Untitled Document
আষাঢ় সংখ্যা ১৪১৮
মূলপাতা শিরোনাম বটতলা পঞ্জিকা প্রদর্শনী
আত্মাহুতির গোলকধাঁধা
- শুভ কিবরিয়া




হরতালের আগের রাত। রাস্তায় তেমন গাড়ি নেই। বাংলামটর থেকে বেরিয়েছি। যাব মিরপুর। রাত আনুমানিক নয়টা সাড়ে নয়টা। ফাঁকা রাস্তায় তখন শাহেনশাহ রিকশাওয়ালারা। একটা দুটো বাসে বাদুড়ঝোলা হয়ে ফিরছে মানুষ। ভাবলাম ফার্মগেট পর্যন্ত গেলে হয়ত একটা ব্যবস্থা হবে। বাংলামটর থেকে হাঁটতে হাঁটতে চলে এলাম ফার্মগেট। ফার্মগেটে তখন শ’পাচেক মানুষ। কোনোরকমে একটা বাস এলে হামলে পড়ছে সবাই। হরতালের আগের রাতে বাস এমনিতেই কমে যায়। এবার কমেছে আরও বেশি। কেননা ইতোমধ্যে ঢাকা শহরের বিভিন্ন জায়গায় বেশ কিছু গাড়িতে আগুন লাগানো হয়েছে।
ফার্মগেটে শ শ মানুষের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছি। কিছু মানুষ হাঁটা শুরু করেছে। অনিশ্চিত অপেক্ষার চাইতে হাঁটা মন্দ কি? এই জনতার কাফেলায় আমিও যোগ দিলাম। শুরু হলো হন্টন। হাঁটছি সবার সঙ্গে। অফিস ফেরতা নারী, পুরুষ, মধ্যবয়সী কিশোর, তরুণ-নানাবয়সী, নানা পেশার মানুষ। মাঝে মাঝে দু’একটি রিকশা খালি পেলেই সবাই ঝাঁপিয়ে পড়ছে। কিন্তু রিকশাওয়ালার এক গোঁ। তারা যাবে না। কেউ কেউ এমন ভাড়া চাইছে, বাস্তবের সঙ্গে যার কোনো মিল নেই। বিপদগ্রস্ত মানুষের সঙ্গে রিকশাওয়ালাদের এ আচরণ খুব অদ্ভুত। তারা বিপন্ন মানুষকে ‘না’ বলে এক ধরনের মজা লোটে। কখনো কখনো বসে বসে পছন্দ করে যাত্রীদের। যাত্রীর চেহারা, পরিচ্ছদ, জেন্ডার পছন্দ হলে তবেই যেতে চায়। এটা কি শ্রেণীগত সংঘাতের কোনো প্রতিশোধপরায়ণতা? যে যাত্রীরা দু/পাঁচ টাকার জন্য রিকশা শ্রমিকদের সঙ্গে বাজে আচরণ করে আজ মওকা পেয়ে তাদের ওপর প্রতিশোধ নেয়া!

যারা রিকশা চালান তারা একটা কঠিন শারীরিক কষ্টের কাজ করেন। বিশেষত এ গরমের মধ্যে এ কাজটি ভয়াবহ কষ্টের। রিকশা প্যাডেলে পা চালিয়ে যাত্রীদের বহন করা কাজটির মধ্যে একটা নিষ্ঠুর অমানবিকতাও আছে। এসব ভাবছি। হাঁটছি। অনেকটা উপায়হীনভাবে।

