Untitled Document
শ্রাবণ সংখ্যা ১৪১৮
মূলপাতা শিরোনাম বটতলা পঞ্জিকা প্রদর্শনী
সীমানার ওধারে: যৌন সংখ্যালঘু প্রশ্নে কিছু ভাবনা
- প্রিসিলা রাজ


সমকামী, উভকামী ও রূপান্তরকামীদের বিরুদ্ধে বৈষম্য বিলোপের লক্ষ্যে জাতিসঙ্ঘ মানবাধিকার কাউন্সিলের ১৮ই জুন তারিখে নেওয়া প্রস্তাবের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছে বাংলাদেশ। তার সঙ্গে রয়েছে রাশিয়াসহ আরো ১৮টি দেশ। প্রথম আলো ১৯শে জুন সংখ্যায় দেখছি প্রস্তাবটির সারাংশ ছিল Ñ শুধুমাত্র যৌন বৈশিষ্ট্যের কারণে কারো বিরুদ্ধে বৈষম্য করা যাবে না।

বিপরীতকামী যৌন বৈশিষ্ট্যের বাইরের মানুষরা তাঁদের বিরুদ্ধে বৈষম্যের বিলোপ সাধনের জন্য এক হতে শুরু করেছেন আজ কয়েক দশক। বেশ কিছু দেশে তাঁদের অধিকারের বেশ কিছু স্বীকৃতিও মিলেছে। ইউরোপ ও আমেরিকার দেশগুলোই এক্ষেত্রে এগিয়ে আছে। ভারত ও নেপাল সহ তথাকথিত তৃতীয় বিশ্বের এসব দেশেও তাঁদের কিছু আইনগত স্বীকৃতি মিলেছে। তবে সারা পৃথিবী জুড়ে সমকামী, উভকামী ও রূপান্তরকামীরা সামাজিকভাবে প্রায় একইরকম কোণঠাসা, সংখ্যাগরিষ্ঠ বিপরীতকামীদের কাছে বিস্ময় ও বিবমিষা মিশ্রিত ঘৃণার পাত্র।

সমকামী, উভকামী ও রূপান্তরকামী মানুষের মানসিক ও অনেক ক্ষেত্রে শারীরিক বৈশিষ্ট্য ভিন্ন ভিন্ন হওয়াতে তাঁদের জৈবিক-মানসিক প্রয়োজনের মাত্রাও ভিন্ন। আবার প্রকৃতিতে এসব বৈশিষ্ট্যের অধিকারী প্রাণীকূলের জীবনধারণ পদ্ধতিও আলাদা। একই আলোচনায় এদের সবাইকে নিয়ে এলে প্রবন্ধের দৈর্ঘ্য বাড়বে, পাঠকের ধৈর্য্যচ্যুতি ঘটবে আশঙ্কায় এ আলোচনা মূলতঃ পৃথিবীতে যৌন সংখ্যালঘুদের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ ও সবচেয়ে পরিচিত সমকামীদের মধ্যে সীমিত রাখতে চেয়েছি।

বিপরীতকাম অর্থাৎ নারী-পুরুষের যৌন সম্পর্কের বাইরে বাকি সব ধরনের যৌন আচরণকে অপরাধ মনে করে যেসব রাষ্ট্র তাদের মধ্যে এগিয়ে আছে সেইসব দেশ যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী হয় মুসলমান অথবা খ্রীষ্টান। অন্ততঃ আন্তর্জাতিক নারী ও পুরুষ সমকামী সমিতি (ওহঃবৎহধঃরড়হধষ খবংনরধহ ধহফ এধু অংংড়পরধঃরড়হ) কর্তৃক পরিচালিত এক জরিপে সেটাই বেরিয়ে এসেছে। সমিতিটি ২০০৬ সালে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সমকাম বিষয়ক আইন নিরীক্ষা করে যেসব দেশে সমকাম শাস্তিযোগ্য অপরাধ সেগুলোকে চিহ্নিত করে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। ‘শোবার ঘরে সরকারের সঙ্গে’ (ডরঃয ঃযব মড়াবৎহসবহঃ রহ ড়ঁৎ ইবফৎড়ড়সং) নামের সে প্রতিবেদনে পৃথিবীর বিভিন্ন মহাদেশের ৯২ দেশের সমকাম বিষয়ক আইন তুলে ধরা হয়েছে। এসব দেশের মধ্যে বাংলাদেশও আছে। এদেশে দণ্ডবিধির ১৮৬০-এর ৩৭৭ ধারার আওতায় ‘প্রকৃতিবহির্ভূত অপরাধ’-এর সংজ্ঞা ও শাস্তি নির্ধারণ করে বলা হয়েছে: ‘কোনো ব্যক্তি যদি প্রকৃতির বিরুদ্ধতা করে পুরুষ, নারী বা পশুর সঙ্গে লালসাপূর্ণ সঙ্গমে লিপ্ত হয় তবে সেই অপরাধের জন্য তাকে যাবজ্জীবন অথবা ১০ বছর কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ড প্রদান করা হবে’ (মূল ইংরেজী থেকে অনুবাদ লেখকের)।

