Untitled Document
অগ্রহায়ণ সংখ্যা ১৪১৭
মূলপাতা শিরোনাম বটতলা পঞ্জিকা প্রদর্শনী

লেখালেখিটাও এ্যাথলেটদের মতো প্রশিক্ষণের বিষয়
ইসাবেল আ্যালেন্দি এর সাক্ষাতকার

ইসাবেল আ্যালেন্দি সমকালীন বিশ্বসাহিত্যে প্রতিষ্ঠিত একজন লেখক। তাঁর লেখালেখি স্প্যানিশ ভাষাতে। চিলির বিখ্যাত বামপন্থী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব স্যালভাদোর আ্যালেন্দি, সম্পর্কে তাঁর কাকা। গত শতকের সত্তুরের দশকের প্রথম দিকে লাতিন আমেরিকার দেশ চিলিতে সামরিক ক্যু’র মধ্য দিয়ে স্যালভাদোর আ্যালেন্দির হত্যাকাণ্ডের সাথে সাথে পরিবারের অন্য সদস্যদের সাথে তাঁকেও ছাড়তে হয় প্রিয় মাতৃভূমি। প্রথমে ভেনিজুয়েলা, তারপর আমেরিকা। এখন আমেরিকাতে বসবাস করছেন। ভেনিজুয়েলায় থাকাকালীন সময়ে এক সকালে প্রিয় দাদুর মৃত্যু সংবাদ শুনে সদ্যমৃত দাদুর উদ্দেশ্যে লিখতে শুরু করেন শোকপত্র। সেই শোকপত্র-ই হয়ে ওঠে তাঁর প্রথম উপন্যাস দ্যা হাউজ অব দ্যা স্পিরিট । তিনি মূলত কথা-সাহিত্যিক। তাঁর সাহিত্যে ইতিহাস, রাজনীতি, প্রেম, যৌনতা, আত্ম-কথন একসূত্রে গাঁথা। এই সাক্ষাৎকারটিতে তিনি জীবন, সাহিত্য, লেখালেখি, রাজনীতি নিয়ে অকপটে তাঁর উপলব্ধি বলে গেছেন। বাংলাভাষী পাঠক ও বিশেষত নবীন লেখকেরা লেখালেখির কিছু ভিত্তি-সূত্র অনায়াসেই পেতে পারেন ইসাবেল আ্যালেন্দি’র কাছ থেকে। প্যারিস রিভিউ থেকে সিলিয়া কোরেস জাপাত্তা নেয়া সাক্ষাতকারের নির্বাচিত অংশ ভাষান্তর এখানে প্রকাশ করা হলো।

ভাষান্তরঃ মনোজ দে 


প্রশ্নঃ সাহিত্যের আর কি ক্ষেত্রে তুমি নতুনভাবে কাজ করতে আগ্রহী, বা তুমি কি মনে করছো তুমি কথাসাহিত্য নিয়েই কাজ করে যাবে?

উত্তরঃ মঞ্চের জন্য আমি তরুণ বয়সে নাটক লিখেছিলাম। এবং এ থেকে অনেক আনন্দও পেয়েছিলাম। আমি দলগত কাজ করতে পছন্দ করি। আমার বাচ্চারা যখন ছোট ছিল তখন আমি ছোটদের জন্য গল্পও লিখতে চেষ্টা করেছিলাম। প্রতিরাতেই  আমি তাদেরকে গল্প শোনাতাম। এটি ছিল আমার জন্য খুবই বিষ্ময়কর এক অভিজ্ঞতা এবং আমি তা নিয়ম করেই করতাম। ২০০১ সালে আমি শিশু-কিশোরদের জন্য “সিটি অব বিস্ট” উপন্যাসটি লিখি। পরে এটি স্পেনে প্রকাশিত হয়। কয়েক বছর ধরে আমি ব্যঙ্গধর্মী লেখা লিখছি। আমার কাছে মনে হয় এ ধরণের লেখা লেখাটাই সবচেয়ে কঠিন কাজ। আমি কখনো কবিতা লিখতে চেষ্টা করিনি; আর কবিতা লেখা আমার ভাবনাতেও নেই।

প্রশ্নঃ তুমি স্প্যানিশে লেখো ?

