Untitled Document
পৌষ সংখ্যা ১৪১৭
মূলপাতা শিরোনাম বটতলা পঞ্জিকা প্রদর্শনী

ধ্রুপদী থেকে
(মুহম্মদ খসরু সম্পাদিত পত্রিকা)
আমাদের চলচ্চিত্রের কাছে স্বাধীনতার চাহিদা
- রণেশ দাশ গুপ্ত

১.
আমাদের বাংলাদেশের চলচ্চিত্র নির্মাতাদের সামনে আজ এমন একটি বিষয়ের উন্মোচন ঘটেছে যাকে অগাধ অফুরন্ত তেজস্ক্রিয় ধাতুর খনির সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে।

বিষয়টা হচ্ছে আমাদের স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় যা জনগণের সংগ্রামী এবং বৈপ্লবিক অভিজ্ঞতার সচেতন এবং অবচেতন ধারণায় বিধৃত।

এই অভ্যুদয়ের দুটি পর্যায়। একটি ১৯৪৭ পর্যন্ত চব্বিশ বছরের আগ্নেয়গিরির মতো ধূমায়িত মুক্তি সংগ্রাম। আরেকটি ৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ। এই দুটি পর্যায়েরই রয়েছে অগণিত ঘটনাগত ও গভীর ভাবগত অভিব্যক্তি ও অনুরণন। রয়েছে এদের বহিঃস্রোত ও অন্তঃস্রোত, অসংখ্য চোখে মুখে যাদের প্রকাশ। অগণিত চরিত্রে অসংখ্য কাহিনী, অব্যাহত সংগ্রামে উদ্বেলিত এবং জড়তাজয়ী এবং এই কারণেই চলচ্চিত্রে যা তরঙ্গায়িত হতে পারে, জীবন ও চেতনাকে নিটোল মুক্তার মতো বিকীর্ণ করে। শব্দ ও যন্ত্রে ধরতে পারলেই বক্তব্য। আলোকচিত্রে ধরতে পারলেই নব নব দিগন্ত।






পুনরাবৃত্তির চক্রে পড়তে হবে না পরিচালককে। মাথা খুঁড়তে হবে না অভিনবত্বের জন্য শিল্পীদের, কারুকর্মীদের। চমক আর নাটকীয়তার জন্য কৃত্রিমতার আমদানি করতে হবে না । বিদেশী গল্পকে দেশী ছাঁচে ফেলে ছদ্মবেশী এবং দেশী উভয়েরই অমর্যাদা ঘটাতে হবে না।

সামনেই জনগণের সংগ্রামী ও বৈপ্লবিক অভিজ্ঞতার সচেতন ও অবচেতন ধারায় বিধৃত হয়ে প্রবাহিত স্বাধীন বাঙলাদেশের অভ্যুদয়ের ঘটনা তরঙ্গ এবং তাদের অভিঘাত, যাকে চলচ্চিত্রই পারে এই মুহূর্তে শিল্পরূপের আধারে উৎকীর্ণ করতে। এবং সঙ্গে সঙ্গে চলচ্চিত্রই পারে একে সেই কোটি কোটি সংগ্রামী নর নারীর কাছে তুলে ধরতে, যাদের এগিয়ে চলার পথে এই শিল্পরূপ হবে পাথেয়।

মহাকাব্যে, গল্পে, গীতিকবিতায়, নাটকে, উপন্যাসে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের রূপটি বিধৃত হবে। কিন্তু যা লেখা সম্ভব হচ্ছে এই মুহূর্তে তা  কোটি কোটি পাঠক পাঠিকার কাছে পৌঁছে দেবার জন্য চাই চলচ্চিত্র। চলচ্চিত্রের রূপকারদের বিজ্ঞান দিয়েছে সময়কে জয় করবার অঙ্গুরীয়। বিপ্লব আজ তাই চায় বিজ্ঞানী, শিল্পী, কারিগরদের জাদুকরী হাতের ছোঁয়াচ। বিজ্ঞান নিয়োজিত হোক বিপ্লবী শিল্পরূপের আধার নির্মাণে।


দ্বিতীয়ত আমাদের স্বাধীনতা চলচ্চিত্রের কাছে স্বাধীনতা চায় এ কারণে যে চলচ্চিত্র এই মুহূর্তে আমাদের স্বাধীনতার সেই মহাকাব্যিক সমগ্রতাকে আমদের চোখের ও মনের  সামনে স্থাপন করতে পারে, যা আমাদের স্বাধীনতাকে ঘরে পৌঁছে দিয়ে তাকে ফলপ্রসূ করবার জন্য অপরিহার্য। আমাদের স্বাধীনতার বিপ্লবের সমগ্র সত্যকে বিদ্যুৎঝলকে বুঝে নিতে পারলেই আমরা স্বাধীনতাকে ফলপ্রসূ করার জন্য অসংখ্য খণ্ড খণ্ড প্রচেষ্টাকে একটি সমগ্র কর্মকাণ্ডের মধ্যে প্রবাহিত করে সম্পন্ন করতে পারবো। আমাদের চাই এমন একটি শিল্পরূপ, যার আবেদন দৃশ্যে ও সুরে বহুজনীন, যার দু’চারটি কথাই কোটি কোটি মানুষের মনের কথা। আমাদের চলচ্চিত্রের কাছে তাই স্বাধীনতার বিশেষ ও একান্ত চাহিদা সামগ্রিক সত্যের।

