Untitled Document
বৈশাখ সংখ্যা ১৪১৮
মূলপাতা শিরোনাম বটতলা পঞ্জিকা প্রদর্শনী
কাচের মিনার ভাঙবেন মার্কিন মুসলমান নারীরা
- আয়শা গাওয়াদ



যুক্তরাষ্ট্রে রমজান মাস চলছে। সারা এলগোবাশি বন্ধুদের সঙ্গে রোজা ভাঙার পর একটা মসজিদ খুঁজে বেড়াচ্ছেন যেখানে তাঁরা কোরআন তেলাওয়াত শুনতে পারবেন।

“মদিনায় যাওয়া যায়,” একজন বললেন। মদিনা মসজিদ কাছেই নিউ ইয়র্কের ইস্ট ভিলেজে অবস্থিত।

“না, মদিনায় যাওয়া যাবে না। ওরা মেয়েদেরকে পছন্দ করে না।” এলগোবাশি বললেন। তারপর জোরে হেসে উঠলেন।

দলটির মধ্যে অস্বস্তিকর নীরবতা নেমে এল। অন্যান্য মেয়েরা চোখ টিপে প্রসঙ্গ বদলে ফেললেন।

মসজিদগুলোতে মেয়েদের দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক ভাবার এই প্রবণতাকে এলগোবাশি কোনো মজার ব্যাপার মনে করেন না। ব্যাপারটাকে যেমন উদ্ভট তেমনই অপমানজনক বলে মনে হয় তাঁর। তবে এ থেকে আবার প্রতিবাদের প্রেরণাও খুঁজে পান তিনি।

এলগোবাশির লক্ষ্য ইসলামে পুরুষের ক্লাবকে ধ্বংস করা। তিনি পুরুষ ও নারীর মিলিত জামাতে নেতৃত্ব দিতে চান যা মুসলিম বিশ্বে খুবই বিরল। মসজিদগুলোতে পুরুষ আর নারীদের জায়গা একেবারে পৃথক করা থাকে আর নারীদের জন্য নির্ধারিত স্থান থাকে মসজিদের ভেতরের দিকে। যে গুটিকয় নারী ধর্মীয় জ্ঞানে ব্যুৎপত্তি অর্জনের সুযোগ পান নেতৃত্বের বেলাতেও তাঁরা কেবল নারীকেই নেতৃত্ব দেওয়ার অনুমোদন পান।

এলগোবাশির লক্ষ্য সনদপ্রাপ্ত ইসলাম বিশেষজ্ঞ হওয়া। এ এক দুরুহ কাজ। নিউ ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করার পর তিনি কোরআন শরিফের ১১৪টি সুরা মুখস্থ করার পরিকল্পনা করেছেন। সঠিক ছন্দ ও লয়, কণ্ঠস্বরের সঠিক উত্থান-পতন আর উচ্চারণ মিলিয়ে মুখস্থ করতে হবে। কঠিন এই কাজ সম্পন্ন করতে পারলে তিনি উলেমা সমাজ অর্থাৎ ইসলামবেত্তাদের দলে যোগ দেওয়ার সুযোগ পাবেন।

ইসলাম ধর্ম বিষয়ে পড়ার সবচেয়ে উপযুক্ত জায়গা কায়রোর আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয় যা কিনা পৃথিবীর প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইসলামী বিজ্ঞানসমূহের শ্রেষ্ঠ পীঠস্থান। এলগোবাশি সম্প্রতি এখানে ভর্তির প্রথম কঠিন চৌকাঠটি পেরিয়েছেন কিন্ত তারপরও কিছু বিষয়ে তিনি যথেষ্ট অসন্তুষ্ট।

আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৭০-এর দশক থেকে মেয়ে শিক্ষার্থীদের ভর্তি করা শুরু করলেও এখানে ক্লাসগুলোতে কঠিন লিঙ্গবিভাজন রয়েছে। তাছাড়া সেখানে মেয়েদের জন্য নির্ধারিত পাঠ আর অধ্যাপকদের মান দু’টোই নিুমানের। আল-আযহার ইসলামী গোঁড়ামির প্রতীক Ñ এখানে প্রথার সমাদর সর্ব্বোচ্চ আর তাকে রক্ষাও করা হয় প্রাণপণে। আর গোঁড়ামিভরা এই প্রথাকে বদলে দেওয়াই এলগোবাশির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। অর্থাৎ যাঁরা বলেন ইসলামে কর্তৃত্বের স্থানটি কেবল পুরুষের জন্য রক্ষিত তাঁদের চ্যালেঞ্জ করেন তিনি।

মুসলমান নারীরা ধর্মবেত্তার দায়িত্ব পালন করেছেন, কোরআনের ব্যাখ্যা প্রকাশ করেছেন এমনকি ফতোয়া বা ইসলামী আইনের আলোকে রায়ও দিয়েছেন কিন্তু তাঁরা কখনোই তাঁদের পুরুষ সহকর্মীদের সমান মর্যাদা পাননি।