প্রতিবেদনটিতে উল্লিখিত আইনগুলোর সারাংশ পড়ে সমকামকে (সমকামীদের অনেকে একে সমপ্রেমও বলে থাকেন) অপরাধ হিসাবে চিহ্নিত করার পেছনে মূলতঃ দু’টি ভিত্তি চোখে পড়েছে Ñ এক, কোনো কারণ উল্লেখ না করে একে সরাসরি প্রকৃতিবিরুদ্ধ বলে অভিহিত করা এবং সৌদী আরব, ইরান, চেচেন ও মৌরিতানিয়ার মতো কিছু দেশে ইসলামী শরিয়া আইনকে ভিত্তি করে একে অবৈধ হিসাবে বিবেচনা করা।

ওপরের চারটি দেশে সমকামিতায় লিপ্ত হওয়ার বিষয়টি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হলে শরিয়া আইনের আওতায় প্রাপ্তবয়স্ক বিশেষ করে বিবাহিত পুরুষকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার বিধান রয়েছে। তবে আইনের ব্যাখ্যাটুকু পড়ে মনে হতেই পারে বিষয়টি প্রমাণ করা বেশ শক্ত। একাধিক পুরুষ সাক্ষী ইত্যাদির ব্যাপার আছে। যে দেশে সমকামের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড সেদেশে কেউ নিশ্চয়ই বলে-কয়ে এ সম্পর্ক করবে না!

যেসব দেশ প্রকৃতিবিরুদ্ধ এই বিধান দিয়ে সমকাম বেআইনি ঘোষণা করেছে তারা কেন তা মনে করছে তার কোনো ব্যাখ্যা প্রতিবেদনটিতে নেই। তবে খ্রীষ্টান ও মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠদের দেশগুলোতেই মূলতঃ এ বিধান প্রচলিত দেখে মনে হয় প্রধানতঃ বাইবেল ও কোরান শরিফের আলোকেই এ আইন করা হয়েছে। পৃথিবীর আর আর সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্ম হিন্দু, বৌদ্ধ ও ইহুদী ধর্মে এ বিষয়ে কী কী বিধান আছে তা আমার জানা নেই। তবে এ কথা হয়তবা সত্যি সমকাম খোলামেলাভাবে স্বীকৃত এমন সমাজ পৃথিবীতে নেই বললেই চলে।

এর কারণ হিসাবে মানুষের হাজার বছরের সংস্কার দায়ী বলে মনে করছেন অনেকে। শত শত বছর ধরে মানুষ যৌনতাকে কেবল প্রজননের হাতিয়ার হিসাবে দেখতে শিখেছে যা কেবল বিপরীতকামের মাধ্যমে অর্জন করা সম্ভব। এর বাইরে গিয়ে মানুষের অন্তর্নিহিত চাহিদার ভিত্তিতে যৌনতার আর কোনো ব্যবহার যে হতে পারে সে ভাবনা তার মাথায় আসেনি। ফলে পৃথিবীর সব সমাজে সমকামিতা থাকলেও এবং সে সম্পর্কে সমাজ ওয়াকিবহাল থাকলেও একে স্বাভাবিক আচরণ হিসাবে গ্রহণ করেনি। মানুষের নানান নেতিবাচক আচরণের সঙ্গে সমকামিতাকে এক কাতারে বসানো হয়েছে। অন্যদিকে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ যেহেতু বিপরীতকামী সেহেতু অন্যান্য যৌন পছন্দের মানুষের স্বর সবসময় নীচুই থেকে গেছে। এভাবেই মানবসমাজের নীতিকাঠামোয় বিপরীতকাম নিরঙ্কুশ প্রাধান্যে অধিষ্ঠিত হয়েছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ বিপরীতকামী মানুষের এই সংস্কার এবং মূল্যবোধ বিভিন্ন ধর্মে ও সমাজে বিভিন্ন ভাবে ও মাত্রায় প্রকাশ পেয়েছে।


