Untitled Document
বৈশাখ সংখ্যা ১৪১৮
মূলপাতা শিরোনাম বটতলা পঞ্জিকা প্রদর্শনী
অসংলগ্ন ভাব, ভাবনা........
ভাঁটফুল ও আমাদের দুটি পঁচিশে বৈশাখ

- অনুপ চণ্ডাল



আজ শেষ। ভোরবেলা ভেঙে- আসা ঘুমের ভিতরে উলুধ্বনি শোনা গিয়েছিল। পর পর তিনটি ভোর ধ্বনি এই। আর গান। পথের ধারে একটা বয়সী জিওল গাছের গোড়া নিকোনো হয়েছিল প্রথমের আগের দিন বিকেল বেলা। সেখানে গাছেরে ঘিরে বসেছে পাড়ার বৃদ্ধারা আর শিশু-কিশোর-কিশোরী। কুলোর পরে সাজিয়ে এনেছে তারা বিবিধ গেঁয়োফুল-মান্দার, পালটে মান্দার, পলাশ.....আর অজস্র অঢেল ভাঁটফুল। ভাঁটিপুজো এর নাম। নামহীন এক গ্রাম্য শূদ্র দেবী, শীতকালীন দু-একটা তুচ্ছ অসুখ-বিসুখ সারিয়ে দেবার ক্ষমতাটুকুই যার আছে, এ পুজো তারই উদ্দেশে। এক-একটি ফুলের নাম ধরে গান গেয়ে গেয়ে সেই ফুল তাকে নিবেদন। ফাল্গুনের শেষ তিনটি ভোর এই পুজো, আজ যার শেষ। সার্থক জনম ভাঁটফুলের! সারাটা বছর ছোট ছোট রূপহীন গাছগুলো পথের পাশে, পুকুর পাড়ে, পোড়ো ভিটেয় আছে যে কারো চোখেই পড়ে না, অথচ মাঝ ফাল্গুন এলেই মাটির অন্তরের সব শুভ্রতা ও সুঘ্রাণ নিয়ে অপার রূপ হয়ে ওঠে। আহা এমন পুজোও আছে যাতে ভাঁটফুল লাগে! ভাঁটফুলকথা যতবার আসে, নাসরিনা রব করে ওঠে :
“......একদিন অমরায় গিয়ে
ছিন্ন খঞ্জনার মত যখন সে নেচেছিল ইন্দ্রের সভায়
বংলার নদী মাঠ ভাঁটফুল ঘুঙুরের মত তার কেঁদেছিল পায়।”

এমনি করে ফাগুন অবসান। যারা উলুধ্বনি, যারা মৃন্ময় গান, জানে তারা আজ ফাগুন ফুরালো; কিন্তু যারা ভোরের ভাঙো-ভাঙো ঘুমের ভিতরে তা শুনে কয়েকটি মুহূর্ত শিশু হয়, সংকট তাদেরই। আধো-ঘুমের ভিতরেই তাদেরকে ভাবতে হয়: আজ বাঙলার ফাগুন যায়, বংলাদেশের যাবে কবে? হায় পয়লা বৈশাখ! হায়রে পঁচিশে!! দিনরাত্রিহীন অসীম সময়ের প্রেক্ষাপটে জন্মমৃত্যুহীন অসীম যে-জীবন তার এক রূপ-সে-রূপ কেবলই উপলব্ধির- কিন্তু আমাদের ভোগ-উপভোগের যে-জীবন, যা জন্মমৃত্যুসীমায়িত, যেখানে সময় দিনরাত্রিবিভাজিত, তার কাছে সংখ্যাচিহ্নিত দিন-মাস-বৎসরের বড় মূল্য, কারণ সেইসব সংখ্যাকে আশ্রয় করেই তার সব স্মৃতি, সকল ইতিহাস। তা যদি, এ তবে কেমন কুৎসিত কৌতুক যে আমাদের দুটি পয়লা বৈশাখ, প্রতি বাঙালির দুুটি জন্মদিন! বংলা ক্যালেন্ডার পরিমার্জনার আধুনিকতা বা বিজ্ঞানভিত্তিকতার ব্যাখ্যা আমরা জানি না; কিন্তু যে ক্যালেন্ডার একটি সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গ, সকলের জানা। অতএব অখণ্ড বাঙালি সংস্কৃতির প্রেক্ষাপটে বিষয়টি বিবেচিত হওয়া উচিত ছিল না কি? কোনো এক পক্ষ যদি এই পরিমার্জনার যৌক্তিকতা অনুধাবন করে থাকে, তবে, সাংস্কৃতিক অভিন্নতার প্রশ্নেই, তা অন্য পক্ষের কাছে উত্থাপন এবং একটি দ্বিপাক্ষিক সমাধান প্রয়োজন ছিল না কি? না কি এ-ও এক বিভাজন প্রকল্প যার অন্ধ লক্ষ্য বিভাজিত স্বাতন্ত্র্য? কে বেশি কেঁদেছেন বিভাজনে? আমরা যে মেনে নিচ্ছি ঋত্বিক কি জুতিয়ে যাচ্ছেন না আমাদের?

