Untitled Document
পৌষ সংখ্যা ১৪১৭
মূলপাতা শিরোনাম বটতলা পঞ্জিকা প্রদর্শনী
হিমালয়ে তীর্থযাত্রা
- মার্জিয়া লিপি




হিমালয়ের শৈবতীর্থ কেদারনাথ শৃঙ্গ
                                                          অথবা

একটা মেয়ে মানুষ, তাঁর চোখের সামনে দিয়ে হিমালয়ের শৃঙ্গে যাচ্ছে,
আর সে পারছেনা...............

 

বছর কয়েক আগের কথা।
ভারত ভ্রমণে গন্তব্য দেরাদুন, সিমলা, নৈনিতাল, দিল্লী।
হাওড়া থেকে যাত্রা করে দুন এক্রপ্রেসে দুই দিন দুই রাত কাটানোর পর
তৃতীয় দিনে সূর্য হঠাৎই বললো -
হিমালয়ের ট্রেকিং করবো কী না? পাহাড়ে ২৮ কিলোমিটার হাঁটতে পারবো কী না?
ট্রেকিং এর কোন পূর্বপ্রশিক্ষণ নাই, আমার ৩০ বছর জীবনে তখনও পাহাড়ে হাঁটার অভিজ্ঞতা কেবল
মাধবকুণ্ড আর সীতাকুণ্ডের চন্দ্রনাথ মন্দিরে।
ভাটি এলাকায় বাড়ী হওয়ার কারণে শুকনা মৌসুমে সদর জেলার বাড়ী থেকে গ্রামের বাড়ী আসা যাওয়ার জন্য
কয়েক কিলোমিটার হাঁটতে হয়
কিন্তু সেটা পাহাড়ে নয় সমতলে। সেই হাঁটার অভিজ্ঞতা আর আত্মবিশ্বাসকে সম্বল করে
সূর্যকে প্রশ্ন করলাম - ২৮ কিলোমিটার হাঁটলে কী পাবো?
উত্তরে শুনলাম হিমালয়
কল্পনার চোখে দেখতে লাগলাম - শাদা বরফের শৃঙ্গ হিমালয় আর শেরপাদের ছবি।
এর আগে দিব্য চোখে কাঞ্চনজঙ্গাকে দেখেছিলাম দার্জিলিং এ।
সেখানে প্রতিষ্ঠিত তেনজিং নোরগের মাউন্টেনিয়ারিং ইনস্টিটিউট এ  গত ট্যূরে কিছুটা সময় কাটিয়েছিলাম।
তখন ইচ্ছে হয়েছিলো, ভাবছিলাম, একটু আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠবো কিনা?
চেষ্টা করে দেখবো নাকি, আমিও শেরপাদের মত পাহাড়ে  যেতে পারি কিনা?
সূযের্র  প্রস্তাবে এতোকিছু না ভেবেই ঝোঁকের মাথায় অবশেষে রাজী হয়ে গেলাম।
একটু দুঃশ্চিন্তা আর পিছুটান ছিলো - কোলকাতা থেকে করে নিয়ে আসা সিমলা,
নৈনিতাল আর দিল্লীর রিটার্ন টিকিটগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে।

সামনের ষ্টেশন হরিদ্বার। ঘন্টা খানেক পর অবশেষে শিবালিক পাহাড়ের পাদদেশে হরিদ্বারে পৌঁছালাম।
পুরানো পরিচয় মায়াপুরী নামে। এখান থেকেই গঙ্গার সমতলে যাত্রা শুরু হয়েছে।
তীথযাত্রী আমি, সূর্য আর কোলকাতার দুজন।
গন্তব্য উত্তর প্রদেশের হিমালয় শৈবতীর্থ কেদারনাথ শৃঙ্গ।
দুপুরে হিমালয়ের ট্রেকিং এর প্রস্তুতি হিসাবে মনসামঙ্গল পাহাড়ে চার ঘন্টার ট্রেকিং শেষ করি।
সন্ধ্যায় হরি কি পাউরি ঘাটে ৯৯৯টি ফুল, প্রদীপ দিয়ে সাজানো পাতার ভেলায়
মঙ্গলারতির কথা এখনোও স্মৃতিতে আছে।
হরিদ্বারে স্টেশনে রিটার্ন টিকিট ফেরত দেওয়ার সময় কোলকাতার দাদাদের কাছে ধরা পড়লাম।
পাসপোর্টের নাম দেখে বুঝে গেলো - আমরা দুইজন তীর্থ সহযাত্রী, হিন্দু নয় মুসলিম!

