Untitled Document
জ্যৈষ্ঠ সংখ্যা ১৪১৮
মূলপাতা শিরোনাম বটতলা পঞ্জিকা প্রদর্শনী
নিলয়ে আলয়
- সামিও শীশ



দশ ফুট বাই দশ ফুটের পাকা ঘর। শিক দিয়ে তৈরী মজবুত গেট। দেয়ালের রং ২/৩ মাস পর পর বদলায়। এখন দেয়ালের রং সাদা। সাদা হবার একটা বড় কারণ নাম লেখা হয়েছে শ্বেত পাথরের ওপরে কালো রঙে। গত কয়বারের রঙিন প্যাঁচানো লেখার বদলে এবারের একেবারে সাধারণ ভঙ্গিতে লেখা FEROS নামটি খারাপ লাগছে না।
FEROS নামটি এসেছে ফেরোসাস থেকে। কুকুরের ভয়াবহতম প্রজাতি কালো ছিপছিপে গড়নের ডোবারম্যানের জন্য একটু শিহরণ জাগানো নামই বাড়ির সকলে চায়, তাই এর চেয়ে উপযোগী কোন নাম এরা খুঁজে পায়নি।
রাস্তার কুকুরের মতো যা পায় তা-খায় - এ স্বভাব তার নয়। তাই সে দুর্বলতো নয়ই, বরং ভিটামিন, ক্যালসিয়াম ইঞ্জেকশনে আর হাড়, মাংস ভক্ষণে সে পেয়েছে ভয়ংকর শক্তিধর ক্ষমতা। আর তাই একটা পা একটু খোঁড়া হলেও সে কিছুতেই কারো চাইতে পিছিয়ে নেই। শক্তিধর কুকুরটির স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে পাশ করা বিশেষজ্ঞ ডাক্তার আসে নিয়মিত। আর প্রতিদিনের দেখাশোনার জন্যে একজন লোক আছে। যদিও কুকুরের খাওয়া, গোসল, বাথরুম সব দায়িত্বই তার, তবে এ মুহূর্তে FEROSকে খাবার দিচ্ছে ছোট ম্যাডাম পেট্রা। লনে দু’জন বসে আছে। পেট্রা এক মনে FEROS এর চোখের দিকে তাকিয়ে আছে।
FEROSকে ঘরের ভিতর রাখতে পেট্রার খারাপ লাগে। কিন্তু উপায় নেই, ক’দিন পর কোরবানির ঈদ, তা-ই কুকুরটিকে তার ঘরের ভিতরে থাকতে হবে। কোরবানির জবাইয়ের দিন চারেক আগ থেকে পরদিন পর্যন্ত FEROSকে ঘরে বন্দী থাকতে হয়। আগের দিন এনে পরদিন জবাই দিলেই হয়, তা-না। এটা নাকি সোশাল স্ট্যাটাসের প্রশ্ন।
বড় অপছন্দীয়, অসহনীয় হলেও না মেনে উপায় নেই। লনের বড়ই গাছটি দেখলেও পেট্রার বিরক্ত লাগে। কিন্তু দাদাজানের নিজহাতে লাগানো গাছ। দাদাতো আর জানতেন না যে বাড়িতে বড়ই গাছ থাকলে ঢিলতো পড়বেই।
গাছটিকে উপড়ে ফেলতে ইচ্ছে করে। একদিন হয়তো এই নোংরা দেশী গাছ এই লনে মানাত, এখন আর মানায় না।
একথা পেট্রার আর্মির রিটায়ার্ড অফিসার বাবাও মানেন। কিন্তু উপড়ে ফেলার সাহস তারও নেই। গাড়িতে উঠবার আগ মুহূর্তে বড়ই গাছ, পেট্রা আর FEROS এর দিকে একবার তাকালেন।
গাড়ি বাড়ির গেট থেকে বের হবার পর কিছুক্ষণ তার মেজাজটা খারাপ থাকে। নেহাতই এই পথটা ছাড়া বের হবার আর কোন রাস্তা নাই। তাই ছোটলোকদের বস্তির পাশ দিয়ে যেতে হয়। পারতপক্ষে ডানে, বামে তাকাতে চাননা, পেপার পড়ার চেষ্টা করেন। তবু বাইরে চোখ চলে যায়।

চশমা পরা কে পথের মাঝে? দাঁড়িয়ে নয়, বসে নয়, শুয়ে নয়, হাত নেই, পা নেই, বুক নেই, পেট নেই - মানে দাঁড়ায় কোন অবস্থানই নেই। ভাসমান সেই সত্তা, রাগী চোখে চারপাশ উপলব্ধি করেন ও করান।...ঘরে ঘরে শিশুর ক্রন্দন কোনোদিন বন্ধ হয় না। এই ঘর কালবৈশাখীতে ধ্বংস হয়, বর্ষার ঢোকা জলে ভেসে যায় আর শীতে ঘরের মানুষগুলির হাড় বাজে কনকন। ক্ষুধা তৃষ্ণার দেবতা, হাসিকান্নার দেবতা, অন্ধকারের দেবতার এখানে বসবাস। তাই এখানে আসে রোগ, আসে শোক। ভগবান থাকেন অন্যখানে।
অনুভবের স্থান, কাল, পাত্র নেই। কী পার্থক্য বহতা নদী আর শহরের মানুষের মলমূত্রাদি আর কারখানার আবর্জনার কালো স্তরের জলাশয়ে?