মজার ব্যাপার, সমকামিতাকে অবৈধ করার জন্য যখন প্রকৃতিকে টেনে আনা হচ্ছে তখন সমকামীরা এবং তাঁদের নিয়ে কাজ করেন এরকম প্রতিষ্ঠান ও গবেষকরা বলছেন সমকামিতা প্রকৃতিরই অংশ, প্রকৃতির মধ্য থেকেই এর উঠে আসা।

কথা সত্যি। উইকিপিডিয়ায় দেখছি ব্র“স বাগেমিহি নামের এক গবেষক জানিয়েছেন প্রকৃতিতে এ পর্যন্ত প্রায় ১৫০০ প্রজাতির মধ্যে সমকামী আচরণ দেখা গিয়েছে, তার মধ্যে ৫০০ প্রজাতিতে এ ধরনের আচরণ সম্পর্কে বেশ ভাল তথ্য সংগ্রহ করা গেছে। তিনি বলছেন সমকামী আচরণ প্রকাশ করে এমন প্রজাতির মধ্যে প্রাইমেট জাতীয় প্রাণী (মানুষ, বানর, শিম্পাঞ্জী জাতীয় প্রাণী এ গোষ্ঠীর অন্তর্গত) যেমন রয়েছে তেমনি প্রাণীর অন্ত্রে বসবাসকারী কৃমিজাতীয় প্রাণীও রয়েছে। সমকামিতা বিষয়ে বিজ্ঞানের জ্ঞান এখনও খুব সীমিত, রাষ্ট্র ও সমাজ সকলেই বিরোধী হওয়ায় আগে এ নিয়ে কাজ বলতে গেলে হয়ইনি। সম্ভবতঃ সমকামীদের অধিকার আন্দোলন শুরু হওয়ার পর গত দু’তিন দশকে এ নিয়ে কিছু কিছু গবেষক উৎসাহী হয়ে উঠেছেন।

প্রকৃতিতে নানা ধরনের যৌন আচরণ থাকা সত্ত্বেও কেন মানুষের সমাজে যৌনতা সম্পর্কে একমাত্রিক দৃষ্টিভঙ্গীটি এরকম কঠোরভাবে চেপে বসল সে নিয়ে এসব সমাজতাত্ত্বিক ও বিজ্ঞানী নানা ধরনের মত দিচ্ছেন, স্থির কোনো সিদ্ধান্তে এখনও পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।

যৌন বিষয়ে অন্যান্য জীব ও মানুষের মধ্যে দু’টি মাত্রাগত তফাৎ দেখা যাচ্ছে Ñ প্রকৃতির বিশাল জীবরাজ্যে বংশবৃদ্ধির জন্য যৌন পদ্ধতি ছাড়াও অন্যান্য পদ্ধতির ব্যবহার রয়েছে যেগুলোকে এক কথায় অযৌন পদ্ধতি বলা হচ্ছে। এককোষী জীব নিজেদের বিভক্ত করে বংশবৃদ্ধি করে, আছে স্পোর উৎপাদন করে তার মাধ্যমে বংশবৃদ্ধি কিংবা পার্থেনোজেনেসিস বলে একটি প্রক্রিয়া জোঁকসহ বেশ কিছু প্রাণীর মধ্যে যা দেখা যায়। বিবর্তনের এক সিঁড়িতে এসে যখন মেরুদণ্ডী প্রাণীর উদ্ভব ঘটল প্রকৃতি তখন এদের প্রায় সকলের ক্ষেত্রে সকলের ক্ষেত্রে (মাছ, সরিসৃপ, উভচর, পাখি ও স্তন্যপায়ী) প্রজননের জন্য মোটের ওপর যৌন পদ্ধতিকে নির্দিষ্ট করে দিল।

অন্যদিকে মেরুদণ্ডী এসব প্রাণীর মধ্যে প্রজনন ছাড়াও যৌনতার বিবিধ ব্যবহার কিন্তু রয়েই গেল। এদের মধ্যে সমকামিতার উপস্থিতির কোনো নির্দিষ্ট কারণ রয়েছে নাকি তা নিছক বিবর্তনের অবশেষ হিসাবেই (যেমন, আমাদের মেরুদণ্ডের নীচের অংশের লেজের মতো গড়ন আমাদের পূর্বপুরুষদের লেজের সাক্ষী) রয়ে গেছে সে নিয়ে গবেষণা চলছে। এর কারণ হিসাবে এ পর্যন্ত যেসব মতামত এসেছে তার মধ্যে দু’টি প্রধান।

