Untitled Document
অগ্রহায়ণ সংখ্যা ১৪১৭
মূলপাতা শিরোনাম বটতলা পঞ্জিকা প্রদর্শনী
আন্দ্রেই তারকোভস্কি (১৯৩২-৮৬)


পৃথিবীর সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ পরিচালকদের একজন বলে স্বীকৃত এবং বার্গম্যানের মতে বিরল স্বপ্নদ্রষ্টা এবং কাব্যিক     অন্তর্দৃষ্টির অধিকারী রূপে ফেলেনি, বুনুয়েল ও কুরোশাওয়ার সঙ্গে তুলনীয়। ইভানস চাইল্ডহুড তাঁর যাত্রাপথে প্রথম বৃহৎ ও এক প্রধান পদক্ষেপ। দশ বছর বয়সের একটি শিশুর যুদ্ধকালীন অভিজ্ঞতা, তার প্রাপ্তমনস্কতা ও কর্তব্যবোধ, সাহস ও ঘৃণা, বীরত্ব ও উন্মাদনা নিয়েই এই ছবি। এর চিত্ররূপ ছিল এতই মৌলিক ও অভিঘাতী যে দর্শকের উপর এর প্রভাব হয় অসামান্য। ছবিকে যুদ্ধকে দেখানো হয়েছে উন্মত্ততা ও মনুষ্যত্বের বিনাশকারী হিসাবে। মিরর ছবিতে আছে এক তীক্ষè সচেতনতা, একাধিক আত্মজৈবনিক মোটিভ। কালচেতনার চেয়ে বেশি গভীর ইতিহাসচেতনা এই ছবির প্রাণ। আন্দ্রেই রুবলেভ একইসঙ্গে কাহিনীচিত্র, জীবনীচিত্র ও ঐতিহাসিকচিত্র- এই ছবির ঘরানা নির্দেশ করা কঠিন। একই সঙ্গে কাব্যিক, কল্পনাসমৃদ্ধ ও তাত্ত্বিক। ছবির  শেষদৃশ্যে রঙের ব্যবহার শুধু দৃষ্টির নয়, বেধেরও উত্তরণ ঘটায়। এ বোধ একই সঙ্গে নৈতিক, আধ্যত্মিক ও অধিবিদ্যক। এই গুরুত্বপূর্ণ আধ্যাত্মিক মূল্যের জন্যই তারকোভস্কির ছবি একই সত্তায় সমসাময়িক ও চিরকালীন।

তাঁর মতে সিনেমার গূঢ় বৈশিষ্ট্য নিহিত তার কালচেতনায়। তাঁর ভাষায় এই সময় হলো "time expressed through facts" বা "photographed time" তাঁর নিজের ছবিগুলোই এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

তাঁর মোট ছবির সংখ্যা দশেরও কম। কিন্তু প্রতিটি ছবিই সত্য ও সুন্দরের উদ্দেশ্যে শিল্পীর যাত্রাপথে এক একটা মাইলস্টোন। সংকট, সমস্যা ও বিরোধের যুগে তারকোবস্কি বার বার সাম্য ও চরিত্রশক্তির জন্য প্রয়াস করেন, ফলে শিবত্বের জন্যও তাঁর আকুলতা রয়েছে।

সিনেমার লক্ষ্য ও আন্তর্জাতিক ভূমিকা সম্পর্কে তাঁর স্পষ্ট ধারণা ছিল। তিনি সবসময় মনে করতেন আধুনিক মানুষের পক্ষে সিনেমা সেইরকম গুরুত্বপূর্ণ যেমন গুরুত্বপূর্ণ ছিল ট্র্রাজেডি পুরাকালের মানুষের ও উপন্যাস গুরুত্বপূর্ণ উনিশ শতকের শিক্ষিত মানুষের কাছে। চলচ্চিত্র তার কাছে যতোটা না পেশাদার কর্ম তার চাইতে বেশি নৈতিক কর্ম। শিল্প মানুষের কাছে জীবনের মুখোমুখি হবার একটা উপায়। আর শিল্পকর্ম হলো সত্য সম্পর্কে শিল্পীর নিজস্ব ধারণার অন্তরঙ্গ প্রকাশ।

