Untitled Document
শ্রাবণ সংখ্যা ১৪১৮
মূলপাতা শিরোনাম বটতলা পঞ্জিকা প্রদর্শনী
আওয়ামী লীগের গাড়ি
- শুভ কিবরিয়া


মধ্যজুনের ঘটনা। ঢাকা শহরসহ সারাদেশে গণপরিবহনে ভাড়া বেড়েছে। গণপরিবহনে ভাড়া বাড়ার উত্তাপ স্বভাবতই ঢাকা মহানগরীতে বেশি। এখানে দিনে প্রায় ৭৫ লাখ গণপরিবহন যাতায়াত করে। সিএনজির দাম সরকার ১ লাফে প্রতি ঘনমিটারে প্রায় নয় টাকা বাড়ায়। এর ফলশ্রুতিতে দ্রুতই গণপরিবহনের মালিকরা তর তর করে ভাড়া বাড়াতে থাকে। ভাড়া বাড়ানো নিয়ে বাসশ্রমিকদের সঙ্গে যাত্রীদের বচসা, হাতাহাতি চলল কদিন। আপাতত তা থিতু। মানুষ সরকারের এ জুলুম মেনে নিয়েছে। অসংগঠিত মানুষ দেখেছে তাদের স্বার্থ দেখার কেউ নেই। কেননা বাস মালিকদের মধ্যে বসে আছে যে খোদ সরকার। বাস শ্রমিকদের নেতা খোদ সরকারের মন্ত্রী। বাসের ভাড়া যারা অযৌক্তিকভাবেই বাড়ায় তাদের মধ্যেও আছে সরকার। ভাড়া যারা অন্যায়ভাবে বাড়ায়, অনায্য মুনাফা করে, গণমানুষকে কষ্ট দেয় তাদের মধ্যেই সরকার ঢুকে গেছে। একপাশে সরে গেছে জনগণ। সুতরাং সবল সরকার আর প্রবল সংগঠিত গণপরিবহন মালিক শ্রমিকদের সঙ্গে দুর্বল অসংগঠিত জনতার লড়াই চলে না। ক্ষোভ, রাগ, দুঃখ, যন্ত্রণা পুষে মনে মনে সরকারের চৌদ্দগুষ্ঠি উদ্ধার করা ছাড়া জনগণের আর উপায় নেই।
আমি নিজেও সেই উপায়হীন জনগণের একজন। প্রতিদিন মিরপুর ১১ নম্বর বাসস্ট্যান্ড থেকে মতিঝিলগামী বাসের যাত্রী। এই রুটে সিটিং যেসব গাড়ি তুলনামূলক ভালোভাবে চলে তাদের ভাড়া এতদিন ছিল পল্লবী-মতিঝিল ১৮ টাকা। এখন বেড়ে তা দাঁড়িয়েছে ২৩ টাকায়। আমিও মেনে নিয়েছি তা। বুঝেছি সরকার চালাতে সরকারের অনেক খরচ। সরকারের লোকজনের খরচ, দলের লোকজনের খরচ! সরকার কিংবা সরকারি দল যাকেই বা কোথায়? জনগণের পকেটে হাত দেয়া ছাড়া তো আর উপায় নেই।
যাকগে ধান ভাঙতে শীবের গীত গাওয়া শুরু করেছি। এবার মূল কথায় আসি। পল্লবী-মিরপুর রোডে যেসব গণপরিবহন চলে তাতে নতুন সংযোজন হয়েছে এনা পরিবহন নামের নতুন একটি গাড়ীবহর। বর্তমানে সরকার ক্ষমতায় আসার পর এই পরিবহনটি পল্লবী মতিঝিল রুটে যুক্ত হয়েছে। প্রথম দু’সপ্তাহ এই গাড়িটির আসন ব্যবস্থা যা ছিল, দু’সপ্তাহে তাতে ব্যাপক পরিবর্তন আসে। ৩২-৩৪ সিটের গাড়ির আসন পুনঃস্থাপিত হয়ে এখন তাতে ৪০ Ñ৪২ সিটের ব্যবস্থা হয়েছে। এতে যাত্রী বেশি নেয়া যায়, ভাড়া আসে বেশি। কিন্তু বসার জায়গা এতই সংকুচিত হয়েছে যে, এখানে বসলে হাঁটু পেটের মধ্যে নিয়ে বসতে হয়। রিমান্ডে বসার মতো যাত্রীদের এই কষ্ট মেনে নিয়েই চলতে হয়। এই পরিবহনের রুট পারমিটে কত সিটের অনুমতি আছে, কত সিট সে বাড়ালো, দুই সিটের মধ্যে কতটুকু দূরত্ব রাখা নিয়মÑ এসব মানছে না তারা। এসব দেখারও কেউ নেই বাংলাদেশে!
কেননা এনা পরিবহনের দৃশ্যমান মালিক খন্দকার এনায়েতুল্লাহ সাহেব সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির নেতা। বর্তমান সরকারের সঙ্গে তার বড় দহরম মহরম। লোকে বলে সরকারের একজন বড় মন্ত্রী, (শ্রমিক নেতা হিসেবে যার খ্যাতি) এই বাসের পেছন মালিকদেরও একজন। এসব শোনা কথা। তাই ধরে নিচ্ছি এনায়েত সাহেবই এই গাড়ির দৃশ্যমান মালিক। গত কয়েকটি হরতালে, হরতালের আগের দিন সরকারের প্রতিনিধিদের সঙ্গে মিটিং করে বাস চালানোর প্রত্যয়দীপ্ত ঘোষণা দিয়ে এনায়েত সাহেব মিডিয়ায় কথা বলেন। সুদর্শন এই ভদ্রলোক এক সময় বিএনপি নেতা মির্জা আব্বাসের ডান হাত ছিলেন বলে বাজারে রটনা আছে। সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে রং পরিবর্তন করে আওয়ামী লীগ সেজেছেন বলে এনায়েতুল্লাহ বিরোধীদের প্রচারণাও আছে।
এত কিছু বলার উদ্দেশ্যে একটাই, এনা পরিবহনের মালিক যথেষ্ট প্রভাবশালী। এ সরকারের গুডবুকে আছেন তিনি। তা তার অতীত রাজনৈতিক পরিচয় যাই-ই হোক না কেন।