একটি মতে বলা হচ্ছে প্রকৃতিতে যৌন পদ্ধতির উদ্ভব ও বিকাশের ইতিহাসের মধ্যে নিহিত আছে সমকামের বীজ। তাঁরা বলছেন যৌন পদ্ধতির সর্বপ্রথম ব্যবহার হয়েছিল বংশবৃদ্ধিতে নয়, প্রতিকূল প্রাকৃতিক পরিস্থিতি থেকে আত্মরক্ষার তাগিদে একটি এককোষী জীবের মধ্যে সর্বপ্রথম এ প্রক্রিয়ার উদ্ভব ঘটেছিল যা লাখ লাখ বছরের বিবর্তনের মধ্য দিয়ে আজকের অবস্থায় এসে পৌঁছেছে। যেহেতু পদ্ধতিটির বিকাশের শুরুতেই রয়েছে প্রজননের বাইরের একটি প্রয়োজন, বহু বিবর্তনের পরেও যৌনতার সেই মাত্রাটি বহু জীবের মধ্যে কম-বেশী রয়েই গেছে, হারিয়ে যায়নি।

অন্য মতটি এর সঙ্গে বাঁধা। গবেষকরা বলছেন মানুষের বাইরে পাখি ও স্তন্যপায়ীদের মধ্যে সমকামের ব্যবহার জুটি বাঁধা, বন্ধুত্ব, পরস্পরকে রক্ষা ইত্যাদি সামাজিক বোধের নিরিখে হয়ে থাকে। একটি প্রবন্ধে পড়লাম অস্ট্রেলিয়ার একটি প্রজাতির পাখিদের মধ্যে অনেক পুরুষ পাখি সমলিঙ্গ পাখির সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদী সপ্রেম জুটি বাঁধে। প্রজননের প্রয়োজনে তারা আবার মেয়ে পাখির সঙ্গেও মিলিত হয় কিন্তু মেয়েটি ডিম ফোটানোর পর তাকে তাড়িয়ে দিয়ে নিজেরাই তা দিয়ে বাচ্চা ফোটায় এবং এভাবে নিজেদের পরিবার গড়ে তোলে।

মানুষের মধ্যে যৌনতার বহুমাত্রিকতার আরেক পরিচয় মনে হয় সৌন্দর্য্য সম্পর্কে তার বোধ। যতদূর জানি এ কথা জীববিজ্ঞানীদের মধ্যে স্বীকৃত যে, যে বোধটিকে আমরা সৌন্দর্য্য বলে থাকি যৌন সম্পর্ক স্থাপন এবং প্রজননের জন্য প্রকৃতি সেটির বহুল ব্যবহার করে থাকে। বিপরীত লিঙ্গকে আকৃষ্ট করতে গাছে রঙিন ফুল ফোটে, বেরঙা ফুলে গন্ধ হয়, ময়ূর পেখম মেলে কিংবা সিংহের কেশর হয়। পাখি ও স্তন্যপায়ীদের মধ্যে সুন্দর হওয়ার দায়িত্ব অবশ্য প্রকৃতি দিয়েছে মূলতঃ পুরুষটিকে। কিন্তু ভাবনার বিষয় হলো এসব জীব ও প্রাণীর সঙ্গে যৌনতার সম্পর্ক না থাকা সত্ত্বেও মানুষের মধ্যেও তাদের এসব বৈশিষ্ট্য অনুরণন জাগায়। এ থেকে মনে হয় প্রকৃতির সৌকর্য্য সৃষ্টির প্রক্রিয়াটি মানুষের সৌন্দর্য্যবোধের সঙ্গে হয়তবা এক সুরে গাঁথা। কিছুটা অপ্রাসঙ্গিক মনে হলেও বিষয়টি এ আলোচনায় নিয়ে এলাম কারণ প্রকৃতিতে যৌন চেতনার যে স্রোত সময় অতিক্রম করে চরাচরব্যাপী বয়ে চলেছে তার সঙ্গে জীবজগতের আরো বহু অনুভূতি, প্রয়োজন ও চেতনাও জড়িয়ে আছে, মানুষ যার বাইরে না। ফলে প্রকৃতিতেই উপস্থিত সমকামিতা যখন মানুষের মধ্যেও প্রকাশিত হয় তখন তাকে অস্বাভাবিক ভাবার অবকাশ খুব একটা থাকে না।