২.
নাখালপাড়ার রাস্তায় সংসদ ভবন পার হচ্ছি। রাস্তার বাতিগুলো অচল। স্বৈরশ্বাসক এরশাদ সাহেব ঢাকা শহরে এক ধরনের হলুদ বাতির প্রচলন করেছিলেন। আলোর চাইতে তা রহস্যময় আলো আঁধারিই তৈরি করে। বেগম খালেদা-শেখ হাসিনা কেউই এরশাদের হলুদ বাতিতে হাত দেয় নাই। রাতের ঢাকায় উজ্জ্বল আলোর ব্যবস্থা নেই সড়কগুলোতে। ছিনতাই, রাহাজানির জন্য তাই অবারিত সুযোগ। নাখালপাড়ার রাস্তাটা সে জন্যই বিখ্যাত। ভাসমান পতিতা, নচ্ছার পুলিশ আর ছিনতাইকারী- এই ত্রয়ীর মধ্যে ঐক্য আছে। এরশাদ খালেদা হাসিনার ঐক্যের মতোই।
প্রায় অন্ধকার রাস্তার এক পাশে দাঁড়িয়ে জলবিয়োগ করছিলেন এক তরুণ। পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া অস্ত্রবিহীন পোশাক এক পুলিশের পছন্দ হলো তরুণটিকে।
দাঁড়িয়ে জলবিয়োগ চলা অবস্থাতেই জেরা শুরু করলেন পুলিশ মহাশয়। বিষয়টা বিচ্ছিরি। মলত্যাগ, জলত্যাগের সময় কাউকে এভাবে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শোভন?
পুলিশ সেপাই তখন ক্ষমতাবান। হরতালের আগের রাতে যে কাউকেই জিজ্ঞাসাবাদের অধিকার তাকে দিয়েছে সরকার। শেখ হাসিনার গণতান্ত্রিক আমলের মজা তাই। রাজনীতিবিদরা হরতাল ডাকবে। সেটা হাসিনার পুলিশের ঢাকাপ্রধান প্রকাশ্যে সংবাদ সম্মেলন করে হুমকি দেবে। শুনেছি ঢাকাজুড়ে গোপালগঞ্জ পুলিশের নাকি বড় দাপট। শেখ হাসিনার বাড়ি গোপালগঞ্জ। পুলিশের বাড়ি গোপালগঞ্জ হলে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে একটা আত্মীয়তার যোগসূত্র মেলে। তাতেই ক্ষমতার তাপ বাড়ে। কেননা ক্ষমতা তো আত্মীয়তার ব্যাকরণও মানে। পুলিশটির আচরণে উগ্রতা ও ঔদ্ধত্য সুস্পষ্ট। যুবকটি নমনীয় হলে আপাতত নিরস্ত্র পুলিশের সশস্ত্র আচরণের হাত থেকে রেহাই মেলে।

৩.
হাঁটতে থাকি। দু’জোড়া যুগল তখন আমার সামনে। ক্লান্তি ভর করছে। কাঁহাতক আর হাঁটা যায়। যুগলের জন্য রিকশা হচ্ছে মোক্ষম যান। হুড তুললেই বাসরঘরের নীরবতা। আলো-আঁধারির রাতের সড়ক তো বোনাস। তরুণ এক রিকশাওয়ালা এই মওকার সুযোগ নিল। শ খানেক মানুষকে ফিরিয়ে এক জোড়া তরুণ-তরুণীকে তার পছন্দ হলো। ভাড়া চাইল আমার হিসেবে প্রায় তিন গুণ। প্রেমিকযুগলের বাসায় ফেরার তাড়া ছিল। রিকশাওয়ালা সেই বিপদকে কাজে লাগাল বাংলাদেশের আমলাদের মতো। বিপদে ফেলিয়া উৎকোচ দিতে বাধ্য করা। অগত্যায় বাধ্য হয়ে তরুণ রিকশাওয়ালার নিপীড়ন মেনে নিতে হলো প্রেমিকযুগলকে। ঠিক জনতা যেমন পীড়ন, নিপীড়ন এবং কখনো কখনো ধর্ষণ মেনে নেয় এরশাদ, খালেদা, হাসিনা, ফখরুদ্দীন, মইনউদ্দীনের মতো শাসকের। উপায়হীন হয়েই মানতে হয় শাসকদের অত্যাচার।