 সোলারিস ও স্টকার এর মতো কল্পবিজ্ঞানচিত্র নির্মাণ করেছেন, তবু এগুলি একই সঙ্গে আধ্যাত্মিক ও অধিবিদ্যকও বটে। এগুলির সময়কাল কোন কাল্পনিক ভবিষ্যতে হলেও এগুলি একইসঙ্গে ভীষণভাবে সমকালীনও; কেননা বর্তমান সময়ের কিছু নৈতিক সমস্যা নিয়ে এরা কথা বলেছে। আন্দ্রেই রুবলেভ - এর মতো এই দুই ছবিও মানবজীবনের অর্থ ও উদ্দেশ্য নিয়ে মানুষের চিরন্তন দার্শনিক জিজ্ঞাসার অপরিহার্য অংশ।

বাস্তব ও বাস্তবাতীতের, লিরিক ও এপিকের, বিশ্বজগৎ ও মনোজগতের মিলন ও সমন্বয়ে তারকোভস্কির চিত্রলোক এক অপূর্ব ও অসামান্য জগৎ- যার মর্ম ও তাৎপর্য্য সঠিক উপলব্ধি করা তৎকালীন সোভিয়েত কর্তৃপক্ষের পক্ষে সহজ ছিল না। তাঁর বহু নতুন ছবির প্রস্তাব কর্তৃপক্ষ একর পর এক বাতিল করেন। এর মধ্য ছিল দস্তয়েভস্কির দি ইডিয়ট উপন্যাসের তারকোভস্কিকৃত সম্পূর্ণ প্রথা-বিরোধী এক চিত্রনাট্য। একটি ছবি থেকে আরেকটি ছবিতে দীর্ঘ বিরতি তার আবেগপ্রবণ, অন্তর্মুখী ও সংরক্ত মানসিকতার পক্ষে ছিল ভীষণ ক্ষতিকর।

তাঁর শেষ দুটি ছবি নস্টালজিয়া- যার নায়ক এক আধুনিক সন্ত ও দি সাক্রিফাইস - যার নায়ক ক্রান্তদর্শী লেখক। বিদেশে তোলা ছবি দুটি তার পূর্ববর্তী ছবি দুটির সাথে অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত, তাঁর বিবর্তনের পক্ষে স্বাভাবিক অগ্রগতি।


কিন্তু পাশ্চাত্য চলচ্চিত্র জগৎও তার কাজের পক্ষে যথোপযুক্ত ছিল না। তাঁর বিপ্লবাত্মক ভাবনাচিন্তা তাদের কাছে ছিল দুষ্পাচ্য। আসলে মাধ্যমগত, বৃত্তিগত এবং রাজনৈতিক কোনো মাপকাঠি দিয়েই এই কিংবদন্তীসুলভ প্রতিভাকে মাপা যায় না। তাঁর তুলনা তিনি নিজে। ফুসফুসের ভয়ংকর ক্যান্সারে তার মৃত্যু হয়। আসন্ন যে মৃত্যুর কথা বার বার এসেছে তার শেষ দুটি ছবিতে।

১৯৮৭ এর ৪ এপ্রিল। ওই দিন মস্কো ফিল্ম-মেকার্স ক্লাব তাঁর সমস্ত ছবির ১০ দিন ব্যাপী একটি রেট্রোস্পেকটিভ শেষ করে। দেশবাসী সেই প্রথম উপলব্ধি করে তারকোভস্কির চিত্রায়িত কাল বা শাশ্বত কালের অপূর্ব ও অসামান্য জগৎটিকে এইভাবে একদিক দিয়ে দেখলে কালসচেতন তারকোভস্কি (তাঁর রচিত গ্রন্থের নামকরণের মধ্য দিয়েও এই চেতনার প্রতিফলন ঘটেছে) কালকে অতিক্রম করে চলে যান।

এন জোরকোয়া

 

প্রাপ্তিসূত্র: কলকাতার গ্রাফিত্তি প্রকাশনা থেকে সাক্ষাৎকার ১০ তারকোভস্কি নামক বই থেকে সংগৃহীত। সংকলক- চন্দন গোস্বামী। 

Untitled Document

পটল ফুল
Total Visitor : 709299
সাপলুডু মূলপাতা | মতামত Contact : shapludu@gmail.com
Copyright © Life Bangladesh Developed and Maintained By :