এরপর আসে সমকামিতা বিষয়ে দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিতর্কটি। সমকাম প্রকৃতিবহির্ভূত অস্বাভাবিকতা বলে যাঁরা কঠোর বিধান দিয়ে বসে ছিলেন তাঁদের কেউ কেউ এটি যে প্রকৃতিতে উপস্থিত তা মেনে নিয়েছেন। মেনে না নিয়ে উপায়ও নেই কেননা জলজ্যান্ত তথ্যপ্রমাণ বর্তমান। ফলে তাঁরা এখন বিতর্কটিকে আরেক জায়গায় নিয়ে গেছেন Ñ প্রকৃতিতে সমকামিতা থাকলেই কি মানুষের মধ্যে তাকে মেনে নিতে হবে? তাঁরা বলছেন প্রকৃতির মধ্যে আছে এমন আরো অনেককিছুই তো মানুষের সমাজ নিজের জন্য মেনে নেয়নি, তবে সমকামকে মেনে নিতে হবে কেন? খুব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

এ প্রবন্ধের সীমিত পরিসরে এ প্রশ্নের ব্যাপক আলোচনা সম্ভব না, তা করার মতো যথেষ্ট জ্ঞানসঙ্গতিও আমার নেই। এ প্রশ্নের সূত্র ধরে কয়েকটি প্রসঙ্গে কেবল আলোচনা টানব। মানুষের মধ্যে সমকামিতার উপস্থিতি প্রকৃতিরই এক অনুষঙ্গ এ কথা স্বীকার করে নেওয়ার পরও যাঁরা মানুষের মধ্যে সমকামিতাকে মেনে নিতে চাইছেন না তাঁদের দু’টি ভিত্তি Ñ ধর্মগ্রন্থ ও ধর্মীয় বিধান এবং নৈতিক মূল্যবোধ।

ধর্মগ্রন্থ বা ধর্মীয় বিধানের সূত্র উল্লেখ করে যাঁরা সমকামিতা শাস্তিযোগ্য এমনকি মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধ মনে করেন তাঁদের উদ্দেশে বিশেষ কিছু বলার নেই। নিজেদের ধর্মের বিশেষ গ্রন্থটিতে যা উল্লেখ আছে, যাকে এটি ভাল বলছে তার বাইরে জগতে আর কিছু নেই, থাকতে পারে না, থাকলে তার থাকার অধিকার নেই। তাঁদের বিশ্বাস মানবসভ্যতায় যা কিছু ভাল বা অগ্রগতি হয়েছে তা খোদ তাঁদের ঐ বিশেষ ধর্মগ্রন্থ বা গ্রন্থগুলি থেকে বেরিয়ে এসেছে। এসব মানুষ নিজেদের অন্ধবিশ্বাস থেকে বেরিয়ে আসার উদ্যোগ নিজেরা যদি না নেন তাঁদের অগ্রাহ্য করা ছাড়া আর কী-ই বা করার আছে?

নৈতিকতার প্রশ্নটি বিরাট এবং জটিল এই কারণে যে এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমাদের শত শত বছর ধরে গড়ে ওঠা ভাল-খারাপের বোধ, সহমর্মিতার মাপকাঠি, মা-বাবা-ভাই-বোনসহ অন্যান্য আত্মীয় ও সামাজিক সম্পর্কের বিধি-নিষেধ, সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলো টিঁকে থাকার শর্ত, এক কথায় আমাদের অস্তিত্বের গোড়াটিই নৈতিক মূল্যবোধের জটিল জালের সঙ্গে অঙ্গে অঙ্গে বাঁধা। আমাদের নৈতিকতার এক বিরাট উৎস যে ধর্ম আমরা বর্তমানে পালন করছি সেটি, আরেক উৎস যে ধর্মগুলো আমাদের পূর্ব নারী-পুরুষ একসময় পালন করেছিলেন এবং যার অবশেষ আমাদের জীবনাচরণের মধ্যে রয়ে গেছে। এই নৈতিকতার মধ্যে বিজ্ঞানের মাপকঠিতে গ্রহণযোগ্য উপাদান যেমন রয়েছে তেমনি অনেককিছুই রয়েছে যার যুক্তি বিজ্ঞানের সঙ্গে মেলে না। কিন্তু এসবকিছু মিলিয়েই মানুষ নিজের সামাজিক অস্তিত্বের নিজস্ব পরিচয়টি তৈরী করেছে। যৌনতা সংক্রান্ত ভাল-মন্দের বোধ যা মূলতঃ বিপরীতকামকেন্দ্রিক, প্রায় সব সমাজের নৈতিক কাঠামোর একটা বড় অংশ জুড়ে রয়েছে। সে কাঠামোর মধ্যে সমকামী, উভকামী ও রূপান্তরকামীদের অন্তর্ভুক্ত করে নেওয়া খুবই কষ্টসাধ্য সন্দেহ নেই তা এদের সপক্ষে যতই বিজ্ঞানসম্মত যুক্তি থাক না কেন।

