Untitled Document
পৌষ সংখ্যা ১৪১৭
মূলপাতা শিরোনাম বটতলা পঞ্জিকা প্রদর্শনী
বাংলায় মণিপুরী থাং-তা
- প্রিসিলা রাজ
 


শ্যামলদার মোটরসাইকেলের পেছনে বসতেই ফিরে এল প্রায় পনের বছর আগের জ্যোৎøাভেজা চা বাগান। ওনার সঙ্গে শমসেরনগর গিয়েছিলাম মণিপুরী মুক্তিযোদ্ধা এল. হরেন্দ্র সিংহের সাক্ষাৎকার নিতে। ফিরতে রাত হয়েছিল। চা বাগানের দীর্ঘ পথ সেই শীতের রাতে আমরা প্রায় শব্দহীন পাড়ি দিয়েছিলাম। প্রকৃতির নানা শব্দ কুয়াশাবৃত তমসাকে ঘনঘোর করেছিল। নানা বেলায় নানা পথ পাড়ি দিতে দিতে বাইকচারীদের আলাদা করে কোনো পথের কথা মনে থাকে না বোধ হয়, ফলে সে যাত্রার কথা আমার বন্ধুর আলাদা করে মনে আছে কিনা জানি না, তবে আমার জীবনে সে রাতের স্মৃতি বার বার ফিরে আসে।

এবার কমলগঞ্জ এলাম প্রায় দশ বছর পর। মৌলভীবাজার জেলার এক উপজেলা এটি। এখানকার সীমান্তবর্তী আদমপুর, ইসলামপুর ইত্যাদি ইউনিয়ন জুড়ে মণিপুরী জাতির বাস। এখানে দুই দফায় প্রায় মাসখানেক করে থেকে গেছি ১৯৯৬ আর ২০০০ সালে। মোবাইলের গণযুগ তখনও শুরু হয়নি তাই কমলগঞ্জের সঙ্গে ঢাকায় বসে চটজলদি যোগাযোগের সুযোগ ছিল না। চিঠি চালাচালি হয়েছে কয়েকবার, তারপর আস্তে আস্তে যোগাযোগের সুতো ছিঁড়ে গেল। কিন্তু যাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা হয়েছিল তাদের সঙ্গে কেন যেন সময়ের ব্যবধান তেমন দূরত্ব তৈরী করতে পারেনি। শ্যামলদা, তাঁর স্ত্রী কুঞ্জরানী বৌদি, সাজ্জাদ, তনুবাবুদা কিংবা হেমন্তদা সকলের সঙ্গে দেখা বা কথা হয়ে মনে হলো দু’দিন আগেই দেখা হয়েছে। কমলগঞ্জে পৌঁছে যথারীতি শ্যামলদার মোটরসাইকেলে সওয়ার হয়েছি, দ্রুত যতটা সম্ভব পুরানো লোকজনের সঙ্গে দেখা করতে হবে, কালই ফিরে যাব, এমন সময় তিনি মনে করিয়ে দিলেন পরদিন হরতাল। কীভাবে তাহলে পরের দিনটাকে ঠিকঠাক কাজে লাগাব ভাবতে ভাবতে চোখের সামনে ভেসে উঠল ১৯৯৭এর এক ভয়ঙ্কর উত্তেজনাকর সন্ধ্যা।

আমি তখন সেড নামে এক এনজিওতে কাজ করি। তাদের হয়েই আমার কমলগঞ্জে প্রথম আসা, মণিপুরী জাতির সমাজ-সংস্কৃতি সম্পর্কে গবেষণার কাজ নিয়ে। ফেব্র“য়ারি কি মার্চ মাসে সেড আদিবাসী সাংস্কৃতিক সন্ধ্যার আয়োজন করেছিল। তাতে বিভিন্ন আদিবাসী দলের সঙ্গে মণিপুরীদের একটি দলও ঢাকায় যোগ দেয়। কমলগঞ্জের মণিপুরী সাংস্কৃতিক সংগঠক তনুবাবু সিংহের সঙ্গে যোগাযোগ করে সে দলটির ঢাকায় আসার ব্যবস্থা করেছিলাম। সে দলে ছিলেন থাং-তা গুরু আকৈ সিংহ।

