Untitled Document
পৌষ সংখ্যা ১৪১৭
মূলপাতা শিরোনাম বটতলা পঞ্জিকা প্রদর্শনী
মায়াংবার মায়ায়


 
অজন্তার বাড়ি থেকে এলাম কুড়ি দিন। ওরা মণিপুরী, সিলেট শহরের বাসিন্দা কয়েক প্রজন্ম ধরে। বেশ কিছুদিন ধরে স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী বাঙালির হাত থেকে জমি বাঁচাতে প্রচণ্ড লড়াই করছে। দেশের অন্যান্য সংখ্যালঘুদের মতো মণিপুরীরাও ধীরে ধীরে বাঙালি ভূমিসন্ত্রাসীদের শিকারে পরিণত হচ্ছে, যদিও গণমাধ্যমে সে বিষয়ে খবর খুব কমই আসছে। অজন্তাদের জমি উদ্ধারের লড়াইটা ভীষণ বিপজ্জনক। জমির দখলদার মানিক চেয়ারম্যান অত্যন্ত প্রভাবশালী। রণক্লান্ত অজন্তা আমাকে অনেকটা টেনেই নিয়ে গেছে সিলেটে ওর সঙ্গে কিছু সময় কাটিয়ে আসতে। বেদখল হওয়া জমির অল্প কিছু অংশ প্রচণ্ড ঝুঁকি নিয়ে উদ্ধার করতে পেরেছে ওরা Ñ অজন্তা আমাকে জানিয়েছিল। জমি দখলে রাখতে সেখানেই একটা চালা তুলে বাস করছে ও। ওদের মূল বাড়ির বদলে আমাকে সেখানেই উঠতে বলেছিল। অসহ্য যানজটে আক্রান্ত হয়ে সেদিন ওর বাসায় পৌঁছাতে রাত নয়টা বেজে গিয়েছিল, আমার বেজেছিল বারোটা। কিন্তু ঘরে পা দিয়ে মন জুড়াল আমার।    

অনেক লম্বা একটা ঘর, দরজা দিয়ে ঢুকলে একটা বড়, গোল চা-টেবিল ঘিরে কয়েকটা চেয়ার ও মোড়া। টেবিলটায় ধবধবে সাদা টেবিলঢাকা। টেবিলের ঠিক মাঝখানে কাঁসার চ্যাপ্টা প্রাচীন বাটিতে হলুদ অলকানন্দা আর সাদা টগর। একপাশে বুকশেলফ, অন্যদিকে ডিভান, এদিক-ওদিক আরো দু’একটা ছোট-খাটো আসবাব। ঘরের শেষ প্রান্তে বেড়া ঘেঁষে ছোট বিছানায় হলুদ ফুল ফুল চাদর পরিপাটি করে বিছানো। বিছানাটা আমার জন্য।

অজন্তা পোশাক নকশাবিদ। কিন্তু তার শিল্পীর মন শান্তি পায় ঘর সাজিয়ে। ওদের মূল বাসায়, যেটা এই বাসা থেকে মিনিট পাঁচেকের হাঁটা পথ Ñ দশ বছর আগে প্রথম যেদিন পা রেখেছিলাম ঠিক আজকের মতোই মুগ্ধ হয়েছিলাম। নতুন এই বাসায়, বাসা না বলে আস্তানা বলাই ভাল, অজন্তা একটি মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে বাস করে। প্রায় অরক্ষিত এ ঘরে এভাবে থাকা খুব বিপজ্জনক কিন্তু কিচ্ছু করার নেই, জমি বাঁচাতে এটাই করতে হবে। কিন্তু সে রাতে অজন্তার ভাই, বন্ধু, ওর পরিবারের সঙ্গী মেয়েরা আর আমাদের দু’জনের হৈ চৈ তে বিপদ-টিপদ কোথায় যেন উড়ে গেল। 