এখানেও মানুষ থাকে। একা নয়, সংসার, পরিবার নিয়ে; ঠাঁইয়ের প্রয়োজনে ঘর তোলে - জলাশয়ের উপরে বাঁশের খুঁটি গেড়ে। দশফুট বাই দশ ফুটের টিনের ঘর। কাঠের দরজা। রূপালি রঙের বাড়ি। কয়েক মাস পরই জং ধরে রং লালচে হয়ে যায়। দরজার পাশে চক দিয়ে লেখা ফরাশ। সে প্রায়ই ঘরের সামনে তার নিজের নামটি লেখে, কখনো অক্ষরগুলো প্যাঁচানো হয়, কখনো গোলগাল, এইবার লিখেছে সোজা করে।
ফরাশের সবগুলো দুধের দাঁত এখনও পড়েনি। তবে এখনই মেয়েকে মাগী ডাকা তার কাছে স্বাভাবিক অভ্যাসে দাঁড়িয়েছে, মুখে খিস্তি সহজেই চলে এসেছে। বিড়ি আরম্ভ করেছে এর মধ্যেই। দু’একদিন গাঁজার টানও মেরেছে। বৃষ্টিতে ভিজে, কাদা মাটিতে গড়িয়ে আর সকলের সাথে ফুটবল খেলে সে। দিন কয়েক আগে খেলতে গিয়ে বাঁ পাটায় সামান্য চোট পেয়েছে। সামান্য চোটে ডাক্তার দেখাবার রেওয়াজ এখানে নেই। একটু খুঁড়িয়ে হাঁটছে এই যা। এটা এ্যামন কোন কঠিন ব্যাপারও নয়।
তাই বলে দিনভর বাসায় বসে থাকবে না সে। কালুর “ল্যাংড়া যায়” কথাটির আজকে জবাব দিবে। কালুদের সাথে কুত্তাওয়ালা বাড়ির বড়ই গাছে সেও উঠবে। যা থাকে কপালে।
প্রথমে সবাই উৎসাহ দেখালেও দেয়ালের পিছনে এসে উৎসাহে সবারই ভাটা পড়ল। আসলে কালো কুত্তাটাকে সবাই ভয় পায়। তাই দেয়ালের উপর উঠা কারোই সাহসে কুলাল না। কালুও এখন গাঁইগুঁই করছে। কালুর সবসময়ে নেতাবাজি ফলানো ফরাশের অসহ্য লাগে। কালুও যখন ভয় পাচ্ছে তখন ফরাশ কালুর বাপ মা তুলে গাল দেবার সুযোগটা হারাল না। যা থাকে কপালে বিসমিল্লাহ্ বলে পাঁচিলে উঠল। আজকে গাছে উঠবেই।
ল্যাংড়ার এত তেজ ক্যান - কালু বুঝে না। তবে ইদানিং ফরাশ তাকে টোক্কর দিবার চায় এটা সে বুঝতে পারছে। ঝোপবুঝে পেয়ে হারামীটার ত্যাল কমাবে। মনে মনে সেও বাপ, মা আর বোন তুলে গাল দেয়। গালি দিয়ে আরাম পায়।
ফরাশ সত্যি সত্যি গাছে উঠছে। দেয়ালে দাঁড়িয়েই কুত্তাটাকে দেখতে পায়। ভয়ে বুকটা কাঁপছে। কিন্তু নামলেই কালু পেয়ে বসবে। তার গালি তাকেই ফিরায় দিবে। একবার গালি দিয়ে সেই গালি ফের হজম করার চেয়ে বড় অপমান আর উপহাস হয় না। কালুরা সবাই হাসবে এবং সমস্বরে খিস্তিগাল দেবে।
গাছের ডাল ধরে উঠতে হবে। বড়ই গাছের ডাল ধরার অসুবিধাও অনেক। কাঁটা বিঁধে। ধরে রাখা মুশকিল। না, আসলেই সাংঘাতিক ভুল হয়েছে। আর কখনও এ্যামন ভুল করা যাবেনা। আল্লাহ্, এবারের মতো বাঁচাও। ফরাশ আসন্ন বিপদের ব্যাপারটা বুঝতে পারছে। গাছে আর ঝুলে থাকা যাচ্ছে না।

