Untitled Document
আষাঢ় সংখ্যা ১৪১৮
মূলপাতা শিরোনাম বটতলা পঞ্জিকা প্রদর্শনী
নাম ফাটানিয়া গালগপ্প
- আতিকা বিনতে বাকী


একটা কৌতুক দিয়ে শুরু করি।
অনেকবার ইউপি চেয়ারম্যান পদে দাঁড়িয়ে শেষ পর্যন্ত বিজয়ী হন জনৈক আবুল সাহেব। তাতে করে স্বাভাবিক ভাবেই ভীষণ খুশী হন তিনি।
চেয়ারম্যান হবার পর একদিন তার বাড়ীতে এক অতিথি এসে দড়জায় দাঁড়িয়ে ডাকতে থাকেন;
"চেয়ারম্যান সাহেব বাড়ীতে আছেন? ও চেয়ারম্যান সাহেব"
ঘরের ভেতর থেকে কোন সাড়াশব্দ না পেয়ে তিনি আরো জোরে ডাকতে থাকেন, "চেয়ারম্যান সাহেব, ও আবুল চেয়ারম্যান সাহেব, বাড়ীতে আছেন?"
চেয়ারম্যানের স্ত্রী খুব বিরক্ত হয়ে স্বামীকে বললেন, "বাইরে লোকটা কখন থেকে আপনারে ডাকতেসে, সাড়া দেন না ক্যান?"
চেয়ারম্যানঃ এত্তোগুলা ট্যাকা খরচ কইরা চেয়ারম্যান হইসি, এইভাবে চিৎকার দিলে নাম ফাটবো চারদিকে, এইটাও বুঝনা বোকা কুথাকার? খাড়াও নামটা ভাল কইরা ফাইটা নেউক"
ওদিকে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে আগন্তুক ধৈর্য্য হারা হয়ে আরো জোরে চিৎকার দিয়ে বসলেন "ঐ শালা আবুইল্লা, বাড়ীত আছ?"
তড়িঘড়ি করে এবার নবনির্বাচিত চেয়ারম্যান জবাব দিলেন "আসতেছি..."
চেয়ারম্যানপত্নী এবার রেগে গিয়ে স্বামীকে বললেন, "এইবার খুশী হইসেনতো এমুন ভালা কইরা নামটা ফাটোনে?"

এবার একটা সত্যি ঘটনা বলি। একবার আমার ইস্কুলের প্রধান শিক্ষিকার সাথে দেখা রংপুরে। কুশল বিনিময়ের পর জানতে চাইলাম অবসর জীবন কেমন কাটছে তাঁর। উত্তরে তিনি জানালেন ভালই, তবে খুব ব্যস্ত।
ঃ কি নিয়ে?
ঃ এই নিন্দা জ্ঞাপন, শোকাহত ও অভিনন্দন জানানো নিয়ে
ঃ মানে?
ঃ কেউ খারাপ কিছু করলে তার জন্য নিন্দা জ্ঞাপন, কেউ মারা গেলে তার জন্য শোক জ্ঞাপন আর কেউ ভাল কিছু করলে তাকে অভিনন্দন জানানো যুগের আলো পত্রিকায়
ঃ আপা এতে আসলে কি হয়, বুঝতে পারছি না, দয়া করে একটু যদি বিষয়টা পরিস্কার করে বলতেন!!
ঃ আমি যে এখনও আছি এটা জনগণকে জানানো মানে জনগনের সাথে ক্লোজ কন্ট্যাক্টে থাকা আর কি। (ক্লোজ কন্ট্যাক্টে থাকলে ভাল মতো নামটা ফাটে)