কিন্তু মুশকিল হচ্ছে যে বিপরীতকামকে মানুষের সমাজে জুটি বাঁধা ও পরিবার গঠনের ভিত্তি বলে ধরে নেওয়া হয়েছে সেটিই যখন কিছু মানুষের প্রকৃতিগতভাবে থাকবে না তখন তাদের কী হবে? পৃথিবীর প্রায় সব সমাজের ঐতিহ্যগত বিধান ও কাঠামোই এরকম, হয় তোমাকে এর মধ্যেই ঢুকতে হবে নয়ত তোমাকে মরতে হবে অথবা সমাজের বাইরে চলে যেতে হবে। সমাজের এই যে মানসিকতা সে কারণেই ভারত উপমহাদেশের উভলিঙ্গ বা ত্র“টিযুক্ত জনন অঙ্গ রয়েছে এমন মানুষকে আলাদা সমাজ তৈরী করতে হয়েছে যা বাংলাদেশসহ অনেক জায়গায় হিজড়া বলে পরিচিত। উভলিঙ্গ বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন মানুষের নিজস্ব গোষ্ঠী নিশ্চয়ই আর আর সমাজেও রয়েছে। সমাজের মূল ধারার কাছে অচ্ছ্যুৎ হয়ে থাকা উভলিঙ্গদের তা-ও একটা নিজের সমাজ আছে Ñ পরস্পরের সঙ্গে দুঃখ-সুখ ভাগ করে নিতে পারেন কিন্তু সমকামীরা দেখতে আর দশটা বিপরীতকামীদের মত হওয়াতে এবং আরো নানা কারণে তাঁরা সমাজের মূল ধারার সঙ্গেই মিশে থাকেন বা থাকতে বাধ্য হন।

সম্ভবতঃ সব সমাজেই এঁদের একটা বিরাট অংশ দ্বৈত জীবন যাপন করে। বিয়ে করে সংসার ধর্ম পালন করেন, বিপরীতকামীদের মতোই বাচ্চার বাবা-মা হন কিন্তু মন পড়ে থাকে মনের মানুষের কাছে। সমলিঙ্গ সামাজিকতা যাকে ইংরেজীতে বলে হোমোসোশ্যাল সে ধরনের সমাজে এঁদের পরিচয় লুকিয়ে রাখতে বেশ সুবিধা কেননা এসব সমাজ ও কোনো কোনো ক্ষেত্রে রাষ্ট্র একই লিঙ্গের মধ্যে সামাজিক মেলামেশা কঠোরভাবে আরোপ করে থাকে। কিন্তু লুকানোর ব্যবস্থা যতই পাকা হোক না কেন নিজের শারীরিক-মানসিক চাহিদার বিরুদ্ধে গিয়ে বিপরীত লিঙ্গের সঙ্গে সম্পর্ক করতে তাঁদের নিশ্চয়ই ভাল লাগে না।


এ প্রসঙ্গে সমলিঙ্গ সামাজিকতা ও সমকামিতার মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে আরেকটু কথা বলতে চাই। ইদানিং কিছু কিছু সমাজতাত্ত্বিক সামাজিক মেলামেশার দিক থেকে পৃথিবীর সমাজগুলোকে দু’টো ভাগে ভাগ করে দেখার চেষ্টা করছেন Ñ একটি বিপরীতলিঙ্গ সামাজিকতা (যবঃবৎড়ংড়পরধষ) যেখানে সমাজ বিপরীত লিঙ্গের সদস্যদের মধ্যে মেলামেশা উৎসাহিত করে অথবা একে সামাজিক অপরাধের দৃষ্টিতে দেখে না, যেখনে নারী-পুরুষ মিলিতভাবে ঘরে-বাইরে শ্রম করে। সমলিঙ্গ সামাজিকতায় হয় ঠিক উল্টোটি, সমাজ সমলিঙ্গ সামাজিক মেলামেশাকে উৎসাহিত করে ও নির্দিষ্ট ক্ষেত্রের বাইরে বিপরীত লিঙ্গের সঙ্গে সামাজিক মেলামেশাকে নিরুৎসাহিত করে, ক্ষেত্রবিশেষে কঠোর হাতে নিয়ন্ত্রণ করে, যেখানে সাধারণতঃ নারী ঘরে ও পুরুষ বাইরে শ্রম করে। যতদূর জানি এই বিভাজনটি এখনও বিশ্বের সমাজতাত্ত্বিকদের কাছে খুব বেশী স্বীকৃত হয়নি। তবে একে একটি কার্যকর বিভাজন বলে মনে হয়েছে আমার। এও মনে হয়েছে একটি সমাজ কালের ব্যবধানে সমলিঙ্গ সামাজিকতার পক্ষপাত থেকে বিপরীতলিঙ্গ সামাজিকতার দিকে যেতে পারে আবার কোনো ক্ষেত্রে এর উল্টোটিও ঘটতে পারে। এ লেখায় এ প্রসঙ্গটি তুলে আনার কারণ এই যে, যেসব সমাজে সমলিঙ্গ সামাজিকতার বিষয়টি কড়াকড়িভাবে আরোপিত হয় সেখানে সমকামী আচরণ গড়ে ওঠার ক্ষেত্র তৈরী হয় কিনা সে নিয়ে ভাবনার যথেষ্ট অবকাশ আছে।

