Untitled Document
শ্রাবণ সংখ্যা ১৪১৮
মূলপাতা শিরোনাম বটতলা পঞ্জিকা প্রদর্শনী
সান্তাল বিদ্রোহের পটভূমি ও পরবর্তী প্রভাব
- এমিলিউস টুডু


ভৌগলিক সীমারেখা নির্ধারনের পূর্ব থেকে যারা কোন দেশে বসবাস করে একমাত্র তাদেরকেই আদিবাসী বলা হয় । ভারতের আদিবাসী যাদের বলা হয় তারাই ভারতের প্রাচীনতম অধিবাসী । ভারতীয় জনগোষ্ঠীর উল্লেখযোগ্য অংশ হলো এই আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অন্তর্গত সান্তাল জনগোষ্ঠী । বৃটিশ শাসন এবং বৃটিশের আশ্রয়পুষ্ট জমিদার, মহাজন শ্রেনীর নির্মম শোষনের বিরুদ্ধে সান্তাল সম্প্রদায়ের বিপ্লব ছিল বৃটিশ শাসনের বিরুদ্ধে এক গণবিদ্রোহ । এই বিপ্লবের কারণ ছিলঃ
১। সান্তালরা প্রাচীনকালে চম্পা নামক দেশে বাস করতেন বলে বিশ্বাস করেন । সান্তালদের বিশ্বাস ছিল যে, চম্পা যুগে তাঁরা ছিলেন প্রকৃত স্বাধীন ও শোষনমুক্ত । তাদের মধ্যে ‘খরোয়াড়ী’ নামক এক আন্দোলন বা ভাবধারা প্রচলিত আছে । এই ভাবধারা অনুসারে সান্তালরা তাদের অতীত যূগের স্বাধীন জীবন ও স্বাধীন রাজ্য ফিরে পেতে চান । ১৮৫৫ খ্রিঃ সান্তাল বিপ্লবের পশ্চাতে স্বাধীন সান্তাল রাজ্য বা পরগনা প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন লুকিয়ে ছিল । সান্তালরা তাদের বিপ্লবকে বলেন “হূল” ।

২। সান্তাল বিদ্রোহের প্রধান কারণ ছিল অর্থনৈতিক । ঊনবিংশ শতকে ভারতের সাধারণ কৃষকের ওপর ইংরেজদের শোষন ও জমিদারী শোষনের বিরুদ্ধে যে বিক্ষোভ দেখা যায় সান্তালরা তা থেকে মুক্ত ছিলেন না । ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর শাসন প্রতিষ্ঠার অল্পকাল পরেই ভাগলপুরের কালেক্টর ক্লীভল্যান্ড সান্তালদের বসবাসের জন্য জঙ্গলাঞ্চলে গ্রাম স্থাপনের জন্য অনুমতি দেন । এই অঞ্চলের নাম দেওয়া হয় দামিন-ই-কোহ । সান্তালরা বিশ্বাস করতেন , জমিতে যারা সর্বপ্রথম নিজ পরিশ্রম ফসল ফলাবে সেই জমি তারই প্রাপ্য । সুতরাং তারা জঙ্গল, পাথর কেটে দামিন-ই-কোহকে আবাদযোগ্য করায় মনে করতেন যে, এই জমি সান্তালদেরই প্রাপ্য । কিন্তু ক্লীভল্যান্ড সান্তালদের জমির জন্য সরকারকে খাজনা ও কর দিতে চাপ দেন । এ জন্যে কোম্পানীর পুলিশ ও কর্মচারী সান্তালদের নির্যাতন করলে বাবা তিলক মাঝির নেতৃত্বে সান্তালরা ১৭৮৪ খ্রিঃ প্রথম বিদ্রোহ করেন । বৃটিশ শাসক সান্তালদের যুদ্ধে পরাজিত করে এবং তিলক মাঝিকে বন্দী করে ফাঁসি দেয় ।
