Untitled Document
শ্রাবণ সংখ্যা ১৪১৮
মূলপাতা শিরোনাম বটতলা পঞ্জিকা প্রদর্শনী
মরগাঙ্গির শেষ বাইচ
- মাসুদুর রহমান




আমাদের নদীতে এখন জল নেই। সে এখন ক্রিকেট মাঠ। নদীর অন্তর রেখা খুব চমৎকার ক্রিকেট পিচ। নৌকা বাঁধার বাঁেশর খুটি গুলো অনেক দিন আগেই স্ট্যাম্প হয়ে দাড়িয়ে পড়েছে সটান। ভাঙ্গা বাইচের নৌকার বৈঠায় টেডুলকারের স্টিকার। সেই বৈঠার ব্যাট হাতে দাড়িয়ে গেছে পরান। জীবন বল হাতে দৌড়ে আসছে। পরান চালিয়েছে বৈঠা। উইকেট কিপার বিল্লার হাত গলে উজানে গেছে বল, সেন বাড়ির ঘাটের সীমানা পেরিয়ে। বিনা দৌড়ে পরানের চার। জীবনের দ্বিতীয় বল, পরানের ব্যাটে পালের হাওয়া। বল গড়িয়ে একটু ঊর্ধ্বমুখে উঠে নদীর শুষ্ক তটরেখা ছুয়ে আবার গড়িয়ে নেমে আসে। আর একটা চার পরানের। সাঁকোর মতো নদীর উপর ঝুলে পড়া বট গাছে পরানের আর সব ব্যাটস ম্যানরা। সেখান থেকে উল্লাসে শিকড় বেয়ে নদীতে ঝাপ দেয় মাহাবুব। হেইয়ো বলে চিৎকার করে গাছের ডাল ধরে ঝুলে পড়ে অন্যরা। মাহাবুব শিকড় বেয়ে গাছে উঠতে উঠতে বোল ধবে - এ সামাল সামাল সামাল সামাল
অন্যরা - হেইয়ো
এাহবুব - এ সামাল সামাল সামাল সামাল
অন্যরা - হেইয়ো
জীবনের পরের বল ভাটি থেকে মহাঘুর্ণীর মতো ছুটে এসে পরানের বাশের স্ট্যাম্প ভেঙ্গে একেবারে সর্বশান্ত করে দিল।

বোয়াল মাছের মতো জীবন শূন্যে লাফ দেয়। তারপর ফড়িয়ের মতো পাখা মেলে ঢেউয়ের মতো এক দৌড়। তটরেখায় দাড়িয়ে থাকা জীবনের অন্যান্য ফিল্ডাররা গড়াতে গড়াতে নেমে আসে পিচের উপর। ওরা তখন এক সাথে বাইচের নৌকা চালায়।

পরান এখন ঝুলে আছে শিকড়ে। বট বৃক্ষ থেকে এবার খসে পড়ে মাহবুব। ব্যাট হাতে নদীকে কুর্নিশ করে নির্ভয়ে নেমে আসে অন্তর রেখায়।

এবার ও জীবনের হাতে বল। হাতের মুঠোয় বলটাকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে নামজাদা বলারের ভঙ্গিতে হাটি হাটি করে দৌড়ে আসে জীবন। মাহাবুব একটু এগিয়ে এসে ব্যাট করে। যেন হোগলার বন থেকে ক্ষিপ্র বেগে উড়ে গেল একট চড়ই। এবং চড়ের ছনের বনে উধাও।

কয়েক জন ছনের বনে বল খুঁজছে। ফিল্ডার ইদ্রিস খুঁজে পায় একটা ঘুড়ি। ঘুড়িটাকে দু’হাতে ধরে আনন্দে আত্মহারা হয়ে যায় ইদ্রিস। এবার হাতের মুঠোয় সুতোটাকে ধরে এক দৌড় দেয়। লিটন বলটাকে খুঁজে পেয়ে ইদ্রিসের ঘুড়ির দিকে ছুড়ে মারে। ইদ্রিস ঘুড়িটাকে গুটিয়ে রেখে আবার এসে ফিল্ডং করতে দাঁড়ায়।

গঞ্জ থেকে ভ্যান নিয়ে ফিরছে রশিদ। সেন বাড়ির ঘাট পেরিয়েই সে টানা বেল বাজাতে থাকে। এবার এক সাথে সমস্ত ব্যাটস ম্যান এবং ফিল্ডাররা নদীর মাঝখানে জড়ো হয়। তারা রশিদকে একটু উচু দিয়ে যেতে বলে।

