Untitled Document
পৌষ সংখ্যা ১৪১৭
মূলপাতা শিরোনাম বটতলা পঞ্জিকা প্রদর্শনী

বাংলাদেশের মানুষের আতিথেয়তা আমি সব সময় অনুভব করি
মনোজ মিত্রের সাক্ষাৎকার
সাক্ষাৎকার গ্রহনঃ শারমিন নাহার


ইন্দিরা গান্ধী কালচারাল সেন্টার ঢাকা এবং শিল্পকলা একাডেমীর আমন্ত্রণে নাট্যকার নির্দেশক মনোজ মিত্র ঢাকায় আসেন। ঢাকায় নাট্যদল সুন্দরম প্রযোজিত নাটক যা নেই ভারতে মঞ্চস্থ হয়। দশ দিন ঢাকা সফরে চট্টগ্রামেও মনোজ মিত্রের নাটক মঞ্চস্থ হয়। সপ্তসিন্ধুর পক্ষ থেকে লিজেন্ড এই নাট্যকারের সঙ্গে কথা বলেন শারমিন নাহার।

আপনার ছেলেবেলা কেটেছে বাংলাদেশে- এই সম্পর্কে কিছু বলুন।

মনোজ মিত্র : আমার ছেলেবেলা কেটেছে সাতক্ষীরায়। আমার জন্ম ১৯৩৮ সালে। বাবা সরকারি চাকরি করতেন। তিনি জেলা ডিস্ট্রিক্ট অফিসার ছিলেন। আমি বলতে পারি ৭৪-৭৫ সালের কথা। বাবার বদলির কারণে আমরা দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘুরেছি। এটা প্রায় ১৯৫০ সাল অব্দি। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মনে আছে ময়মনসিংহের কথা। সেখানে যে বাড়িতে আমরা থাকতাম সেটা ছিল অসাধারণ এক জায়গা। বাড়ি থেকে গারো পাহাড়ের একটা চূড়া দেখা যেত- সব মিলিয়ে অপূর্ব। সেখানে পাহাড়িরা দুধ বিক্রি করতো। কলসি ভর্তি দুধ দাম করে নিতে হতো। তখন আমার বয়স ১০/১১ বছর হবে। শৈশবের সেই স্মৃতি কখনো আর ভুলতে পারিনি। নব্বইয়ে যখন ঢাকায় আসি তখন মামুনুর রশীদ আমাকে টাঙ্গাইলে যাওয়ার জন্য বলে। কারণ মামুনের বাবাও সেখানে থাকতেন। তখন মামুনের সঙ্গে ছেলেবেলার সেই জায়গাটায় চলে গেলাম। গিয়ে দেখলাম অবিকল সেই জায়গা, কোনো পরিবর্তন হয়নি, সেই পাহাড় আগের মতো রয়ে গেছে। কিন্তু কোনোভাবেই বাড়িটা খুঁজে পেলাম না। একটা বাড়ি দেখে মনে হলো হয়তো এটা হবে। পাশের দোকানদার বললো হ্যাঁ এটাই কোনো এক ঘোষ মশায়ের বাড়ি। তখন আমি, মামুন ও সঙ্গে আর একজন ছিল অধ্যাপক বিষ্ণু বসু। তখন দুপুর ২টা বাজে। আমরা তিনজন গিয়ে কড়া নাড়লাম। খুব তিরিক্ষি মেজাজের একটা লোক দরজা খুললেন। মামুন তাকে বুঝিয়ে বললো যে, এই বাড়িটাতে ইনি- আমাদের বন্ধু ছেলেবেলা কাটিয়েছেন। লোকটি বললো ও তাহলে তো ঢাকায় অনেক কিছু দেখবার আছে। সেগুলো দেখে পরে যাওয়ার সময় দেখে যেও। আমার খুব অপমান লাগলো। মনে হলো এতটা ছেলেমানুষি না করলেও পারতাম। আমরা ঘুরে গাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করলাম। লোকটি এসে অমার হাত ধরলো। এই দুপুরবেলা এসে আপনারা না খেয়ে চলে যাবেন। পরে বাড়ির মধ্যে ঢুকে অন্যদের ডেকে বের করলেন, খেতে দিলেন। বাংলাদেশের মানুষের এই আতিথেয়তা আমি সবসময় অনুভব করি, এটা ভোলা যায় না।

নাটকের শুরুটা কীভাবে? কেন মনে হলো জীবনে নাটকই সব?