সকালে উঠে উঠানটা আবিষ্কার করি। দখলদারদের খেদানোর পর আমার বন্ধু আস্তে আস্তে মানুষ করার চেষ্টা করছে আঙিনাটাকে। জংলা অনেক গাছ গজিয়ে আছে পুরো উঠানটা জুড়ে। সেখানে নানান ফুল আর ঘাস। একপাশটা পরিষ্কার করে তুলসীতলা করা হয়েছে। অজন্তারা বৈষ্ণব। মণিপুরীরা বেশির ভাগই তাই।  বাংলাদেশে বসবাসকারী মণিপুরী জাতি অবশ্য দু’টি সম্প্রদায়ে বিভক্ত, মৈতৈ আর বিষ্ণুপ্রিয়া। অজন্তারা মৈতৈ।

তুলসীতলার একধারে আরেকটা ঝোপড়া। প্রথমে তো তুলসীই ভেবেছিলাম আমি। অজন্তা পরে জানিয়েছিল ওটা আসলে মায়াংবা গাছ। দুই গাছে এত মিল! পাতা, গাছের আকৃতি, ফুল, ফল, সবকিছু একইরকম। কাছ থেকে খেয়াল করে দেখলে তফাৎগুলো আস্তে আস্তে পরিষ্কার হয়। তবে দুই গাছের পাতার গন্ধ একেবারেই আলাদা। তুলসীর গন্ধ আমার অভ্যস্ত নাকে বেশি ভাল লাগল। মৈতৈরা ভর্তা ইত্যাদি খেতে ধনিয়া পাতার মতো মায়াংবা পাতা ব্যবহার করে। জনশ্র“তি আছে মণিপুরীরা কয়েকশ’ বছর আগে যখন মণিপুর থেকে এদেশে এসে বসবাস শুরু করে তখন তারা খাবারে ব্যবহারের জন্য কয়েকটি গাছ সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিল। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশী ব্যবহার হয় জ্নম্ পাতা। এই পাতা দেখতে একেবারে পিঁয়াজের কচি পাতার মতো। বৈষ্ণব বলে মণিপুরীদের হেঁসেলে মাংস, পিঁয়াজ, রসুন আর ডিমের প্রবেশ নিষিদ্ধ। পিঁয়াজের অভাব তাঁরা জ্নম্ পাতা দিয়ে মেটান। এখন অবশ্য কিছু কিছু মণিপুরী পরিবার, বিশেষ করে শহরে যাদের বাস, পিঁয়াজ, রসুন, ডিম এমন কি মুরগিও খেতে শুরু করেছে। জ্নম্এর স্বাদ আমার খুব ভাল লাগে। এবার আশ মিটিয়ে জ্নম্ পাতা দিয়ে রান্না খেয়েছি মাসিমা অর্থাৎ অজন্তার মায়ের হাতে। জ্নম্ দিয়ে মুড়িভাজাও দারুণ লাগে। গাছটার ছবি এযাত্রা তোলা হয়নি। তবে মায়াংবার ছবি তুলতে ভুলিনি।

কার্তিকের মিঠেকড়া রোদ মেখে এক শেষ-সকালে মায়াংবা আমার ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়েছিল। এত সুন্দর আবহেও ছবি মনমতো হলো না, মনে হয় বেলাটা বেশি বেড়ে গিয়েছিল। তার থেকেই দু’টো এখানে দিলাম।

 


ছবি ও লেখা: প্রিসিলা রাজ



মায়াংবা ফুল           আলোকচিত্রী : প্রিসিলা রাজ

মায়াংবা ফুল          আলোকচিত্রী : প্রিসিলা রাজ

মায়াংবা ফুল           আলোকচিত্রী : প্রিসিলা রাজ
     
Untitled Document

মায়াংবা ফুল
Total Visitor : 708718
সাপলুডু মূলপাতা | মতামত Contact : shapludu@gmail.com
Copyright © Life Bangladesh Developed and Maintained By :