Untitled Document
জ্যৈষ্ঠ সংখ্যা ১৪১৮
মূলপাতা শিরোনাম বটতলা পঞ্জিকা প্রদর্শনী
বাঘের বাড়ী
- মার্জিয়া লিপি



বছর কয়েক আগের দেখা সুন্দরবন।
রয়েল বেঙ্গল টাইগার, চিত্রা হরিণ, নানা রঙের পাখি, গাছ আর জলের কুমির নিয়ে সুন্দরবন। বনবিভাগে থেকে ইকোটুরিজ্যম গবেষণায় সুন্দরবনের দূর্গম গহীনে যেয়ে দেখেছি দর্শনীয় অনেক কিছইু। সেবার ট্যুরে এসেছিলাম সাতক্ষীরা রেঞ্জ দিয়েÑ কারণ একটাই, সমগ্র সুন্দরবনের মধ্যে এই সাতক্ষীরা রেঞ্জেই সবচেয়ে বেশি দেখা হয়ে যায় বাঘের সাথে।

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সপ্তমাশ্চর্য সুন্দরবন, পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় একক ম্যানগ্রোভ বন । এ বনে জালের মতো জড়িয়ে আছে সামুদ্রিক জল ধারা, বাদাবন আর ছোট ছোট দ্বীপ। বাংলাদেশের অন্যতম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ভূমি Ñ বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ। জাতিসংঘের অঙ্গ সংস্থা ইউনেস্কো, ১৯৯৭ সালে সুন্দরবনকে ‘বিশ্বের ঐতিহ্য’ রূপে স্বীকৃতি দিয়েছে।

প্রাকৃতিক ভাবেই সৃষ্টি হয়েছে - এই বন। নতুন চরে জেগে উঠে ধানসী, পরে কেওড়া, গরান, বাইন, পশুর, ধুন্দল, সবশেষে সুন্দরী গাছ।অনেকের মতে সুন্দরী গাছের নামে এ বনের নাম হয়েছে সুন্দরবন। অনন্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সুন্দরবন, যেখানে সময়ের সঙ্গে সৌন্দর্যের রঙ বদলায়। নির্জন দুপুরের রূপ অচেনা, ভোরগুলো আবার অন্যরকম স্নিগ্ধ।

 

সুন্দরবন অভিযান টিমে ছিলাম ৬ জন সহকর্মী ছাড়াও  বন বিশেষজ্ঞ খসরু চৌধুরী, বিদেশী পরামর্শক, জাহানারা নূরী, গাইড, কেবিন ত্র“, ক্যামেরাম্যান ও দুজন ফরেষ্ট গার্ডসহ মোট ২২জন। খুব সকালে আমরা ঘাটে এসে পৌঁঁছলেও জাহাজের কিছু যান্ত্রিক সমস্যার কারণে যাত্রা শুরু করি মাথার উপর সূর্যকে রেখে। জাহাজ চলার আধাঘন্টার মধ্যেই দ্যা গাইড ট্যুরের মুগলী ভাইএর হঠাৎ চিৎকারে চোখ পড়লো একটা শূশক পরিবারের উপরে। ঝুপ করে এক ডুব দিয়ে একটু পরেই আবার পানিতে ভেসে উঠছে ছোট বড় শূশকগুলো, পর পর কয়েকবার ভাসছে আর ডুবছে।
এ যাত্রায় অভিযানের শুরুতেই আমরা বুড়িগোয়ালীনির কাছাকাছি কলাগাছি বনটহল ফাঁড়িতে নেমে এ্যাডভ্যাঞ্চারের শুরু।কলাগাছি ফরেষ্ট ক্যাম্পের ঠিক পেছনে রয়েছে বনের ভিতর দিয়ে একটা হাঁটা পথ। এই হাঁটা পথেই  বনের রাজা বাঘ মামারা হাঁটাহাঁটি করে। শেষ বিকেলে বনের মধ্যে হাঁটতে গিয়ে বাঘের পায়ের ছাপ দেখে টের পেলাম বাঘের
অস্তিত্ব।

