Untitled Document
আষাঢ় সংখ্যা ১৪১৮
মূলপাতা শিরোনাম বটতলা পঞ্জিকা প্রদর্শনী
গোল্লা¬ছুট খেলার গোল্লারা
- অনুপম হীরা মণ্ডল




বাংলাদেশের একটি জনপ্রিয় লোকক্রীড়া হলো গোল্লাছুট। এটি একটি দলবদ্ধ খেলা। দুইটি দলের মধ্যে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে এই খেলা অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি অঞ্চলে এই খেলার প্রচলন রয়েছে। তবে দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলে খেলাটির প্রভাব বেশি। প্রতিটি দলে ৮/১০ জন খেলোয়াড় থাকে। খেলোয়াড়ের সংখ্যা বেশিও থাকতে পারে। সাধারণত কিশোর-কিশোরীরা এই খেলায় অংশগ্রহণ করে। কখনো কখনো বালক-বালিকাদেরও খেলায় অংশ নিতে দেখা যায়। এই খেলার জন্য খোলা মাঠ বা বাড়ির আঙিনাকে নির্বাচন করা হয়। প্রশস্ত জায়গা ছাড়া এই গোল্ল¬াছুট খেলা অসম্ভব।
দুইটি দলে সমান সংখ্যক খেলোয়াড় নিয়ে এই খেলা অনুষ্ঠিত হয়। এর একটি দলকে ঘরের দল এবং অন্যটিকে বাইরের হিসেবে নির্বাচন করা হয়। এই নির্বাচন খেলোয়াড়রা নিজেরাই করে। কোনো মাঠ বা উন্মুক্ত স্থানের মধ্যখানে একটি বাঁশ-কাঠের দণ্ড বা কলাগাছ পুঁতে রাখা হয়। সাধারণত এর উচ্চতা ৪/৫ ফুট হয়ে থাকে। এই দণ্ডটি হতে বৃত্তাকারে ৩৫/৪০ হাত দূরত্বে কিছু সীমানা চিহ্ন নির্দেশ করা হয়। এই সীমানায় গাছ, পাথর, ইট, ঘর ইত্যাদিকে চিহ্ন হিসেবে ধরে নেওয়া হয়। গ্রামে ফসল মাড়াই করার জন্য বাঁশ-কাঠের দণ্ড পুঁতে রাখা হয়। যে দণ্ডকে কেন্দ্র করে গরু-মহিষ ঘোরানো হয়। এই দণ্ডকে কেন্দ্র করেও গোল্ল¬াছুট খেলা হয়ে থাকে।
গোল্ল¬াছুট খেলার নামকরণে দেখা যায় এই খেলার সঙ্গে দুইটি শব্দ জড়িত। একটি গোল্ল¬া অন্যটি ছুট। গোল্ল¬া হলো নির্দিষ্ট স্থান বা বিন্দু যেটিকে কেন্দ্র করে ঘর নির্দেশ করা হয়। আর ছুট হলো দৌড় দেওয়া। ঘরের খেলোয়াড়েরা গোল্ল¬া হতে ছুটে পালায় বলে এর নামকরণ হয়েছে গোল্ল¬াছুট। যশোর-খুলনা অঞ্চলে দেখা যায় খেলোয়াড়দেরকেই গোল্ল¬া বলা হচ্ছে। আর এই খেলোয়াড়রা নির্দিষ্ট কেন্দ্র থেকে ছুটে সীমানার বাইরে ছুটে পালায় বলে এই অঞ্চলে একে ‘গোল্ল¬ার-ছুট’ খেলা বলা হয়।
ঘরের দলটি পরস্পরের হাত ধরাধরি করে গোল্ল¬াকে কেন্দ্র করে ঘুরতে থাকে। প্রতি দলে একজন সর্দার বা দলপতি থাকেন। সে তার দলের খেলাকে পরিচালিত করে। বৃহত্তর যশোর-খুলনা অঞ্চলে একে ‘দলের গোদা’ বা ‘পালের গোদা’ বলা হয়। ওয়াকিল আহমদের মতে, দলপতি ছাড়া অন্য খেলোয়াড়দেরকে ‘গোদা’ বলা হয়।এই মত সমর্থন করা যায় না। কারণ বাংলাদেশে একটি প্রবাদই আছে ‘পালের গোদা’। ক্ষেত্রসমীক্ষায় এই অঞ্চলের দেখা যায় গোল্ল¬াছুট খেলায় দলের সর্দারকে গোদা বলা হচ্ছে।