৪.
নির্বাচন কমিশনের পাশ দিয়ে হাঁটছি। আমরা অনেক মানুষ। হাসিনা-খালেদার ঝগড়ার পাপ বইছি। হরতাল যারা ডেকেছে, যারা ঠেকাচ্ছে দু’দলের কারও এই কষ্ট নেই। কষ্ট করছে আমজনতা। নির্বাচন কমিশনের গা ঘেঁষে হাঁটতে হাঁটতে পুরনো কথা মনে এলো। মনের চেহারায় ভেসে উঠল প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) আজিজ।
সিইসি আজিজ এখন কোথায়? এ রাত্তিরে সিইসি আজিজ নিশ্চয়ই ঘুমুতে যাবার কথা ভাবছেন। সিইসি আজিজ নিশ্চয়ই এখন হাসছেন। আবার তার সময়কালই ফিরছে বাংলাদেশে। টেকো মাথার সিইসি আজিজ কি জ্বালানোটাই না জ্বালিয়েছে। খালেদা তখন ভর করেছে সিইসি আজিজের ওপর। হাসিনা তাকে মানবেন না। দুই মহিলার হ্যাঁ না তখন তুঙ্গে। আজিজ বের করলেন এক ফর্মুলা। তিনি যাবেন না...। সাংবিধানিক পদ থেকে কাউকে সরানো যায় না। কাজেই খোলাপথ রাস্তার আন্দোলন। শুরু হলো হরতাল, জ্বালাও, পোড়াও। হাসিনার হরতাল বলে কথা! তার তেজও আলাদা। আমার কখনো কখনো মনে হয় আ’লীগকে সরকারে মানায় না। রাস্তায় যতটা মানায়। সাহারা খাতুন, মতিয়া চৌধুরী, শাজাহান খান ফার্মগেটের রাস্তায় বাস আটকাচ্ছেন, পিকেটিং করছেন- আহা রে যে জোশ, মন্ত্রিসভায় বসে কি সেই চেহারা পাওয়া যায়। আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে, হরতালের দিনে মন্ত্রী মতিয়া, সাহারা, শাজাহান খানরা ঘুমুতে পারেন! তাদের হাত-পা নিস্পিস্ করে না। রাস্তায় নামতে ইচ্ছে করে না! মতিয়া আপা, সাহারা খাতুনকে কতদিন রাস্তায় দেখি না!

৫.
নির্বাচন কমিশনের পাশ দিয়ে তখন প্রায় আগারগাঁওয়ের চার রাস্তার মোড়ের কাছাকাছি এসে গেছি। ক্লান্তি কিছুটা ভর করেছে। গতি শ্লথ হয়ে এসেছেও। সিইসি আজিজের কথা ভুলতে বসেছি। মনে পড়ল জাকারিয়া-জকরিয়া গংদের কথা। বিএনপির ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা আর ব্যারিস্টার মওদুদ এই দুই জোকারকে যে কোথা থেকে আবিষ্কার করেছিলেন কে জানে? নির্বাচন কমিশনে বসে দুই জোকার বেশ রঙ্গ করেছিলেন বটে। এই রঙ্গ শেষ পর্যন্ত মওদুদ-হুদাকেও ছাড়েনি। জেলের ঘানি টানিয়েছে। জানি না মওদুদ-হুদা গং এসবের জন্য অনুতাপ করেন কি না?
হঠাৎ দেখি হৈ চৈ। হুটোপুটি। ছুটাছুটি। প্রচণ্ড শব্দ। সামনে গজ ত্রিশ দূরে আগুন। প্রায় অন্ধকার রাস্তার কোনে জ্বলছে এক সিএনজি কালো ক্যাব। আগুন ক্রমেই ঊর্ধ্বমুখী হচ্ছে। ক’জন মানুষ লাঠি হাতে দাঁড়িয়ে। রাস্তা থেকে মানুষ, গাড়ি, রিকশা ফিরিয়ে দিচ্ছে। যারা লাঠি হাতে সাদা পোশাকে জ্বলন্ত কালো ক্যাব থেকে মানুষদের দূরে সরিয়ে দিচ্ছে তাদের দেখেই আমার ভয় বাড়ল আরও বেশি। এরাই এখন সবচাইতে ক্ষমতাবান। যে কাউকে যে কোনোদিন উঠিয়ে নিতে পারে। কোমরে অস্ত্র গুঁজে এরাই এখন শাহানশাহ্।
দূরে দাঁড়িয়ে গাড়ি জ্বলা দেখছি। কালো ক্যাবের জ্বালানি সিএনজি। আগুনে তার রূপ বাহারি হচ্ছে। আলো-আঁধারির রাতে ভয়ঙ্কর সুন্দর রূপ নিচ্ছে আগুন। আগুনের শিখা যত উপরে উঠছে ততই রঙের মধ্যে বাহার ফুটছে। কি যে সুন্দর লাগছে। ভয়ানক সুন্দর! আগুনের রূপের মধ্যে মাদকতা আছে। কি ভয়ানক সৌন্দর্য বিলোচ্ছে। মন্ত্রমুগ্ধের মতো দাঁড়িয়ে থাকি।
হঠাৎ সম্বিত পাই পাশের লোকটির কথায়। আগুন দিল কে? পিকেটার! না র‌্যাব, পুলিশ, গোয়েন্দা বিভাগের সোর্স? সেই তালাশতত্ত্ব কে দেবে? এ কথার জবাব দেয়ার মধ্যেও বিপদ আছে। যিনি প্রশ্ন তুলছেন তিনি যে কার সোর্স কে জানে?
আমি তখন কিছুটা মগ্নঘোরাক্রান্ত। আগুনের শিখা আমাকে টানছে ভয়ানকভাবে। মনে হচ্ছে আত্মাহুতি দেই ঐ অপরূপ সৌন্দর্যে। হাসিনা-খালেদার কল্যাণে প্রতিদিনই তো দেশ জ্বলছে। আগুন ধরছে সর্বত্র। কিন্তু এ রকম রূপ দর্শন কি সবসময় কপালে জুটবে!!