মনোজ মিত্র : পরিবারটি ছিল নাটকের। সেখানে সামাজিক কারণে দায়বদ্ধতা ছিল। পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। নাটকের চাঁদা দিতে হতো। গাঁয়ের সবাইকে আমার ঠাকুরদা নাটকের সুযোগ করে দিতেন। বাড়ির উঠোনে, চ-ি ম-পে যেখানে দুর্গাপূজা হতো সেখানেই নাটক অনুষ্ঠিত হতো; কিন্তু আমরা কেউ এলাউ ছিলাম না। আমার বাবা কখনো চাইতেন না আমি নাটক-থিয়েটার করি। কলকাতায় আমার যত চাকরি হতো তিনি সব এপয়েনমেন্ট লেটার ছিঁড়ে ফেলতেন। আমাকে বাইরে পাঠিয়ে দিতে চাইতেন। বাইরে মানে কলকাতার বাইরে মফস্বলে। কিন্তু যে করবে করবেই, তাকে কোনোভাবেই আটকানো যাবে না। এখন আমি দীর্ঘদিন করছি, আমার মেয়ে করছে আবার তার মেয়েও করছে।

এর আগে আপনি বাংলাদেশে সাজানো বাগান নাটক করেছিলেন। এবার করলেন যা নেই ভারতে। অনুভূতিটা কেমন?

মনোজ মিত্র : সাজানো বাগানে জনজীবনে আমার দেখা জীবন তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। এটা সময়ের কারণে প্রাসঙ্গিক। আর মহাভারত নিয়ে আমি অনেক নাটক করেছি। মহাভারতের কথা তো আর বলে শেষ করা যায় না। ২০০৫ সালে নাটকটা করি। তখন সবাই প্রশংসা করেছিল। এতে সমকালীন রাজনীতি, নারী প্রসঙ্গ সবই এসেছে। একটা কথা আছে এমন- যা নেই মহাভারতে তা নেই ভূভারতে। বিশ্বে যা আছে তার সবই আছে মহাভারতে। যেকোন সময় মহাভারতে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠতে পারে। ক্ষমতার রাজনীতিতে, মহিলাদের রাজনীতিতে ব্যবহার, সন্তান উৎপাদনের প্রসঙ্গে ইত্যাদি সবই ক্ষমতার কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত। এগুলো সবই পাই মহাভারতে।

আপনার লেখা নাটকগুলোর মধ্যে প্রাচ্যনাট করেছে কিনু কাহারের থিয়েটার, নাট্যপ্রয়াস করেছে দম্পতি, দেশ নাট্যদল করেছে দর্পণে শরৎ শশী। ঢাকার বাইরেও অসংখ্য দল আপনার নাটক করেছে। এক্ষেত্রে আপনার অনুভূতি কেমন?

মনোজ মিত্র : খুবই ভালো লাগে। দর্পণে শরৎ শশী নাটকটি লিখেছিলাম খুলনার পটভূমিতে। এখানে পাঁচক্ষীরা বলে একটা জায়গার কথা বলা হয়েছে। এটা আসলে সাতক্ষীরা। দম্পতি নাটকটি যারা করছে সেই নাট্যপ্রয়াসের সবাই এসেছিল। ভালো লেগেছে সবাইকে দেখে। নিজের লেখা নাটক যখন অন্য দল করে কিংবা অন্য দেশের দল করে খুবই আনন্দ হয় মনে।
তবে নাট্যকারের মূল ভাবনাটি খুঁজে বের করে যখন নাটকে প্রয়োগ করা হয় তখন সেটা দেখার ইচ্ছেটাই আলাদা।  

আপনি এ পর্যন্ত নব্বইয়ের অধিক নাটক লিখেছেন। বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি জেলায় আপনার লেখা নাটক মঞ্চস্থ হয়। এ ছাড়া ভারত, কানাডা কিংবা লন্ডনেও মঞ্চস্থ হয়। আপনার কাছে জানার ইচ্ছা নাটক লেখার সময় কোন কোন দিকে দৃষ্টি রাখা উচিত।