একটু দু:সাহসী হয়ে কলাগাছি থেকে সন্ধ্যায় জাহাজে উঠে যাত্রা শুরু করি মান্দারবাড়িয়ার উদ্দেশ্যে। বাতাসে লোনা পানির গন্ধ, জন্তু, জানোয়ার আর নিশাচরের পদচারণে রহস্যময় রাত, নির্জনতার রূপ যেন অচেনা অন্যরকম। সন্ধ্যার পর গাঢ় অন্ধকার নেমে এলো সুন্দরবনের মাঝ দিয়ে এঁকেবেঁকে চলা নদীর বুকে।ঘোর অন্ধকার ভেদ করে ইঞ্জিনের শব্দ আর চার্জ লাইটের আলোয় মুন্ধ হতে হতে এগিয়ে চলেছি। মাঝে মাঝে যখন দল বেঁধে কয়েকটা নৌকা আমাদের জাহাজের দিকে এগিয়ে আসছে তখন মনে মনে ভাবছিলাম রূপকথার জলদস্যূদের কথা। অবশেষে মাঝরাতে জাহাজ নোঙ্গর করলো মান্দারবাড়িয়ার সমুদ্র সৈকতে।

 

হাড়িয়াভাঙ্গা নদীর তীরে মান্দারবাড়িয়ায় বন আর বেলাভূমির যুগল মিলন । আমার দেখা এক অন্য রকম অপার্থিব দৃশ্য। অনুভবে দেখছিলাম প্রকৃতির অতলে সৃষ্টির বিচিত্রতার বিস্ময়! ভোরের আলোতে কেবিন থেকে বের হয়ে দেখি এক পাশে বিশাল সমুদ্র আর অন্য পাশে ঘন বন। বৃক্ষ আচ্ছাদিত রহস্যময় ঘনবন, মনের রহস্যকে আনমনা করে দেয়, মনোজগতে তৈরি এক ধরনের বিচ্ছিন্নতার টান।

প্রায় ৮ কিলোমিটার লম্বা এই সমুদ্র সৈকত যেন ছবির মত । অসম্ভব ভালোলাগার আচ্ছন্নতায় মুগ্ধ। কক্সবাজার, টেকনাফ, উখিয়া, ইনানী, সেন্টমার্টিনসহ বঙ্গপোসাগরের অনেকগুলো সৈকত বেশ কয়েকবার দেখেছি। সুন্দরবনে এসে এত বড় একটি সৈকতের দেখা হয়ে যাবে ভাবতেও পারিনি। কিন্তু মান্দারবাড়িয়া সৈকতের সাথে অন্যকোনো সৈকতের একটুও মিল নেই। অপূর্ব সৌন্দর্য ঘেরা এক জায়গা। পিছনে বাঘের ভয় আর সামনে অসম্ভব ভালোলাগার হাতছানি দেয়া সমুদ্র, বিস্তীর্ণ সৈকত, সবুজ রহস্যে ঘেরা বন। নির্জন সৈকতে নিজেকে নষ্টালজিয়ার লাল-নীল-সবুজ/ লতাপাতার জালে জড়িয়ে খুঁজতে থাকি অন্যরকম ভিন্ন এক অনুভূতিতে।
সী-বিচে ঘুরতে ঘুরতে পেলাম সামুদ্রিক কচ্ছপ, রাণী কাকড়া, হরিণ আর বাঘের পায়ের ছাপ। তার মানে বিচে কিছুক্ষণ আগেই হরিণ আর বাঘ মামারা হাঁটাহাঁটি করেছে। মান্দারবাড়িয়ায় ফরেষ্ট রেঞ্জ অফিসারকে জিজ্ঞাসা করে শুনলাম, ভোর বেলায় বাঘ এসেছিল। বাঘের পায়ের ছাপ দেখার পর থেকে আবারও বাঘ দেখার নেশা আরেকটু জাঁকিয়ে বসলো। পায়ের ছাপের পিছুপিছু কিছুদূর যাওয়ার পর ব্যর্থ হয়ে ফিরে এলাম জাহাজে। এর দক্ষিণে তালপট্টি। সুন্দরবনে এমন অনেকগুলো ছোট-বড় সমুদ্র সৈকত আছে। কচিখালি থেকে কটকা এরকমই নির্জন সুন্দর ৭ কি. মি. দীর্ঘ আরেকটি সমুদ্র সৈকত।