২.
এনায়েত সাহেবের এনা-পরিবহনে চড়ে মিরপুর ১১ থেকে মতিঝিলের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিয়েছি। গাড়ির নাম্বার ঢাকা মেট্রো-ব-১১৪৮৪০। দুপুর ১১.২৫ মিনিট। জুন মাসের  দ্বিতীয় সপ্তাহের কোনো একদিন (তারিখটা নিয়ে রেখেছিলাম, খুঁজে পাচ্ছি না)। ১২.১৫/১২.১০ নাগাদ গাড়িটা এসে পৌঁছাল শেওড়াপাড়া বাসস্ট্যান্ডের কাছে। প্রচণ্ড জ্যাম। গরমও ভীষণ। গাড়ির ড্রাইভার গায়ের জামা খুলে ফেলেছে। উদাম গায়ের এ গাড়ির ড্রাইভারের বয়স আনুমানিক ২৫-২৬। তরুণটির খেয়াল নেই, এ গাড়িতে নারী, শিশু, নানান বয়সী মানুষ আছে। এভাবে উদোম শরীরে গাড়ি চালানো অসভ্যতা। কিন্তু এনা পরিবহনের গাড়ির ড্রাইভার বলে কথা! মালিকের মতো ড্রাইভাররাও ক্ষমতাবান। কাকে কেয়ার করবে? যাত্রীদের... হা হা, ওদের আবার কেয়ার করতে হবে কেন?

