হরিণঘাটা নদী, পশ্চিমে রায়মঙ্গল নদী এবং উত্তরে কলিঙ্গ নদী পাড়ের ধুলিয়াপুর গ্রাম, যমুনা বা যবুনা নদীতীরের কাগ্রীঘাট গ্রাম, কপোতাক্ষ নদ তীরের চিংড়িখালী গ্রাম, মারজাটা নদীর ধাকি খালের মুখ, ধাকি খালের শেষ প্রান্ত, দাউদখালী নদী পাড়ের শের পাতালয়া গ্রাম ও বলেশ্বর নদী  তীরের কচুয়া গ্রাম। এরপর লেফটেন্যান্ট ডব্লিউই মরিসম ১৮১১-১৮১৪ সালে সুন্দরবন আবার জরিপ করেন। তার করা এই গুরুত্বপূর্ণ জরিপ এলাকা ছিল হুগলী নদী থেকে পশুর নদী পর্যন্ত মরিসনের অপর একভাই ক্যাপ্টেন হিউ মরিসন ১৮১৮ সালে এই জরিপের ত্র“টি বিচ্যূতি সংশোধন করেন। এর মধ্যে ১৮১৫ সালে বৃটিশ বাজস্ব বোর্ড ম্লেল্টকে সুন্দরবনের জমি পরিমাপ করার জন্য নিয়োগ করে। হেঙ্কেল যেসব জমি পরিমাপ করেছিলেন সেগুলোর সঠিক কর ধার্য করা এবং তারপরে বন কেটে আরও যেসব নতুন কৃষিজমি তৈরী করা হয়েছিল সেগুলোর পরিমাপ ও তার কর ধার্য করা ছিল স্মেল্টের কাজ।
তিনি ১৮১৬ সাল পর্যন্ত এ জরিপ চালান। তিনি ৩,২৩,২৫২ বিঘা জমি পরিমাপ করেন। এর মধ্যে ২,১২,০২৫ বিঘা জমি ছিল আবাদী। বৃটিশ শাসন আমলে সুন্দরবনকে ছয়টি রেঞ্জে ভাগ করা হয়। এই রেঞ্জগেুলোর সীমানা আজও অপরিবর্তিত আছে। এর মধ্যে চারটি রেঞ্জ বর্তমানে বাংলাদেশ সুন্দরবনের        অন্তর্ভূক্ত। বাকি রেঞ্জ দু’টি পড়েছে ভারতের পশ্চিম বঙ্গে। তবে বর্তমানে প্রশাসনিক কাজের সুবিধার  জন্য এগুলোকে আরও কতগুলো ছোট ছোট ভাগে ভাগ করা হয়েছে এগুলোকে বলা হয় কম্পার্টমেন্ট। বর্তমানে বাংলাদেশের সুন্দরবনে ৪টি রেঞ্জে ৫৫টি কম্পার্টমেন্ট আছে। রেঞ্জগুলি হচ্ছে শরণখোলা, চাঁদপাই, খুলনা ও সাতক্ষীরা।

সুন্দরবন সংরক্ষণের গুরুত্ব ঃ 
ক.     সুন্দরবন পৃথিবীর সর্ববৃহৎ একক ম্যানগ্রোভ বনভূমি 
খ.      সুন্দরবন জীববৈচিত্র্যের এক বিশেষ আধার
গ.      সুন্দরবনের দক্ষিণাংশ বিশ্ব ঐতিহ্য সংরক্ষণ এলাকা
ঘ.      সুন্দরবন থেকে গৃহীত কাঠ, গোলপাতা, মধু, মৎস্য ও অন্যান্য সম্পদ অর্থনৈতিক ভাবে জীবিকা নির্বাহের গুরুত্বপূর্ণ উৎস।
ঙ.      জাতীয় প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত বিপন্ন প্রজাতি রয়েল বেঙ্গল টাইগারের আবাস স্থল।
চ.      প্রাকৃতিক দূর্যোগ - সিডর, আইলা, জোয়ার-ভাটা, জলোচ্ছ্বাস, ঝড়-ঝঞ্ঝা রক্ষার্থে বাফার জোন হিসাবে সুন্দরবনের গুরুত্ব অপরিসীম।