আরো একটা সত্য গল্প, যে মানবাধিকার সংস্থায় আমি কাজ করতাম, সেখানকার প্রধান কর্তা ব্যক্তিটি প্রায় দিনই ফোন এলে নিজের চেম্বারে বসেই বলতেন উনি মন্ত্রণালয়ে জরুরী কাজে খুব ব্যস্ত আছেন। তবে মাঝে মাঝে কিছু দুষ্টু সাংবাদিক বলে বসতো, "আপা কোন মন্ত্রণালয়ে আছেন বলেন, তাহলে সেখানেই চলে আসি।" এধরণের পরিস্থিতিতে উনি খটাস করে ফোনটা রেখে দিতেন। মানে উনি গুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যস্ত মন্ত্রীমহোদয়ের সাথে এবং অবশ্যই জনকল্যাণে। মাঝে মাঝে আমাকেও তার হয়ে একই মিথ্যে কথা বলতে হতো এবং তখন উনি রিমোর্ট টিপে টিপে নানান টিভি চ্যানেলে ঘুরে বেড়াতেন। সারাদুনিয়া জুঁড়ে ওনার নাম ফাটতো, উনি মানুষ থেকে অতিমাণবী হয়ে উঠতেন।

ঢাকা শহরের অভিজাত দাওয়াতগুলো থেকে আমি নিজেকে স্বেচ্ছায় নির্বাসন দিয়েছি বহুবছর। এই দাওয়াতগুলোতে যে যতো দেড়িতে এসে পৌঁছান তার নাম ততো ফাটতে থাকে। সবাই সেই ব্যক্তির জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। নগণ্য আমি যথা সময়ে উপস্থিত হয়ে দেখতাম কেউই এসে পৌঁছাননি। কেউ না পৌঁছালে খাবার দেয়া হয়না আর দাওয়াতে না খেয়েও চলে আসা যায়না। তাই ক্ষুধা নিয়ে অপেক্ষা করতে করতে  খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দাওয়াত বাড়ীর সোফাসেট, কার্পেটের নকশা, পর্দার ভাঁজ গুনতে থাকতাম আর আমার নাম কোন ভাবেই না ফাটার কষ্টে ছটফট করতাম।

তবে নাম ফাটাফাটি নিয়ে আমার ও আমার মতো অনেকেরই এই দুঃখ কিছুটা লাঘব করেছে ফেসবুক। এইযে মাঝে মাঝে এইসব আজগুবি লেখা লিখি, তাতে ছোট-বড়-মাঝারি আকারে আমারো নাম ফাটে। পাঠক চাইলে এই আজব ও গজবতামাশার ফেসবুকে নানা ভাবে আপনিও আপনার নাম ফাটাতে পারবেন। এরজন্য বেশী কিছু করতে হবে না, শুধু কিছু বিষয় মাথায় রাখলেই চলবে। যেমন ধরেনঃ
  • কেউ আপনাকে বন্ধুত্বের অনুরোধ জানালো, সাথে সাথেই তাকে আপনার বন্ধু তালিকায় যুক্ত করবেন না। কিছুদিন তাকে ঝুলে থাকতে দিন, এতে করে জনগন বুঝবে যে আপনি হেলাফেলার কোন পাত্র নন। আবার যতো অনুরোধ আসবে টকাটক গ্রহণ করুন, তাতে লিস্টের দৈর্ঘ্য বাড়লেও বোঝা যাবে আপনি ঠিক কতোটা জনপ্রিয়। (সিদ্ধান্ত এখন আপনার হাতে)
  • সাম্প্রতিক যাবতীয় বিষয় নিয়ে আপনি প্রবন্ধ, গল্প, কবিতা, গান, ছড়া যা পাড়েন লিখে ফেলুন। শুধু তাই না, নিয়মিত এইসব বিষয় নিয়ে কোথায় কি লেখা হচ্ছে তার লিংকগুলো হাজির করতে থাকুন অন্যকেউ করার আগেই। আবার দ্রুতই অন্যের লেখায় নিজের মতামত দিতে থাকুন। আন্তরিক ভাবে তর্কাতর্কি করতে থাকুন বা ঝাঁঝালো ভাবেও করতে থাকুন। আসলে অংশগ্রহণটাই এক্ষেত্রে বড় কথা, মানে আপনি বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন এটা জনগণকে বুঝতে দিন।
  • দুই এক কথায় বিষয়টি নিয়ে আপনার উদ্বিগ্নতার কথা স্ট্যাটাস আকারে লিখতে থাকুন নিয়মিত।
  • বিষয়টির কাছাকাছি কোন গানসহ ভিডিও ক্লিপিংস ইউটিউবে পাওয়া গেলে দ্রুতই সেটা আপলোড করুন।
  • নিত্যনতুন বিষয় নিয়ে মেতে থাকুন। পড়শুদিন যে বিষয় নিয়ে কঠিন হাউকাউ করেছেন, আজ যদি নতুন কোন বিষয় পেয়ে যান, তবে পড়শুদিনের বিষয় থেকে আপসে সড়ে পড়ুন (খেয়াল রাখবেন জনগন যেন সেটা টের না পায় এবং অবশ্যই অপশন রাখবেন যেন আবার পড়শুদিনের বিষয়টি মাথা চাড়া দিলে সেসময় যেন ফিরে এসে শান্তিতে হাউকাউ করতে পারেন) এবং অবশ্যই আপনাকে জনগনের হৃদকম্প বুঝেই হাউকাউটা করতে হবে। তবে মনে রাখবেন, আপনি ব্যক্তিগত ভাবে বা ব্যক্তিগত জীবনে কোথায় কি করছেন সেটা নিয়ে ভাব্বার কিছু নাই। 