অনুষ্ঠানটা হয়েছিল জাতীয় জাদুঘরের মূল মঞ্চে। সন্ধ্যার সে অনুষ্ঠানে আমাকে মঞ্চের পেছনে ব্যস্ত থাকতে হচ্ছিল। জানতাম একজন যুদ্ধকলাবিদ এসেছেন তবে তিনি কী খেলা দেখাবেন সে সম্পর্কে কোনো ধারণা ছিল না। ফলে উইংসএর আড়াল থেকে আকৈএর তলোয়ারবাজি যখন দেখলাম আমার মুখ বন্ধ হয়ে গেল। আর তারপরই ঘটল সেই ভয়ঙ্কর ঘটনাটা। কোত্থেকে এক আগুনঝরা দড়ি নিয়ে এসে তিনি বিদ্যুদ্বেগে ঘোরাতে শুরু করলেন। মঞ্চের পেছনে আমাদের সকলের দম আটকে গেল। মঞ্চভর্তি বিদ্যুতের তার, জাদুঘরের মূল মঞ্চের কারিগরি জটিলতা অনেক বেশী, ওদিকে বন্ধ হলভর্তি দর্শক। দর্শকরা প্রথমে বিপুল হর্ষে তাঁকে গ্রহণ করেছিলেন কিন্তু আগুনের খেলা দেখে তাঁরা ভয় পেয়ে গেলেন। একদিকে ‘ভয় নেই ভয় নেই’ বলে তাঁদের শান্ত রাখা, অন্যদিকে আগুন নেভানোর জন্য পানি, বস্তা, বালি যা পারি যোগাড়ের জন্য মঞ্চের পেছনে আমাদের হুড়োহুড়ি। ওদিকে জাদুঘরের কর্মীরা মহা আতঙ্কে চেঁচামেচি শুরু করেছেন, আগুনের খেলা দেখানো হবে জানানো হয়নি কেন? জানাব কী, আমরা নিজেরা জানলে তো! শেষে দেখি আকৈ নিজেই আগুন নিভিয়ে দিলেন। মানে উনি খেলা দেখানোর আগে থেকে মঞ্চে বালি-টালি যোগাড় করে রেখেছিলেন। সে সন্ধ্যার কথা মনে পড়লে আজও গায়ে কাঁটা দেয়। কিন্তু এই যে এত দৌড়াদৌড়ি, আতঙ্ক, ভয়, আকৈকে তার কিছুই স্পর্শ করল না। খেলা শেষ হলে তিনি মঞ্চের পেছনে এলে আমরা দৌড়ে গেলাম। দেখি থাং-তার পোশাক-টোশাক ছেড়ে তিনি আবার ছনগাঁও গ্রামের প্রবীণ চাষী বনে গেছেন। কিন্তু বয়সের রেখা আঁকা সেই মুখ আর সুঠাম দেহে এমন এক খাড়া, শান্ত, সংহত ধী ফুটে ছিল যে তা আমার মধ্যে স্থায়ী ছাপ রেখে গেছে।        
 