 

সুন্দরবনের গুরুত্ব ঃ

১.      সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যের এক বিশেষ আধার একথা বিবেচনায় রাখা।
২.      সুন্দরবনে পৃথিবীর সববৃহৎ একক ম্যানগ্রোভ বনভূমি (প্যারাবন) এই তথ্য স্মরন রাখা।
৩.     সুন্দরবনের দক্ষিণাংশকে বিশ্ব ঐতিহ্য সংরক্ষণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে একথা মনে রাখা।
৪.      সুন্দরবন থেকে গৃহীত কাঠ, গোলপাতা, মধু, মৎস্য ও অন্যান্য সম্পদ কয়েক লক্ষ্য লোকের জীবিকার প্রধান উৎস একথা বিবেচনায় রাখা।
৫.      সুন্দরবন অঞ্চলের আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির দিকে দৃষ্টি রাখা।
৬.     সুন্দরবনের বিভিন্ন সম্পদ অত্যধিক মাত্রায় আহরণের ফলে সুন্দরবন তার পার্শ্ববর্তী এলাকার সম্পদ এবং জনবসতিকে রক্ষা করে একথা মনে রাখা।
৭.      জাতীয় প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত রয়েল বেঙ্গল টাইগার রক্ষা করা।
৮.     ৫ ও ৭ নং ব্লকের তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানের ফলে বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের ক্ষতি হতে পারে এ ব্যাপারে লক্ষ্য রাখা।