মসজিদে “প্রত্যেক কাজের কেন্দ্রে থাকে লিঙ্গ বৈষম্য,” বলেছেন আফগান-মার্কিন লেখক ও সাংবাদিক আসরা নোমানি। নোমানি মুসলমান নারীদের এক বিতর্কিত আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছেন যার নাম তিনি দিয়েছেন “লিঙ্গ-জেহাদ” বা “জেন্ডার জিহাদ”। প্রথা অনুযায়ী “নারীকে মসজিদের সামনের অংশে কখনও যেতে দেওয়া হয় না, বক্ত ৃতা দিতে দেওয়া হয় না, সমাজের পক্ষে রাখতে দেওয়া হয় না কোনো বক্তব্য।”

নোমানি এবং তাঁর সহকর্মীরা নারী ঈমামের ঈমামতিতে নারী-পুরুষের মিলিত জামাতের আয়োজন করেছেন। অধিকাংশ মুসলমানের জন্য এটা এক বিরাট ধাক্কা।

কয়েকজন নারী আবার নারী-পুরুষের মিশ্রিত সভায় ধর্মীয় বক্তব্য পেশ করে থাকেন। এসব ক্ষেত্রে মুসলিম-মার্কিন গোষ্ঠীগুলো নারীদেরকেই এগিয়ে দেয়। উত্তর আমেরিকার বৃহত্তম মুসলিম সংগঠন দ্য ইসলামিক সোসাইটি অব নর্থ আমেরিকা (আইএসএনএ) ২০০৬ সালে প্রথম এর নারী সভাপতি নির্বাচিত করে।

কিন্তু মসজিদে নারী ঈমামের নেতৃত্বে মিশ্র-লিঙ্গ জামাত পরিচালনা খুবই বিরল ঘটনা। সত্যি বলতে কি, এ ব্যাপারে মসজিদগুলো যেন দিন দিন আরো কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে। শতকরা ৬৬ ভাগ মসজিদে মহিলারা আলাদা নামাজ পড়েন যেখানে অনেকসময় তাঁরা ঈমামকে দেখতেই পান না। ২০০১ সালে করা কাউন্সিল অন আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশন্স গোষ্ঠীর জরিপে এ তথ্য বেরিয়ে এসেছে। হিসাবটি ১৯৯৪ সালে ছিল ৫৪ শতাংশ। আর ৩১ শতাংশ মসজিদে দেখা গেছে কার্যনির্বাহী পরিষদে নারীরা সদস্য হওয়ার কোনো অধিকারই রাখেন না।

সমস্যাটা যে কেবল পুরুষের তা নয়, আসলে খুব কম নারীই এ ব্যাপারে মুখ খুলেছেন।

“মেয়েদের এগিয়ে এসে বলা উচিত ’আমরা যথেষ্ট জ্ঞানী এবং আমাদের সমাজে নিজেদের জ্ঞান বিনিময় করার অধিকার ও দায়িত্ব আমাদেরও আছে,’ ” বলেছেন আইএসএনএ-এর যোগাযোগ পরিচালক মোহাম্মদ এলসানুসি। “নারীদের অবশ্যই এগিয়ে আসতে হবে, এসব সাংস্কৃতিক অপধারণা সম্পর্কে পুরুষদের শিক্ষিত করার দায়িত্ব তাদের নিতে হবে,” তিনি বলেন।

নোমানি ও এলগোবাশির মতো নারীরা সে চেষ্টাই করে যাচ্ছেন তবে পুরুষদের প্রবল আধিপত্য কীভাবে ভাঙা যাবে সে নিয়ে রয়েছে মতবিরোধ।
নোমানি চান মুসলমান সমাজের মূলস্রোতের চেতনায় আঘাত করার মধ্য দিয়ে পরিবর্তন আনতে। ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া প্রদেশের মর্গানটাউন নামে যে ছোট্ট শহরের তিনি বাসিন্দা, সেখানকার মসজিদে সরাসরি ঢুকে গিয়ে শুধু পুরষের প্রবেশাধিকার আছে এমন ঘরে নামাজ আদায় করে প্রবল বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্রের পরিপ্রেক্ষিতে এ ঘটনার সঙ্গে একমাত্র তুলনীয় কৃষ্ণাঙ্গ অধিকার আন্দোলনের নেত্রী রোজা পার্কসের বাসে সামনের সিটে বসার ঘটনাটি।

মসজিদ থেকে তাঁকে নিষিদ্ধ করার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু এতে তাঁর উৎসাহ আরো বাড়ে মাত্র। এর পর পরই তিনি “মুসলমান নারীদের স্বাধীনতা” বলে এক প্রচারণা সংগঠিত করে সারা যুক্তরাষ্ট্রের মসজিদগুলোতে যেতে শুরু করেন।

“এসব ক্ষেত্রে ভাবমূর্তি একটা ব্যাপার, আঘাত করাটা একটা ব্যাপার, কারণ এতে মানুষ একটা প্রবল ধাক্কা খায় তারপর নিজেকে বদলায়,” বলেন নোমানি। “বিরাজমান সামাজিক ব্যবস্থাকে আমাদের বদলে দিতে হবে কারণ খুব বেশি লম্বা সময় ধরে আমরা অপেক্ষা করে আছি। প্রবল ধাক্কা খুব ভাল জিনিস কারণ এই ধাক্কার চোটেই আমরা হয়ত একুশ শতকে পা রাখতে পারব,” নোমানির আশা।