ভেবে দেখেছি থাং-তা সম্পর্কে আমার বিস্ময়ের একটা বড় কারণ এত সূক্ষ্ম একটা শিল্প বাংলাদেশের মণিপুরীরা সযতেœ কয়েকশ’ বছর ধরে নিভৃত গ্রামে লালন করে এসেছেন অথচ তার কথা বাংলাদেশের খুব কম মানুষই জানে। বাংলাদেশের সমরকলা বলতে আমরা সাধারণতঃ বাঙালির লাঠিখেলাকে বুঝি যার ঐতিহ্যও যথেষ্ট সমৃদ্ধ। বঙ্গের এ অংশে বসবাসকারী অন্যান্য জাতির এ জাতীয় শিল্পকলা আছে কিনা আমার জানা নেই এক মণিপুরী ছাড়া। তীরন্দাজিতে সাঁওতালরা একসময় পৃথিবীর যে কোনো জাতির সঙ্গে পাল্লা দিতে পারতেন কিন্তু সে শিল্প এই বিপন্ন আদিবাসী জাতির পক্ষে এখনও বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব হয়েছে কিনা জানি না। তবে তীরন্দাজি মনে হয় ঠিক উপস্থাপন-শিল্প বা পারফর্মিং আর্টের মধ্যে পড়ে না, এটি মূলতঃ খেলা বা স্পোর্টস। সে হিসাবে লাঠিখেলার পাশাপাশি থাং-তা বাংলাদেশের আরেকটি সমরকলা যা হয়ত বা মঙ্গোলয়েড ধারার একমাত্র দেশীয় উপস্থাপন-শিল্প।

বাংলাদেশে সুপরিচিত মঙ্গোলয়েড ধারার মার্শাল আর্ট কুংফু, কারাতে, তাইকোয়েন্দো ইত্যাদি সব যুদ্ধকলার উৎস মূলতঃ চীন, জাপান, কোরিয়া এসব মঙ্গোলয়েড জাতি অধ্যুষিত দূর প্রাচ্যের দেশ। সেখান থেকেই বিভিন্ন সময়ে ও বিভিন্ন মাধ্যমে এসব শিল্প সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছে। থাং-তার উৎসও বাংলাদেশ নয়, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অন্যতম প্রদেশ মণিপুরের মূল জাতি মৈতৈ মণিপুরীদের মধ্যে এর জন্ম। আমরা জানি উত্তর-পূর্ব ভারতের সাতটি প্রদেশ মঙ্গোলয়েড জাতি অধ্যুষিত এবং জাতিগত-সামাজিক-সাংস্কৃতিক মিলের জন্য তাদের ‘সেভেন সিস্টারস’ বলা হয়। কয়েকশ’ বছর আগে মৈতৈদের একটি দল এদেশে আবাস স্থাপনের সময় থাং-তাও সঙ্গে নিয়ে আসে।

এখানে যে কথা বলে রাখা ভাল, বাংলাদেশে বসবাসকারী মণিপুরী জাতি দু’টি মূল সম্প্রদায়ে বিভক্ত: মৈতৈ ও বিষ্ণুপ্রিয়া। মণিপুরী পরিচয়ের দাবি নিয়ে এদের মধ্যে বিস্তর মতভেদ রয়েছে। মৈতৈরা কোনোভাবেই বিষ্ণুপ্রিয়াদের মণিপুরী পরিচয় স্বীকার করতে রাজী নন। ওদিকে বিষ্ণুপ্রিয়ারাও নিজেদের মণিপুরী পরিচয় ছাড়বেন না। এর পেছনে বহু রাজনৈতিক-ঐতিহাসিক কারণ রয়েছে যার বিশদে যাওয়ার পরিসর এখানে নেই। কেবল এটুকু উল্লেখ যথেষ্ট, বাংলাদেশের মণিপুরী সম্পর্কে অ-মণিপুরী গবেষক/অনুসন্ধানকারী এসব বিতর্ক এড়াতে একটিকে মৈতৈ মণিপুরী এবং অপরটিকে বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী বলে ডেকে থাকেন। আগেই বলা হয়েছে থাং-তার জন্ম মৈতৈদের হাতে। বাংলাদেশে মূলতঃ তারাই এর চর্চা করে থাকে, বিষ্ণুপ্রিয়াদের মধ্যে এর চর্চা আছে কিনা এখনও জানি না।