আমাদের দেশের জেলখানাগুলোতে সমকামী আচরণের যথেষ্ট ঘটনা শোনা যায়। অন্যান্য দেশেও এর অন্যথা হওয়ার কোনো কারণ নেই। আবার যেসব সমাজে ধর্ম শিক্ষার্থী ও গুরুদের সমলিঙ্গ সামাজিকতার মধ্যে থাকার কঠোন বিধান রয়েছে সেখানেও এ ধরনের আচরণ হরহামেশা দেখা যায় বা শোনা যায় যদিও তা নিয়ে আলোচনার ওপর কঠোর ট্যাবু রয়েছে। তবে পাশ্চাত্যের ক্যাথলিক খ্রীষ্টানদের মধ্যে সে বিধিনিষেধের বেড়া কিছুটা হলেও ভাঙছে। গত কয়েক বছরে বেশ কিছু ক্যাথলিক যাজক সমকামী আচরণের অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছেন, অনেক ক্ষেত্রে সে অভিযোগ প্রমাণিতও হয়েছে। এটা মনে করার কোনো কারণ নেই এ ঘটনা ক্যাথলিক যাজকদের মধ্যেই কেবল ঘটেছে সমলিঙ্গ পরিবেশে বসবাসকারী অন্য ধর্মের গোষ্ঠীগুলোতে ঘটেনি।

এসব ক্ষেত্রে ব্যাপারটা এরকম হতে পারে, বিপরীত লিঙ্গের সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগের অভাবে ব্যক্তি নিজের জৈবিক চাহিদা মেটাতে একই লিঙ্গের ব্যক্তির সঙ্গে যৌন সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। আবার এমনও হতে পারে একই লিঙ্গের মানুষের সঙ্গে থাকতে গিয়ে কারো কারো সঙ্গে যে গভীর মানসিক বন্ধন তৈরী হয় তা শারীরিক সম্পর্কের দিকে মোড় নেয়। এও হতে পারে, এ ধরনের পরিবেশে যারা একই লিঙ্গের সঙ্গে শারীরিক-মানসিক সম্পর্ক তৈরী করছে তারা বিপরীতলিঙ্গ সামাজিকতার মধ্যে থাকলেও তা-ই করত। এখানে তাদের বেশী করে চোখে পড়ছে কেননা তার গোষ্ঠীর সংখ্যাগরিষ্ঠ বিপরীতকামী অংশটি বিপরীত লিঙ্গের সঙ্গ থেকে বঞ্চিত।

আবার সমকামিতা বিষয়ে গবেষকদের মধ্যে এ মতটিও যথেষ্ট জোরেশোরে বিদ্যমান যে একটা বিরাট অংশের মানুষের মধ্যে বিপরীতকাম ও সমকাম একসঙ্গে অবস্থান করে যা পরিবেশের পরিপ্রেক্ষিতে প্রকাশিত বা বিকশিত হয়। তাঁরা বলছেন মানব সমাজের একটি অংশ পুরোপুরি বিপরীতগামী এবং আরেকটি অংশ পুরোপুরি সমকামী আর এ দু’য়ের মাঝামাঝি অংশে অবস্থান করছে তারা যাদের উভয়দিকে ঝোঁক রয়েছে। মতটিকে গ্রহণ করলে আমাদের মনে হতেই পারে যেসব রাষ্ট্র বা সমাজ বিপরীতলিঙ্গ সামাজিকতাকে কঠোর হাতে নিয়ন্ত্রণ করে এবং একইসঙ্গে সমকামী সম্পর্কের জন্য কঠোর শাস্তির বিধান রেখেছে তারা প্রকৃতপক্ষে একটি স্ববিরোধী ক্ষেত্র তৈরী করেছে। মানুষের মধ্যে সমকামী আচরণ নিরুৎসাহিত করতে হলে তাদের বিপরীতলিঙ্গ সামাজিকতার ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে হতো।