 

ভোর ৫টায় রওনা হলাম শৈবতীর্থ হিমালয় শৃঙ্গের উদ্দেশ্যে।
কাঁধে হ্যাভারস্যাক, হাতে স্পাইক লাগানো লাঠি
আর হঠাৎ ঝড়ের কবল থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্যে উইন্ডসর ।
কেদারশৃঙ্গের পাদদেশে মন্দাকিনী নদীর কূলে, গাড়োয়াল হিমালয়ে
১২৮৬৬ ফুট উুতে কেদারনাথের মন্দির।
সেসময় ছিলো অক্টোবর মাসের ১৯ তারিখ।
দেয়ালীর পর ২৫ তারিখে মন্দিরের মূর্তিকে সমতল ভূমি উখিমঠে অধিষ্ঠিত করা হয় ।
তখন বন্ধ হয়ে যাবে বরফের কারণে গৌরীকুণ্ডের যোগাযোগ ব্যবস্থা।

কেদারনাথের পথে সবুজ মন্দাকিনী আর শ্বেত অলকানন্দা নদী রুদ্রপ্রয়াগে মিলিত হয়েছে।
সেখানে সঙ্গমে একখণ্ড শিলা - নাম নারদশিলা
কথিত আছে, শিলায় বসে নারদ তার বীণা বাজাতেন।
কেদারনাথ যাওয়ার জন্যে হরিদ্বার থেকে ১৩ ঘণ্টা বাস জার্নি করে প্রথমে পৌছেছি গৌরীকুণ্ডে।
শিবের পার্বতী এখানকার উষ্ণ কুণ্ডে স্নান করতেন, তাই এ জায়গার নামকরণ গৌরীকুণ্ড।
শৈবতীর্থ কেদারনাথ শৃঙ্গ সেখান থেকে ২৮ কি. মি. আসা যাওয়া, ট্রেক বা পায়ে হাঁটার পথ।
যদিও হেলিকপ্টার, ঘোড়া, ড্যান্ডি - অনেক কিছুর ব্যবস্থা আছে
কিন্তু আমাদের এই ৪ জনের পদযুগল ভরসা।

কোলকাতার শিবুদার প্রেরণা আমি।
তার ভাষায়, “একটা মেয়ে মানুষ, তার চোখের সামনে দিয়ে হিমালয়ের শৃঙ্গে যাচ্ছে,
আর সে পারছেনা; তা কি হয়?”
আমিও পারছিলাম না, তারপরও অনেক কষ্টে একরকম কাঁদতে কাঁদতে হাঁটছিলাম।
পা সাথে আছে কিনা বুঝতে পারিনি।
গৌরীকুণ্ড  থেকে ৭ কিলোমিটার যাওয়ার পর রামবাড়াতে যাত্রা বিরতি করলাম।
সেখানে অসংখ্য ভেড়ার দেখা মেললো।
ভেড়ার আধিক্যের কারণে নাকি এ জায়গার এরূপ নামকরণ।
ছোট্ট পাহাড়ী টঙ এ চা খেলাম শরীরের তাপমাত্রা কিছুটা বাড়ানোর আশায়।
দলনেতা আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন । তিনি জানতেন পাহাড়ে একই গতিতে হাঁটতে হয়।
থেমে গেলে স্থিতি জড়তার কারণে চলার গতি স্লথ হয়ে যায়।
এতো উচ্চতায় অক্সিজেন কম তাই নি:শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল।
বুকের ভিতরে প্রচন্ড চাপ অনুভব করছিলাম।

রাস্তার দুপাশে গভীর খাদ।
হিমালয়ের শাদা বরফে সোনা রঙয়ের রোদের তীব্র ছটায় মনে হয়,যেন পাহাড়ে আগুন ধরে গেছে।
খালি চোখে তাকানো যায় না।
রোদ চশমায় তাকিয়ে দেখছিলাম বরফে সূর্যের তীব্র আলোর প্রতিফলন।
অসাধারণ অপার্থিব। প্রতিমুহূর্তে বিমোহিত হয়েছি।
পথের নৈসর্গিক দৃশ্য, মন্দাকিনীর সবুজ সুন্দর প্রবাহ, অসংখ্য ঝর্না,
পাহাড়ের গা বেয়ে পাথর চিরে ছুটে যাচ্ছে প্রচণ্ড বেগে
কোথায়বা ঝিরঝির হয়ে।
কেদারশৃঙ্গের বরফের রুপালি ঝলক, পথের সমস্ত কষ্ট দূর করে দেয়।
জীবন কি সুন্দর! চারপাশের শ্বেত শুভ্র তুষার ওপরে গাঢ় নীল আকাশ -
চারপাশে আশ্চর্য আলো! অবাক বিস্ময়ে দেখছিলাম, শাদা বরফের শৃঙ্গ হিমালয়কে, শৈবতীর্থ কেদারনাথ শৃঙ্গকে।