উদ্দেশ্য এবার হিরণ পয়েন্ট। দুপুরের মধ্যে পুষ্পকাঠির হিরণ পয়েন্টে পেঁৗঁছে গেলাম আমরা। সবাই ব্যস্ত নীলকমলে বিশ্বঐতিহ্য চিহ্নের পাশে নিজের স্থির চিত্রকে স্মৃতিতে ধরে রাখার জন্যে। মনে মনে সুন্দরবনের জন্যে আমারও একরকম গর্ব আর অহংকার উঁকি দিল। দলের মধ্যে থেকে তিনজন  হিরণ পয়েন্ট পিছনের হাঁটা পথ ধরে হাঁটতে শুরু করলাম ক্যামেরা অন করে। এবারও আমাদের সাথে ফরেষ্ট গার্ডেরা বনের ভিতর কোষ্টগাডের্র দপ্তর থেকে প্রায় আধা মাইল খানেক আসার পর দেখি বিশাল শন বন। এ পথের শুরুতে কয়েকজনের সাথে দেখা হলেও এখানে এসে আর কাউকেই পেলাম না। শন বনের আবহাওয়াটা কেমন যেন একটু গুমোট। স্নিগ্ধ শন শনে হাওয়া বইছে চারিদিকে। নীরব, নিস্তব্দ এলাকা। একটু শব্দ হলেই গাঁ ছমছম করে কাঁপছে। এই বুঝি বাঘ চলে এলো। বাঘের ছবি তোলার নেশায় আবার সাহস জোগাচ্ছি একে অপরকে। কিন্তু কেউ কারো দিকে তাকাতে পারছি না। হঠাৎ শন বনের মাঝে আবিষ্কার করলাম হ্যালিপ্যাড। এখানে হ্যালিক্যাপ্টার ল্যান্ড করে। জায়গাটা শনে ঢেকে আছে। দূর থেকে বোঝার উপায় নেয়। আমরা সেখান থেকে আরও একটু এগিয়ে গেলাম ঘন বনের দিকে। জানি না কোথায় বাঘ বসে বিশ্রাম নিচ্ছে নাকি শিকারের আশায় চুপচাপ ঘাপটি মেরে অপেক্ষায় আছে? বাঘের পায়ের ছাপ দেখতেই ভয়টা সবাইকে আরও বেশি ঘিরে ধরল। হঠাৎ  ভীত সন্ত্রত হরিণের পাল  দিগবিদিক শূন্য হয়ে দ্রুত ছুটছে আর ছুটছে, স্পষ্ট বুঝতে পারছি আশেপাশে কোথাও বাঘ আছে।

 

কীভাবে যাবেনঃ

ঢাকা থেকে সাতক্ষীরার বুড়িগোয়ালীনি থেকে ট্যুরের জন্য শ্যামলী থেকে সাতক্ষীরার বাস ধরে সাতক্ষীরা/শ্যামনগর। ভাড়া এসি ৫০০/৬০০, নন এসি ৩০০/৩৫০ টাকা। ঢাকা থেকে সাতক্ষীরার দূরত্ব ৩৪৩ কিলোমিটার। সাতক্ষীরা সদর থেকে বুড়িগোয়ালীনি ৭০ কিলোমিটার। যেতে সময় লাগে সাত থেকে আট ঘন্টা। তিন চার দিনের এই ধরনের ট্যুরে প্রতিজনের খরচ হয় সর্বসাকুল্যে কমবেশি ৭-৮ হাজার টাকা।
তবে সাতক্ষীরার এই রুটে মালঞ্চ টুরস্ এন্ড ট্রাভেলস প্যাকেজ পরিচালনা করছে। এখান থেকে সুন্দরবনের দর্শনীয় স্থানগুলো কাছে হয়, সময় লাগে কম, তাই খরচও কম। কম সময়ে সুন্দরবনের অন্যতম চারটি স্পটের মধ্যে হীরণ পয়েন্ট, নীলকমল, দুবলারচর ও মান্দারবাড়ি সমুদ্র সৈকত ঘুরে আসা যায়। জনপ্রতি খরচ হবে আড়াই হাজার টাকার মত।
     
Untitled Document

ফিবোনাক্কির কেরামতি
Total Visitor: 708521
সাপলুডু মূলপাতা | মতামত Contact : shapludu@gmail.com
Copyright © Life Bangladesh Developed and Maintained By :