Untitled Document
বৈশাখ সংখ্যা ১৪১৮
মূলপাতা শিরোনাম বটতলা পঞ্জিকা প্রদর্শনী
বাঙালির উত্তেজনা
- শুভ কিবরিয়া


বিশ্বকাপ ক্রিকেটের প্রাথমিক উন্মাদনার ঘোর এখন নিবু নিবু।
প্রতিবেশী ভারত চ্যাম্পিয়ন হয়ে আমাদের আনন্দকে কিছুটা ধরে রেখেছে। নইলে এই ক্রিকেট বিশ্বকাপে বাংলাদেশের পারফরমেন্স যে উঠা-নামার মধ্যে ছিল তা আমাদের উত্তেজনাকে বাড়িয়েছে কেবল। বাঙালি যে উত্তেজনা রোগ আক্রান্ত তার বড় প্রমাণ মিলেছে এবার বিশ্বকাপে ক্রীড়া আসরে।
বাঙালি কি উৎসবপ্রবণ?
নইলে জুম্মার দিনে ঢাকা শহরের প্রত্যেকটি রাস্তার সকল মসজিদের সামনের সড়ক অবরোধ করে ঘণ্টা দুয়েক নামাজ আদায় করে কেন আমজনতা? এরা কি ধার্মিক? শাস্ত্রসম্মত বিধিবিধান কি এরা প্রয়োগ করে নিজের জীবনে? তাহলে এত ঘুষ, দুর্নীতি, দুদক, ট্রুথ কমিশন কেন দেশজুড়ে?
নীরদচন্দ্র চৌধুরীর পর্যবেক্ষণ হচ্ছে, ‘বাঙালি গুণের অনুকরণে তত পটু নহে; দোষের অনুকরণে ভুমণ্ডলে অদ্বিতীয়।’
তাই হয়ত উৎসব প্রবণতায় অস্থির বাঙালি। কি করতে হবে না বুঝেই বিশ্বকাপ ক্রিকেট উৎসবে সারারাত আফ্রিকার ভুভুজেলা বাঁশি বাজিয়ে জাতে ওঠে।

বিশ্বকাপ ক্রিকেট নিয়ে আমাদের মিডিয়ার প্রবণতা দেখলেও বোঝা যাবে বাঙালির উত্তেজনা কি জাতের।
আয়ারল্যান্ডের সঙ্গে গ্রুপ পর্বে বাংলাদেশ দল জেতার পর ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১১, দেশের দৈনিক সংবাদপত্রের শিরোনামগুলো দেখুনÑ
‘প্রতিশোধের জয়, স্বস্তির জয়’ (প্রথম আলো),
‘দুর্দান্ত প্রতিরোধ, দুর্বার প্রতিশোধ’ (আমাদের সময়),
‘একটি জয় যেন এক গোছা রজনীগন্ধা’ (যুগান্তর)।
এই উচ্ছ্বাসের উত্তেজনা মিইয়ে গেল ৫ মার্চ ২০১১ তারিখেই। ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে আগের দিনে হেরেছে বাংলাদেশ। দলের মোট রান ছিল ৫৮। সংবাদপত্রগুলোও মুষঢ়ে পড়ল। সংবাদপত্রের শিরোনাম দাঁড়ালো,
‘দুঃস্বপ্নের এক দিন’ (প্রথম আলো),
‘মুখ ঢেকে যায় লজ্জায়’ (কালের কণ্ঠ),
‘এ লজ্জা রাখব কোথায়’ (যুগান্তর)।
এ যেন বাঙালির চরিত্রের চিরচেনা রূপ। প্রতিশোধ, প্রতিরোধ যেমন উত্তেজনায় তুঙ্গে ওঠে, ঠিক তেমনি নেতিয়ে পড়ে ম্রিয়মানতায়। লজ্জা, হতাশা, দুঃস্বপ্ন তাকে ঘিরে ধরে সমমাত্রিক উত্তেজনায়।
আরেকটি বড় হারের ঘটনা ঘটল দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে । মাত্র ৭৮ রানে শেষ বাংলাদেশের ইনিংস। পরের দিন ‘বাংলাদেশ প্রতিদিন’ নামের সংবাদপত্রটি শিরোনাম দিল, ‘টাইগার হয়ে যাত্রা, বিড়াল হয়ে বিদায়।’
এই হচ্ছে বাঙালি।
উত্তেজনায় কখনো সে টাইগার, কখনো বিড়াল।