৩.
স্বাধীনতার মহাকাব্যিক শিল্পরূপের আধার হতে গিয়ে আমাদের চলচ্চিত্র তার অতীতের মোহের আবর্ত থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে। আমাদের শিল্পী, কারিগরেরা বের হয়ে আসতে পারবে ভোগবাদের আবর্ত থেকে।

স্বাধীনতার আগে আমাদের চলচ্চিত্র নির্মাতা এবং শিল্পী ও কুশলীদের অধিকাংশই আবদ্ধ  হয়েছিলেন ভোগবাদের আবর্তে। তখন আমরা বাঙলাদেশের মানুষ পাকিস্তানী উপনিবেশিক শাসকচক্রের উচ্ছিষ্টভোগী অর্থাৎ মুনাফাবাজ ভোগবাদের উচ্ছিষ্টভোগী। চলচ্চিত্রকে এরা চোখ বেঁধে জুড়ে দিয়ে রেখেছিল মুনাফাবাজ ভোগবাদের ঘানিতে। আমাদের বাংলাদেশের চলচ্চিত্র নির্মাতাদের মধ্যেও একদল এই ভোগবাদে শরিক হয়ে উপনিবেশিক শাসকচক্রের কাছে আত্মবিক্রয় করে ভোগবাদী ছবি তৈরি করেছিল। তারা মৃত ছবিতে কৃত্রিম চাঞ্চল্য আর সুর আর কথা চড়িয়ে দেশবাসীকে প্রতারিত করেছিল। তারা সংক্রামিত করেছিল দেশবাসীর মনকে ভোগবাদের ক্লিন্নতায়।

অবশ্য আর একদল চেষ্টা করেছিল উপনিবেশিক শাসন নিয়ন্ত্রণ আর ভোগবাদের বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসতে। এরা স্পর্শ করতে চেয়েছিল মুক্তিসংগ্রামের প্রাণপ্রবাহকে। পাকিস্তানী শাসক চক্রের চোখকে ফাঁকি দেবার জন্যে এরা প্রতীক আর রূপকথা কিংবা লোককাব্য ব্যবহার করেছিলেন। কিন্তু এর উপরেও ভোগবাদের একটা আবরণ চড়াতে হয়েছিল। সুতরাং যদিও স্বাধীনতার আগে কিছু কিছু ছবি প্রাণ পেয়েছিল, তবে তারা ছিল খর্বিত।  বিদ্রোহের চাপা আগুন। দ্বিধান্বিত। দেশবাসীর চেতনাকে ওরা কিছুটা উসকে দিয়েছিল। কিন্তু সত্য-পূর্ণ প্রাণবন্ত চলচ্চিত্রের আস্বাদকে জাগিয়ে দিতে পারে নি দেশবাসীর মনে। সত্যকে ঘিরে থেকেছে মোহ। পাকিস্তানী উপনিবেশিক শাসক ও শোষক চক্র বাংলাদেশ থেকে বিতাড়িত হবার সঙ্গে সঙ্গে এই মোহ থেকে আমাদের চলচ্চিত্রের মুক্তি। মুক্তি ভোগবাদ থেকে। মুক্ত শিল্পরূপকে জীবনবিমুখ করার চক্রান্ত থেকে। দেশবাসীকে এবার সত্যপূর্ণ প্রাণবন্ত চলচ্চিত্রের আস্বাদ দেয়া যাবে। কী আনন্দ! কী মুক্তি!

চলচ্চিত্র তার সমস্ত দ্বিধা কাটিয়ে উঠতে পারবে আজ। অপার সম্ভাবনা তাই আমাদের স্বাধীন বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের।  

৪.

সঙ্গে সঙ্গে এ কথাও সত্য যে, আমরা একটা বিপ্লবের মধ্য দিয়ে চলেছি। বিপ্লবের প্রথম পর্যায়ে আমরা স্বাধীন হয়েছি। এর পরবর্তী পর্যায় স্বাধীনতাকে আপামর জনসাধারণের কাছে ফলপ্রসূ করে তোলা। এটা একটা বৈপ্লবিক চলমান ও বিকাশমান প্রক্রিয়া। চেতনা আর আনন্দের একটা বৃত্ত ভেঙে বৃহত্তর বৃত্তে যাওয়া। এর চলমান ভিত্তি তৈরি হয়েছে বাস্তব জীবনে। স্বাধীনতার মধ্য দিয়ে আমরা একটা স্থবির ও শ্বাসরোধকর সমাজব্যবস্থা ভেঙে বেরিয়ে জঙ্গম ও খোলা হাওয়ার সমাজ ব্যবস্থায় প্রবেশ করেছি। দেশকে গড়ে তোলার ব্যাপারটি আমাদের কাছে একটি বৈপ্লবিক ভবিষ্যতকে এগিয়ে আনার কাজ।