এখানে উপস্থাপন-শিল্প (ঢ়বৎভড়ৎসরহম ধৎঃং) ও ক্রীড়া (ংঢ়ড়ৎঃং) বিষয়ে আরো দু’একটি কথা প্রাসঙ্গিক হবে। কোনো কোনো উপস্থাপন-শিল্প একইসঙ্গে ক্রীড়াও হতে পারে। ফুটবল, হকি, দৌড় বা তীরন্দাজীর মতো খেলাগুলোকে ক্রীড়া হিসাবে চিহ্নিত করার জন্য সাধারণ কাণ্ডজ্ঞানই যথেষ্ট। তার বাইরে বেশ কিছু খেলা  রয়েছে যেগুলোর ক্রীড়াসুলভ বৈশিষ্ট্যের পাশাপাশি বিশিষ্ট নন্দনতাত্ত্বিক দিকও রয়েছে। এ ধরনের খেলাকে সংশ্লিষ্ট জাতীয় বা আন্তর্জাতিক ক্রীড়া সংস্থাগুলো বিভিন্ন শর্ত ও মানদণ্ডের নিরিখে বিচার করে একে প্রতিযোগিতাভিত্তিক ক্রীড়া হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া যাবে কিনা সে সিদ্ধান্ত নেয়। যতদূর জানি লাঠিখেলা বাংলাদেশে উপস্থাপন-শিল্প হিসাবে স্বীকৃত, প্রতিযোগিতামূলক ক্রীড়া হিসাবে এর কোনো জাতীয় বা আন্তর্জঅতিক স্বীকৃতি নেই। থাং-তাও এখন পর্যন্ত আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিযোগিতামূলক ক্রীড়া হিসাবে স্বীকৃতি পায়নি যদিও ইন্ডিয়ান অলিম্পিক এসোসিয়েশন ইতিমধ্যে একে ক্রীড়ার মর্যাদা দিয়েছে।   



যাই হোক, এবার কমলঞ্জে গিয়ে আকৈএর খোঁজ করলে শ্যামলদা জানালেন তিনি ভারতে চলে গেছেন। মণিপুর এবং বাংলাদেশের মণিপুরীদের সংযোগ কখনও বিচ্ছিন্ন হয়নি, সাতচল্লিশের আগ পর্যন্ত তাঁরা অবাধে যাতায়াত করতেন। আসা-যাওয়ার এই ধারা দেশভাগের পর বড় হোঁচট খেলেও কখনও থেমে থাকেনি। আকৈ ওদেশে পাড়ি জমিয়েছেন আত্মীয়-স্বজন সব ওপারে বলে। বুড়ো বয়সে ওঁকে এখানে কে দেখবে?

আকৈ চলে যাওয়ার খবর পেয়ে খুব কষ্ট হলো। উনিই ছিলেন এদেশে তাঁর প্রজন্মের শেষ থাং-তা গুরু। বাকিরা আগেই দেশ ছেড়েছেন বা মারা গেছেন। শ্যামলদা কিছু আশার বাণী শোনালেন। আকৈএর এক শিষ্য বিদ্যাধন সিংহ গুরুর বিদ্যা ধরে রেখেছেন। তিনি নিজেই শুধু চর্চা করছেন না, এক দল ছেলেকেও শেখাচ্ছেন। বিদ্যাধন সিংহের সঙ্গে দেখা করাবেন কথা দিলেন তিনি।

আকৈএর এই শিষ্যের বাড়ি ভানুবিল গ্রামে। পরদিন বিকালে বিদ্যাধনের মুখোমুখি হলাম এ গ্রামে অবস্থিত ইমা-বাংলাদেশ-এর কার্যালয়ে। ইমা-বাংলাদেশ অর্থাৎ ইন্টিগ্রেটেড মণিপুরী এসোসিয়েশন - বাংলাদেশ, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা মণিপুরীদের ৩২টি সংগঠনের ঐক্যের মঞ্চ। ভানুবিল গ্রামে সংগঠনটির একটি কেন্দ্র রয়েছে। বিদ্যাধনের সঙ্গে কথা বলার সময় সেখানে তাঁর একসময়কার থাং-তা সতীর্থ শৈলতন সিংহ যোগ দিয়েছিলেন। 

