Untitled Document
আষাঢ় সংখ্যা ১৪১৮
মূলপাতা শিরোনাম বটতলা পঞ্জিকা প্রদর্শনী
রাস্তা চিন্তা
- এ,এফ,এম, “শিপু” মনিরুজ্জামান



 

ঘরের জিনিষ-পত্র যখন গোছানো থাকে তখন খুব সহজেই ওই ঘরের মধ্যে দিয়ে চলাফেরা করা যায় অথচ যখন এলোমেলো ভাবে ছড়ানো ছিটানো থাকে তখন ওই একই ঘরের মধ্যেই আবার চলা ফেরা করা বেশ কঠিন হয়ে পড়ে। বাসা পাল্টানোর অভিজ্ঞতা যাদের আছে তারা নিশ্চয় এটা ভালো করেই উপলদ্ধি করেছেন। শুধু মাত্র বুদ্ধিমত্তার সাথে গুছিয়ে রাখা বা না রাখার কারণে একই বাসার ভিতরে চলা-ফেরা করা সহজ অথবা কঠিন হয়ে পড়তে পারে। আর তাই, ঘরের মধ্যে সহজে চলাচল করার জন্য আমরা বেশ বুদ্ধি খাটিয়ে পরিকল্পনা করে আমাদের ঘরের খাট, ফ্রিজ, টেলিভিশান, ইত্যাদি বড় বড় জিনিষ থেকে শুরু করে ছোট ছোট জিনিষগুলো পর্যন্ত গুছিয়ে রাখি।

অথচ যে কোন কারণেই হোক এই গোছানোর কাজটা আমরা আমাদের শহরের রাস্তাগুলোর ক্ষেত্রে করছিনে। আমাদের রাস্তাগুলো সব ভাঙ্গা এবং এবড়ো থেবড়ো। যেখানে সেখানে ম্যানহোলের গর্ত, বা উঁচু-নীচু। যত্রতত্র ফেলে রাখা আছে ইট, শুঁড়কি, পাথর, বালি। ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে আছে সিগারেটের দোকান, চটপটির দোকান। এদিকে সেদিকে থেমে আছে গাড়ী, বাস আর ঝাকে ঝাকে রিক্সা। এবং যত্রতত্র দাঁড়িয়ে আছে অসংখ্য মানুষ।

ভাঙ্গাচোরা রাস্তায় এরকম এলোমেলো দাঁড়িয়ে থাকা বিভিন্ন জিনিষের ফাঁক-ফোকর দিয়েই চলতে হয় আমাদের। তাতে করে কেউ স্বাভাবিক গতিতে চলতে পারেনা। একজন আরাকজনকে টপকিয়ে আগে যেতে চায়। অনর্গল চলতে থাকে ওভার-টেক। একটু ফাঁকা পেলেই ঢুকে যেতে চায় সেখানে। মানতে চায়না কোন ট্রাফিক সিগন্যাল বা ট্রাফিক আইন। যার ফলে ধুপ-ধাপ রাস্তাগুলো বন্ধ হয়ে যায়। শুরু হয় ট্রাফিক। আমাদের দেশে যাকে বলে “জ্যাম”। এখানে “ট্রাফিক” এর থেকে “জ্যাম” শব্দ ব্যবহার করাই অবশ্য সমিচীন হবে। কারণ “ট্রাফিক” এর সৃষ্টি হয় শুধু অতিরিক্ত যানবহনের জন্য আর “জ্যাম” এর সৃষ্টি হয় বিশৃঙ্খলতার কারণে। 

একটা জাতির বা দেশের উন্নতিকে মাপা হয় তাদের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির মাপকাঠির উপর নির্ভর করেই। আর যোগাযোগ ব্যবস্থার মাধ্যম হচ্ছে রাস্তা। হোক সে ডিজিটাল-ওয়ার্ল্ড এর “কেবল” এর রাস্তা অথবা গাড়ী চলার জন্য পীচের রাস্তা। আমাদের দেশে কিন্তু একসময় জলের রাস্তাও ছিল। ঢাকা শহরে এই কিছুদিন আগেও অনেক অনেক খাল ছিল।  জল-জালের মধ্যে আবিষ্ট এই দেশের জন্য পানি-পথই যে হবে যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রধান মাধ্যম সেটাই স্বাভাবিক এবং যৌক্তিকও বটে। কিন্তু আমরা সে সব পানি-পথ গুলোকেও বুজিয়ে দিয়ে তৈরী করেছি ভুমি-পথ। যার ব্যবহার-বিধি আবার আমাদের জানা নেই এবং সেই অজ্ঞতার ফলাফল এই জ্যাম।

পাঠক। আপনি একটু খেয়াল করলেই দেখবেন, যেসব স্থানের রাস্তাতে অসহনীয় জ্যাম নেই সেসব স্থানে হয় তেমন যানবহন নেই অথবা যানবহনের বৃদ্ধির সাথে সাথে উন্নুত হয়েছে পরিকল্পনা এবং নিয়ম-কানুন। রাস্তাগুলো পরিপাটি এবং কোথাও কোন ভাঙ্গাচোরা নেই। কোথাও কোন ম্যানহোলের ঢাকনার কারণে গর্ত বা উঁচু নেই। নেই কোথাও ইটশুড়কি, চায়েরদোকান, বা দাঁড়িয়ে থাকা লোকজন। কেউ কারো আগে যাবার চেষ্টা করছেনা। সামনে কোন গাড়ী দাঁড়িয়ে থাকলে পিছনের গাড়ীও তার পিছনে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে।হর্ণও বাজাচ্ছে না।  ট্রাফিক পুলিশরা রিক্সাওয়ালাদেরকে পেটাচ্ছেনা অথবা ঘুষ নিচ্ছেনা।