সভ্যতার আদিতে মানুষ ছিল একতাবদ্ধ। খাদ্য, আশ্রয়ের সন্ধানে আর বৈরী প্রকৃতির সাথে লড়তে তারা ছিল যুথবদ্ধ আর বণ্টনের ক্ষেত্রে সমভাগীদার। দিন, দিন তারা নতুন পথ তৈরি করেছে। মানুষের পরম বন্ধু হিসেবে সেদিন যে প্রাণী তার পাশে দাঁড়িয়েছিল - সে হচ্ছে কুকুর।
প্রবল ঘ্রাণ শক্তির অধিকারী এ জীবটি অনেক কিছুই টের পায়। যেমন FEROS মালিকের বাড়িতে অনাকাক্সিক্ষত জনের প্রবেশ টের পেয়েছে। প্রবল বেগে ছুটছে।
ফরাশ কোনোমতে ডান হাতে ঝুলে আছে। বাম হাতটা ছুটে গেছে। বাম পাটা মাটি ছুঁই, ছুঁই করছে।
গোড়ালির উপরের মাংস উঠে গেছে। FEROS এর চিৎকার ছাপিয়ে ফরাশের আর্তনাদ শোনা যাচ্ছে না। ডানহাত ডাল থেকে ছুটে গেছে। ধড়াম করে পুরো শরীরটাই লনের ঘাসে পড়ল। সবুজ ঘাসের কয়েক ফোঁটা কালচে লাল রক্ত, পা থেকে ঝরছে। মাথাটা ঝিম ঝিম করছে। ‘আল্লাহ্, মা গো’ বলে চিৎকার করে উঠল। কালুকেও ডাকল -‘বাঁচা’।
দেয়ালের ওপাশে কালু দাঁড়িয়ে আছেই। ঠিক বুঝতে পারছে না, কী করবে? ভয়ংকর কুত্তাটার সাথে লড়াই করা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। কিন্তু ফরাশ হতভাগাকে এভাবে ছেড়ে পালাতে মন সাড়া দিচ্ছে না। সে গাছ বেয়ে বাউন্ডারি দেয়ালের দিকে এগিয়ে যায়।

FEROS এর পা দু’টি এখন ফরাশের বুকের উপর। থুঁতনির কাছে হালকা দাঁত বসিয়েছে। ফরাশের গলার উপরে FEROS এর মুখ । ফরাশের বুকের উপর থেকে রক্ত বেয়ে FEROS এর পায়ে লাগে। পেট্রা তা লক্ষ করল।
FEROSকে আজকে ভালভাবে ওয়াশ করতে হবে। নোংরা রক্তে তার শরীর মাখামাখি। কুকুরের কেয়ারটেকারটি FEROSকে সামলায়। খুনাখুনি হলে এই ছোটলোকগুলো ঝামেলা করবে।
ফরাশের চোখ দু’টি ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। ডানে কাঁধ ফিরে সে কুকুরের মুখটা দেখে। রাগে কুকুরের মুখটা গজড়াচ্ছে। কাঁধ ঘুরাবার শক্তি পাচ্ছেনা। নইলে হয়তো দেখতে পেত কালু তাকে ছেড়ে পালায়নি। সেও পাঁচিল টপকানোর চেষ্টা করছে।
পেট্রা, কেয়ারটেকার আর দারোয়ান আঁচ করতে পারছে কিছু একটা ঝামেলা বাঁধাবার পায়তারা চলছে। পেট্রা ছুটে যায় তার বাবাকে ফোন করতে। আব্বু সব সল্ভ করতে পারে।