বিদ্যাধন জানালেন তাঁরা প্রায় ৫০ জন ছেলে আকৈএর কাছে শিখতে শুরু করেছিলেন। এক-দু’জন করে ঝরতে ঝরতে শেষে গিয়ে দাঁড়াল ১২ জনে। শেষ পর্যন্ত রইল বাকি দুই - বিদ্যাধন আর শৈলতন। পরের জন তেতইগাঁও গ্রামের। গুরু তাঁদের দু’জনকে জোড় করে শেখাতেন। থাং-তায় জোড় ব্যাপারটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। লড়াইয়ের বিভিন্ন কম্পোজিশন তৈরীর সময় কে কোন ভূমিকা রাখবে, কে কোন কম্পোজিশনে জিতবে বা হারবে তা আগেই ঠিক করা হয়, আর সেজন্য স্থায়ী জোড় থাকতেই হয়। বিভিন্ন সঙ্কটে শৈলতন খেলা ছেড়ে দিয়েছেন কিন্তু বিদ্যাধন লেগে আছেন এরই পেছনে।
বিদ্যাধনের বয়স ছেচল্লিশ যদিও তাঁকে দেখে তা বোঝার জো নেই। ভাঙা ভাঙা সিলেটী বাংলায় তিনি তাঁর সাধনার কথা বলে গেলেন। থাং-তায় ব্যবহৃত বিভিন্ন অস্ত্র, ঢাল, পোশাক দেখালেন। বলা হয়নি, থাং-তা কথাটার অর্থ আসলে তলোয়ার ও বর্শা। থাং - তলোয়ার, তা - বর্শা। থাং-তা আসলে খেলাটির কথ্য নাম - লোকমুখে প্রচলিত হয়ে গেছে। এর আসল নাম ‘হুইয়েন লাল্লোং’ (ঐুঁবহ খধষষড়হম), বাংলা করলে দাঁড়ায় ‘আত্মরক্ষার পদ্ধতি’। দৃশ্যতঃ কারাতে-কুংফু জাতীয় মঙ্গোলীয় মার্শাল আর্টের বিভিন্ন ধারার চেয়ে হুইয়েন লাল্লোংএর মূল তফাৎ এতে অস্ত্র ব্যবহৃত হয়। কয়েক ধরনের তলোয়ার আর বর্শা ছাড়াও এখানে ঐতিহ্যগতভাবে লাঠি, দা ও কোদালও ব্যবহৃত হয়। ইদানিং নানচাকুও যোগ হয়েছে। বিদ্যাধন জানালেন সাধারণতঃ দেড় থেকে দু’ বছর বাঁশের লাঠি দিয়ে নিবিড় অনুশীলনের পর শিক্ষার্থীর হাতে তলোয়ার তুলে দেওয়া হয়।