মনোজ মিত্র : দেখো একটা বিষয়কে কেন্দ্র করে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিতে নাটক লেখা যায় এবং নাট্যকাররা লেখেনও সেভাবে। এ ক্ষেত্রে নাট্যকারের একাডেমিক অর্জন আবার জীবন বোধের অর্জন দুই-ই জরুরি। কথা হচ্ছে, শেষ পর্যন্ত নাট্যকারের একটা জোরালো বক্তব্য থাকতেই হবে। বক্তব্য নির্ধারণ হলে সেই বক্তব্য বলবে যে পাত্র-পাত্রী কিংবা পাত্র-পাত্রী কোন সময়ে কোন স্থানে দাঁড়িয়ে তাদের অবস্থানকে চিহ্নিত করবে সে ব্যাপারে নাট্যকারের থাকবে সজাগ দৃষ্টি। কল্পনাতেই নাটকের চরিত্র ঘটনা স্পষ্টতই দৃশ্যমান হওয়া জরুরি। যখন চরিত্র ঘটনা স্পষ্ট হবে তখন ওই চরিত্ররাই নিজেদের মতো করে এগিয়ে চলে নাট্যকারকে পথ দেখাবে। নাট্যকারের কাজটা তখন তাদের অনুসরণ করা। এই অনুসরণের পথে একটা কথা মাথায় রাখতেই হবে, আর তা হলো দ্বন্দ্ব। নাটকের দ্বন্দ্ব যত বলিষ্ঠ হবে নাটকটি ততই পাঠক এবং দর্শকের কাছে হৃদয়গ্রাহী হয়ে ধরা দেবে।

আপনিতো প্রায় তিন যুগেরও বেশি সময় ধরে মঞ্চ নাটকে এবং টিভি চলচ্চিত্র মাধ্যমে অভিনয় করছেন। অভিনয় সত্তা নিয়ে কিছু একটা বলেন।

মনোজ মিত্র : অভিনয় ব্যাপারটা নিয়ে কি আর বলবো। অভিনয় করাটাইতো বলা। তবে শুনেছি অভিনেতা-অভিনেত্রীরা চেষ্টা করে আরোপিত চরিত্রের মধ্যে ডুব দিতে। এই ডুব দিতে কে কতটা পারে এবং সাগরে ডুব দিয়ে মণি-মুক্তা তোলার মতো কে কতটা চরিত্রের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য তুলে এনে দর্শকদের সামনে প্রদর্শন করতে পারলো, সেটিই বড় কথা। আসলে কি জানো কুয়াশায় এপার থেকে ওপারের মানুষটাকে দেখা চাই। সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মাতি অনুভূতিকে গভীর থেকে গভীরে গিয়ে পর্যাবেক্ষণ করা চাই। সেভাবেই যা কিছু করা।

আপনার নাটক সাজানো বাগান গত তেত্রিশ বছর ধরে আপনার দল সুন্দরমের প্রযোজনায় নিয়মিত মঞ্চায়ন হচ্ছে। চিত্র পরিচালক তপন সিংহ সেটিকে নিয়ে নাটকও করেছেন। উভয় ক্ষেত্রে বাঞ্ছারাম চরিত্রে আপনি অভিনয় করেছেন। এ ক্ষেত্রে কিছু বলুন।