বাবারা এমন সমস্যা করে যান - ছেলেদের যা সারাজীবন বহন করতে হয়। পেট্রার বাবা জীবনভর তার পিতার বেকুবির সাজা পান। কোন মানে হয় ছেলের নাম ফকির রহমান রাখার? আর্মির বড় অফিসার হয়ে রিটায়ার্ড করে একজন ব্যবসা সফল মানুষ হয়েও এই নামের উপহাস থেকে মাফ পায়নি। কার্ডে এফ. রহমান লিখেও এ নামটি প্রতিষ্ঠিত করতে পারেননি। পার্টনাররা এমনকি রিসিপশনের চেংড়িটাও এটা নিয়ে উপহাস করেন। তবে চেংড়ি একটা জিনিস বটে। তিনি বেশ অ্যাপিলড্।
রহমান সাহেব ফোনে বাড়ির সব ঘটনা শুনলেন। পেট্রা বেচারি একা, নিশ্চয়ই বেশ ভয় পেয়েছে। তার মা’তো রূপচর্চা আর স্লিমের সাধনার জন্য বাড়িতে থাকার সময় পায়না।
বাড়িতে ঝামেলা হতে পারে। দ্রুত বাড়ি পৌঁছাতে হবে। গাড়ি যত বেগে সম্ভব ছুটে যাচ্ছে। পুলিশকেও ইনফর্ম করা দরকার। তিনি মোবাইলটা বের করলেন।
বিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগে বিজ্ঞানের চরম উৎকর্ষতায় মানুষ দূরকে করেছে কাছে। মানুষে মানুষে যোগাযোগ সহজ হয়েছে। আবার মানুষে মানুষে প্রভেদ, বিভেদও বাড়িয়েছে। ভিটেমাটি ছাড়ার দুঃসহ কত কথন জমা রয়ে গেছে লক্ষ লক্ষ মানুষের বুকের মাঝে? আজ ক’জন মানুষের বিবেককে তা নাড়া দেয়?
শতবর্ষের প্রান্তে পৌঁছে জীবন্ত বিবেক হয়েছিলেন অন্নদা। অন্নহীন মানুষকে তিনি কী দান করবেন? ছন্দহীন জীবনের মাঝেও তিনি ছড়ার সম্পদ খুঁজেন। সম্পদই পরিণত হয় শক্তিতে। পরম যন্ত্রণাতে তিনি বিদ্রƒপ করে বলেছিলেন - কুলের শাখা ভাঙলে পরে খোকার ’পরে রাগ করো/ তোমরা যে সব বুড়ো খোকা দেশটা খেয়ে ছাড় করো তার বেলা?

বাড়িতে পুলিশ চলে এসেছে। ফরাশ শুয়ে আছে ঘাসে। পুলিশ দেখেও কালু তাকে ছেড়ে যায়নি। FEROSকে এর মধ্যেই ওয়াশ দেওয়া হয়েছে।
ফরাশ কালুকে দেখে কেঁদে ওঠে। এ মুহূর্তে কালুকে বড় আপন মনে হচ্ছে। ফরাশের চোখ ঝাপসা হয়ে যায়। দূর থেকে FEROSকে দেখে। দূর থেকে সে FEROS এর তিনটা পা দেখতে পায়। নিজের পায়ের যন্ত্রণা আরও তীব্র হয়।

তীব্র যন্ত্রণা থেকে বাঁচতে মানুষ কবিতা লেখে, ছবি আঁকে, ব্যাকুল হয়ে গান ধরে, লক্ষ্যবিহীন স্রোতের ধারায় তার সকলি ভাসিয়ে পথের নেশায় পাথেয়কে হেলা করে।
ফরাশ তার যন্ত্রণা থেকে মুক্তির জন্যে কী করবে? দিনভর খেটে যাওয়া বাবা, সারাদিন অভাবের চিন্তায় খিটিমিটি মেজজের মা, স্বামী পরিত্যক্তা বড় বু, গুলিতে নিহত কোন্ পার্টির লাশ প্রশ্নে দ্বিধান্বিত মৃত বড় ভাই, পাশের পাড়ার ছেলের সাথে গোপন লটঘটকারী ছোট বু, চকলেটে কামড় দিয়েও আধাটা প্যাকেটে পুরে রাখা লজেন্স ফেরি করা পিঠাপিঠি মেজ ভাই আর কৃমি ভর্তি পেট নিয়ে ঘরের মেঝেতে হামাগুড়ি দেওয়া ছোট ভাই - এদের মুক্তি কোথায়? ফরাশের মনে পড়ে তার আঙিনার আপনজনদের কথা।
সে আবারও কুকুরের তিনটি পায়ের দিকে তাকায়। চোখ বুজে আসে। মনে পড়ে আপনজনদের কথা।

আমি কি বাস করব ক্ষুধার্তের ক্ষুধার রাজ্যে? আশ্রয়হীনের সাথে খোলা আকাশের নিচে? ছন্দহীন জীবনে ছন্দময় কবিতার মাঝে? মন কাঁদানো সঙ্গীতের সঙ্গে? স্বপ্ন আর না পাওয়া বেদনাই কি আমার জীবনের পরিণতি?
কোন কোন প্রশ্নের উত্তর পণ্ডিতমশাইরাও জানেনা। ঘূর্ণিপথের পাকচক্রে কোথায় আমার আবাস? গভীর আগ্রহ নিয়ে উত্তরের অপেক্ষায় থাকেন। দীর্ঘ অঙ্কের শেষে উত্তরমালা দেখেন। কিন্তু মেলেনি উত্তর।

     
Untitled Document

ফিবোনাক্কির কেরামতি
Total Visitor: 709954
সাপলুডু মূলপাতা | মতামত Contact : shapludu@gmail.com
Copyright © Life Bangladesh Developed and Maintained By :