Untitled Document
বৈশাখ সংখ্যা ১৪১৮
মূলপাতা শিরোনাম বটতলা পঞ্জিকা প্রদর্শনী
তিনি অন্ধ তবে তিনি চক্ষুমান!
- এস এম নাজমুল হক ইমন



বগুড়া শহর থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরে সান্তাহার পৌর এলাকা আর সেই সান্তাহার থেকে আরো ২ কিলো ভেতরে মালশন গ্রামের পূবপাড়ায় এক আজব মানুষের বসবাস। এই আজব মানুষের আজব আজব কাজ সব মানুষকেই তাক লাগিয়ে দেয়। আরোও তাক লাগানো বিষয় হলো একজন স্বাভাবিক মানুষ যেখানে হাত পা ছড়িয়ে চলাফেরা করতেই ভয় পায় আর সেখানে তিনি এক বিজয়ী যোদ্ধার বেশে জীবন যাপন করছেন। কথাগুলো শুনলে হয়তো প্রথম বিশ্বাস হবে না কিন্তু বিশ্বাস যে করতেই হবে কারন আমাদের চোখ ও মানুষের চোখগুলো তো আর কিছু মিথ্যা কোন কিছু দেখেনি। আমাদেরও কথাগুলো শুনে প্রথমে বিশ্বাস হতে চায়নি তাই পুরোটিম নিয়ে গিয়েছিলাম সেই আজব মানুষের সন্ধানে আজব মানুষটিকে দেখতে। প্রথমে সব কিছুই যেন আজব আজব লাগছিলো; তারপর মনে হলো মানুষ এই পৃথিবীতে কিনা করতে পারে।
তিনি নামে মাত্র একজন অন্ধ কিন্তু এর ছিটে ফোটা নেই তার মাঝে। কেননা আমরা যখন গিয়েছিলাম তার বাসায় তখন তিনি কাজে ব্যস্ত ছিলেন। গরুর খাবারের ব্যবস্থা করছেন। আমরাই প্রথমে বুঝতে পারিনি। কিন্তু টের পেলাম তখন যখন তিনি আমাদের খবর পেয়ে উঠে এলেন। এরপর কথা হলো সেই আজব মানুষের সাথে। জানতে পারলাম তার নাম ওসমান। তিনি অন্ধ কিন্তু অনেক কিছুই করতে পারেন। ইট ভাঙ্গ, মাতুল (বিছানা) বুনা, খড় কাটা, ডালী তৈরি ও শেলাই, মাটি ঢোয়ান ভাড় তৈরি, গরু ছাগলের জন্য খাবার তৈরি করা এবং খাবার দেওয়া, আর সব চাইতে আশ্চয বিয়ষ হলো তিনি ডাব গাছ, খেজুর গাছে উঠতে পারেন। গাছের ডাল কাটতে রস লাগাতে তিনি এখনও গাছে গাছে উঠেন। তবে বয়সের কারনে তিনি আর ডাব গাছে উঠেন না। এখন শুধু রস লাগানো জন্য তিনি খেজুর গাছেই উঠেন। এছাড়া তিনি আইসক্রিমও বিক্রি করেন। টাকা গুনতেও তার অসুবিধা হয় না।
আমরা তাকে প্রশ্ন করেছিলাম আপনি এতো সাহস পান কিভাবে এই র্দুসাহসী কাজ গুলো করতে? তিনি যা বলেন, সাধনা আর চেষ্টা থাকলে চোখ থাকতে হয় না। চোখ তাদের বেশি দরকার হয় যাদের সাহসের অভাব।
অবাক করা কথা হলো তিনি যেগুলো অস্ত্র দিয়ে কাজ করেন তার সবগুলোই ধারালো। তবু অন্ধ মানুষ কাঁটাওয়ালা খেজুর গাছে উঠে যায় এটা অবাক করা ব্যাপার। সারা শীতের মৌসুম তিনি তার গ্রামসহ আশে পাশের গ্রামগুলোতে খেজুর গাছে রস লাগিয়ে থাকেন।