২.
বাঙালির উত্তেজনা দেখতে হলে যেতে হবে তার উৎসব পার্বণে। সাংস্কৃতিক উৎসব হিসেবে বইমেলায় যান, দেখবেন কি অসম্ভব সংখ্যাগরিষ্ঠতার বিয়োচ্ছে বই।বইমেলায় শতেক সংখ্যায় বই বেরুল প্রতিদিন। নানা রঙ্গের নানা ধরনের বই। সংখ্যাধিক্যের ক্যানসারে গোটা দেশ যে আক্রান্ত, ফেব্রুয়ারির বইমেলা তার বড় নিদর্শন। শ’য়ে শ’য়ে স্টল, হাজারো হাজারো মানুষ। শুদ্ধ-অশুদ্ধ-বিশুদ্ধ বিবেচনা নেই। চলছে প্রচারণা। বইয়ের নামে, প্রচারণার আত্মীয়তায় ঢেকে থাকছে আমাদের প্রচার মাধ্যম। সবখানেই সংখ্যাধিক্য। কোনো গুণগতমান বিবেচনা নেই।
বইমেলায় গেলে বই ছুঁতে পারবেন না। দেখতে পারবেন দূর থেকে। ভালো বই কোনটি তা খুঁজবার ফুরসৎ নেই, সুযোগও নেই। প্রবন্ধ, উপন্যাস, গল্প, কবিতা, সমালোচনাÑ ইত্যাদি শাখায় কি কি ভালো বই বেরুল, সংবাদ মাধ্যমে যারা খবর দিচ্ছেন তারা তো বটেই, আমাদের বিদগ্ধজনেরাও দিতে পারবেন না। এত নিম্নমান আর এত সংখ্যাধিক্য!
কোন সম্পাদনা নেই, কোনো গুণমান বিচার নেইÑ বই বেরুচ্ছে, বিকোচ্ছে।
এসব নিয়ে বাঙালির দারুণ উত্তেজনা।
আজকাল ‘উত্তেজনা’ বাঙালির জীবনে স্ট্যাটাস হয়েও দাঁড়িয়েছে। ‘আপনি বইমেলায় কবার গিয়েছেন’Ñ এই প্রশ্ন জনে জনে। উত্তরের সংখ্যাধিক্যই বলে দেবে আপনার জাতপাত।
বাংলাদেশের শিক্ষা বা রাজনীতি কিংবা সাংস্কৃতিক জগত পুরোটা জুড়েই এখন উত্তেজনা আর সংখ্যার কাল।
কিন্তু এই উত্তেজনা কি সাম্প্রতিক?
নাকি এ তার নৃতাত্ত্বিক প্রবণতা?
রবীন্দ্রনাথ বাঙালির শ্রেষ্ঠ আশ্রয়। শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠও বটে। রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুতে তাই শোকগ্রস্ত বাঙালির বেদনা আকাশচুম্বী হবার কথাই। কিন্তু সেই শোকপ্রকাশের ভাষা কি হওয়া উচিত? নৃতত্ত্ব বলে উত্তেজনা। উত্তেজনা থেকে উন্মত্ততা। অনেক ভদ্রলোক এই সত্য লুকিয়ে রাখেন। আত্মঘাতী বাঙালির সেই প্রবণতার এক গল্প নিজের আত্মস্মৃতিতে লিখেছেন তপন রায় চৌধুরী। রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর পর বাঙালির আচরণ নিয়ে এক বয়ান দিয়েছেন তিনি ‘বাঙাল নামা’ নামের বইটিতে।
‘১৯৪১ সালের অগাস্ট মাসে একদিন মোয়াট সাহেবের ক্লাস করছি। হঠাৎ বাইরে একটা গোলমাল শোনা গেল। মোয়াট আমাকে বললেন, দেখে আসতে কী ব্যাপার। বের হয়ে শুনলাম, একটু আগে রবীন্দ্রনাথ মারা গিয়েছেন। কথাটা এসে ক্লাসে বলতেই প্রচণ্ড একটা হইচই শুরু হলো। মোয়াট সাহেবের চোখে সেই গভীর ব্যাঙ্গের দৃষ্টি তা কখনো ভুলব না। ভারতবাসীরা যে বর্বর, তাদের দেশের শ্রেষ্ঠ মানুষটির প্রয়াণে শোকপ্রকাশের ভঙ্গি দেখে উনি সে বিষয়ে নিঃসন্দেহ হলেন।
নিঃসন্দেহ আমিও কিছুটা হলামÑ শম্ভুর সঙ্গে জোড়াসাঁকো গিয়ে। এমন দ্বিধাহীন বর্বরতার দৃশ্য দেখতে হবে কখনো ভাবিনি। প্রচণ্ড চেঁচামেচি ঠেলাঠেলি চলছিল। জনতার চাপে ঠাকুরবাড়ির লোহার গেট ভেঙে গেল। মানুষের ভিড় এত বেশি যে আমাদের পা প্রকৃতপক্ষে মাটি ছুঁচ্ছিল না। এরই মধ্যে হঠাৎ প্রচণ্ড বেগে মানুষের মাথায় মাথায় খাটের উপর শোয়ানো ওঁর দেহ বেরিয়ে এলো। আর অনেক লোক ওঁর চুল দাড়ি ছিঁড়ে নিচ্ছিল। কবির দেবদেহ শুধু মুহূর্তের জন্য দেখতে পেলাম। বাইশে শ্রাবণ আমার কাছে শুধু জাতীয় শোকের দিন নয়, জাতীয় গ্লানির দিনও হয়ে আছে। এই বর্বরতার নায়করা যতদূর দেখতে পেলাম তথাকথিত ভদ্র বাঙালি ছাড়া আর কেউ নয়।’

