Untitled Document
বৈশাখ সংখ্যা ১৪১৮
মূলপাতা শিরোনাম বটতলা পঞ্জিকা প্রদর্শনী
জলদাপাড়া অভয়ারণ্যে একদিন দুইরাত্রি
- মার্জিয়া লিপি



নেপাল সীমান্তবর্তী মিরিকের পাহাড়ী লেকে ঘুরে প্রায় মধ্যবেলায় শিলিগুড়িতে পৌঁছাই। ব্রীজের পাশে হোটেল ‘স্নোভিউ’তে ফ্রেস হয়ে দুপুরের খাবারের খোঁজে বেড়িয়ে পড়ি। বাসস্ট্যান্ডের পাশে একটা ভোজনশালায় গরম গরম আলু পরাটা, সয়াবিন আর গরম চা খেয়ে তেনজিং নোরগে বাস স্ট্যান্ডের উদ্দেশ্যে রওনা হই। মাঝ বয়সী রিক্স্রাচালকের কাছে জানতে পারি নকশাল বাড়ীর কিংবদন্তী সিপিএম নেতা চারু মজুমদারের বাড়ী আশে পাশেই। বাসস্ট্যান্ড থেকে জয়গাঁর বাসে মাদারীহাটের জলদা পাড়ায় যেতে সময় লাগবে প্রায় সাড়ে তিন ঘন্টা থেকে চার ঘন্টা। অরণ্যের সামনে বাস যখন থামলো তখন বিকেল গড়িয়ে প্রায় সন্ধ্যা। দীর্ঘ পথ কুচবিহার, জলপাই গুড়ির ডুয়ার্সের চা বাগান পেরিয়ে এসেছি। বিশাল আয়তনের বিখ্যাত ডুয়ার্স বাগান - পশ্চিম বাংলার অনেক কথা সাহিত্যিকের লেখার পটভূমি নকশালবাড়ী, আঙরাভাসা নদী, ডুয়ার্সের চা বাগানে জীবনচিত্র।

জলদাপাড়া অভয়ারণ্যে প্রবেশপথে চোখে পড়ল ‘দ্যা রাইনোল্যান্ড’ খ্যাত পাথরের সাইনবোর্ড খোদাই করা ফটক। পূর্ব হিমালয়ের ভূটান পাহাড়ের গা ঘেসে ২১৬ বর্গ কি:মি: বিস্তৃত জলদাপাড়া অভয়ারণ্যের খ্যাতি লুপ্ত প্রায় এক শৃঙ্গী গন্ডারের জন্য। মালঙ্গী, হলং, বুড়িবসরা, কালিঝোড়া সহ পূর্ণেন্দ্র পত্রীর কবিতায় যুবতী তোর্সা নদী এই অরণ্যের মধ্য দিয়ে বয়ে গিয়েছে।