আপাতোত এভাবে চলতে থাকলেই দেখবেন আপনাকে আর ঠেকানো যাচ্ছে না নাম ফাটানোর আতশবাজি থেকে।

পরিশেষেঃ বিভিন্ন ভাবেই মানুষ নিজেকে প্রকাশ করতে ভালবাসে। আর এই চাওয়াটা অন্যয় কিছু না। নামডাক-যশ-খ্যাতির লোভ প্রতিটি মানুষেরই স্বাভাবিক চাওয়া। এটা ব্যক্তিগত। কিন্তু খেয়াল রাখাটাও জরুরী এই ব্যক্তিগত চাওয়াটার জন্য আপনি মিথ্যাচার/ ভন্ডামি করছেন কিনা জনগণের সাথে। যেমনঃ মাদকাশক্ত হয়ে মাদকের ভয়াবহতা নিয়ে নিয়মতি বড় বড় কথা বলছেন/ পূঁজিবাজারের সমস্ত ভোগ্যপণ্য ভোগ না করে যেখানে থাকতে পারেন না সেখানে সারাক্ষণই পূঁজিবাজারকে সবসমস্যার মূল হিসেবে চিহ্নিত করছেন/ ব্যক্তিগত জীবনে প্রতিনিয়ত নির্যাতিত (শারীরিক ও মানসিক) হয়ে বা অনেক সময় নির্যাতন করে হটকেক ইস্যু "নারী উন্নয়ণ নীতিমালা" নিয়ে হাটে-মাঠে-ঘাটে বিস্তর বুলি আওড়ে যাচ্ছেন অন্য নারীর অধিকার আদায় করে দেয়ার জন্য তাদের ক্ষেত্রে বলা যায় নাম ফাটানোর চেষ্টাটা খুব খারাপ না। তবে যে কৌতুকটি দিয়ে লেখাটা শুরু করেছিলাম, সে রকম করে ফাটলেও "নাম ফাটা"র আকাংখাটা শেষ পর্যন্ত যে ফেটে চৌচির হয়ে যাবে, তা বলাই যায়। 
     
Untitled Document

কড়াইশুঁটির বিস্ময়
Total Visitor: 708392
সাপলুডু মূলপাতা | মতামত Contact : shapludu@gmail.com
Copyright © Life Bangladesh Developed and Maintained By :