৩.
এবার নিজের একটা হাল অভিজ্ঞতার কথা বলি। অনেকদিন পর সব্যসাচীর সঙ্গে দেখা। ইউরোপের একটি দেশ থেকে উচ্চ শিক্ষা নিয়ে ফিরেছে দেশে। কাজকর্ম জুটিয়ে নিয়েছে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থায়। ভালো বেতনেই। সুখী সুখী চেহারা তার; কিন্তু দু’চোখ ভরা স্বপ্ন এখনো আছে। দেশ, সমাজ নিয়ে ভাবনার কমতি নেই। বছর দশেক আগে দেখা সব্যসাচীর অবয়বে বয়সের ছাপ পড়েছে কিন্তু স্বপ্ন আর উদ্যম এখনো টগবগে। ওকে দেখেই আমার পুরনো দিনের কথাটা মনে পড়ে গেল। বাসদ রাজনীতির অন্তঃপ্রাণ সব্যসাচী বিশ্ব সাহিত্যকেন্দ্রের ক্যাফেটেরিয়ায় আমাকে বুঝিয়েছিল জামান ভাই কেমন করে বদলে দিল তার জীবন। রাজনীতি আর বাসদের জামান ভাই কি অন্তর্দৃষ্টি এনে দিল তার উচ্ছ্বাসপ্রাণ বর্ণনার চেহারাটা ভাসছিল তখনও। আমিই তাকে জিজ্ঞেস করি, সমাজ বদলের সেই পুরনো স্বপ্ন এখনো ধরে রেখেছেন? জামান ভাই প্রেম কি এখনো আছে? উত্তর পাবার আগেই সাংবাদিকসুলভ তথ্যগুলো জানাই সব্যসাচিকে। জানেন তো, জামান ভাইয়ের সংগঠন এবং তার ছাত্র সংগঠনই বামদের মধ্যে এখন টগবগে। এরাই তেলগ্যাস খনিজসম্পদ রক্ষার আন্দোলনে এগিয়ে। কথাগুলো বলতেই সব্যসাচীর চেহারায় সামান্য পরিবর্তন টের পাই। আমাকে মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে ব্যাগ থেকে কিছু কাগজপত্র বের করে সব্যসাচী। প্রাচ্যের লজ্জা ঝেড়ে পশ্চিমের স্মার্টনেস নিয়ে আমাকে কিছুটা হতচকিত করে সব্যসাচী বলতে থাকে, আপনি বোধ হয় সাম্প্রতিক তথ্য জানেন না। আরে জামান ভাই হালে কতকিছুর সঙ্গে জড়িয়ে গেছেন। জামান ভাইয়ের ব্যক্তিগত সম্পত্তি এবং ব্যক্তিগত সম্পর্কের বয়ান শুরু করেই সব্যসাচি সরাসরি প্রস্তাবটা দিয়েই বসে। জামান ভাইয়ের এসব নেতিবাচক তথ্য দিচ্ছি প্রমাণসমেত। এবার কলম ধরুন। লিখুন, কিভাবে এরা বছরের পর বছর পীর সেজে বসে আছে। এসব কথা জানাতে হবে মানুষকে।
সব্যসাচী এসব বর্ণনা দিতে দিতে জানাতে থাকে বাসদ রাজনীতির অভ্যন্তরীণ সঙ্কট এবং সংঘাতের কথা; কিন্তু তার অনুরোধ জামান ভাইয়ের ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে লিখতে হবে।
সব্যসাচীকে থামাই। বলি এসব তথ্য জানি। আপনার আগেই এসব কাগজপত্র নিয়ে দলের জামান ভাই বিরোধিরা এসেছিল। রাজনৈতিক দলে বিশেষত বাম সংগঠনগুলোর মধ্যে নানান বিরোধিতা, ভাঙ্গন নতুন ঘটনা নয়। তাত্ত্বিক ব্যবহারিক বিরোধ হরহামেশাই হচ্ছে। আকসার দলও ভাংছে। ভাংতেই পারে; কিন্তু সংগঠনের রাজনৈতিক বিরোধিতার জন্য ব্যক্তিগত কুৎসা রচনার চর্চাটা কি ন্যায়সঙ্গত? একজন মানুষের ব্যক্তিগত বিষয়কে সামনে এনে তার সারাজীবনের সাংগঠনিক অর্জনকে ধ্বংস করা কি উচিত?
সব্যসাচীকে মনে করিয়ে দেই, বাঙালির সংগঠন চিন্তা নিয়ে আমাদের পুরনো আলোচনা-বিতর্কের কথাগুলো। কেন বাঙালি সংগঠন টিকিয়ে রাখতে পারে না। কেন সংগঠনগুলো ভাঙে, সেসব তাত্ত্বিক আলোচনার কথা পাড়ি। সব্যসাচীকে বোঝাই, আপনার দেয়া তথ্য প্রকাশিত হলে ব্যক্তি জামান ভাই হয়ত ক্ষতিগ্রস্ত হবেন, কিন্তু বড় ক্ষতি হবে দেশের তেলগ্যাস খনিজসম্পদ রক্ষা আন্দোলনের। সব্যসাচীর পুরনো কথাই ফিরিয়ে দেই। বলি, বুর্জোয়াদের লাভবান করতে নিজেদের অস্ত্র তুলে দিচ্ছেন কেন, সাময়িক ব্যক্তিগত বিরোধে? কি লাভ তাতে দেশের?
সব্যসাচীর পশ্চিমা শিক্ষায় কিছু ঘা লাগে। কাগজপত্রগুলো গুছিয়ে নেয়। হয়ত ভেতরে ভেতরে আমার সঙ্গে সহমতও পোষণ করতে থাকে। তার বেদনা বুঝতে চেষ্টা করি। দলের প্রতি তার মমত্বকেও অনুধাবন করার চেষ্টা করি। যেসব মানুষ বা দলকে এতদিন বুকের মধ্যে রেখে ভবিষ্যতের রাজনৈতিক পরিবর্তনের আকাক্সক্ষার স্বপ্ন দেখেছে সে, তার প্রতি আঘাতের বেদনাও বুঝি। কিন্তু ‘নিজের নাক কেটে পরের যাত্রাভঙ্গের’ এ কুযাত্রার পরিণতিটার কথাটাও তাকে বোঝাতে চাই।
সব্যসাচীর বেদনাঘন মুখের দিকে চেয়েই অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যারের পুরনো কথাটা নতুন করে বলিÑ ‘আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলোর আসল মৃত্যু ঘটে এক অদৃশ্য ছুরির আঘাতে। সে আততায়ী নিঃশব্দ এবং অলক্ষ্য। কেউ তাকে কখনো দেখতে পায় না।’
সব্যসাচীর উঠে পড়ে। আমি তার দু’হাতে দু’হাত চেপে স্বগক্তি করি। প্রতিষ্ঠানগুলো বাঁচানো দরকার। বাঙালির এ প্রতিষ্ঠান ভাংবার আত্মবিনাশী প্রবণতা রোখা দরকার। অন্যরা যাই করুক, আপনি অন্তত এ দুষ্টচক্রের সঙ্গে নিজেকে মিশিয়ে ফেলবেন না।