ভাঁটফুল ফাগুন-নিয়মে আর মানুষের হাতে আমাদের দুটি পঁচিশে বৈশাখ

এবার, নাসরিনা, এখানে এটা পড়-২১ ফেব্র“য়ারি ১৯৯৮, নন্দন-চত্বরে নবজাগরণের সভায় পঠিত ও ২২ ফেব্র“য়ারি ১৯৯৮ আজকাল পত্রিকায় প্রকাশিত। এবং গদ্যসমগ্র-২, প্রতিভাস, পৃষ্ঠা-৭৮। লিখেছেন, যিনি লিখেছেন, “এত কম সামাজিক সমঝোতা যে মৃত্যুর পর চারজন শববাহক জুটবে এমন আশা করতে পারি না।” সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়।

একুশের ঘোষণা : স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলা ভাষা-রাষ্ট্র
স্বাধীন বংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে আসসালাম আলেকুম জানিয়ে, আমি আগেও বলেছি আবারও বলি, ম্যাঞ্চেস্টারের তৈরি একটি কাঁচি দিয়ে ১৯৪৭ সালে বংলার ম্যাপটি কেটে ফেলা হলেও, দেশভাগের সময়, ঘরবাড়ির মত, ভাষা-সাহিত্যটাকেও আমরা ওদেশে ফেলে আসিনি যে কেউ তার দখল নিয়ে বলবে, এটা শত্র“-সম্পত্তি। এটা আমার। এবং ওদেশের সরকার তা সঙ্গে সঙ্গে আইনসিদ্ধ করে নেবে।
বস্তুত, এরকম সম্পত্তি-সমর্পণ পশ্চিমবঙ্গীয় সারস্বত সমাজের পক্ষে খুবই কঠিন কার্য। কেন না, প্রকৃত প্রস্তাবে, বাংলাদেশি ভাষা-সাহিত্য বলে আলাদা কিছু হয় না, এবং নেইও। আমেরিকায় ইংরেজি ভাষা-সাহিত্যের একটা ঘরানা তৈরি হয়েছিল, কারণ মাঝখানে ছিল আটলান্টিকের দুস্তর ব্যবধান। আর, সেটুকু হতেও সময় লেগেছিল ২০০ বছর। জার্মানিতে ৫০ বছরেও পূর্ব বা পশ্চিম জার্মান সাহিত্য বলে কিছু হয়নি। মাঝখান থেকে পাঁচিলটাই ভেঙে পড়ল। বংলাদেশ তো সবে তিরিশে পড়ল।
স্বাধীন বংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান অক্ষুণœ রেখেই বলছি, জার্মানিতে যা হয়নি, বংলাদেশেও তা হওয়ার সম্ভাবনা নেই। রবীন্দ্র-শরৎ-মানিক-জীবনানন্দ কি কমলকুমার ব্যতিরেকী, ওখানে কোনও আলাদা বংলাদেশি সাহিত্য গড়ে ওঠার সম্ভাবনা নেই। কারণ একটাই। কারণ এমন মসজিদ ওদেশে থেকে গেছে যার অজু করার পানি এদেশে। কারণ এদেশের বারাসতে মেঘ দেখলে, ওদেশে খুলনার লোক ছাতি খোলে এবং চিরকালই খুলবে।
কারণ, দেশভাগ হলেও আমাদের ভাষা-রাষ্ট্র ভাগ হয়নি। ভাগ করা যায় না। এবং যায়নি।
আসুন একটু সাল-তারিখের দিকে তাকাই।
বাংলা ১৩৩২ (১৯৫০) ১৬ আশ্বিন। বঙ্গভঙ্গ রুখে দিলেন রবীন্দ্রনাথ। শুধু হিন্দুদের জন্য? না, বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন তার অব্যবহিত পূর্বের হিন্দুমেলার মত ছিল না । এবং ভুবনডাঙার ফাঁকা প্রান্তরে রবীন্দ্রনাথ যে চারাগাছগুলি পুঁতেছিলেন, সেই বা কার জন্য? সে কি শুধু পশ্চিমবঙ্গের জন্য? তাঁর প্রতিটি পঙ্ক্তির উত্তরাধিকারী কি বংলাদেশিরা নন? দেশভাগের প্রশ্ন তো তাঁর দুঃস্বপ্নেও কখনও দেখা দেয়নি।‘আমার সোনার বাংলা’ বংলাদেশ নয়। পশ্চিমবঙ্গ তো নয়ই।