থাং-তার উদ্ভব মণিপুরে তা আগেই বলেছি। মণিপুরের ভৌগোলিক অবস্থান ভারত, চীন ও বার্মার মধ্যে এমন জায়গায় যেখানে একে প্রাচীন যুগ থেকে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর আক্রমণ সইতে হয়েছে। মণিপুরে নাগা ইত্যাদি আরো অনেক জাতি বাস করলেও মৈতৈ মণিপুরীরাই সংখ্যায় গরিষ্ঠ, বহু যুগ ধরে মূলতঃ তারাই অঞ্চলটি শাসন করে আসছে এবং তাদের নামেই অঞ্চলটির নাম হয়েছে। বাইরের এবং নিজেদের মধ্যে গোষ্ঠী আক্রমণ থেকে বাঁচতেই প্রাচীন গুরুরা হুইয়েন লাল্লোং অর্থাৎ আত্মরক্ষার পদ্ধতির জন্ম দিয়েছেন। খেলা হিসাবে এটি অস্ত্র, গতি ও দমের খেলা কিন্তু এর আসল তাৎপর্য এর গভীর আধ্যাত্মিক দর্শনে। মঙ্গোলীয় জাতিগুলোর মধ্যে উদ্ভূত সমরশিল্পের যে কোনো ধারার সঙ্গেই সেখানকার আধ্যাত্মিক দর্শনের গভীর যোগ রয়েছে। বৌদ্ধ ও হিন্দু ধর্মের বিভিন্ন দর্শনের প্রভাব যেমন রয়েছে তেমনি এসব অঞ্চলের নিজস্ব ধর্মীয় দর্শনের প্রভাবও রয়েছে। থাং-তা এর আধ্যাত্মিক রূপের জন্য যেমন মৈতৈদের আদি ধর্ম আপোকপার কাছে বিশেষভাবে ঋণী।     

মণিপুর ইংরেজ শাসনের অধীনে এলে সেখানে থাং-তা নিষিদ্ধ হয়। ফলে জনগণের মধ্যে এর চর্চাও ব্যাহত হয়। ভারত স্বাধীন হলে মণিপুর ১৯৪৯ সাল পর্যন্ত পৃথক রাষ্ট্রীয় অস্তিত্ব বজায় রেখেছিল তারপর সেখানকার জনগণের অনেক বিরোধিতা আর দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে ভারত সরকার একে নিজের অন্যতম প্রদেশ হিসাবে যুক্ত করে। সেই থেকে প্রদেশটিতে সশাসনের লড়াই চলে আসছে। এ লড়াইয়ের অন্যতম হাতিয়ার জনগণের মধ্যে প্রাচীন ধর্ম-সংস্কৃতির জাগরণ তোলা। এ কারণেই প্রায় অবলুপ্ত প্রাচীন মৈতৈ ধর্ম আপোকপার উত্থান ঘটেছে, থাং-তা পুনরুজ্জীবীত হয়েছে, সংস্কৃতির আরো নানা উপাদানের চর্চা আবার ফিরে আসছে।

বাংলাদেশের ক্ষুদ্র মৈতৈ মণিপুরী সমাজ এ প্রভাবের বাইরে থাকতে পারেনি যেহেতু তাদের সঙ্গে মণিপুরের নিত্য যোগাযোগ বিদ্যমান। মণিপুরে থাং-তা উত্থানের জোয়ারেই সম্ভবতঃ এখানকার মৈতৈদের মধ্যে থাং-তাকে ধরে রাখার একটা তাগিদ জাগে। ১৯৯৬ বা ২০০০ সালে যখন এখানে এসেছিলাম তখনও বিলুপ্তপ্রায় শিল্পটিকে কীভাবে ধরে রাখা যায় সে নিয়ে এখানকার সাংস্কৃতিক সংগঠকদের মধ্যে চিন্তা-ভাবনা চলছে দেখতে পেয়েছিলাম। দশ বছর পর এবার যখন গেলাম তখন দেখতে পেলাম আকৈএর মতো পুরানো শিল্পগুরুদের হারালেও পরের প্রজন্ম তাঁদের শিল্পকে পুরোপুরি হারিয়ে যেতে দেয়নি। মৌলভীবাজারের পল্লীর নিভৃতে, লোকচক্ষুর আড়ালে এক মহান ঐতিহ্যের ধারাকে অব্যাহত রেখেছে তারা।

