Untitled Document
শ্রাবণ সংখ্যা ১৪১৮
মূলপাতা শিরোনাম বটতলা পঞ্জিকা প্রদর্শনী
‘টেকা জমাইতেছি, বিদেশ যামু
- আফরোজা সোমা





পাখির ডাকে সূর্য সবে জাগে। গাছের পাতায় নেচে উঠে রোদের প্রথম আভা। ঢাকা শহরের রাস্তাগুলোর চোখেও তখন ঘুম না ভাঙার রেশ।  সেই সময়- সূর্য যখন জাগে, পাখি যখন জাগে- জেগে উঠে ছিমছাম গড়নের শ্যমলা বরন কিশোর।
এক মাথা কালো চুল, মুখ ভরা লাজুক হাসি’র এই ছেলেটি শিপন; শিপন দাস।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শামসুন্নাহার হলের মূল ফটকের পাশেই তার কর্মস্থল। গত কয়েক বছর ধরে এই ফটকের পাশেই তাকে দেখি। জুতো সেলাই করে। ভোর সাতটা বাজতে না বাজতেই এখানে হাজির হয় সে। থাকে সন্ধ্যা ছ’টা কি সাতটা অব্দি। শিপন, যার দিন শুরু হয় পাখির ডাকে, সূর্য জাগার সময়। সূর্য অস্ত গেলেই যার কাজে ছুটি, কথা হয় তার সাথে-‘‘ ঘুম থেইক্যা উইঠ্যা তো পইলা হাত-পাও-মুখ ধুই। তারপরে রান্দা-বাড়া কইরা খাই। তার পরে দুপুরের খাওন সাথে লইয়া কাজে আইয়া পড়ি। আগে অবশ্য কাজের মহিলা আসিলো। সেই রান্তো। কিন্তু মহিলা বেশি তেল দিয়া রান্দে। অতো তেল খাইয়া গেস্টিক (গ্যাস্ট্রিক) অইয়া গেসে। হেল্লিগ্যা মহিলারে বাদ দিয়া অহন নিজেরাই রান্দি।’’ দিন শুরু হওয়ার কথা এভাবেই জানায় শিপন।

সে দিন সন্ধ্যার ঠিক আগ মুগূর্তে কথা হচ্ছিলো শিপনের সাথে। কবে, কোত্থেকে এ শহরে এসেছে সে? শিপন বলে-
‘‘ যেই সময় আমার হাফপেন (হাফপ্যান্ট) পড়ার বয়স, এই সময় ঢাকা আইসি আমি। সেইটাও মনে করেন যে, আজকে প্রায় আট দশ বচ্ছর। ’’

শিপনের বাড়ি ব্রাহ্মনবাড়িয়া। বাবা ছিলেন ফেরিওয়ালা। তিনি আজ নেই। মা আছেন। মায়ের নাম কাজলী দাস। ব্রাহ্মনবাড়িয়া সদরের বাদুগর গ্রামে মা থাকে, একা একা। কারণ শিপনের ছোট এক ভাই সে-ও এখন ঢাকায়। কাজ করে পুরান ঢাকায় এক জুতার কারখানায়। আর আছে এক বোন, তারও বিয়ে হয়ে গেছে। মা তাই একা। মা একা থাকলেও তাকে ঢাকা আনা হয় না। আবার শিপনও বাড়িতে খুব একটা যায় না। বছরে-ছয়মাসে কোনো একবার, এক দিনের জন্য যায় শুধু। বাড়ি যেতে শিপনের ভালো লাগে না। সেখানে একা একা লাগে। ফাঁকা ফাঁকা  লাগে। নিজে না গেলেও প্রতি মাসেই মায়ের জন্য খরচ পাঠায় শিপন। কোনো মাসে এক হাজার, কখনো দেড় হাজার। আবার পূজো-আর্চ্যায় শাড়ি-ও পাঠায় মায়ের জন্য। 

আরো অনেক কথাই হয় ওর সাথে। জানতে চাই, বয়স কতো হলো? উত্তরে মাথা চুলকায় আর লাজুক হাসে কিছুক্ষণ। তারপর বলে, ‘‘এইটা তো সঠিক জানি না দিদি!’’ আমি বলি, ‘‘কেন? মা বলে নাই?’’ সে বলে, ‘‘অতো কিছু মনে নাই দিদি!’’ কিছক্ষণ পর আবার সন্দেহ ভরা স্বরে সেই বলে, ‘‘অ্যা...মমম... বয়স কতো অইবো! মনে অয় ২২-২৪ বসর।’’
পাশেই বসে ছিলো শিপনের বাল্যবন্ধু অমল দাস। অমল কাজ করে জুতার কারখানায়। শিপনের কাছে এসেছে কারণ এখন দ’ুজনে একসাথে বাসায় ফিরবে। কিন্তু শিপন যখন নিজের বয়স বাড়িয়ে এক্কেবারে বাইশ-চব্বিশের ঘরে নিয়ে গেলো, তখন শিপনের দিকে একটা ধমক ছুঁড়ে দেয় সে! ‘‘অই বেডা, এইডা কী কস! তুই তো আমার বয়সী। তর বয়স বাইশ অইল কেমনে?’’ বন্ধুর এমন কথায় শিপন যেনো লাজে আরো রাঙা হয়ে যায়। আরো কুঁকড়ে যেতে চায়। সেই অবস্থায়ই বলে, ‘তে তুই ক, কতো অইবো বয়স।’ অমল বলে, ‘‘এই বড়জোড় ষোল্লো কি সতরো।  