উত্তরঃ আমার কথাসাহিত্য আমি কেবলমাত্র স্প্যানিশে লিখতে পারি। কারণ এই ভাষাটি আমার সাথে জৈবিক সম্পর্কে সম্পর্কিত; আর কেবলমাত্র আমার ভাষাতেই আমি আমার কাজগুলি করতে পারি। সৌভাগ্যবশত বিশ্বজুড়েই আমার কাজের ভাল অনুবাদক রয়েছে।

প্রশ্নঃ তোমার অনুপ্রেরণার উৎসভূমি কি?

উত্তরঃ আমি একজন ভাল শ্রোতা এবং বলতে পারো গল্প শিকারীও। প্রত্যেকেরই জীবনে গল্প থাকে। বলার ঢঙয়ের জন্যে এসব গল্পগুলি আগ্রহ উদ্দীপক হয়ে ওঠে। আমি পত্রিকা পড়ি। পত্রিকায় অনেক ছোট লুকোনো খবরও অনেকসময় আমাকে গোটা একটা উপন্যাস লিখতে অনুপ্রাণিত করেছে।

প্রশ্নঃ অনুপ্রেরণাকে তুমি কীভাবে কাজে পরিণত করে?

উত্তরঃ আমার লেখালেখি করার ঘরটিতে দিনে দশ-থেকে বারো ঘন্টা আমি একা কাটাই। সেসময়ে আমি কারোর সাথে কথা বলি না, টেলিফোন ধরি না। তখন আমি শুধুমাত্রই যেনো একটা মাধ্যম অথবা আমার পিছনে ঘটে চলা কোনকিছুর প্রকাশযন্ত্র। সে কন্ঠস্বর আমাকে দিয়ে তার কথাগুলো বলিয়ে নেয়।আমি এমন এক জগৎ তৈরি করি যে জগৎ আখ্যানের বটে; কিন্তু সেখানটায় আমার অধিকার নেই। আমি সৃষ্টিকর্তা নই, আমি এক প্রকাশযন্ত্র মাত্র। এবং এই সময়ে, নিত্যদিনের নিষ্ঠাবান লেখালেখির চর্চার মধ্য দিয়ে আমি আমাকে এবং জীবন সম্পর্কে বহুকিছু আবিষ্কার করতে পারি। আমি শিখে চলি। আমি কী লিখছি তা নিয়ে আমি সচেতন থাকি না। এটা এক অদ্ভুৎ প্রক্রিয়া। আখ্যানের মধ্যে থাকা বিষয়গুলো হতে তুমি মাঝে মাঝে তোমার সম্পর্কে, জীবন সম্পর্কে, মানুষ সম্পর্কে, জগৎ কীভাবে চলছে সে সম্পর্কে  ছোট ছোট সত্যগুলো আবিষ্কার করছো।

প্রশ্নঃ তুমি কি তোমার সৃষ্ট চরিত্রগুলো নিয়ে আমাদের কিছু জানাবে?

উত্তরঃ যখন আমি একটা চরিত্র নির্মাণ করি তখন আমি সাধারণত এমন একজন মানুষকে বেছে নিই যে ঐ চরিত্রটির মডেল রূপে থাকতে পারবে। আমার জানাশোনার মধ্যে যদি চরিত্রের সেই মানুষটা হয় তবে তখন বিশ্বাসযোগ্যভাবে সে চরিত্র নির্মাণ করা যায়। মানুষ হচ্ছে জটিল এবং দুরূহ। খুব কম মানুষই আছে যে তার ব্যক্তিত্বের সকল প্রান্ত প্রকাশ করে। সাহিত্যের চরিত্রগুলোর ক্ষেত্রেও একই বিষয় সত্য।

বইতে আমি সাধারণত চরিত্রগুলোকে তাদের নিজস্ব জীবন যাপন করতে দিই। মাঝে মাঝেই আমার এ অনুভূতি হয় যে আমি তাদেরকে নিয়ন্ত্রণ করতে পরছি না। গল্পটা অপ্রত্যাশিতভাবে বাঁকবদল করছে। আর তা লিখে যাওয়াই আমার কাজ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। আর আগে পরিকল্পিত ধারণাকে আগের জায়গাতেই রেখে এগুচ্ছি।

প্রশ্নঃ তুমি কি কম্পিউটারে লেখো?