রশিদ ওদেরকে ভ্যানটাকে একটু ঠেলা দিয়ে পিচটকে পার করে দিতে বলে। এবার সবাই রশিদের মালামাল ভর্তি ভ্যানটাকে ঠেলা দিচ্ছে। বোল ধরছে মাহাবুব –
এ মার ঠেলা, -------- হেইয়ো
ধাক্কা মারো --------- হেইয়ো
ঘুরাইয়া দাও -------- হেইয়ো
নজেল মারো -------- হেইয়ো
প্যান্ডেল মারো ------- হেইয়ো
চইলা গেছে ---------- হেইয়ো
উইড়া যাইব --------- হেইয়ো

ক্রিকেট পিচ ছাড়িয়ে অনেক দূর চলে এসেছে সবাই। সেদিকে কারো খেয়াল নেই। বোলের জোশ এসে গেছে সবার শরীরে। এই সময়ে রশিদের ভ্যানে যেন পালের হাওয়া লেগেছে - ভাটিয়ালী মনে জেগেছে ঢেউয়ের দোলা ---------
রশিদ গান ধরে ------ ‘মাঝি বাইয়া যাওরে অকুলো দরিয়ার মাঝে আমার ভাঙ্গা নাওরে মাঝি বাইয়া যাওরে।’

এইটুকু গাওয়ার পরেই সবাই দাড়িয়ে পড়ে। কামরুল রশিদকে মজা করে গালি দিয়ে বলে ------- ‘হালার পুতে চালায় ভ্যান, ভাব খানা যেন জোবার নৌকায় বাদাম দিয়ে যায়।’

সবাই হো হো কইরা হাইসা ওঠে। রশিদও হঠাৎ ব্রেক কষে দাড়িয়ে যায়।

বংশ পরম পরায় রশিদরা এই নদীর মাঝি ছিল। নদী শুকিয়ে গেছে কিন্তু রক্তে এখনো ঢেউয়ের দোলা। পাঁড় ভাঙ্গার গুরুম গুরুম শব্দে আর পাহাড় সমান ঢেউয়ের মুখে বদর বদর আর গাজী গাজী ডাকে বৈঠার ঘায়ে ঘায়ে বিজলী জ্বলে। পাহাড় সমান ঢেউ ভাঙ্গে পুর্ব পুরুষের নৌকা গুলি। মুহুর্তের মধ্যে এ দৃশ্যটি ভেসে ওঠে চোখের পর্দায়। ও যেন বাবার কণ্ঠ স্বর শুনতে পেল --- ‘বৈঠা চালা রশিদ, উইড়া যাওন চাই বাপজান।’
------ গাজী ----------গাজী -----------

রশিদের কন্ঠে শব্দ দুটি প্রতিধ্বনিত হয়। খেলোয়াড়দের কোলাহল পিছে ফেলে গাজী গাজী বলে প্যাডেল চালায় রশিদ। যেন জলের বুকে তিন চাকার এক এৈয়ী ঘুর্ণি। যেন উচু নিচু ঢেউয়ের উপর দিয়ে ছুটে যাচ্ছে তিন তক্তার নৌকা। হঠাৎ আঙ্গুলের চাপে বেল বেজে ওঠে। ঘোর কাটে রশিদের। যেন মুুহুর্তে সাগর শুকিয়ে এক তপ্ত মরুভুমির বুকে উটের পিঠে এক ক্লান্ত মরু যাত্রীর মতো পিপাসায় ওষ্ঠাগত প্রাণ।

এমন সময় রশিদের চোখে পড়ে পাড়ে ওল্টো করে রাখা ওর নৌকা খানি। বর্ষার ভরা জলের জন্য অপেক্ষা করছে ছ’মাস ধরে। ঘামে ভেজা শরীর বেয়ে ক’ফোটা চোখের জল ঝরে পড়লো মরা নদীর শুকনো বুকে।

এক জন চাষী, জেলে কিংবা মাঝির নদীর জন্য এই কান্না যারা স্বচক্ষে দেখেনি তারা হয়তো বিশ্বাস করবে না। কিন্তু রশিদের বাপ এখনো বেচে আছে। নব্বইয়ের কাছাকাছি বয়সেও সপ্তাহে দু’তিন বার এই নদীর পাড়ে বটের শিকড়ে কম্পমান দেহ নিয়ে বসে থাকে। অবাক বিস্ময়ে দেখে সেই অকুল দরীয়ার বুকে চড় আর চড়।

পথচারীরা কুশল জিজ্ঞেস করলে বলে -------- ‘আর কতো বাচুম ------ কত বড় নদী মইরা গেছে, মুই এহোনো অর কুলে বইসা বাতাস টানতাছি।’ তা মুই মরলে আর কি আসে যায়, নদী মরলে বাচন দায় আছে। এই কয় বছরে চর লইয়া কত খুন জখম। তা জমি দিয়া কি হইবো? নদী না থাকলে ফসল ফলবো?