ষোলো কি সতেরো বা হয়তো আঠারো বছরের শিপন। জুতোর কাজ করে। সকাল থেকে সন্ধে অব্দি বসে থাকে শামসুন্নাহার হলের গেটে। দীর্ঘদিন এক জায়গায় কাজ করতে করতে হলের অনেক আপুর সাথে খুব স্নেহের সম্পর্ক তৈরি হয়। তাই অনেক সময় দেখা যায়, ছোট্টো কোনো টুকি টাকি কাজ করে দেয়ার পর শিপন টাকা নেয় না , নিতে চায় না। তখন অনেক সময় সেই সব আপুরা জোড় করে টাকা দিয়ে যায়। আবার ঠিক এর বিপরীতটাও ঘটে। রাজনীতি করে এমন দু’একজন মেয়ে কাজ করিয়ে নেয়, কিন্তু টাকা দিকে চায় না। খারাপ ব্যবহার করে। এই সব দ’ুএকটা ঘটনা ছাড়া এই পেশাটা শিপনের ভালোই লাগে। সাড়াদিন নিজের মতো একা এক থাকা, কাজ করা এই ব্যাপারটা বেশ ভালোই লাগে শিপনের । তবে এখনেই শেষ নয়। এই পেশাতেই শিপন কাটাবে না সারা জীবন। তাহলে কী করবে সে? ভবিষ্যতে কী করার ইচ্ছে? খুব-ই মৃদু স্বরে, কিন্তু ভীষন স্বপ্নময় গলায় শিপন বলে-
- দিদি, দেশের বাইরে যামু। টেকা জমাইতেছি।
- কোন দেশে যাইবা তুমি?
-           মালয়েশিয়া
-           মালয়েশিয়া কেন?
-           আমরার গেরামের একজন মালয়েশিয়া গেসে। গিয়া বেশ উন্নতি করছে। আমিও তাই মালয়েশিয়া যাইতে চাই।

শিপন টাকা জমাচ্ছে। মালয়েশিয়া যাবে। অমল ছাড়া শিপনের আর বিশেষ কোনো বন্ধু-বান্ধব নাই। নাটক সিনেমা-ও কখনো দেখতে যায় না সে। সকালে ঘুম থেকে উঠে নিজেই রাঁধে-বাড়ে খায়। তারপর কাজে আসে। সারা দিন কাজ করে আবার ঘরে ফিরে পুনরায় রান্না-বান্না-খাওয়া আর ঘুম। তবে দিনের যাবতীয় কাজের মাঝে আরেকটা কাজ করে শিপন। সেটা হলো গান শোনা। জুতো সেলাই করতে করতে কিংবা ভাত রান্না করতে করতে অথবা তরকারী কুটতে কুটতে গান শোনে সে। বেশির ভাগই হলো মনির খানের গান। পল্লীগীতিও শোনে কিছু। আর কিছু মমতাজের গান। এর বাইরে অন্য গান সে শোনে না, শুনতে পছন্দও করে না। বিরহী গানগুলো শিপনের  বড়ো ভালো লাগে। শিপন বলে, এই গানগুলো শুনলে মনটা জানি কেমন হইয়া যায়। অবশ্য মাইনষে কয় যে, ছ্যাক যারা খায় হেরা বুলে বিরহী গান পছন্দ করে।  আমি কুনো ছ্যাক-ট্যাক খাই নাই।  কিন্তু এই গানগুলো ভালো লাগে।’’ এইটুকু বলে লাজে সে চোখ তুলে তাকায় না। তবে মিটি মিট হেসে আরো যোগ কওে, ‘‘আমি সুখি মানুষ। আমার কোনো দু:খ নাই। আমার খালি এখন একটাই স্বপ্ন আছে। দেশের বাইরে যাইতে চাই। মালয়েশিয়া। ’’

আমারা কথা বলতে বলতেই সন্ধ্যা ঘন হয়ে এসেছে। কথা বলতে বলতেই শিপন গুছিয়ে নিয়েছে জুতোর কালির বিবিধ পট, ছোটো ছোটো হাতুরি, লোহা, বাইরে বের করে রাখা ছেড়া-কাঁটা চামরার টুকরো। প্রায় সাতটা বেজে গেছে। এখন বাসায় যেয়ে রাঁন্না-গোসল-খাওয়া সব করতে হবে। তারপর ঘুম। তারপর আবার কাজ। শিপন টাকা জমাচ্ছে।  মালয়েশিয়া যাবে।
     
Untitled Document

পুঁতিফুল
Total Visitor: 709298
সাপলুডু মূলপাতা | মতামত Contact : shapludu@gmail.com
Copyright © Life Bangladesh Developed and Maintained By :