সুতরাং চলচ্চিত্র এই ভবিষ্যতের কাছ থেকেও পাচ্ছে তার অব্যাহত সম্মুখ গতির জন্য সম্মতি। 

এখানেও আসছে গণজীবনের অগনিত চারিত্রিক অভিব্যক্তি। আমাদের ভবিষ্যতে প্রসারিত। অগণিত আকাক্সক্ষার পাপড়ি  নিয়ে ফুল ফোঁটা। আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের দুটি পর্যায়Ñ প্রস্তুতি আর অভ্যুদয় থেকেই এই ভবিষ্যৎ উৎসারিত। এই ভবিষ্যৎ তৈরি করার জন্য আমাদের বৈপ্লবিক কর্মধারা যত বেগবান ও গভীরাশ্রয়ী হবে, ততোই আমাদের চোখে মুক্তিযুদ্ধের ভাবনা চিন্তা অর্থময় হয়ে উঠবে। স্বাধীনতা আমাদের চলচ্চিত্রের কাছে চায় এই যোজনা।

৫.
স্বাধীনতা আর বিপ্লবের আজও একটা কাজ ভাঙ্গা। অতীত জীর্ণ সমাজ ব্যবস্থার অনেক কিছুই আজো অপসারিত হয় নি। এগুলি আমাদের স্বাধীনতার বিশাল ধারাকেও আবিলতায় ভরে দিচ্ছে। এই আবিলতা সরানো যাবে এর উৎসগুলোকে উৎখাত করে। সুতরাং আমাদের চলচ্চিত্র  স্বাধীনতার পরেও যে নির্মল সলিল নয় তাতে বিস্মিত হবার কিছু নেই। এতে নিরাশ হবারও কিছু নেই। আমাদের চলচ্চিত্রের আবিলতাকে আজ উৎখাত করে দিতে হবে। এটা করার জন্য আমাদের চলচ্চিত্র নির্মাতা, শিল্পী, কুশলীদের শুধু জীবনের ছায়া নয়, কায়াও হতে হবে। অর্থাৎ মেহনতি মানুষ হতে হবে। আমাদের শিল্পীরা হবেন সমাজতন্ত্র নির্মাতা মেহনতি জনগণের একাংশ, যারা জরাজীর্ণ পুঁজিবাদী মুনাফাবাজ ভোগবাদী ব্যবস্থাগুলোকে ভাঙ্গবেন, শোষণহীন সমাজব্যবস্থাকে গড়ে তোলার জন্য।

 স্রোতে গা ভাসিয়ে চললে এ কাজ সম্ভব হবে কি? কখনও না। আবিলতায় আচ্ছন্ন হতে হবে স্রোতে গা ভাসিয়ে চললে। এটা এখনোও চলছে স্বাধীনতার পরেও। নতুনকে না গড়েই জীবনের কাছ থেকে পাওনা আদায় করার  চেষ্টা আমাদের জনগণের একটা অংশকে রাখছে ভোগবাদী আবিলতায় আচ্ছন্ন করে। এই গতানুগতিকতার চক্র থেকে উঠে আসতে হবে শিল্পরূপের গ্রাহক জনগণকে এবং জনগণের শিল্পী ও রূপকার দের একই সঙ্গে।

একজন উঠে এলে আরেকজনও উঠে আসবে এই চক্র থেকে। কারণ চলচ্চিত্র হলো জনগণ-শিল্পরূপ। শিল্পীরা এবং জনগণ এখানে সমষ্টিগত। সঙ্গে সঙ্গে স্বাধীনতা একটি মহাবিপ্লবী প্রাণপ্রবাহ। একে নষ্ট করার সাধ্য কারোও নেই। কারণ, জনগণ কখনো নষ্ট হয়ে যেতে পারে না। আজ যে বিপ্লবী ছবি আনন্দকামী দর্শকদের মন পাচ্ছে না, এর সত্যের বিশুদ্ধতার  জন্যে কাল তা পাবেই।

আজ যে বিপ্লবী দর্শকেরা ছবিঘরে গিয়ে নিছক আনন্দের ছবি দেখে আশাহত হয়ে ফিরে আসছেন, তাঁরা অবশ্যই আগামীকাল তাঁদের মনোমতো ছবি পাবেন।

চলচ্চিত্রের মতো মুক্তধারা কখনো কুন্ঠিত হতে পারে না। চলচ্চিত্র অজড়।   


     
Untitled Document

মায়াংবা ফুল
Total Visitor : 708419
সাপলুডু মূলপাতা | মতামত Contact : shapludu@gmail.com
Copyright © Life Bangladesh Developed and Maintained By :