ফতোয়া বিষয়ে আপিল বিভাগের সাম্প্রতিক ফতোয়া নিয়ে দু'চার কথা
বিশেষ দ্রষ্ট্রব্যঃ (ধর্মনিরপেক্ষতা+জাতীয়তাবাদ+গণতন্ত্র+সমাজতন্ত্র=বাংলাদেশ রাষ্ট্র ১৯৭১)



"বিআইডিএস-এর সাম্প্রতিক (২০০৯) এক গবেষণাতথ্য জানাচ্ছে যে, ২০০২ থেকে ২০০৭ পর্যন্ত সময়েই বাংলাদেশে ৩৪৫ জন নারী ফতোয়ার শিকার হয়েছেন। একই বিষয়ে মহিলা পরিষদের দেয়া একটি হিসেবে দেখা যাচ্ছে, ২০০২ থেকে ২০০৮-এর মধ্যে ফতোয়ার ঘটনা সংঘটিত হয়েছে ৩৭৫টি। অথচ ২০০১-এর ২ জানুয়ারি হাইকোর্টের বিচারপতি মোহাম্মদ গোলাম রাব্বানী ও বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানার সমন্বয়ে গঠিত অবকাশকালীন বিশেষ ডিভিশন বেঞ্চের দেওয়া ফতোয়াবিরোধী এক রায়-এর বলে এ সময়ে বাংলাদেশে ফতোয়া নিষিদ্ধ ছিল। ফতোয়া আইনগতভাবে নিষিদ্ধ থাকা অবস্থায়ই যদি দেশে এতগুলো ফতোয়ার ঘটনা ঘটে থাকে, যখন ফতোয়াকে বৈধ বা জায়েজ আখ্যা দিয়ে আপিল বিভাগ নতুন ফতোয়া জারি করলেন, তখন অনেকেই মনে করছেন যে দেশে ফতোয়াসংক্রান্ত পরিস্থিত আরো ভয়াবহতার দিকে যেতে পারে। এ অনুমানের একটা ভিত্তি এই যে, ফতোয়ার সমর্থক দল ও সংগঠন এবং সেসবের নেতৃবর্গ এই রায়ে বিশেষভাবে খুশি হয়েছেন। ফতোয়ার রায় তাঁদের অনুকূলে হওয়ায় নানা নিষেধাজ্ঞায় কোণঠাসা ধর্মভিত্তিক দলগুলো এখন নবউদ্যমে নতুন নতুন দাবি তুলতে শুরু করেছে, যথা সংবিধান থেকে ‘আল্লাহর ওপর অবিচল আস্থা ও বিশ্বাস’ তুলে না দেওয়া এবং ‘পর্দা করতে বাধ্য করা যাবে না’ মর্মে হাইকোর্টের দেওয়া রায় বাতিল করা ইত্যাদি। একেই বোধহয় বলে বসতে পারলে শুতে চাওয়ার ফন্দিফিকির করা!
ফতোয়া মানে হলো ধর্মীয় আইন সম্বন্ধীয় মত (কতক অভিধান রচয়িতার মতে এর অর্থ হলো অনুগ্রহ, বদান্যতা, দানশীলতা, মনুষ্যত্ব ও শক্তি প্রদর্শন)। ইসলামের শরিয়ত সম্পর্কিত অনুশাসনগুলিতে যখন কোনো জটিল প্রশ্নের সরাসরি সমাধান পাওয়া যায় না, ধর্মশাস্ত্র অনুযায়ী তখন ফতোয়ার বিধান আছে বলা হয়। নিয়মানুযায়ী ফতোয়া দিতে পারেন মুফতি, ফতোয়া বিষয়ক সাম্প্রতিক রায়ে যাকে বলা হয়েছে 'যথাযথ শিক্ষিত ব্যক্তি'। আর মুফতি হলেন তিনি, যিনি কোরআন, হাদিস, ফিকহ, ইজমা, কিয়াস বিষয়ে পণ্ডিত, যিনি রাজনৈতিক প্ররোচনামুক্ত, যিনি দেশি-বিদেশি ক্ষমতাসীন শক্তি কিংবা কোনো ব্যক্তির অনুগত নন। কিন্তু ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রকাশিত সংক্ষিপ্ত ইসলামি বিশ্বকোষ জানাচ্ছে, আলেম সমাজের মধ্যে সাধারণ মতানৈক্যের কারণে, ব্যক্তিগত বিদ্বেষবশত, ঈর্ষার বশবর্তী হয়ে লব্ধপ্রতিষ্ঠিত প্রতিপক্ষের আলেমদের পরাস্ত করতে, রাজনৈতিক কারণে, দেশি-বিদেশি রাজশক্তির প্ররোচনায় নানা সময়ে হামেশাই ফতোয়ার অপব্যবহার হয়েছে। যার ফলে মুসলিম জনগণের মধ্যে প্রচুর হানাহানি হয়েছে ও ইসলাম ধর্মাবলম্বীরা বহু দল-উপদলে বিভক্ত হয়েছে।