যৌন সংখ্যালঘুত্ব এমন এক স্পর্শকাতর প্রশ্ন যা সরাসরি আমাদের অস্তিত্বের সঙ্গে জড়িত। হঠাৎ কোনোদিন যদি জানতে হয় গর্ভের সন্তান, ভাই, বোন অথবা ঘনিষ্ঠতম বন্ধু সমকামী, উভকামী অথবা রূপান্তরকামী তখন তার অবর্ণনীয় আঘাত যিনি না সয়েছেন তাঁর পক্ষে কল্পনা করাও অসম্ভব। সমকামীদের ভাষ্য থেকে জেনেছি শুধু যে নিজেকে রক্ষা করতেই নিজেদের পরিচয় তাঁরা লুকিয়ে রাখেন তা না বরং বিষয়টি জানাজানি হলে পরিবার, বন্ধু-স্বজনের জন্য তা প্রচণ্ড আঘাত বয়ে আনবে, তাঁদের জীবন এলোমেলো করে দেবে, এ আশঙ্কা থেকেও তা প্রকাশ করেন না।

কিন্তু জুটি বাঁধার ক্ষেত্রে জৈবিক সম্পর্কের ভিত্তিটি যদি আমাদের স্বীকার করে নিতে হয় তবে যত রূঢ় বাস্তবই হোক না কেন সমকামী, উভকামী এবং রূপান্তরকামীদেরও পছন্দের ব্যক্তির সঙ্গে জুটি বাঁধা এবং একই ধরনের মানুষের সঙ্গে সামাজিক সংগঠন করার অধিকার স্বীকার করা ছাড়া তো উপায় থাকে না। সেক্ষেত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠের নীতিকাঠামোর সীমা আরো প্রসারিত করতে হবে। এ প্রশ্ন প্রকৃতপক্ষে যৌন-পছন্দ নিরপেক্ষভাবে মানুষের ব্যক্তি, সামাজিক ও রাজনৈতিক অধিকার স্বীকার করা না করার প্রশ্ন। আগেই বলেছি পাশ্চাত্যের বিভিন্ন দেশে জুটি নির্বাচনের ক্ষেত্রে এ অধিকার অনেকটা স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে। অন্যান্য দেশেও এ নিয়ে চিন্তা-ভাবনা শুরু হয়েছে। পাকিস্তানের মতো দেশ যেখানে ইসলাম রক্ষার নামে নানা ধরনের আইন প্রচলিত আছে এবং যেখানে উঁচু মাত্রার সাম্প্রদায়িক পীড়ন বিদ্যমান সেখানেও উচ্চ আদালত কয়েক বছর আগে রায় দিয়েছে লিঙ্গ-পরিচয়ের কারণে উভলিঙ্গদের ক্ষেত্রে কোনো বৈষম্য করা যাবে না। এ বার্তা অন্য যৌন সংখ্যালঘুদের জন্য ইতিবাচক নিশ্চয়ই ।

১৯শে জুনের জাতিসঙ্ঘ সভায় বাংলাদেশের ভেটো এদেশে যৌন সংখ্যালঘুদের নিয়ে কাজ করছে যে গুটিকয়েক সংগঠন স্বভাবতই তাদের হতাশ করেছে। এ প্রশ্নে বাংলাদেশের অবস্থান যদি ইতিবাচক হতো তবে রক্ষণশীল পক্ষ বিশেষ করে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনগুলো নিশ্চয়ই সরকারের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ত। অন্যদিক থেকে সমকামিতা বিষয়ক কঠোর শাস্তির বিধান তুলে দেওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি হতো। যৌন সংখ্যালঘু দলগুলো আরো কিছুটা প্রকাশ্যে, আরো কিছুটা স্বস্তিতে কাজ করতে পারত, যৌনতা সংক্রান্ত জটিল নৈতিক প্রশ্নগুলো নিয়ে আরো কিছুটা নাড়াচাড়ার সুযোগ সৃষ্টি হতো। জাতিসঙ্ঘে বাংলাদেশের এই অবস্থান যৌন সংখ্যালঘুদের প্রশ্নগুলো আরো অনেকদিন ধামাচাপা দিয়ে রাখার সুযোগ তৈরী করে দিলো।

জুলাই ২০১১
     
Untitled Document

পুঁতিফুল
Total Visitor: 709204
সাপলুডু মূলপাতা | মতামত Contact : shapludu@gmail.com
Copyright © Life Bangladesh Developed and Maintained By :