নদীর নামে নাম বনবাংলো হলং অতিথিশালায় আমাদের থাকার ব্যবস্থা হলো। বাংলাদেশের বন বিভাগের সুন্দরবনে কাজ করেছি তাই কিছুটা বাড়তি আপ্যায়ন। চারপাশে জঙ্গলের মাঝখানে অনেকটা জায়গা জুড়ে ছোট ছোট কয়েকটা কটেজ। হলং বাংলো কাঠের মাচার উপর। দশ বারোটা সিড়ি ভেঙে কটেজে উঠতে হয়। প্রথমে কয়েকটা ছোট বারান্দা। পরিপাটি বাথরুম, সুন্দর পরিচ্ছন্ন বিছানা, অরণ্যের ভেতরেও নাগরিক সুবিধা। রাতের আলো অন্ধকারে মনে মনে সত্যাজিৎ রায়ের অরণ্যের দিনরাত্রিতে যেন বসবাস। তবে খাবার খেয়ে বিছানায় গা লাগানোর সাথে সাথেই লম্বা বাস জার্নির ক্লান্তি বুঝতে না বুঝতেই ঘুমের রাজ্যে হারিয়ে গেলাম। ঘুম ভাঙলো খুব সকালে চেনা অচেনা নানা পাখির ডাকে। যেন পাখির স্বর্গরাজ্য - টিয়া, ময়ূর, চিল, বাজ, বক, ধনেশ সহ আরও কতো নাম না জানা পাখি। এখন থেকে ৫৬ বছর আগে ১৯৫৪ সলে জলদাপাড়া বন কে সংরক্ষিত বনাঞ্চল ঘোষনা করা হয়। আর এখন ও তো অভয়ারণ্য- বিভিন্ন জীবজন্তু আর পশুপাখির। একটা ছোট চিড়িয়াখানা রয়েছে অফিসের সাথেই। সেখানে এ অরণ্যে প্রাপ্ত বিভিন্ন প্রজাতির পরিসংখ্যান আর পরিবার সহ জীবন্ত চিতা বাঘ। জঙ্গলে সাফারী হয় দুটো ট্রিপে। সকালে আর বিকালে। প্রতি হাতিতে চারজন পর্যটক বক্সারে সাফারী করতে পারে। যেন ধীর গতির গজগামিনীতে অরণ্য দর্শন। একটু আতংক কাজ করে চিতাবাঘের কথা মনে হলেই। কাজীরাঙা বন থেকে কেবল ভ্রমন শেষ করে আসা এক বৃদ্ধ অরণ্যচারী দম্পতির সাথে দেখা হয়ে যায়। আমাদের ট্যুর গাইড বীনা, সবকিছুই যেন তার চোখে আগে ধরা পড়ে। এ বনে হরিণ, হাতির দেখা মেলে সহজেই। পরিদর্শন টাওয়ারে উঠে দূরের দৃষ্টিতে আবছা ভাবে নজরে এলো বিখ্যাত একশিঙা ভয়ংকর রাইনো । চলাচলের পথে গন্ডারের জন্য মাটিতে ছোট গর্তে লবন রাখা, পাশেই ছোট একটা নদী। পাহাড়ী নদীর স্বচ্ছ কাঁচের মত টলটলে পানি। নীচে পাথরের নুড়ি, খুঁদে রঙ - বেরঙের মাছের মেলা।

রোদ পড়তেই এই অভয়ারণ্যের পোষা হাতিরা সারাদিন মুক্ত জঙ্গলে ঘাস পাতা খেয়ে ফিরে আসছে। পাশের নদীতে কয়েকটা হাতি স্নান করছে আমাদের উপেক্ষা করেই।
সাফারী শেষে এবার কটেজে। শুধু খাবারের জন্য নিচে নামতে হয় চাইলে উপরেও খাবার মেলে। নিরব নিস্তব্ধ রহস্য ঘেরা অরণ্যে এক রাত্রি দুই দিন পাড় করে এবার জয়গাঁ যাওয়ার পালা। বনের মায়ায় মনে হলো ট্যুরের পরিকল্পনাটা বুঝি ভুলই ছিলো। অন্য কোথাও না যেয়ে শুধু পশু-পাখির কাকলীতে নিঃসর্গে কয়েকদিন প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সবুজে হারিয়ে গেলে মন্দ হতো না।
তবে মনে মনে ভাবি, আবারও ফিরব আবার অরণ্যে, অরণ্যের দিনরাত্রিতে।


কিভাবে যাবেন
শিলিগুড়ির তেনজিং নোরগে বাসষ্ট্যান্ড থেকে জয়গাঁর বাসে মাদারিহাট । মাদারিহাট বাসষ্টপের সামনেই জলদাপাড়া অরণ্যের প্রবেশদ্বার ।
কোথায় থাকবেন
জলদাপাড়া অরণ্যের মধ্যে বিলাসবহুল হলং বাংলো অথবা ভুটানের প্রবেশদ্বার জয়গাঁয় রয়েছে নানা মানের হোটেল।


     
Untitled Document

পাঁচ পাপড়ির পদ্য
Total Visitor: 708318
সাপলুডু মূলপাতা | মতামত Contact : shapludu@gmail.com
Copyright © Life Bangladesh Developed and Maintained By :