জানা যায়, খোলাফায়ে রাশেদিনের পর উমাইয়াদের খেলাফতকালে নবীর পরিবারবর্গের ওপর যে অত্যাচার করা হয়েছে, তা করা হয়েছে ইসলামের কথা বলে ফতোয়া দিয়েই। সুফী ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ প্রকাশিত ‘সুফী সম্রাটের যুগান্তকারী ধর্মীয় সংস্কার’ (প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড) গ্রন্থে বলা হয়েছে, রাজক্ষমতা সম্পর্কে এজিদের ইসলামিক ফতোয়াই ইমাম হোসেনকে শহীদ করেছিল, নবীর পরিবারবর্গের ওপর অত্যাচার করেছিল, মদিনায় আক্রমণ করে ১০ হাজার মুসলমান ও ৭ শত সাহাবিকে শহীদ করেছিল এবং মদিনায় এজিদ বাহিনী ৩ দিন অবস্থান করে মুসলমান পরিবারসমূহে এক হাজার জারজ সন্তান জন্ম দিয়েছিল!
অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে, ইসলামের ইতিহাসের প্রায়-সূচনাকাল থেকেই এটি নানাভাবে এক পক্ষের স্বার্থসংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়েছে। এতে ধর্মের কতটা মঙ্গল হয়েছে জানি না, তবে মানুষের যে অমঙ্গল হয়েছে তা খুবই পরিষ্কার।
আমাদের দেশের ফতোয়ার ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করলেও দেখা যাবে যে, এগুলো যত না ধর্মীয় বিষয়ে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ হাজির করেছে, তার চেয়ে বেশি সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছে। এতে ফতোয়া আর ফতোয়া থাকে নি, হয়ে উঠেছে ফতোয়াবাজি। ফতোয়া ফতোয়াবাজিতে উপনীত হয়েছে কারণ, প্রভাবশালী সুবিধাবাদী ব্যক্তিবর্গ কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত হয়ে ফতোয়াবাজ কাঠমোল্লা, হাফেজ, মৌলবি ও ক্কারিরা ১. ফতোয়াকে ব্যবহার করেছেন রাজনৈতিক স্বার্থে, ২. সমাজে নিজের এবং নিয়োগকারীর প্রতিপত্তিকে প্রতিষ্ঠা করতে, ৩. নারীসমাজকে দাবিয়ে রাখতে এবং ৪. শাসন ও শোষণমূলক ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে। অথচ ইসলামি বিধান মতে, এ ধাঁচের প্রায়-অশিক্ষিত বা আধাশিক্ষিত লোকদের ফতোয়া দেবার অধিকার নেই।
লক্ষ করলে দেখা যাবে, এই ফতোয়াবাজরা কখনোই নতুন কোনো কিছুকে গ্রহণ করতে পারেন নি। ইসলামের প্রথম দিকে যা ছিল না, তা যখন নতুনভাবে মানুষের জীবনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে, তখন তার বিরুদ্ধে তাঁরা ফতোয়া দিয়েছেন। আবার ফতোয়ার প্রতিক্রিয়ায় নতুন ফতোয়াও ঘোষিত হয়েছে, যার বক্তব্য ঠিক উলটো। এবং মজার হলো, দুই ক্ষেত্রেই ব্যবহার করা হয়েছে ধর্মীয় (শরিয়তি) অজুহাত। আরো লক্ষণীয় যে, এসব ফতোয়া ঘোষণায় মোল্লাদের পাশাপাশি কখনো কখনো রাজনৈতিক নেতৃবর্গ, লেখক, বুদ্ধিজীবীরাও অংশ নিয়েছেন। এরকম অনেক ফতোয়াকে আজকাল অবিশ্বাস্য মনে হবে, কিন্তু এদেশেই তা সম্ভব