৬.
আগামীকাল সকাল থেকে ছত্রিশ ঘণ্টার হরতাল শুরু হবে। অনেক নিপীড়ন সইতে হবে মানুষকে। হাসিনা খালেদা আগুন জ্বালালে তার উত্তাপ তো বইতেই হবে দেশবাসীকে। আহা রে তাদের মিলিত ঝগড়ার আগুনে আত্মাহুতি দেবে জনগণ! আবার হঠাৎ করে শাহ মোয়াজ্জেমের কথা মনে পড়ে। এরশাদের পা চাটতে চাটতে একবার বলেই ফেলেছিলেন, দুই নারীর মিলনে কিছুই হয় না। কথাটা ভুল।
এই রাত্রির কালো ক্যাবের আগুনে আমার মনে হলো শাহ মোয়াজ্জেম ঠিক কথা বলেন নাই। আজকের আগুনে ঝলসে যাওয়া কালো ট্যাক্সিক্যাব প্রমাণ করেছে এরা দুজন আগুন জ্বালাতে জানেন। মিললেও আগুন। বিরোধেও আগুন। দুজন মিলেছিলেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে একদা। তখনও আগুন ছিল- হরতাল, অবরোধ, জ্বালাও, পোড়াও। এখনও যে মিলছেন না তখনও রয়েছে আগুন।
প্রায় আধাঘণ্টা চলল এই নাটক। কালো ক্যাব পুড়ে ছাই হলো। হাওয়ায় আতশবাজির মতো মিলিয়ে গেল সাদা পোশাকের অচেনা বন্ধুরা। বিকট আওয়াজ তুলে এলো র‌্যাব, পুলিশের গাড়ি। এলো লালরঙা শরীর নিয়ে ফায়ার সার্ভিসের গাড়িও। কালো ক্যাবের আত্মাহুতি শেষে বসল এদের মিলনমেলা। আমরা অপেক্ষমাণ জনতা আবার হাঁটা শুরু করলাম।
     
Untitled Document

কড়াইশুঁটির বিস্ময়
Total Visitor: 708414
সাপলুডু মূলপাতা | মতামত Contact : shapludu@gmail.com
Copyright © Life Bangladesh Developed and Maintained By :