৩। এরপর জমি ও খাজনা-সংক্রান্ত বিবাদ সান্তাল বনাম কোম্পানী ও কোম্পানীর তরফে জমিদারদের সাথে বিরোধ দীর্ঘকাল ধরে চলতে থাকে । বাংলা বিহারে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত চালু হবার ফলে কোম্পানী সরকার সান্তালদের অধিকৃত দামিন-ই-কোহ অঞ্চলে এই বন্দোবস্ত চালু করে কর আদায়ের জন্য ব্যস্ত হন । সান্তালরা জঙ্গল কেটে, পাথর সাফাই করে যে বিরাট জমি আবাদযোগ্য করে তোলেন তাতে ১৮৫১ খ্রিঃ ১৪৩৭টি সান্তাল গ্রাম গড়ে ওঠে এবং ৮২,৭১৫ জন সান্তাল এই গ্রামগুলোতে বসবাস করতেন । স্বভাবতই এই জমিগুলি অধিকার করার জন্য কোম্পানীর দ্বারা জমিদারদের লালসা দেখা দেয় । জমিদাররা সরলমতি সান্তালদের প্রতারিত করে জমি গ্রাস করতে থাকে । চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে অনেকে মেদিনীপুর, বাঁকুড়া, বীরভূমের হাসিল করা জমি ছেড়ে দিয়েছিল । এখন দামিন-ই-কোহ এর ওপর জমিদারের লোভী থাবা বিস্তৃত হলে সান্তালরা ক্ষোভে ফেটে পড়েন । ১৮৩৮ খ্রিঃ দামিন-ই-কোহ থেকে আদিতে সরকারের প্রাপ্য খাজনা ছিল ২ হাজার টাকা । ১৮৫১ খ্রিঃ এই খাজনা বেড়ে দাঁড়ায় ৪৩,৯১৮ টাকা ১৩ আনা ৫.০৫ পয়সা । জমিদারদের খাতায় সান্তালরা প্রাপ্য টাকা পরিশোধ করলেও তা ওয়াশীল হত না । সান্তালদের এই রাজস্ব বৃদ্ধির বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল নায্য । ১৮৫৩ খ্রিঃ বিচারক ডব্লিউ বি জ্যাক্সন ( W.B. Jacktion ) বাংলা বিহারের বিভিন্ন অঞ্চল পর্যবেক্ষন করে রিপোর্ট দেন যে, “যেখানে চাষ বাড়ার সম্ভাবনা ছিল সেখানে চাষ বেড়েছে । কৃষকেরা জঙ্গল সাফ করে চাষাবাদ শুরু করে আর জমিদার তার লভ্যাংশ নেয়”।
৪। সেই সঙ্গে সান্তাল গ্রামগুলিতে চলে আসে ধূর্ত ব্যবসায়ী ও মহাজন শ্রেণী। সান্তালদের হাতে নগদ টাকা ছিল না । জমির খাজনা নগদ টাকায় দেওয়ার নিয়ম থাকায় তারা বাধ্য হয়ে মহাজনের কাছে ফসল বিক্রি করে নগদ টাকা জোগাড় করত । মহাজনরা যে টাকা ধার দিত তা কখনও শোধ হোত না । মহাজনরা শতকরা ৫০-৫০০% সুদে টাকা ধার দিত । ফলে- দরিদ্র সান্তাল যতই ওয়াশীল দিক না কেন, মহাজনের খাতায় ঋণ বাকী থেকেই যেত। টাকা পরিশোধে ব্যর্থ হলে জমি চলে যেত মহাজনের কাছে । ময়রা, মনিহারী জিনিসের ও খাদ্যের প্রলোভন সামলাতে না পেরে নিজের সমস্ত ক্ষেতের ফসলের বিনিময়ে চড়া দামে এই সকল জিনিস কিনে সর্বসান্ত হত । সান্তালরা তার ধান বা চাউল ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করলে বেশী ওজনের বাটখারার দ্বারা ওজন কম দেওয়া হত । এর নাম ছিল “বেচারাম” । তাদের উৎপাদিত শস্যের বেশীর ভাগ জমিদার, মহাজন এবং দোকানদাররা আত্মসাত করত ।
