Untitled Document
জ্যৈষ্ঠ সংখ্যা ১৪১৮
মূলপাতা শিরোনাম বটতলা পঞ্জিকা প্রদর্শনী
সাক্ষাৎকারঃ আন্দ্রেই তারকোভস্কি


শিল্প হলো মূলত আধ্যাত্মিকতার অনুসন্ধান


প্রশ্নঃ আন্দ্রেই আপনি একবার বলেছিলেন ‘যতবেশী পাপ এই পৃথিবীতে জমা হচ্ছে, ততটাই সৃষ্টিমূলক কাজের সংগত কারণ খুঁজে পাওয়া যাবে।’ আপনি আরো বলেছিলেন, ‘যে জিনিসের আধ্যাত্মিক বুনিয়াদ নেই, শিল্পের সঙ্গে তার সম্বন্ধ থাকতে পারে না।’ আপনার ‘এন্দ্রই রুবলেভ’ ছবিতে ঋষিনায়ক এমন সহজাত এক পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছিলেন যা জীবনকে পরিস্কুট করতে পারে। আমরা এখন আর মধ্যযুগীয় বর্বরতার মধ্যে বাস করি না যেমন আপনি আপনার ছবিতে নিপুণভাবে দেখিলেছিন। আমাদের বর্তমান জগতে কিন্তু সেই উগ্রহতা, নিষ্ঠুরতা, মানবিক অবমাননা, মূল্যবোধের অবক্ষয় সব-কিছুই রয়ে গেছে। তাহলে কি আপনি আপনার বক্তব্যের মধ্যে এটাই বলতে চান যে, আবহমান কাল ধরে শিল্প হলো মূলত আধ্যাত্মিকতার অনুসন্ধান।

উত্তরঃ আমার মনে হয় আপনি সম্পুর্ণ আলাদা দুটো বিষয়কে গুলিযে ফেলেছেন। শিল্প এবং আধ্যাত্মিকতা শব্দ দুটোর অর্থ এক নয়। কেউ শিল্প সম্পর্কে কোনো চিন্তা না করেও তাঁর আধ্যত্মিক জীবনযাপন করতে পারেন। আবার কোনো একজনের মধ্যে শিল্পী হওয়ার আকাঙ্খা আছে, অথচ তাঁর মধ্যে আধ্যাত্মিককতার লেশামত্র নেই; আবার নিঃসন্দেহে একথাও বলা চলে, আধ্যাত্মিকতার অন্বেষণ থেকেও শিল্পের জন্ম হয়।

প্রশ্ন আমরা আপনাকে প্রশ্ন করতে চাই শৈবকাল সম্বন্ধে। মনে হয় এটি আপনার প্রিয় বিষয়। ‘চাইল্ডডুড অব ইভান’ চবি থেকে যার শুরু, জীবনের এই বিশেষ সময়টি আপনার প্রতিটি ছবিতে ঘুরেফিরে বার বার এসেছে। আপনি কি আমাদের বলতে পারেন, আপনার নিজের শৈশবকাল আপনার সমস্ত ছবিতে কী ভূমিকা গ্রহণ করেছে।

উত্তরঃ কখনোই আমি ‘শৈশবকাল’- এর ভাবনা ঐ ভাবে ভেবে কোনো কাজ করিনি। আমার কোনো ছবির বিষয়বস্তুতে এই ব্যাপারটা ছিল না। এটা আমার কোনো ছবির মূল ছিল না। সকলেই যদি ভেবে থাকেন আমি ঐ বিষয় নিয়ে ছবি করেছি, তাহলে বলব কতগুলো ভ্রান্ত ধারণার ওপর ভিত্তি করে আমার ভুল ভ্যাখ্যা করা হয়েছে। আমার শেষ দুটো ছবি ব্যক্তিগত অনুভূতি নিয়ে নির্মিত। সেখানে শৈশবকা/ল বা অতীতকাল এদুটোর কোনোটারই সম্বন্ধ নেই বরং সেখানে প্রেক্ষাপট বলতে বর্তমান সময়। আমি নিজস্ব ‘ধারণা’ কথাটার উপর জোর দিচ্ছি। শৈশবকালের স্মৃতি কখনোই কোনো ব্যক্তিকে শিল্পী করে তোলে না। এ ব্যাপারে আমি আনা আখমাতোভার১ গল্প বা শৈশবকাল নিয়ে লেখা বা মার্সেল গ্র“স্ত-এর কথা উল্লেখ করব। আমরা আমাদের জীবনে শৈশবকালকে অতিমাত্রায় প্রাধান্য দিইি। আমি শিশুকাল সম্বন্ধে মনোবিশ্লেষণকারেিদর দুষ্টিভঙ্গি বিশেষভাবে বহন করে চলি। আমরা খুঁজতে চাই শিশুকালের যাবতীয় স্তরগুলির ব্যাখ্যা বা কিনা পরবর্তীকালে মানুষের ব্যক্তিত্ব গঠন মিশে থাকে। মানুষের মানের আচরণ বোঝার ক্ষেত্রে হয়তো এটা একটা উপায়। কিন্তু এটাই একমাত্র উপায় হতে পারে না। সম্প্রতি আমি একজন বিখ্যাত মনোবিশ্লেষকের অদ্ভুত একটা চিঠি পেয়েছি, যিনি আমাকে মানুষিক আচরণের ব্যাখ্যা দিতে চেয়েছেন মনোবিশেÍষণের ভিত্তিতে। শিল্পীর তাড়না, উপাদান, সত্তা প্রভৃতি অত্যন্ত জটিল ব্যাপার। কোনো সহজ ব্যাখ্যা চলে না। ছেলেবেলোর কোনো ঘটনা বা ধারণাগুলোর বিলম্বিত প্রকাশ একে বলা যাবে না। আমি মনে করি শিল্পের এধরদনের ব্যাখ্যা অতিমাত্রায় সহজীকরণ, এমন- কি ভীষণ সেকেলে।

প্রশ্নঃ তবু খোঁজার কল্পনা সত্য, আধ্যাত্মিক তৃষ্ণা, এ সমস্ত বিষয় কি আপনার সমস্ত ছবিতে বর্তমান?