১৯৪২ সালে কবিতা ভবন থেকে যখন ‘বনলতা সেন’ বেরল নাটোর কি তখন পূর্ব পাকিস্তানে? পশ্চিমবঙ্গই বা তখন কোথায়। তখনও তো জিন্নসাহেব পাকিস্তানের দাবিই রাখেননি। সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহর প্রথম বই ১৯৪৮-এ। উনি কি তাহলে পূর্ব পাকিস্তানি ঔপন্যাসিক?
সত্য এই যে, রাজনৈতিক স্বাধীনতার জন্যই ওদেশে ভাষা-শভিনিজমকে তোয়ানো হয়েছিল। মৃন্ময়পাত্র যে কারণে কাংস থেকে দূরে থাকে-অনেকখানি সেই কারণেই বাংলাদেশ কি দূরে রাখেনি নিজেকে- ভারত থেকে? আমরাও তো একুশে ফেব্র“য়ারিকে কেন্দ্র করেই হিন্দির বিরুদ্ধে বাংলার জন্য লড়াই করছি। শুধুই কি ভাষার জন্যে? এর সঙ্গেও বাংলাদেশের ভাষা-আন্দোলনের মত আরও অনেক কিছু আছে। যেমন হিন্দি- হিন্দু সাম্রাজ্যবাদ।
যাই হোক, যা ভাবছিলাম। দেশ ভাগ হলেও ভাষা ভাগ হয়নি। বাংলা ভাষা- সাহিত্যের কেন্দ্র যেখানে ছিল এখনও সেখানেই আছে। আর সেটা আছে না ঢাকায়, না কলকাতায়। তাহলে আছে কোথায়? আছে, অস্ত্র যাকে বিদ্ধ করতে পারে না, বাংলা ভাষার সেই অচ্ছেদ্য, অদাহ্য, অক্লেদ্য, ইতিহাসে।
বস্তুত, সেই সার্বভৌম বাংলা ভাষা-রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি, স্রেফ বর্ণপরিচয়ের কারণেই আজও বিদ্যাসাগর।
উপরাষ্ট্রপতি- মধুসূদন দত্ত।
প্রধানমন্ত্রী- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
স্বরাষ্ট্র- বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়।
(সাম্প্রদায়িক হোন বা না হোন)
বিদেশ- সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ্।
পর্যটন- বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়।
গ্রামোন্নয়ন- তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়।
সংখ্যালঘু ও ওয়াকফ- মীর মুশাররফ হোসেন।
যুবকল্যাণ- কাজী নজরুল ইসলাম।
নগর-উন্নয়ন- মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়।
মৎস্য দপ্তর- অদ্বৈত মল্লবর্মন।
দপ্তরবিহীন- জীবনানন্দ দাশ।
গ্রামীণ হস্তশিল্প- জসিমুদ্দিন।
(মৌলবাদী হোন বা না হোন)

সার্বভৌম বাংলা ভাষা-রাষ্ট্রের এই ক্যাবিনেট ক্রমেই সম্প্রসারিত হতে থাকুক। একুশের এটাই প্রার্থনা।

     
Untitled Document

পাঁচ পাপড়ির পদ্য
Total Visitor: 709303
সাপলুডু মূলপাতা | মতামত Contact : shapludu@gmail.com
Copyright © Life Bangladesh Developed and Maintained By :