যে দল ঘরের দল হয় তাদের একজন কেন্দ্রের খুঁটিটি ধরে রাখে। অন্যরা তার হাত ধরাধরি করে ঘুরতে থাকে। এর পর বাইরের খেলোয়াড়দের চোখকে ফাঁকি দিয়ে তারা এক এক করে বৃত্তের বাইরের সীমানায় নির্দিষ্ট করা চিহ্ন ছুঁয়ে দেয়। যে খেলোয়াড় সীমানা চিহ্ন ছুঁতে পারে সে মুক্ত হয়। এক এক করে ঘরের সব খেলোয়াড় যদি প্রতিপক্ষের খেলোয়ড়দের চোখ ফাঁকি দিয়ে সীমানার চিহ্নকে ছুঁতে পারে তবে তাদের জয় হয়। ঘরের খেলোয়াড়দের বাইরের খেলোয়াড়েরা সব সময় নজরে রাখে। কেউ যাতে বৃত্তের চিহ্নকে ছুঁতে না পারে। কোনো খেলোয়াড় বৃত্তের চিহ্ন ছুঁতে এলে বাইরের খেলোয়াড়েরা তাদের ছুঁয়ে দেয় তখন ঘরের খেলোয়াড়টি মারা পড়ে। তাকে স্বদলে যোগ দিতে হয়। ঘরের খেলোয়াড়েরা সীমান চিহ্ন ছুঁতে যায় এবং তাকে ধরা না যায় তখন, বাইরের খেলোয়াড়েরা তাদের হাতে থাকা টুকরো টুকরো কলার ডোগা তার দিকে ছুঁড়ে মারে।
ঘরের খেলোয়াড়েরা যতোক্ষণ কেন্দ্রের দণ্ড বা নিজ দলের খেলোয়াড়দের হাত ছুঁয়ে রাখে ততোক্ষণ তারা নিরাপদ থাকে। যখই তাদের হাত দণ্ডের স্পর্শ হতে সরে যায় তখই তারা বিপদের মধ্যে পড়ে। এই সময় প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়েরা তাদেরকে ছুঁয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। ঘরের খেলোয়াড়রা যে কোনো সময় যে কোনো দিকে ছুটে পালাতে পারে। এক এক করে কিংবা এক সঙ্গে অনেকে ছুটতে পারে। মূল কথা হলো দৌড়ে সীমানা চিহ্ন ছুয়ে দেওয়া। সীমানা চিহ্ন হলো তাদের বিপদ মুক্তির চিহ্ন।
গোল্ল¬াছুট খেলার অন্তিম পর্বে একটি ভিন্ন রীতি বিদ্যমান। যেমন, গোল্ল¬াছুট খেলার শেষভাগে স্বতন্ত্র আর একটি পর্ব সূচিত হয়। যে দল খেলায় বিজয়ী হয় তারা কেন্দ্রের খুঁটি হতে জোড় পায়ে একে একে সীমানার দিকে লাফিয়ে যায়। সবাইয়ের লাফিয়ে যাওয়ার দূরত্ব মিলে সীমানা পার হতে পারলে এক পাটি বা এক পা’ড় খেলা হয়। আর যদি তারা লাফিয়ে যেতে না পারে তবে তাদের পুনরায় ঘর ধরে ঘুরতে হয়।
বাংলাদেশের সব অঞ্চলে অন্তিম পর্বটি পালন করতে দেখা যায় না। সিরাজগঞ্জ, পাবনা, টাঙ্গাইল, বৃহত্তর যশোর-খুলনা অঞ্চলে এই রীতিতে খেলা সমাপন হতে দেখা যায় না। এই অঞ্চলে দেখা যায় যদি ঘরের দল দৌড়ে এক এক করে সীমানা নির্দেশক চিহ্ন ছুঁতে পারে তবে তাদের পাড় হয়। আর যদি কেউ ব্যর্থ হয় তবে তাকে আবার ঘরে ফিরিয়ে নিয়ে আসা