উত্তরঃ আমি সবসময়ই নোট রাখি। আমি আমার হাতব্যাগে সবসময়ই একটি নোটবই রাখি; আর যখন কৌতুহল উদ্দীপক কোনো দেখি বা শুনি সাথে সাথে তা লিখে রাখি। পত্রিকা এবং টেলিভিশনের সংবাদ দিযে ক্লিপিং তৈরি করি। মানুষজন আমাকে যে গল্প শোনায় তা লিখে রাখি। যখন কোনো বই লিখতে  শুরু করি তখন এইসব নোটগুলো আমি উল্টেপাল্টে দেখি কারণ এগুলো আমাকে লিখতে অনুপ্রাণিত করে। পূর্ববর্তী কোনো খসড়া-চিত্র ছাড়াই আমার মনোবৃত্তির ওপর ভর করে, কম্পিউটারে আমি লিখতে শুরু করি। পর্দার উপর গল্পটা যখন বলা শেষ হয় তখনই প্রথমবারের মতো প্রিন্ট কপি বের করি। তারপরেই আমি বুঝতে পারি বইটি কি নিয়ে লেখা হলো। দ্বিতীয় খসড়াতে ভাষা, গঠন, ভঙ্গি এবং গতি নিয়ে কাজ করি।

প্রশ্নঃ কারা কারা তোমার লেখায় প্রভাব ফেলেছে?

উত্তরঃ আমার সময়ের আগে আমাদের মহাদেশের লেখকদের লেখা সহজপ্রাপ্য ছিল না। বিশেষত চিলীতে লাতিন অন্যান্য দেশের লেককদের লেখা পড়া কষ্টসাধ্য ছিল। লাতিন আমেরিকার সাহিত্য জগতের সমস্ত মহান লেখকেরা আমার জীবনে মহত্তম প্রভাব রেখেছে। এছাড়া রাশিয়ান সাহিত্য , ইংরেজি ভাষার উপন্যাসিকেরা এবং আমার ছোটবেলায় পড়া কৈশোর লেখাগুলোর প্রভাবও কম নয়। এইসব বই থেকে প্লট এবং শক্তিশালী চরিত্র সম্পর্কে আমার একটা ধারণা জন্মে । এক হাজার এক রজনী আমার ভেতরে কল্পনা ও যৌনতা বোধের জন্ম দিয়েছে। সত্তুরের দশকে প্রথমভাগে পড়া নারীবাদী লেখকদের লেখা আমার চিন্তা ও কাজে অপরিহার্য প্রভাব রেখে চলেছে।

 আবার মাঝে মাঝে কোনো কোনো চলচ্চিত্র আমাকে অনেক বেশি প্রভাবিত করেছে।

প্রশ্নঃ যখন তুমি কোনো উপন্যাস লেখা শুরু করো তখন তোমার মধ্যে কি ব্যাপারগুলো ঘটে চলে?

উত্তরঃ আমি যখন লিখতে শুরু করি তখন পুরো ঘোরের মধ্যে চলে যায়। গল্পটা কোথায় যাচ্ছে, কিংবা কি হতে যাচ্ছে অথবা কেন আমি এটি লিখছি সে সম্পর্কে আমার কোনো পূর্ব ধারণা থাকে না। আমার মনে হয় আমি কেবল এটুকুই জানি- আমি যে বিষয়ের মধ্যে আছি, সে সময়ে আমি তা বুঝবো না। আমি গল্পটার সাথে থাকি। গল্পটা আমি বেছে নিয়েছি কারণ অতীতে সেটি আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল, অথবা ভবিষ্যতে সেটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

প্রশ্নঃ তুমিতো অনেক বিখ্যাত পরিবারের সন্তান। তোমার কাকা স্যালভ্যাদোর আ্যালেন্দে এবং তোমার উপরে তাঁর প্রভাব নিয়ে আমাদেরকে কি কিছু জানাবে?

উত্তরঃ জীবিত অবস্থায় আমার উপরে তাঁর অনেক প্রভাব তৈরি হয়েছিল- এভাবে আমি ভাবি না। যদিও সবসময়েই আমি তাঁর একজন অনুরক্ত। ১৯৭৩ সালে চিলিতে যখন সামরিক ক্যু হলো, তখন শুধুই তাঁর জীবন নয়, অনেক চিলিয়ানের জীবনও পরিবর্তিত হয়ে গেল। অর্ধেক জনগোষ্ঠীর জীবন নাটকীয়ভাবে পরিবর্তিত হয়ে গেল।

 

