Untitled Document
বৈশাখ সংখ্যা ১৪১৮
মূলপাতা শিরোনাম বটতলা পঞ্জিকা প্রদর্শনী
ডিজিটাল যুগে রেয়াজউদ্দীনরা বড়ো অসহায়
- জাহাঙ্গীর আলম ইমরুল:


বয়সের ভাড়ে ন্যুঁব্জ্য, দাত গুলো পড়ে গেছে, চুল গুলোও ঝরে গেছে। মাথায় অবশিষ্ট শ্বেত বর্ণের গুটিকয়েক চুল। শুভ্র শ্মশ্র“ মন্ডিত এক বৃদ্ধ। চোখের জ্যোতি নেমে এসছে প্রায় শুন্যের কোঠায়। সবকিছু ছাপিয়ে এবয়সেও তিনি একজন পেশাজীবি। পেশা তার বিকল ঘড়ি মেরামত করা। এক কথায় আমরা যাকে বলি ‘ঘড়ি মেকার’।
কি বিচিত্র এই পৃথিবী ! জীবন-জীবিকা এ বয়সেও মুক্তি দেয়নি এই বৃদ্ধকে! নিজের দেহঘড়ির কাটা’ই যার থেমে থেমে আসছে, তিনি কিনা সারাবেন ঘড়ির.....। অথচ এ বয়সেও পরের ঘড়ির কাটা সচল রাখার কাজে ব্যস্ত তিনি। দিব্যি সারিয়ে তুলছেন অন্যের বিকল ঘড়ি। জীবন-জীবিকা, পেশা-নেশা সবই যেন একই সুতোয় গাঁথা হয়ে গেছে এতোদিনে। কুমিল্লা জেলা প্রশাসন কার্যালয় মসজিদের উত্তর গেটের সামনে গছেতলায় জরাজীর্ণ ছোট্ট একটি কাঠের বাক্স; ক‘টা ছোট-বড় বিকল দেয়াল ঘড়ি নিয়ে সাজানো তার চেম্বার। ঘড়িগুলো থরেথরে সাজানো কাঠের বাক্সটির চারপাশে। রেয়াজউদ্দীন একটি আতশী কাচে চোখ রেখে বিকল ঘরি মেরামতে ব্যস্ত..... কয়েক কদম এগিয়ে তার সামনে দাড়াতেই মাথা তুলে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে, নির্বাক....! কয়েক সেকেন্ড পর...... ‘ঘড়ি ঠিক করাইবেন বাবা? বিনয়ের সাথে জানতে চাইলেন তিনি। মাথা নেড়ে না’সূচক জবাব দিতেই..... ‘তাইলে কি দেখতাছেন? .....আমার নিরবতায় হয়তোবা তিনি বুঝে নিলেন- ‘সব প্রশ্নের উত্তর হয়না’।
একপর্যায়ে সংক্ষিপ্ত আলাপচারিতায় বেড়িয়ে আসে তার জীবন-জীবিকার নানান কাহিনী, অনেক দুঃখ গাঁথা।
বৃদ্ধের নাম রেয়াজ উদ্দীন। বয়স নব্বইয়ের কোঠায়। ভারতের চব্বিশ পরগনায় তার জন্ম। সেখানকার বেরেকপুর মিস্ত্রি ঘাটের প্রয়াত ইসমাঈল এর ছেলে তিনি। রেয়াজউদ্দীন জানান, ভারত-পাকিস্তান বিভক্তির পরই তিনি বাংলাদেশে (পূর্ব পাকিস্তান) চলে আসেন।
সে থেকেই তিনি কুমিল্লায় বসবাস করছেন। পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন ঘরি মেরামতের কাজ। একপর্যায়ে খুলনার নূরজাহান বেগমের সাথে ঘর বাঁধেন। বর্তমানে বৃদ্ধা স্ত্রী নূরজাহানকে নিয়ে মফিজাবাদ বিহারী কলোনিতে থাকেন। স্বধীনতার পর এই কলোনি গুলো চলেযায় প্রভাবশালীদের দখলে। তখন থেকেই কলোনিতে বিনেপয়সায় থাকার সুবিধা চিরতরে চুকেযায়। সেখানে থাকতে বর্তমানে মাসিক ২’শ টাকা ভাড়া গুনতে হয় তাদের। বৃদ্ধ রেয়াজউদ্দীন জানান, ঊকীল লাইব্রেরী মার্কেটে একসময় তার ঘড়ির দোকান ছিলো। সে সময় ভারত থেকে মালামাল এনে ব্যাবসা চালাতেন। একবার রাজশাহী দিয়ে আসার সময় বড় অংকের টাকার মালামাল চুরি যায়। তারপর ধীরে ধীরে ব্যাবসাও চুকেযায়। অবশেষে উপায়ান্ত না দেখে এভাবেই গাছতলায় বসে ঘড়ি মেরামতের কাজ শুরু করেন। তিনি বলেন, আগে এই পেশা থেকে অর্জিত অর্থ দিয়ে সংসার চলতো বেশ। কিন্তু, সময়ের বিবর্তনে আধূনিকায়ন হচ্ছে সব কিছু। সেইসাথে দিন দিন সব কিছুই হয়ে যাচ্ছে ডিজিটালাইজড্। আর ডিজিটাল যুগে রেয়াজউদ্দীনরা হয়ে উঠছেন বড়ো অসহায়। ডিজিটাল যুগে বাংলাদেশে ঘড়ির উপরই পড়েছে ডিজিটালের প্রথম প্রভাব। আশির দশকের গোড়ার দিকে চায়না-জাপানী ঘড়িতে সয়লাব হয়ে যায় এদেশ। সে থেকে এনালগ ঘড়ির চাহিদাও কমতে থাকে ব্যাপক হারে। এনালগ ঘড়ির ক্রম হ্রাসমান যুগে এখন আর কেউ এনালগ ঘড়ি ব্যাবহার করতে চাননা। তাই, জিটালের বিরোপ প্রভাবে রেয়াজউদ্দীনদের মতো মেকারদেরও কদর কমে এসেছে। কমেগেছে আয় রোজগারও। ফলে, সন্তানদের কাছেও কমেগেছে বৃদ্ধ এ পিতার কদর। রেয়াজউদ্দীন চার ছেলে এক মেয়ের জনক। সন্তনরা বৃদ্ধ পিত-মাতার খোঁজ রাখেন না। ফলে, বার্ধক্যে এসে অতি কষ্টে চলে বৃদ্ধ জুটির জীবন সংসার। দিন কাটে অনাহারে-অর্ধাহারে। বৃদ্ধা স্ত্রী নূরজাহান এবয়সেও কাজ করেন অন্যের বাসায়। এদিকে বৃদ্ধ স্বামী রেয়াজউদ্দীন খোলা আকাশের নিচে বাক্সপেট্রা নিয়ে সাজানো চেম্বারে বসে প্রতিনিয়ত তীর্থের কাকের মতো প্রতীক্ষার প্রহর গুনেন বিকল ঘড়ির প্রত্যাশায়। বৃদ্ধ রেয়াজউদ্দীনের দুঃখ গাঁথা শুনতে শুনতে মনের গহীনে বেঁজেওঠে আব্দুর রহমান বয়াতির সেই গান- ‘মন-আমার দেহ ঘরি সন্ধান করি.....
     
Untitled Document

পাঁচ পাপড়ির পদ্য
Total Visitor: 708288
সাপলুডু মূলপাতা | মতামত Contact : shapludu@gmail.com
Copyright © Life Bangladesh Developed and Maintained By :