 



হিমালয়ে তীর্থযাত্রা
৭ জুলাই ০৪

 

গত হিমালয় তীর্থযাত্রা শেষে আমি তোমাকে ধারণ করি, তোমার অস্তিত্ব অনুভব করি।
দূর থেকে গান ভেসে আসছে - পাহাড়ের কান্না দেখে, তোমরা তাকে ঝর্না বলো
বরাবরই প্রকৃতি আমাকে খুব টানে। নদী, ঝর্না, পাহাড়, সন্ধ্যার আকাশ, আকাশ ভরা তারা, পূর্ণিমা, শরতের ভোর, শিউলি ফুল ঝরা, কাশবন - নিস্বর্গ প্রকৃতির সৌন্দর্য
আমার ভিতরের শূন্যতাকে আরো শূন্য করে।
আমার তখন শূন্যতায়, নিমগ্নতায় ডুবে যেতে ইচ্ছে করে।
সব মানুষই অন্যরকম। তারপরও আমি সব সময়ই খুব বেশি অন্যরকম।
আমার ভাবনায় ছিলো - মা হওয়ার জন্যে মাতৃত্বকালীন ছুটি পাবো-
একসাথে ১২০ দিনের; লম্বা অবসর। মাতৃত্বের অনুভূতি সকলেরই শাশ্বত।
তবে মা হওয়া যতটা না আনন্দের তার চেয়ে অনেক বেশি দায়িত্বের।
আমার ভাবনায় ছিল, বাচ্চাকে মায়ের কাছে রেখে ১২০ দিনের জন্য লম্বা ট্যুরে যাবো Ñ
পাহাড়ে, সমুদ্রে, কাশ্মীরের ডাল লেকে, লাদাখ অথবা অমরনাথের তীর্থে যাবো।
গত তীর্থযাত্রায় উত্তর প্রদেশে হিমালয়ে ট্্েরকিং ছিলো - শৈবতীর্থ কেদারনাথ।
সঙ্গী ছিলাম আমি, তোমার বাবা আর কোলকাতার দুজন। কেদারশৃঙ্গের পাদদেশে মন্দাকিনী নদীর কূলে, গাড়োয়াল হিমালয়ে ৩৫৮৮ মিটার উুতে কেদারনাথের মন্দির। সবুজ মন্দাকিনী আর শ্বেত অলকানন্দা নদী রুদ্রপ্রয়াগে মিলিত হয়েছে। সঙ্গমে একখণ্ড শিলা - নাম নারদশিলা
কথিত আছে, শিলায় বসে নারদ তার বীণা বাজাতেন।
হাওড়া থেকে দুন এক্সপ্রেসে যাত্রা করে তৃতীয় দিন দুপুরে শিবালিক পাহাড়ের পাদদেশে হরিদ্বারে পৌঁছালাম। পুরানো পরিচয় মায়াপুরী নামে। এখান থেকেই গঙ্গার সমতলে যাত্রা শুরু হয়েছে।
হরি কি পাউরি ঘাটে সন্ধ্যায় ৯৯৯টি ফুল, প্রদীপ দিয়ে সাজানো পাতার ভেলায়
মঙ্গলারতির কথা অনেক দিন স্মৃতিতে থাকে।
হরিদ্বারে স্টেশনে রিটার্ন টিকিট ফেরত দেওয়ার সময়
কোলকাতার দাদাদের কাছে ধরা পড়লাম।
পাসপোর্টের নাম দেখে বুঝে গেলো - আমরা দুইজন তীর্থযাত্রী, হিন্দু না মুসলিম।
কেদারনাথ যাওয়ার জন্যে হরিদ্বার থেকে ১৩ ঘণ্টা বাস জার্নি করে প্রথমে পৌছতে হয় গৌরীকুণ্ডে।
(শীবের পার্বতী এখানকার উষ্ণ কুন্ডে স্নান করতেন, তাই এ জায়গার নামকরণ গৌরীকুণ্ড)।
সেখান থেকে ২৮ কি. মি. আসা যাওয়া, ট্রেক বা পায়ে হাঁটার পথ।
যদিও হেলিকপ্টার, ঘোড়া, ড্যান্ডি - অনেক কিছুর ব্যবস্থা আছে
কিন্তু আমাদের এই ৪ জনের পদচরণ ভরসা।