স্যালভাদোর আ্যালেন্দে যৌথ পরিবারে আমাদের কাকা। সাপ্তাহিক ছুটি কিংবা অন্য কোনো ছুটির সময়ে তাঁর সথে আমার দেখা হতো। কিন্তু তাঁর সাথে একত্রে কখনো থাকিনি।

সামরিক ক্যু হবার পরেই আমি বুঝতে পারলাম তাঁর ঐতিহাসিক গুরুত্ব সম্পর্কে। আর এটি বুঝতে পারলাম চিলি ছেড়ে আসার পরে; কারণ তাঁর নাম চিলিতে নিষিদ্ধ ছিল। আমি যখন ভেনিজুয়েলাতে গেলাম, তখন আমি যখন কাউকে আমার নাম বলতাম, সাথে সাথে সে আমাকে জিজ্ঞাসা করতো আমি স্যালভাদোর আ্যালেন্দের কেউ কিনা। তখন আমার উপলদ্ধিতে আসলো তিনি একজন সত্যিকারের মানুষ ছিলেন। একজন কিংবদন্তী, বীর।

 

প্রশ্নঃ সালভ্যাদর আলেন্দ কে নিয়ে কি কোনো বই লিখবে?

উত্তরঃ না আমি এভাবে চিন্তা করিনি। আমি ভাল জীবনী লিখতে পারি না। এক্ষেত্রে আমি বস্তুনিষ্ঠ ভাবে লিখতে পারি না।

প্রশ্নঃ তুমি কি আবার কখনো চিলিতে ফিরে যেতে চাও?

উত্তরঃ প্রতিবছরই মাকে দেখতে আমি চিলি ফিরে যায়। সেখানে আমি খুব স্বস্তি বোধ করি। কিন্তু এখন আমি আর ভাবতে পারি না ওখানে গিয়ে আমি আবার বসবাস শুরু করতে পারবো। বিশেষত আমেরিকাতে বাড়ি করার পরেই এটি মনে হয়েছে। আমার ছেলে আর নাতি-নাতনিরা এখন এখানে। বাস্তবিক অর্থে আমি চিলির জন্য মন খারাপ করছি না কারণ আমি চাইলেই যেকোনো সময় চিলিতে যেতে পারি।

প্রশ্নঃ জানুয়ারির ৮ তারিখ থেকে তুমি তোমার সব বই লেখা শুরু করে কেন?

উত্তরঃ ৮ জানুয়ারি ১৯৮১। আমি তখন ভেনিজুয়েলায় থাকি। টেলিফোনের কল ধরে জানতে পারলাম আমার দাদু মারা গেছেন। আমি তাকে উদ্দেশ্য করে একটা চিঠি লেখা শুরু করি; পরে এটিই আমার প্রথম উপন্যাস “দি হাউজ অব দ্যা স্পিরিট” হয়ে ওঠে। শুরুতেই এটি ছিল সৌভাগ্য বয়ে আনা একটি উপন্যাস , সেজন্যই আমি এই সৌভাগ্যের দিনটি দিয়ে বই লেখা শুরু করি।

প্রশ্নঃ নতুন যারা লিখছে তাদের জন্য আপনার পরামর্শ...?

উত্তরঃ লেখালেখিটাও এ্যাথলেটদের মতো প্রশিক্ষণের বিষয়। কোনো একটি কাজ শেষ করার জন্য প্রচুর অনুশীলন আর খাটুনির প্রয়োজন পড়ে, যে বিষযটা অন্য কারো নজরে না পড়াটাই স্বাভাবিক। একজন আ্যাথলেটকে যেমন প্রতিদিন প্রশিক্ষণ নিতে হয়, ঠিক তেমনি একজন লেখককে প্রতিদিন লিখতে হয়। যদিও অধিকাংশ লেখাই পরে প্রকাশ উপযোগী থাকে না, তবুও একজন লেখকের জন্য প্রতিদিন লেখা অত্যাবশ্যক।

আমি সবসময় আমার নবীন ছাত্রদেরকে বলি দিনে অন্তত একপাতা ভাল লেখা লেখো। বছর শেষে গিয়ে তা অন্তত ৩৬০ পৃষ্ঠার একটা ভাল বই হয়ে উঠবে।

 

 

 

 

  


     
Untitled Document

পটল ফুল
Total Visitor : 708322
সাপলুডু মূলপাতা | মতামত Contact : shapludu@gmail.com
Copyright © Life Bangladesh Developed and Maintained By :