হয়েছে। এবং বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এসব ফতোয়া তৎকালে ও পরে সমাজে নানা বিভ্রান্তি, বিশৃঙ্খলা ও অস্থিরতাই সৃষ্টি করেছে। যেমন ‘যেকোনো ভাষায় নামাজ পড়লে গ্রহণযোগ্য হবে না’, ‘রেডিও শয়তানের বাক্স, ফুটবল শূয়োরের মাথা’, ‘মাইক ব্যবহার হারাম’, ‘কবি নজরুল কাফের,  ‘রবীন্দ্রসংগীত হিন্দু সংগীত’, ‘রবীন্দ্রনাথ ঈশ্বরের মতো’, ‘আইয়ুব খান আল্লাহর প্রেরিত পুরুষ’, ‘ইরিধান চাষ হারাম’, ‘বাংলা নববর্ষ হিন্দু নববর্ষ’, ‘অমুসলমানদের সুশ্রী ছেলেরা ও তরুণী কন্যারাই হবে বেহেশতের গেলমান ও হুর’, ‘বাঙালি ইমামের পিছনে নামাজ না-জায়েজ’, ‘যুদ্ধকালে নারী হলো গণিমতের মাল’, ‘শহীদ মিনারে আল্পনা আঁকা ইসলামবিরোধী’, ‘মুক্তিযোদ্ধারা জারজ সন্তান’, ‘ড. আহমদ শরীফ ও কবীর চৌধুরী মুরতাদ’,  ‘কাদিয়ানীরা কাফের’, ‘তসলিমা নাসরিন মুরতাদ, কাফের’, ‘নারী-নেতৃত্বের কারণে দেশ গভীর অরাজকতায়’, ‘বাংলাদেশের সংবিধান কুফুরি’, ‘মহিলাদের ভোটদান ধর্মসম্মত নয়’, ‘নারী-নেতৃত্ব না-জায়েজ’, ‘আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামাতকে ভোট দেয়া গুনাহ’, ‘জামায়াতে ইসলামীরা মুসলমান নয়’, ‘মাদ্রাসায় চাঁদা না দিলে মুরতাদ’, ‘অমুসলমানের মৃত্যুতে ইন্নালিল্লাহ পড়া যাবে না’, ‘বইপড়া হারাম’, ‘ফতোয়াবাজরা বর্বর, মানুষের শত্রু, রাষ্ট্রের শত্রু’, ‘বুদ্ধিজীবীরা ধর্মদ্রোহী’, ‘কৃষকরা কাফের’, ‘শাড়িপরা বেপর্দা : এশিয়ানরা মুসলমান নয়’, ‘মহিলাদের সাইকেল চালনা বেদাআত’, ‘মাওলানা আমিনী মাফিয়া’, ‘ছোট দাড়িওয়ালার ইমামতি জায়েজ নয়’, ‘একুশের অনুষ্ঠান ইসলামবিরোধী’, ‘গান-বাজনা হারাম’, ‘ইফতার পার্টি বেদাআত’, ‘ছবি তোলা না-জায়েজ’, ইত্যাদি ইত্যাদি।               
এসব ফতোয়ার পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলে হামেশাই ধর্মীয় মোড়কে নারী নির্যাতনের একটি হাতিয়ার হিসেবে ফতোয়াকে ব্যবহার করা হচ্ছে। এ ধরনের যেসব ঘটনায় মামলা হয়েছে বা গণমাধ্যমের দ্বারা নিবিড় অনুসন্ধান পরিচালনা করা হয়েছে, দেখা গেছে নেপথ্য কারণ মোটেই ধর্মীয় নয়। হয়ত তা জমিসংক্রান্ত বিরোধ, যৌনাগ্রহ চরিতার্থ না হওয়া, পূর্বশত্রুতা, ভিটাদখল করবার আগ্রহ ইত্যাদি।
ফতোয়াকে বৈধ করে দেয়া হাইকোর্টের বর্তমান রায় এ ধারাকে আরো বেগবান করা ছাড়াও অস্পষ্টতার কারণে অপব্যবহৃত হবারও সুযোগ তৈরি করে দেবে বলে মনে করছেন অনেকে। কারণ রায়ে ‘যথাযথ শিক্ষিত ব্যক্তি’ কীভাবে নির্ধারণ করা হবে সে সম্পর্কে সুস্পষ্ট রূপরেখা নেই। যদি মুফতি ফজলুল হক আমিনীর মতো ব্যক্তিরা যথাযথ শিক্ষিত ব্যক্তি হিসেবে পরিগণ্য হোন, তাহলে এঁরা জাতিকে রীতিমতো নাজেহাল করে ছাড়বেন বলে ধারণা হয়। কারণ এঁরা বর্তমান সমাজব্যবস্থায় ব্যাপকভাবে গ্রহণযোগ্য অনেক কিছুকেই অগ্রহণযোগ্য বলে মনে করেন। এমনকি নারীনেতৃত্বকেও অনেক আগেই এই গোষ্ঠী নাজায়েজ বলে রেখেছে।