শুধু হেটে চলার জন্য কিন্তু কখনো বিশেষ ভাবে রাস্তা তৈরী করতে হয়নি আমাদের। পথচারীরদের হেটে চলা পথই অনন্তকাল ধরে তৈরী করেছে প্রাকৃতিক সব রাস্তা। অপুর্ব সুন্দর সেসব মেঠো বা পাহাড়ি রাস্তা।

তবে গাড়ী চালানোর জন্য তৈরী করতে হয় উপযোগী সব যান্ত্রিকরাস্তা। বিভিন্ন প্রকার যানবহনের প্রয়োজনের দিকে খেয়াল রেখে দিনে দিনে সে রাস্তার উন্নতিও করতে হয়। রাস্তাকে মজবুত করতে হয়। রাস্তা যাতে এবড়ো-থেবড়ো না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হয়। আসা এবং যাওয়ার যানবহনের ক্ষেত্রে আলাদা আলাদা চলার জন্য রাস্তাকে মাঝখান থেকে দুই ভাগ করে দিতে হয়। দ্রুতগামী এবং অপেক্ষাকৃত কম দ্রুতগামী যানবহনের জন্য রাস্তা তে দাগ টেনে আলাদা আলাদা ‘রো’ তৈরী করে দিতে হয়। হেটে চলার জন্য রাস্তার দুই পাশে একটু উঁচু করে ফুট পাথও তৈরী করতে হয়। গাড়ী/রিক্সা ইত্যাদি দাড়াবার জন্য রাস্তার বাইরে আলাদা জায়গা তৈরী করে দিতে হয়। বাস স্টপগুলোকেও রাস্তাকে ছেড়ে আরো বাইরে তৈরী করে দিতে হয়। অথচ ঢাকা শহরে এ ব্যবস্থার অনুপস্থিতি বিশেষভাবে লক্ষণীয়।

আমাদের ঢাকা শহরে এখন আরো ফ্লাইওভার তৈরী করবার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে যানজট কমানোর জন্য। চাল সেদ্ধ না হলে সে ভাত যত ভালো প্লেটেই পরিবেশন করা হোক না কেন সে ভাতকে খাওয়ার উপযুক্ত বলা যায়না। সর্বপ্রথমে আমাদের রাস্তাগুলোর পরিতলকে সমান করতে হবে। শুধু রাস্তার মাঝখানটা নয়, রাস্তার একেবারে কিনারা পর্যন্ত ঠিক করতে হবে। রাস্তার মাঝখানটা উঁচু হবে এবং দু সাইডে ঢালু করে একটা ড্রেনের সাথে সংযুক্ত রাখতে হবে। ড্রেনের উপরে লোহার শক্ত নেট দিয়ে ঢেকে দিতে হবে যাতে বড় কোন বস্তু ঢুকে ড্রেনের মুখ বন্ধ না হয়ে যায়। রাস্তার দুইধার দিয়ে ফুটপাথ থাকতে হবে। ফুটপাথের শুরু এবং শেষ মাথা ঢালু করে জমিনের সাথে মিশিয়ে দিতে হবে যাতে সহজেই ফুটপাথে ওঠা ও নামা যায়। রাস্তা থেকে বাইরে বাস,গাড়ী, রিক্সা, ইত্যাদি দাড়ানোর জায়গা করে দিতে হবে। প্রত্যেক রাস্তার পাশেই কিছুদুর পরপর সরকারী খালি জায়গা আছে। উঁচু তলার বিল্ডিং অথবা গুগুল-আর্থ এ গেলেই এর প্রমাণ দেখতে পাবেন। ঐসব খালি জায়গাগুলোতে বাস স্ট্যান্ড, রিক্সা স্ট্যান্ড, ইত্যাদি অনায়াসে তৈরী করা যেতে পারে।

রাস্তা পার হওয়ার জন্য আরো অনেক ওভার ব্রীজ এবং আন্ডার পাস তৈরী করতে হবে। হকাররা আপাতত ওইসব স্থানগুলোতে বসতে পারে। আড্ডার জায়গা হিসেবেও ঐ ওভারব্রীজগুলো অনেক সুন্দর জায়গা হতে পারে।

আর একটি ব্যাপার। রাস্তায় অনতিদুর পরপরপ গন-সৌচাগার নির্মান করতে হবে এবং ময়লা ফেলার জন্য ডাস্টবিনের ব্যবস্থা রাখতে হবে।

উপরে যা আলোচনা করা হল তা অনেকটা সরকার দায়িত্বের উপরে বর্তায়। কিন্তু সাধারণ জনগনের দায়িত্ব আরো বেশী। জনগনকে এই রাস্তা ব্যবহারে সচেতন ও যত্নবান হতে হবে। রাস্তা খোঁড়াখুড়ি (বিভিন্ন অনুষ্ঠান ইত্যাদি উপলক্ষে বাঁশ ইত্যদি গাড়ার জন্য রাস্তা খোঁড়া) থেকে সম্পুর্ণ বিরত থাকতে হবে। গাড়ী/রিক্সা চলার রাস্তা দিয়ে না হেটে সর্বদা ফুটপাথ দিয়ে হাটতে হবে। ……

(চলবে)
     
Untitled Document

কড়াইশুঁটির বিস্ময়
Total Visitor: 708394
সাপলুডু মূলপাতা | মতামত Contact : shapludu@gmail.com
Copyright © Life Bangladesh Developed and Maintained By :