৫। খ্রিস্টান মিশনারীরা সান্তালদের ধর্মান্তরিত করার চেষ্টা করে । লর্ড ডালহৌসির আমলে রাজমহলের ভেতরে রেলপথ তৈরী হলে রেলের কর্মচারীরা সান্তাল গ্রামে খাদ্য ও মুরগী জোর করে তুলে নেয় । কোন কোন ক্ষেত্রে তারা সান্তাল নারীদের নির্যাতন এবং ধর্ষন করত ।
৬। বাংলার ছোট লাট ফ্রেডারিক হ্যালিডের নির্দেশে সান্তাল সম্প্রদায়কে ব্রিটিশ সরকারের দেওয়ানী ও ফৌজদারী আইনের অধীনে আনা হয় । সান্তালরা আদি থেকেই তাঁদের নিজস্ব সামাজিক আইন দ্বারা শাসিত হয়ে আসছিলেন । ইংরেজদের আইন তারা জানতেন না ও বুঝতেন না । ইংরেজদের আইন ছিল জটিল ও আদালতের মামলা ছিল ব্যয়বহুল ও বিলম্বিত । জমিদার মহাজনরা ইংরেজদের আইনের সাহায্যে সান্তালদের ব্যাপক ক্ষয় ক্ষতি করে ।
৭। ইতিমধ্যে নীলকর সাহেবরা সান্তালদের সরলতার সুযোগ নিয়ে সান্তালদের জমিতে ধানের পরিবর্তে নীল চাষে বাধ্য করে । তারা তাদের ধানের জমিতে নীল বুনতে না চাইলে তাদের ওপর নির্যাতন করা হত, জুলুম করা হত ।
এই সকল অন্যায়ের প্রতিকার না হলে শেষ পর্যন্ত সান্তালরা বিদ্রোহের পথে পা বাঁড়ান । এই বিদ্রোহের প্রধান কারণ ছিল অর্থনৈতিক শোষন । সেই সঙ্গে সান্তালদের স্বাধীনতা লাভের স্বপ্ন ছিল । এই বিদ্রোহ ছিল জমিদার মহাজন শ্রেণী ও তাদের সমর্থক ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে সান্তা কৃষকদের সশস্ত্র বিপ্লব বা হুল । বীর সিং, কালো প্রামানিক , ভ্রোমন মাঝি প্রমুখ সান্তাল নেতারা এই বিদ্রোহের নেতৃত্ব প্রদান করেন । সিধু এবং কানু এই দুই ভাই ছিলেন এই বিদ্রোহের প্রধান নেতা এবং তারা স্বাধীন সান্তাল রাজ্য গড়ার শপথ নেন । রোমান সাম্রাজ্যের ত্রাস গ্রাকী ভাতৃদ্বয়ের সাথে সিধু ও কানুর চমৎকার মিল খুজে পেয়েছেন ইতিহাসবিদেরা । যদিওবা গ্রাকী ভাতৃদ্বয়ের আবির্ভাব ঘটেছিল ১৩০ খ্রিঃ পূঃ মাঝামাঝি সময়ে ।
বিদ্রোহের সময়ে সান্তালরা সহস্র কন্ঠে গেয়ে ঊঠত-
নেরা নিয়া, নুরু নিয়া ;
ডিডা নিয়া , ভিটা নিয়া
হায়রে, হায়রে! মাপাঃক গপচ দো
নুরিচ নড়াঁও গাই কো , নাচেল লাগিৎ পাচেল লাগিৎ
তব দো বোন হুল গেয়া হোসান্তালী ভাষায়
বাংলায় – “স্ত্রী সন্তান নিয়ে, বসতভিটা নিয়ে, হায়রে হায়রে খুনাখুনী । গোয়াল ভরা গরু, ধন সম্পত্তির জন্য আমরা সংগ্রাম করবই”।
সান্তাল কৃষক সেনারা অসীম সাহসে তীর ধনুক, কুড়াল নিয়ে সশস্ত্র ইংরেজ বাহিনীর বিরুদ্ধে (১৮৫৫ খ্রিঃ) লড়াই চালান। “ভাগনাদিহি” গ্রাম থেকে বিদ্রোহের সুচনা হয় । গোড়ার দিকে সান্তালরা জয় লাভ করলেও সংগ্রামপুরের যুদ্ধে সান্তালরা শোচনীয়ভাবে পরাজিত হন । সিধু ও কানু ইংরেজ সেনার গুলিতে নিহত হন । হাজার হাজার সান্তাল সেই যুদ্ধে প্রাণ দেওয়ার পর বিদ্রোহের অবসান হয় ।