এলগোবাশির তরিকা অবশ্য আলাদা। তিনি আরেকটু নরম পথ নিতে চান।

“জনগণের একটা বিরাট অংশ আপনার দৃষ্টিভঙ্গীকে গ্রহণ করার ক্ষেত্রে আরো বেশি অনুপ্রাণিত হবে। এবং আপনি যদি মুসলমান সমাজের বাকি অংশ থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে না নেন তাহলে আপনি আরো বেশি মানুষকে প্রভাবিত করতে পারবেন,” বলেন এলগোবাশি।

আল-আযহারের ছাত্রী ইসলামী পণ্ডিত দুহা আব্দ এল-হাকিম বিশ্ববিদ্যালয়টিতে তাঁর নেতিবাচক অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন। সে কারণেই ঐতিহ্যবাহী ইসলামী শিক্ষা সম্পর্কে পড়াশোনার জন্য তাঁকে অন্য পথ ভাবতে হয়েছে।

“কায়রোয় পুরুষ শিক্ষক খুঁজে পাওয়াই ছিল মুশকিল কারণ তাঁদের কেউই আমার সঙ্গে একা কাজ করতে রাজী ছিলেন না,” তিনি বলেন। তিনি সেখানে এক শেখ বা ইসলাম বিশেষজ্ঞের পাঠচক্রে যোগ দেন কিন্তু তাঁকে আলাদা একটা ঘরে বসতে বলা হয় যেখান থেকে তিনি না দেখতে পান শিক্ষককে, না তাঁর পড়ানো ঠিকমতো শুনতে পান।

তবু আব্দ এল-হাকিম নোমানির ধাক্কা দেওয়ার কৌশলকে সমর্থন করতে পারেন না। এটাকে তাঁর কাছে “বাপ-মায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা টিনএজারের” মতো ছেলেমানুষি মনে হয়।

“ব্যাপারটা এমন না যে পরিবর্তন দরকার নেই,” তিনি বলেন, “কিন্তু পরিবর্তনকে আরো বেশি কাণ্ডজ্ঞানসম্পন্ন হতে হবে। নারী হিসাবে চোখ খোলার সবচেয়ে বড় উপায় পড়াশোনা করা এবং যতটা সম্ভব ওয়াকিবহাল হওয়া। মুসলমান গোষ্ঠীর সংখ্যা অসংখ্য। এদের সকলের সম্পর্কেই আপনার ভাল জানা থাকতে হবে এবং সকলের সঙ্গেই আপনার ভাল যোগাযোগ রক্ষা করতে হবে। ছোট করে শুরু করুন তারপর ধীরে ধীরে বড় হবেন।”

নোমানির কাছে আব্দ এল-হাকিমের এই দৃষ্টিভঙ্গী একেবারেই আনাড়িসুলভ। “সমাজকে এই পথে ১৫ বছর যাবৎ বদলানোর চেষ্টা করে যান, তারপর আমার সঙ্গে এসে দেখা করবেন,” উপদেশ দিয়েছেন নোমানি। “আল-আযহারে যান তারপর ফিরে এসে যথা পূর্বং ৯৬ স্ট্রিট মসজিদের সেই খুপরি ঘরে বসেই মহিলাদেরকে আপনার শিক্ষা দিতে হবে,” বলেন তিনি। ৯৬ স্ট্রিট মসজিদ নিউ ইয়র্ক শহরের আপার ইস্ট সাইড এলাকার বেশ বড় এক মসজিদ যেখানে নারী-পুরুষের পৃথক উপস্থিতির নিয়ম কঠোরভাবে অনুসরণ করা হয়।

“যদি আপনি অনেক দিন বাঁচেন তাহলে আপনাকে স্বীকার করতেই হবে যে কিছু মাত্রায় আপনাকে বাইরে থেকে কাজ করতে হবে কারণ ক্ষমতা ভোগ করছে এমন কেউই স্বেচ্ছায় ক্ষমতার সূচাগ্রও ছেড়ে দেবে না,” বলেন আসরা নোমানি।

অরংযধ এধধিফ রচিত ট.ঝ.: গঁংষরস ডড়সবহ ঞৎু ঃড় ঝযধঃঃবৎ ঃযব এষধংং গরহধৎবঃ-এর অনুবাদ,
নিউইয়র্ক ১১ মার্চ (আইপিএস), ২০০৯, নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটি লাইভওয়্যার থেকে আইপিএস-কে দেওয়া বিশেষ রচনা।

অনুবাদ: প্রিসিলা রাজ
     
Untitled Document

পাঁচ পাপড়ির পদ্য
Total Visitor: 708566
সাপলুডু মূলপাতা | মতামত Contact : shapludu@gmail.com
Copyright © Life Bangladesh Developed and Maintained By :