রায়ে আরো বলা হয়েছে যে, ফতোয়া গ্রহণের বিষয়টি হবে স্বতঃস্ফূর্ত, এর মাধ্যমে কোনো শাস্তি দেওয়া বা মানবাধিকার ক্ষুণ্ন করা যাবে না। ব্যাপারটা রীতিমতো অসম্ভব বলে মনে হয়। কারণ কারো বিরুদ্ধে ফতোয়ার রায় উচ্চারিত হলে কিছু না কিছু শাস্তি তাঁর ওপরে বর্তাবেই। শারীরিক শাস্তি না পেলেও মানসিক শাস্তি তাঁর ক্ষেত্রে বরাদ্দ হবেই, তা তিনি যেরকম অর্থনৈতিক স্তরেই অবস্থান করুন না কেন। তবে গ্রামীণ দরিদ্র নারীর বিরুদ্ধে যখন কোনো হিল্লা বিয়ে বা দোররা মারা বা একঘরে করা বা মাথার চুল কেটে দেয়ার ফতোয়া ঘোষিত হবে, তখন প্রায় রায় উচ্চারিত হওয়ামাত্রই তার বাস্তবায়ন শুরু হয়ে যাবে। কারণ গ্রামীণ ক্ষমতাকাঠামোতে দরিদ্র নারীরা অর্থনৈতিকভাবে এমনই প্রান্তিক যে, তাঁদের বিপরীতে অবস্থানরত ফতোয়াবাজ প্রভাবশালীদের আদেশ উপেক্ষা করবার তাঁদের সাধ্যিই নেই। ফলে কান্নাকাটি ছাড়া তাঁর/তাঁদের মানসিক অবস্থার আর কোনো রূপই বাইরে প্রকাশিত হবে না। আর প্রকাশের চেষ্টা করলেও চোখ রাঙিয়ে তা আধপথেই থামিয়ে দেয়া হবে, এতদিনও যা করা হয়েছে। সুতরাং শাস্তি ঠিকই কার্যকর হবে, কিন্তু আমরা বুঝব তিনি/তাঁরা স্বতঃস্ফূর্তভাবেই রায়টা মেনে নিয়েছেন। আর যখন কারো বিরুদ্ধে কোনো ফতোয়ার রায় কার্যকর হবে, তখন যে তাঁর মানবাধিকার লঙ্ঘিত বা ক্ষুণ্ন হবে তাতে আর বিচিত্র কী! এই ব্যাপারগুলো দেখবার জন্য আদালত কোনো ধরনের ম্যাকানিজম রাষ্ট্র বা সরকারকে গ্রহণ করতে বলেছেন বলে শুনি নি। আইন থাকা অবস্থায়ও প্রশাসনের বিশেষ দেখভাল না থাকলে অবস্থা প্রকৃতপক্ষে কী দাঁড়ায়, ১০ মে প্রকাশিত ১৫ দিন একঘরে করে রাখা শাবানার বিষপানে আত্মহত্যা এবং ১১ মে প্রকাশিত জয়পুরহাটে সালিশের নামে পুরো পরিবারকে মারধর করা বিষয়ক সংবাদ দুটি সে-সংক্রান্ত ধারণা দিতে পারবে। যেখানে ফতোয়ার নামে বিচারবহির্ভূত কার্যক্রম ও শাস্তি দেওয়ার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে পৃথক তিনটি রিটের শুনানি শেষে গত ৮ জুলাই, ২০১০ বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন ও বিচারপতি গোবিন্দ চন্দ্র ঠাকুরের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের আরেকটি বেঞ্চ ফতোয়ার নামে শাস্তি দেওয়া অবৈধ ঘোষণা করে সাজা ঘোষণাকারীকে অপরাধী হিসেবে শাস্তি দিতে বলেছিলেন।

১২ মে ঘোষিত রায়ে ফতোয়াবাজের বাক-স্বাধীনতার ওপরেও জোর দেয়া হয়েছে। আশা করি, আমাদের  মতো সাধারণ নাগরিকের বাক-স্বাধীনতারও আদালতের কাছে মূল্য আছে। সেই ভরসায়ই ফতোয়া সম্পর্কিত আমাদের  উদ্বিগ্নতার কথাগুলো এই লেখায় টুকে রাখলাম, যা কোনোভাবেই আদালত অবমাননার উদ্দেশ্যে পরিকল্পিত নয়।"
সাপলুডু.কম