হয়। সবাই পার হয়ে গেলে তাদের এক পা’ড় খেলা হয়। পরবর্তীতে অন্যদল আবার ঘর পায় বা তাদের কেন্দ্রের খুঁটি ধরে বৃত্তাকারে ঘুরতে হয় এবং এক এক করে পূর্বের ন্যায় সকলের দৃষ্টি ও ছেঁাঁয়া এড়িয়ে সীমানা পার হতে হয়। এভাবে এক এক দলের খাটুনি দিতে হয়। এই খেলার কোনো সময় নির্দিষ্ট নেই খেলোয়াড়দের আগ্রহ অনুযায়ী খেলার সময় নির্দিষ্ট হয়।
এখন প্রশ্ন হলো গোল্লাছুট কি কেবলই শিশুতোষ ক্রীড়। এর উদ্ভব কি কেবল শিশু-কিশোরের বিনোদনের জন্য। সমাজ-ইতিহাস কিন্তু অন্য কথা বলে। ফোকলোরবিদদের ধারণা এর সঙ্গে লুকিয়ে আছে সমাজের অনেক অজানা ইতিহাস। এই খেলার মধ্যে দাস সমাজের বেদনাময় এক ইতিহাসের দিকে সমাজ গবেষকের দৃষ্টি নিবদ্ধ করে। এই খেলার অন্তরালে দেখা যায় দাস জীবনের অশ্র“সিক্ত বঞ্চনার ইতিহাস যুক্ত। দাস জীবনে দাসদের যে বন্দি করে রেখে অনেক কঠিন শারীরিক কাজে লাগানো হতো তা ইতিহাসে বিবৃত আছে। সেই বন্দী জীবন হতে পালিয়ে বাঁচা কোনো দাস-এর পক্ষে সম্ভব ছিল না। যদি কোনো দাস তার প্রভুর বন্দিশালা থেকে পালাতে চেষ্টা করতো তবে তাকে কঠিন শাস্তি পেতে হতো। পাহারাদারেরা তাদের ধরে নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার অপরাধে শারীরিক শাস্তি দিতো। এমনকি শারীরিক শাস্তি শেষে তাদের আবার কঠিন কাজে নিয়োজিত করা হতো। দাসজীবনের সেই বঞ্চনা আর দুঃখের প্রতিচ্ছবি খুঁজে পাওয়া যায় গোল্লাছুট খেলার মধ্যে। গোল্লাছুট খেলার এক একটি গোল্লা হলো এক একটি দাসের প্রতিরূপ। দাসরা যেমন বন্দিদশা থেকে পালানোর চেষ্টা করতো তেমনি গোল্লাছুটের গোল্লারা পালাতে চেষ্টা করে। দাস জীবনের সেই আত্মরক্ষার প্রতিচ্ছবি খুঁজে পাওয়া যাবে গোল্লাছুট খেলায়। তাই গোল্লাছুট ফোকলোরবিদদের নিকট কেবল একটি শিশুতোষ ক্রীড়া নয়। এই খেলা সমাজ ঘটনার একটি প্রতীকি রূপায়ণ। দাস জীবনের সেই করুণ ঘটনা হয়তো সমাজ হতে অনেকাংশে দূর হয়ে গেছে কিন্তু সমাজের সেই বস্তব ঘটনা মানুষ ভুলতে পারেনি। মানুষের সেই বঞ্চিত ইতিহাস প্রতীকের মাধ্যমে শিশুতোষ ক্রীড়ার মধ্যে আশ্রয় পেয়েছে। এই ক্রীড়া বাস্তব ঘটনাকে নির্দশ করে না। তবে এই ঘটনার মধ্যে বাস্তবের ছায়পাত আছে। তাই গোল্লাছুট খেলার গোল্লারা কেবল এক একটি শিশু চরিত্র নয়। এটি দাস জীবনের এক একজন বঞ্চিত মানুষে প্রতিনিধিত্ব করে।
     
Untitled Document

কড়াইশুঁটির বিস্ময়
Total Visitor: 708395
সাপলুডু মূলপাতা | মতামত Contact : shapludu@gmail.com
Copyright © Life Bangladesh Developed and Maintained By :