৩.
শেওড়াপাড়া বাসস্ট্যান্ড ছাড়াতেই হঠাৎ দেখি ট্রাফিক পুলিশ গাড়িটাকে থামাচ্ছে। আমাকে অবাক করে দিয়ে সার্জেন্ট পুলিশরা গাড়িকে সত্যি সত্যিই রাস্তার এক পাশে থামিয়ে দিল। এনা পরিবহনের ঢাকা মেট্রো-ব-১১৪৮৪০ গাড়িটি সত্যি সত্যিই পুলিশের কথায় থেমে গেল। পুলিশের বুকের পাটা আছে তো!!
গাড়ির কণ্ট্রাক্টর বা ভাড়া কাটছিল যে তরুণটি সে হাসতে হাসতে গাড়ি থেকে নেমে সার্জেন্টদের কাছে গেল। ড্রাইভার তরুণটিরও খেয়াল হলো, গায়ের জামাটা পরা দরকার। হাজার হোক পুলিশ তো! তাদের সঙ্গে অসভ্যতা না করাই ভালো। তাকিয়ে দেখছি, পুলিশ সার্জেন্ট কাগজপত্র চাইলেন। একটা কেসও লিখছেন।  মিনিট পনের ধরে পুলিশÑ গাড়ির কন্ট্রাক্টর বাহাস চলল। জনাচল্লিশ যাত্রী আমরা বসে বসে এসব দেখছি। এরপর আবার গাড়ি চলা শুরু হলো। তরুণ কণ্ট্রাক্টরটিকে কাছে ডেকে জানতে চাইলাম কি হলো। তরুণটি বেশ রসিক। বলল, কেস লিখল। জিজ্ঞেস করলাম কেন? বলল, কোনো কাগজ নাই তো? কাগজ নাই কেন, জিজ্ঞেস করতেই বলল, আওয়ামী লীগের গাড়ি কাগজ লাগে না। ইনসুরেন্স, রুট পারমিট কিছুই নাই। লাগব না। আগামী দুই বছর আলীগ ক্ষমতায় থাকাকালীন লাগবে না। সরকার দলীয় মালিকের আবার গাড়ির কাগজ! কি কন! তাহলে পুলিশ ধরল কেন, কেস দিল কেন? তরুণটি বেশ রসিয়ে রসিয়ে বলতে শুরু করল, পুলিশগো দোষ কি। ওগোও তো চলতে হইব। মাসের টাকাটা ঠিকমতো দেয় নাই বোধ হয়। এসব কিছু না। কেস ফেসে কিছু হইব না। মালিক বুঝাব। পুলিশের সেলামিটা ঠিক মতো দিয়া দিলেই হইব। তার পরিস্কার বক্তব্য অন্তত আগামী দুই বছর আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকাকালীন এনায়েত সাহেবের গাড়ির কোনো কাগজ লাগবে না।

৪.
এনায়েত সাহেব সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির নেতা। ক্ষমতাসীন সরকারের দারুণ আস্থাভাজন। সরকার দলীয় এমপি মন্ত্রীদের সঙ্গে তার নিত্য উঠাবসা। পুলিশ- সরকার সব মহলেই তার দহরম মহরম। সরকারের রাস্তায় গাড়ি চালাতে আবার তার এতসব কাগজ লাগবে কেন? এটা কি মগের মুল্লুক, তাদের সরকারের আমলে, মাসোহারা পাওয়া তাদেরই পুলিশের আমলে তাদের গাড়ির সব কাগজ লাগবে?
প্রশ্নটি নিজেকে করেই বেকুব বনে গেলাম।
জনগণ, আমরা আসলে বেকুব।
সরকার, তার দল, দলের লোকজনের জন্য আইন, নিয়ম কেন?
নিয়ম তো থাকব আমজনতার জন্য!!
মফিজ পাাবলিকের জন্য থাকবে আইন, থাকবে সুশাসন, থাকবে বিআরটিএ, থাকবে ঢাকা মহানগর পুলিশ থাকবে আদালত, থাকবে ভ্রাম্যমান আদালত...!!
সরকারের লোকদের জন্য এসব আবার কি!!!
     
Untitled Document

পুঁতিফুল
Total Visitor: 708676
সাপলুডু মূলপাতা | মতামত Contact : shapludu@gmail.com
Copyright © Life Bangladesh Developed and Maintained By :