৪.
সব্যসাচীর ঘটনা ভুলেই গেছি প্রায়। মেনে নিয়েছি এসব সুখ ও দুঃখ জীবনেরই অংশ। বাঙালির জীবন তাই চলমান। কিন্তু মনের মধ্যে নানা জিজ্ঞাসা চলছে। বাঙালির এসব আত্মঘাতি অসুখ কেন? উত্তর খুঁজতে পেয়ে যাই আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের একটি লেখা। বাঙালির উত্থানবর্বের নামি পুরুষ আচার্য্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় এর আত্মজীবনীতে ‘বাঙালির অসুখ’ কি তা নির্ণয় করে বলছেন,---
‘১৯০৬ সালে ‘স্বদেশী’ আন্দোলনের সময় শিবনাথ শাস্ত্রী মহাশয়কে একবার জিজ্ঞাসা করিয়াছিলাম যে, বাঙালি যুবক নিজের স্বার্থের জন্য নয়, দেশোদ্ধার হইবে এই ধারণার উপর কার্য করিয়া অম্লানবদনে ফাঁসীকাষ্ঠে ঝুলিতে শিখিয়াছেÑ কিন্তু সমাজ সংস্কার কার্যে বিধবা বিবাহ করিবার লোক পাওয়া যায় না ইহার কারণ কি? তিনি বলিলেন, বাঙালি ভাবপ্রবণ জাতিÑ হুজুগের স্রোতে গা ভাসাইয়া দিয়া মৃত্যুর সম্মুখীন হইতেও ভীত হয় না।’
বাঙালির এসব রোগ নিয়ে কাজ করেছেন মনস্বী প-িত আহমদ শরীফ। বাঙালি নিয়ে তার বিবেচনা হচ্ছেÑ
ক.
বাঙালি চিরকাল বিদেশী ও বিজাতি শাসিত।