কোলকাতার শিবুদার প্রেরণা আমি।
তার ভাষায়, “একটা মেয়ে মানুষ, তার চোখের সামনে দিয়ে হিমালয়ের শৃঙ্গে যাচ্ছে,
আর সে পারছেনা; তা কি হয়?”
আমিও পারছিলাম না, তারপরও কষ্টে কাঁদতে কাঁদতে হাঁটছিলাম।
পা সাথে আছে কিনা বুঝতে পারিনি।
এতো উচ্চতায় অক্সিজেন কম থাকে, নিশ্বাস নিতে কষ্ট হয়।
পথের নৈসর্গিক দৃশ্য, মন্দাকিনীর সবুজ সুন্দর প্রবাহ, অসংখ্য ঝর্না,
কেদার শৃঙ্গের বরফের রুপালি ঝলক,
পথের সমস্ত কষ্ট দূর করে দেয়।
হৃষীকেশ, হরিদ্বার থেকে ২৪ কি.মি. দূরে বিখ্যাত আর এক পৌরাণিক শহর।
ত্রিবেণী সঙ্গম আর প্রকৃতির শান্ত নির্জন বনচ্ছায়া, ঋর্ষি, মুনি, পর্যটক কুলকে মুগ্ধ করে।
ত্রিবেণী সঙ্গমের কাছে শৈলশহর মৌসুরী আর উত্তরাঞ্চলের রাজধানী, দেরাদুন।
সন্ধ্যায় গেলাম শহর থেকে ৮ কি.মি. দূরে দক্ষিণ এশিয়ার বিখ্যাত ফরেষ্ট রিসার্চ ইনষ্টিটিউটে।
ইন্দিরাগান্ধী আর রাজিবগান্ধীর বিখ্যাত দুন স্কুল কাছেই।
শিখদের সাঁইবাবার দরবারে সুরের ঝংকার, চোখ বন্ধ করলে আজও কানে বাজে।
সারা রাতের বাস যাত্রা শেষে হিমাচল প্রদেশের রাজধানী সিমলায়।
ব্রিটিশ যুগে গড়ে উঠা শহর।
সিমলা থেকে কালকা, পাহাড়ের ১৪০ টি সুড়ঙ্গ কেটে রেলপথ। গ্রীনভ্যালি, কুফরি, ফাগু, হ্যালিপ্যাড আর বিখ্যাত এ্যাসেম্বলি ভবন যেখানে ১৯৭২ এর পাকিস্তান ও ভারতের সিমলা চুক্তি হয়েছে।
কালকার খুব কাছেই হরিয়ানা আর পাঞ্জাবের রাজধানী চন্ডিগর।
পৌরাণিক কুরুক্ষেত্র খ্যাত হরিয়ানায় মোঘলদের শিল্প সৌকর্যের পিঞ্জর গার্ডেন।
ঘোড়ায় চড়ে কুফরির পাহাড়ের শৃঙ্গে আপেল গাছের নীচে বসে রেস্টুরেন্টে টমেটোর স্যুপ খেতে হঠাৎই চোখে পড়লো অর্ধবৃত্তাকার হিমালয়ের তুষারের রুপালি শৃঙ্গমালা -
অপার্থিব সৌন্দর্য, চারপাশে যেন মালার মতো ঘিরে রেখেছে - সিমলাকে।
জীবন কি সুন্দর! চারপাশের শ্বেত শুভ্র তুষার, নিচে সবুজ পাইনের উপত্যকা, উপরে গাঢ় নীল আকাশ -
চারপাশে আশ্চর্য আলো, হাত ধরে সূর্যের পাশে দাঁড়িয়ে আছি তারপরেও মনে হয়,
কোথাও কেউ নেই। এতো অসহ্য সৌন্দর্যের কাছে নিজেকে খুব রিক্ত মনে হয়।
আজ ছিলো আমার জন্মদিন।
হঠাৎ মনে হলো, এতোগুলো বছরে নিজের অর্জন কি ? “কিছুই না
     
Untitled Document

মায়াংবা ফুল
Total Visitor : 708694
সাপলুডু মূলপাতা | মতামত Contact : shapludu@gmail.com
Copyright © Life Bangladesh Developed and Maintained By :