সুন্দরবন সংরক্ষণ বিষয়ক সুপারিশ ঃ

৯.      সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের লক্ষ্যে এ অঞ্চলের আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবিলম্বে উন্নতি ঘটাতে হবে।
১০.    জাতীর প্রতীক হিসাবে চিহ্নিত সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগার রক্ষার জন্য অনতিবিলম্বে বাঘ, হরিণসহ সকল প্রকার প্রাণী হত্যা বন্ধসহ যাবতীয়  বে-আইনী কার্যকলাপ বন্ধ করতে হবে।
১১.     সুন্দরবনের পার্শ্ববর্তী এলাকাসমূহের উন্নয়ন কল্পে যে কোন পদক্ষেপ গ্রহণের পূর্বে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ এবং আগ্রহী জনগনের মতামত নিতে হবে যাতে তার কোন ক্ষতিকর প্রভাব সুন্দরবনের উপর না পরে।
১২.     আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যের এ অপূর্ব সমাহারকে সংরক্ষণ, নবায়ন ও উন্নয়নের লক্ষ্যে যথোপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
১৩.    সুন্দরবনের পরিবেশ বিপন্নকারী যে কোন কার্যকলাপ বিশেষ করে তেল গ্যাস আবিষ্কাারের জন্য সন্ধানী উদ্যোগ বন্ধ করতে হবে।
১৪.     আইনানুগতভাবে সম্পদ আহরণকারী জনসাধারনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে এবং যথার্থভাবে সুন্দরবন সংরক্ষণের পক্ষের শক্তি হিসেবে তাদেরকে বিকাশে সংগঠিত করতে হবে।
১৫.    বিশ্ব-সংরক্ষণ এলাকা হিসাবে ঘোষিত সুন্দরবনের অংশে সকল প্রকার সম্পদ আহরণ, সংরক্ষণ ও নবায়নের সুষ্ঠু নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে।
১৬.    বন ও বন্য প্রাণী আইনকে আরও যুগোপযোগী ও প্রয়োগবাদী করে যথাযথ বাস্তবায়ন করতে হবে। প্রয়োজনে সুন্দরবনের জন্য পৃথক আইন করতে হবে।
১৭.     সুন্দরবনের ভিতর বা পার্শ্ব দিয়ে প্রবাহিত নদ-নদীসমুহের প্রয়োজনীয় সংস্কার করতে হবে। বিশেষ করে গোরাই নদী শাসনের ব্যবস্থা ঢেলে সাজাতে হবে।
১৮.    সুন্দরবন এলাকায় চিংড়ির পোনা ধরার জন্য এবং অন্যান্য কারণে মাছসহ বিভিন্ন জলজ সম্পদের যে অপূরনীয় ক্ষয়-ক্ষতি সাধিত হচ্ছে তা রোধকল্পে পোনা আহরণকারীদের অর্থনৈতিক প্রয়োজনের দিক বিবেচনায় রেখে উপযুক্ত কর্মপন্থা প্রণয়ন করতে হবে।
১৯.    সুন্দরবনে জাতীয় আন্তর্জাতিক পর্যটন স্থান হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে উপযুক্ত এবং পরিবেশ সম্মত কর্মপদ্ধতি গ্রহণ করতে হবে।
২০.    সুন্দরবনের জীববৈচিত্র সংরক্ষণের লক্ষ্যে এডিবির অর্থায়নে যে বৃহৎ প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হতে যাচ্ছে তাতে সুশীল সমাজ, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং স্টক হোল্ডারদের অংশগ্রহণকে নিশ্চয়তা প্রদানের উদ্দেশ্যে আরো ব্যাপক উদ্যোগের  প্রয়োজন চিহ্নিত বিতর্কিত বিষয়ে অধিকতর মত বিনিময়ের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
২১.     খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান, দক্ষতা ও আগ্রহ বিবেচনা করে সুন্দরবন বিষয়ক গবেষণা ও উন্নয়ন কার্যক্রমে প্রতিষ্ঠানটিকে বিশেষ ভূমিকা রাখার সুযোগ প্রদান বিবেচনা করতে হবে।
২২.     সুন্দরবনের সম্পদ ব্যবস্থাপনায় বিশেষ করে সম্পদ ব্যবহার, নবায়ন ও সংরক্ষণে বিভিন্ন সরকারি কর্মকান্ডে জনগণের ও সুশীল সমাজের অংশগ্রহণ যা বর্তমানে প্রায় নেই বা অপর্যাপ্ততা ব্যপকভাবে নিশ্চিত করতে হবে।
২৩.    সুন্দরবনে সম্পদ ও সম্ভাবনা এবং সংরক্ষণ, নবায়ন ও উন্নয়নের বিষয়ে গণসচেতনা সৃষ্টির জন্য প্রচার মাধ্যমের অগ্রণী ভূমিকা অব্যাহত রাখতে হবে।
২৪.     সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য সকল উপাদানসমূহের প্রজনন বা বংশবৃদ্ধি, রোগ-বালাই সহ যে কোন একটি উপাদানের আধিক্য বা লোপসহ সকল প্রকার পরিবর্তন সঠিকভাবে সনাক্তকরণ ও তার প্রতিকার গ্রহণের লক্ষ্যে ক্রমাগতভাবে পর্যবেক্ষণ ও গবেষণার পদক্ষেপ নিতে হবে। এ বিষয়ে প্রয়োজনে নূতন প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা বিবেচনা করতে হবে।
২৫.    সুন্দরবনের অবক্ষয় রোধকল্পে বনবিদ, শিক্ষাবিদ, গবেষক, পরিবেশবিদ জাতীয় ও স্থানীয় এনজিও সামাজিক প্রতিষ্ঠান ও জনপ্রতিনিধি সমন্বয়ে নির্বাহী ক্ষমতাসম্পন্ন সুন্দরবন ওয়াচ গ্র“প বা সুন্দরবন পর্যবেক্ষক দল অনতিবিলম্বে গঠন করতে হবে।
     
Untitled Document

পটল ফুল
Total Visitor : 708551
সাপলুডু মূলপাতা | মতামত Contact : shapludu@gmail.com
Copyright © Life Bangladesh Developed and Maintained By :