আজব সেই অন্ধ মানুষের নাম ওসমান প্রমানিক বয়স বর্তমানে ৭০ এর কাছাকাছি। বাবা মৃত অহিদ প্রমানিক আর মা মৃত অভরুন বেওয়া। অহিদের ২ ছেলে আর ১ মেয়ের মধ্যে ছোটবেলা থেকেই ওসমান ছিলো সাহসী ও চঞ্চল প্রকৃতির। সব সময় ছুটাছুটি আর এই গাছের আম, ঔ গাছের জাম পাড়া ছাড়াও অন্যান্য গাছে গাছে ওসমানকে পাওয়া যেতো। দুষ্টু প্রকৃতির ওসমানের বয়স তখন সবে ১০ বছর ৫ম শ্রেনীর ছাত্র তখন হঠাৎ করে তিনি টাইফোয়েড রোগে আক্রান্ত হয়। টাইফোয়েড থেকে সেরে উঠে ঠিকই কিন্তু চোখটা তার যায়। দিনের বেলায় ভালো ভাবে দেখতে পেলেও তিনি রাতের বেলায় দেখতে পেতেন না এক কথায় তিনি রাত কানা রোগে আক্রান্ত হয়। এভাবে চলতে থাকে কিন্তু দিন দিন তার চোখেরও অবস্থা খারাপ হতে থাকে। এক পর্যায়ে রাত কানা রোগ হয়ে যায় অন্ধেত্বের কারন আর তাই এক সময় তিনি দিনের বেলাতেও খুব কম দেখতে পেতেন।
আজ থেকে প্রায় ৩৮ বছর আগের ঘটনা। একটি খেজুরের গাছে রস লাগাতে গিয়ে তিনি গাছ থেকে পড়ে যান আর এই পড়ে যায় তার জন্য বড় ধরনের কাল হয়ে দাড়ায়। তার চোখ সম্পূর্ন নষ্ট হয়ে যায়। অনেক ডাক্তার অনেক কবিরাজ দেখানো হয়। আগে থেকেই দেখানো হতো তবে এই ঘটনার পরে আরো জোড়ালো ভাবে দেখানো হয় কিন্তু কোন লাভ হয়নি। বরং ডাক্তাররা বলেছে ওসমানের চোখ আর ভালো হবার কোনো সম্ভাবনা নেই। কিন্তু ওসমান জীবনকে ছেড়ে কথা বলেনি। একজন স্বাভাবিক মানুষ যা যা করতে পারে ওসমান তার চেয়ে কম জানে না। এই অন্ধত্ব নিয়েই ১২ সদস্যের পরিবার চালাতেন। পরিবারে কোনদিন এতোটুকু অভাব বুঝতে দেয়নি ওসমান।
ওসমান বিয়ে করেন ৫২ বছর আগে। স্ত্রী রহিমা বিবিকে নিয়ে ছিলো তার সোনার সংসার। স্ত্রী রহিমা বিবিও ওসমানকে অনেক ভালোবাসতো। তাই অন্ধ হওয়ার পরও স্বামীর প্রতি ছিলো অন্যধরনের ভালবাসা। অন্ধ মানুষের সাথেই সংসার করে কাটিয়ে জীবনের অনেকটা সময় কিন্তু তারপরেও ছেড়ে যায়নি। তবে সব বাধা ছিন্ন করে মাস চারেক আগেই সবাইকে ছেড়ে চলে যায় পরপারে। সংসারে ১০ ছেলে-মেয়ের মধ্যে ওসমান এখনো দিতে পারেনি ৪ ছেলে আর ১ মেয়ের বিয়ে। তবে গ্রামের স্থানীয় পৌর কাউন্সিলার তাকে বৃদ্ধভাতার ব্যবস্থা করে দেয়। আর তাই ১০ ছেলে-মেয়েকে টাকার অভাবে শিক্ষিত করাতে পারেনি তিনি তবে এখন তার ছোট মেয়েকে তিনি শিক্ষিত করাতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠাচ্ছে। ওসমানের বসবাস মালশন গ্রামে হলোও তার কাজকর্মের জন্য আশে পাশের গ্রামগুলো ও ছোট-বড়, বৃদ্ধ-যুবক সব মানুষেরা ওসমানকে একনামেই চেনেন আর তার দূঃসাহসী আচরনগুলোতে সবাই অবাক হয়ে যায়
     
Untitled Document

পাঁচ পাপড়ির পদ্য
Total Visitor: 709962
সাপলুডু মূলপাতা | মতামত Contact : shapludu@gmail.com
Copyright © Life Bangladesh Developed and Maintained By :