খ.
একত্রিত হওয়া সহজ কিন্তু মিলিত হওয়া সাধনাসাপেক্ষ। সে সাধনা বাঙালি করেনি, তাই আবেগবশে যে ক্ষণিকের জন্যে উদার হয়, উত্তেজনাবশে সে ক্ষণিকের জন্যে মরণপণ সংগ্রামে নামে, মৌহূর্তিক স্বার্থবশে ঐক্যবদ্ধও হয় কিন্তু কোনোটাই টেকে না। তাই চৈতন্যের সাম্য ও প্রতিভিত্তিক প্রেমবাদও বাঙালায় ব্যর্থ হল। এজন্যে বাঙালি বৈষয়িক জীবনে কোনো বৃহৎ কর্মে উদ্যোগী হলেও সফল হয় না। লীগ-কংগ্রেসের জন্ম বাঙলায়, বিদ্বান বুদ্ধিমানও বাঙলায় সুলভ ছিল, তবু নেতৃত্ব বাঙালির হাতে থাকেনি।
গ.
প্রতিদ্বন্দ্বী বা ভিন্ন দলগুলোকে পর, সন্দেহভাজন ও শত্রু না ভাবলে স্বদলের স্বাতন্ত্র্য ও সংহতি রক্ষা করা সম্ভব হয় না। সুতরাং অন্য দলের প্রতি অবজ্ঞা, ঈর্ষা কিংবা প্রতিদ্বন্দ্বিতার ভাব পোষণ না করলে স্বদলের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ পায় না।
ঘ.
বাঙালি ভাবপ্রবণ ও কল্পনা নিয়ে উচ্ছ্বাস ও উত্তেজনাতেই এর প্রকাশ। তাই বাঙালি যখন কাঁদে, তখন কেঁদে ভাসায়। আর যখন হাসে, তখন সে দাঁত বের করেই হাসে। যখন উত্তেজিত হয়, তখন আগুন জ্বালায়। তার সবকিছুই মাত্রাতিরিক্ত।


৫.
পণ্ডিতদের এসব কথা বিবেচনাযোগ্য। উত্তেজনার এ কারণ অবশ্যই ভাবনার খোরাক জোগায়। ৪০ বছর বয়সী রাষ্ট্রের নানা অসুখ সারাতে হলে এ ‘উত্তেজনা’ রোগের উপশম হওয়াটাও দরকার। উত্তেজনা থেকে উন্মাদনা, উন্মাদনা থেকে ঢলে পড়া, ঢুলে পড়া বাঙালির এই প্রবণতা বদলাতে হবে। নইলে উত্তেজিত বাঙালির দুর্বলতা বাড়বেই কেবল। সুস্থিত সিদ্ধান্ত নিয়ে লক্ষ্যস্থির কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ার দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচি চালাতে হলে এসব রোগ সারাতে হবে।
আশা করি বাঙালি সমাজ জাগ্রত হবে।
নতুন চিন্তায় নতুন উদ্দীপনায় সুস্থিরতার বিষয়ে অধিকতর মনোযোগী হবে।
     
Untitled Document

পাঁচ পাপড়ির পদ্য
Total Visitor: 709222
সাপলুডু মূলপাতা | মতামত Contact : shapludu@gmail.com
Copyright © Life Bangladesh Developed and Maintained By :