উত্তরঃ প্রতিটি শিল্পী এই পৃথিবীতে সববাসের সময়ের মধ্যে সত্যের অন্তত একটা টুকরো যা সভ্যতায় বা মনুষ্যত্বে আছে সেটুকু খুঁজে বের করে নিজের কাছে রাখার জন্য। খোঁজা, এই ধারণাটাই শিল্পীর কাছে অপমানজনক। শিল্প হচ্ছে জঙ্গলে ব্যাঙের ছাতা খোঁজা, কেউ খুঁজে পায় কেউ পায় না! এমন-কি পিকাসো বলেছিলেন, ‘আমি খুঁজি না, ‘আমি পেয়ে যাই-’ আমার মতে তিনি কোনো মতেই অভিজ্ঞতা থেকে তেমন আচরণ করবেন না। ‘আম চেষ্টা করেি করি, চেষ্টা করে দেখো-’ শিল্পী চেষ্টাকৃত হয়েই সত্যকে বোঝেন,, এই জগতের সত্যকে বুঝে নেন। শিল্পী অবশ্যই বিশ্বাস করবেন, তিনি আর তাঁর সৃষ্ট সত্যের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত। আমি পরীক্ষা করা, খোঁজা প্রভৃতি বিষয় সরাসরি নাকচ করি, শিল্পের আঙিনায় এসব চলে না। শিল্পের ব্যাপারে কোনোরকম খোঁজ যাকে গলা ফুলিয়ে বলা হয় ‘আঁভা গার্দ’ এসব ককথায় ধাপ্পাবাজি।

প্রশ্নঃ এখন সৌন্দর্য, সৌন্দর্যচর্চা সম্বন্ধে বলতে চাই, যা কিনা সবসময় উৎসাহ দেয় আধ্যাত্মিক ভাবের প্রতিপন্নতায়, যাত প্রতিটি সভ্যতাকে যুগ যুগ ধরে অনুপ্রাণিত করেছে, এি ব্যাপারে আপনি কী ভাবেন?

উত্তরঃ কেউ জানে না সৌন্দর্য কী। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সৌন্দর্যের ধারণা পাল্টেছে, তার সঙ্গে দার্শনিকতার ভিত্তির পরিবর্তন ঘটেছে। মানুষের ব্যক্তিজীবনের পরিসীমার মধ্যেও এই ধারণা ঘনগণ বদলে যেতে পারে। এসব ব্যাপার আমি বাধ্য হয়েছি ভাবতে। বুঝেছি সৌন্দর্য ব্যাপারটা কিচুই নয়, শুধু একটা প্রতীক। কিন্তু কিসের প্রতীক, আপনি প্রশ্ন করতে পারেন। সত্যের প্রতীক, নিশ্চিতভাবে বলতে পারি। সুন্দরের মূল্যবোধ, এই ব্যাপারটা প্রতিটি যুগের সমসাময়িক মানুষগুলোর চৈতন্যবোধের স্তর বুঝতে চেষ্টা করায় সাহায্য করেছে। একটা সময় ছিলযখন এই সত্য ভেনাসের মূর্তিতে প্রতিফলিত হয়েছিল। কিংবা বিবিন্ন মূর্তিতে যেখানে নারীর বসুধা রূপ সৃষ্টি করা হয়েছিল। এব্যাপারে পিকাসোর কাছে থেকে যেভাবে আমরা সৌন্দর্যের উপলদ্ধি করতে শিখেছি তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারন, তিনি, সৌন্দর্য যেমন ঠিক সেইভাবে না এঁকে, সুন্দরকে আরো গৌরবান্বিত করেছেন। সুন্দরের ধ্বংসকারী ভূমিকাটি নিজে থেকে প্রতিপন্ন করে, যেখানে তিনি একাধারে ভর্ৎসনাকারী, আপকারী-। রহস্য হলো সৌন্দর্যের প্রকৃত সত্র, সেই ভাষাকে না যায় পাঠোদ্ধার করা না যায় শব্দ দিয়ে তার ব্যাখ্যা করা কিন্তু যখন কেউ সৌন্দর্যের সামনে এসে দাঁড়ান, তার মুখোমুখি হন, তার বিরোধিতা করেন, তার অস্তিত্বকে অনুভব করেন তখন সেই প্রত্যক্ষকারী হয়ে পড়েন আবেগবিহুল। সুন্দর বস্ত সদা বিস্ময়কর, তা একধরনের জাদু। তা আমাদের এমন এক নম্বর জগতে নিয়ে যায় যেখানে মৃত এসে পৌঁছতে পারে না।
Untitled Document

ফিবোনাক্কির কেরামতি
Total Visitor: 708602
সাপলুডু মূলপাতা | মতামত Contact : shapludu@gmail.com
Copyright © Life Bangladesh Developed and Maintained By :