গত কয়েক বছর ধরে মণিপুরের থাং-তা সংগঠকরা এটি যাতে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে কুংফু-কারাতের পাশাপাশি আরেকটি সমরকলা হিসাবে স্বীকৃতি পায় সেজন্য চেষ্টা করছেন। এর অন্যতম মূল উদ্যোক্তা হৈদ্রম প্রেমকুমার সিংহ যিনি বিশ্ব থাং-তা কাউন্সিলের চেয়ারম্যান। তাঁদের চেষ্টায় ইতিমধ্যে থাং-তা ভারত অলিম্পিক এসোসিয়েশনের স্বীকৃতি পেয়েছে। আগামী বছর ভারতের হায়দরাবাদে আন্তর্জাতিক থাং-তা প্রতিযোগিতার আয়োজন হচ্ছে যেখানে বিদ্যাধনকে শিষ্যসহ যেতে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে, তিনি বললেন। সেই প্রস্তুতি নিতে তিনি এখন ব্যস্ত। তবে জানালেন দেশের মান রাখার মতো করে শিষ্যদের তৈরী করতে না পারলে যাবেন না কেননা প্রতিযোগিতায় তাঁরাই খেলবেন, বিদ্যাধন থাকবেন তাঁদের প্রশিক্ষক হিসাবে। এখানে অংশ নেওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব না যেহেতু প্রতিযোগীর ঊর্ধ্বতম বয়সসীমা ধরা হয়েছে ৩০ বছর। 


এ ধরনের খেলা দেখানোর জন্য যথেষ্ট প্রস্তুতি দরকার হয় বলে বিদ্যাধনবাবুর কাছে খেলা দেখানোর আবদার ধরতে পারিনি। হয়ত তিনি আমার আগ্রহ দেখেই সাক্ষাৎকার শেষে খেলা দেখাতে চাইলেন। দুই তরুণ শিষ্যসহ তৈরী হতে শুরু করলেন। শিষ্যদের নাম থৌনাঅজম মাঙান ও এন. রাজু সিংহ। দু’জনই কমলগঞ্জ ডিগ্রি কলেজে ইন্টারমিডিয়েট সেকেন্ড ইয়ার পড়ছেন। জানালেন তিন বছর ধরে তাঁরা বিদ্যাধনের কাছে থাং-তার পাঠ নিচ্ছেন।

শিষ্যদের নিয়ে বিদ্যাধন যখন তৈরী হয়ে এলেন তাঁদের দেখে মুগ্ধ হলাম। কালো ধুতি হাঁটুর কিছু নীচ পর্যন্ত আঁটো পাজামার মতো করে পরা। গোড়ালির ওপরের অংশটুকু কালোর ওপর লাল নকশার পট্টি। শরীরের ওপরের অংশে কালো জামা, তারও রয়েছে বিশেষ নকশা। বিভিন্ন কম্পোজিশন থেকে বেছে দুটো ছোট্ট ছোট্ট খেলা দেখালেন তাঁরা। অনেক দূর থেকে আসা অতিথির মন রাখতে হঠাৎ করে খেলা দেখাতে গিয়ে নিখুঁত করা গেল না। লড়াইয়ের এক পর্যায়ে মাঙান আর রাজুর হাত থেকে তলোয়ার খসে পড়ল, চোখ বেঁধে বিদ্যাধন দম বন্ধ করা খেলা দেখাতে গিয়ে লক্ষ্যভেদ করতে পারলেন না পুরোপুরি। কিন্তু সামর্থ্যরে যে ঝিলিক তাঁরা দেখালেন তাতেই মন ভরে গেল আমার। কৃতজ্ঞচিত্তে, মনের মধ্যে বিরাট খুশি নিয়ে ফিরে এলাম আমি। খেলা দু’টোর ভিডিও বন্ধুদের সঙ্গে ভাগ করে নিতে সাপলুডুতে দিলাম। বাংলাদেশের একেবারে নিজের মার্শাল আর্টের একটু নমুনা দেখুন বন্ধুরা। 



     
Untitled Document

মায়াংবা ফুল
Total Visitor : 709214
সাপলুডু মূলপাতা | মতামত Contact : shapludu@gmail.com
Copyright © Life Bangladesh Developed and Maintained By :