সমকালীন ক্যলকাটা রিভিউ পত্রিকার মাধ্যমে জানা যায়, সান্তালদের ওপর অমানুষিক অত্যাচার করা হয় । অবশিষ্ট সান্তালদের সরকার ক্ষমা প্রদর্শন সুচক ঘোষনা করেন ।
সান্তাল বিদ্রোহ ব্যর্থ হলেও এর প্রভাব পরবর্তীকালে লক্ষ্য করা যায়। প্রথমতঃ সান্তালদের জন্য স্বতন্ত্র সান্তাল পরগানা নামে একটি আলাদা জেলা গঠন করা হয় । এভাবে সান্তালদের ভারতীয় জনজীবনের মূল স্রোত থেকে আলাদা করে দেওয়া হয় । তাদের উপযুক্ত শিক্ষা , কৃষিজ জমি , বানিজ্য প্রভৃতির সুযোগ না দিয়ে সরকার তাঁদের অনুন্নত অবস্থায় বিচ্ছিন্ন রাখার নীতি নেন । সান্তালদের জমি থেকে সরকার কর হ্রাস করা থেকে বিরত থাকে ।
দ্বিতীয়তঃ সান্তাল বিদ্রোহ ভারতের ইংরেজ শাসনের দুই সহযোগী লক্ষ্য করা যায় । জমিদার ও মহাজন শ্রেণীর ওপর কৃষক শ্রেণীর আঘাত লক্ষ্য করা যায়। ইংরেজদের মুদ্রা অর্থনীতির সন্তান ছিল এই মহাজন শ্রেণী ।
তৃতীয়তঃ সান্তাল বিদ্রোহ কৃষক শক্তির আত্মপ্রতিষ্ঠার চেষ্টা লক্ষ্য করা যায় । এই বিদ্রোহ দাম্ভিক ইংরেজ সরকারের অস্ত্রবলকে অগ্রাহ্য করে বিপুলবেগে আত্মপ্রকাশ করে । এই বিদ্রোহের মধ্যে ১৮৫৭ খ্রিঃ এর মহাবিদ্রোহের পদধ্বনি শোনা যায়।
চতুর্থতঃ বিদ্রোহ দমনের পর আদালত যে ২০০ জনকে অভিযুক্ত করেন তাঁদের মধ্যে সান্তাল ছাড়াও ছিলেন নিম্ন বর্ণের হিন্দু, গোয়ালা, ভূইয়া, ধাঙ্গড়, ডোম, প্রভৃতি সম্প্রদায়ের মানুষ । সান্তাল বিদ্রোহ ব্যর্থ হলেও তাদের মধ্যে স্বাধীনতার আগুন জ্বলতে থাকে । ১৮৫৫ খ্রিঃ সান্তাল বিদ্রোহে যে সমন্বয় দেখা যায় তা ছিল সান্তাল সম্প্রদায়ের নিজস্ব সভ্যতার বিকাশ ।
১৮৫৫ খ্রিঃ সান্তাল বিদ্রোহ না হলে ১৮৫৭ খ্রিঃ এর মহাবিদ্রোহ, নীল আন্দোলন, ১৮৫৯-৬১ খ্রিঃ, ১৯০৪ খ্রিঃ এর বঙ্গভঙ্গ, ১৯৪০ খ্রিঃ লাহোর প্রস্তাব, ১৯৪৭ খ্রিঃ ভারত পাকিস্তান ভাগ না হলে বর্তমানের স্বাধীন ভুখন্ড বাংলাদেশের জন্ম হত না ।
তাই একজন সান্তাল হিসেবে আমি গর্বিত ।
----
লেখক:এমিলিউস টুডু (এমি), বাংলা বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
----
সহায়ক গ্রন্থ:আধুনিক ভারত, অধ্যাপক প্রভাতাংশু মাইতি
      The Santal Insurrections, K.K Datta
      ভারতে কৃষক বিদ্রোহ, সুপ্রকাশ রায়
----
লেখাটির উৎস:আদিবাসী বাংলা ব্লগ [লিংক]

     
Untitled Document

পুঁতিফুল
Total Visitor: 708324
সাপলুডু মূলপাতা | মতামত Contact : shapludu@gmail.com
Copyright © Life Bangladesh Developed and Maintained By :