মনোজ মিত্র : সেসব অনেক অনেক কথা। সব কথা বলে পারবো না। তবে একটা কথা মনে পড়ে। চলচ্চিত্র শুটিংয়ের আগের রাতের কথা। আমার থাকার জায়গা ছিল একটা বাগান ঘেরা বাংলোতে। রাতের খাবার খেয়ে ঘুমাতে গেছি। ভাবনায় বাঞ্ছারাম চরিত্র। কোমর পড়ে যাওয়া এক বৃদ্ধ যে বাগানটিকে আগলে রাখে। মাটি ঘেঁষে ঘেঁষে চলে। পাখির কোলাহল কিচির মিচির ডাক তার ভালো লাগে। রাত-বেরাত সব সময় তার বাগানকেই ঘিরে চিন্তা। সকালে ঘুম থেকে উঠেই শুটিং করতে হবে। একদিকে শুটিং নিয়ে চিন্তা অন্যদিকে বাঞ্ছারামকে নিয়ে। ভাবতে ভাবতে একসময় আমি যেন আমার ব্যক্তিসত্তা হারিয়ে অভিনয় সত্তা নিয়ে বাঞ্ছারাম হয়ে গেলাম। নিজেই নিজের অগোচরে বিছানা ছেড়ে ফ্লোরে নেমে কোমর দিয়ে মাটি ঘেঁষে ঘেঁষে দরজার খিল খুলে কখন যে বাগানের মধ্যে গিয়ে পড়লাম সেসব যখন খেয়াল হলো তখন গভীর রাত শেষে ঊষালগ্ন হয় হয়। সে রাতের টানাপড়েন আজো ভাবায়। সেসব কথাই লেখা আছে আমার লেখা বই থিয়েটারে সিনেমায়। হাতের কাছে পেলে পড়ে নিও। সেসব জানতে পারবে।

আপনিতো রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘ ২৭ বছরের মতো অধ্যাপনা করেছেন। বাংলাদেশের অনেক ছাত্রছাত্রী আপনার কাছে পড়েছে। তাদের সঙ্গে কি দেখা হলো?

মনোজ মিত্র : আমি তো বেশ অবাক আমার ছাত্রছাত্রীদের দেখতে পেয়ে। একটা টেলিভিশন চ্যানেলে মামুনুর রশীদের সঙ্গে কথা বলার সময় রাহাত-জলি ওভার ফোনে কথা বললো। ওরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নাট্যকলা বিভাগে পড়াচ্ছে জানালো। আশীর্বাদ চাইলো। শিল্পকলায় ২৮ তারিখ আমার নাটক ছিল যা নেই ভারতে। আমিতো আমার নাটকে ভারী সেট আনতে পারিনি। এখানেই করতে হয়েছে। এসে দেখি আমার ছাত্র আরিফ হায়দার সবকিছু করে রেখেছে। লোপা, বৈদ্য, নূর আরো অনেকের সঙ্গে দেখা হলো। আমার আরেক ছাত্র অপূর্ব কুমার কুন্ডুর দেখা পেলাম। দোকানে তার তিন-চারটে চলচ্চিত্রের বই দেখলাম। বেশ কয়েকটি পত্রিকায় তার লেখাও দেখলাম। আমার ছাত্রছাত্রীরা যে এত দ্রুত গতিতে কাজ করছে ভেবে যারপরনাই আনন্দ হলো।

আপনি এ মুহূর্তে কি কোনো নাটক লেখার বিষয় নিয়ে ভাবছেন।

মনোজ মিত্র : দেখো, একটা বিষয় নিয়ে আমি খুবই ভাবিত। বর্তমানে কর্মব্যস্ত সময়ে অফিস প্রতিষ্ঠান যেভাবে আবার ২০ ঘণ্টা করে যুব সমাজকে খাটাচ্ছে কিংবা বাঁচার যুদ্ধে যুবসমাজ যেভাবে প্রতি মুহূর্তে লড়ছে তাতে তো তাদের দম ফেলবার ফুরসত নেই। অথচ তাদেরও তো চাই একটু বিশ্রাম একটু বিনোদন একটু নিরাপদ বাসস্থান। দেখি এই বিষয়টি নিয়ে কী করা যায়।

আপনি আরো নাটক লিখবেন আরো মঞ্চায়ন করবেন- এটা আমাদের একান্ত প্রত্যাশা। ব্যস্ততার মধ্যেও সময় করে আসবেন।

মনোজ মিত্র : মনে মনে তো সব সময় আসি। শৈশবের সাতক্ষীরাকে কি ভোলা যায়? বলো ভোলা যায়? নাটক নিয়ে হয়তো আবার আসা হবে। এখন উঠি।

আপনাকে ধন্যবাদ, এতটা সময় দেয়ার জন্য। আপনি ভালো থাকবেন।

মনোজ মিত্র : তোমরাও ভালো থেকো।
  


     
Untitled Document

মায়াংবা ফুল
Total Visitor : 708310
সাপলুডু মূলপাতা | মতামত Contact : shapludu@gmail.com
Copyright © Life Bangladesh Developed and Maintained By :