তারপর বিড় বিড় করে কথা বলতে থাকে বৃদ্ধ রহমত মাঝি। নদীর তুফান দেইখা পরান কাইপা উঠতো। ডরে গাজী গাজী হাঁক পাড়তাম। আর কত সুরের গান চলতো। কই গেল হেই সব মাঝিরা, নাও ও গেছে গানও গেছে, এহোন মরগাঙ্গির চরে কাইজ্জা চলে কাইজ্জা।


রশিদ ভ্যানটাকে টেনে রাস্তার উপরে তোলে। রহমত মাঝি ডাক পাওে ---- কেডা রশিদ
হ-বাপজান। কহন আইছেন।
তা মেলাসময়। গঞ্জে গেলি। তা মোওে একটু কইতি। একটা গামছা আনানো লাগতো।
গামছা ্আনছি – বাপজান
কই দেহাতো
রশিদ গামছাটা বের করে বাবার হাতে দেয়।
বা! বেশ বেশ জব্বর হইছে ।
আব্বা- ‘মুই গ্রাম ছাড়–ম।’

বৃদ্ধ হাঁক পাড়ে ------ ‘কি কইস?’
রশিদ ---- ‘ভ্যান চালাইতে ভাল লাগে না। নৌকাডাও চরে হুগাইয়া ভাঙ্গতেছে। নাওডারে লইয়া বড় নদীতে যামু। কাটাদিয়ার নদীর দুই পাশে মেলা হাট বাজার বসছে। বছর খানেক ধরে টাহা পয়সার ছরাছরি। ঐ নদীতে নাও বামু। মাঝে মাঝে বাড়িতে আসুম, তবু এই মরগাঙ্গিতে আর ভ্যান চালামু না। ছোড ছোড পোলা পান পর্যন্ত গাইল পাড়ে।’
বৃদ্ধ ----- ‘কেডা কি কয়?’
রশিদ ---- ‘আমরা মাঝি, সারা জনম নদীতে নাও বাইছি, এহন হেই নদীতে ভ্যান চালাই তা অরা মজা নেবে না?’
বৃদ্ধ ---- ‘ও তাই ক’। তা নদী না থাকলে আর উপায় কি?’
রশিদ --- ‘মুই বড় নদীতে যামু।’
বৃদ্ধ ------ ‘ও সবে কাম নাই। বড় নদীর সব নায়ে ইঞ্জিন বসাইছে। হ্যাগো লগে পাল্লা দিয়া তুই পারবিনা বাপ।’
রশিদ ----- ‘মুই ও ইঞ্জিন লাগামু।’
বৃদ্ধ একটু উপহাসের হাসি হেসে ------ ‘ইঞ্জিন লাগাবি টাহা পাবি কই?’
রশিদ ----- ‘জমি বেচুম।’
বৃদ্ধ ----- ‘চুপ কর, জমি বেচুম! গেলে আগে নাও সারাইয়া কয় দিন নাও নিয়া গিয়া বাও বাতাস বুইঝা আয়। তারপর যা ভাল বুঝিস করিস। আমার আর কয় দিন?’
রশিদ ---- ‘ভ্যানে আসেন বাপজান। বাড়ি দিয়া আসি।’
বৃদ্ধ ----- ‘তাই চল বাড়ি যাই।’

রশিদ খুব সকালে ভ্যান নিয়ে ধলু মিস্থ্রির বাড়ি যায়। উঠানে বেলের টুং টাং করে ডাক দেয়। ‘ধলু কাহা, ও ধলু কাহা! মিস্ত্রি কাহা বাড়ি আছেন?
মি¯্রি ------- ‘ক্যাডা? ও রশিদ? কি ব্যাপার বাপজান? এই সকাল বেলা? তোমার বাজানের শরীর ভাল তো?’
রশিদ ---- ‘এই আছে কোন রকম। আইছিলাম আপনেরে নিতে।’
মিস্ত্রি ---- ‘কি ব্যাপার, কও দেহি!’
রশিদ ----- ‘মোর নৌকাডারে একটু মেরামোত করতে হইবে।’
মিস্ত্রি ----- ‘এই অদিনে নৌকা হারাইবা? পাগল হইয়া গ্যালা? চালাইবা কই? শুকনা গাঙ্গে? দেখ দেখি পোলার মতি গতি!’
রশিদ ---- ‘না কাহা, মতি ঠিকই আছে। নৌকা সারাইয়া বড় নদীতে লইয়া যামু।’
মিস্ত্রি ----- ‘ও তাই কও। তা কহন যাওন লাগবে?’
রশিদ ---- ‘এহন ই চলেন।’
মিস্ত্রি ---- ‘তা বও একটু, কয়ডা মুড়ি খাইয়া লই। এহনও প্যাডে কিছু দেই নাই। তুমিও খাও বহ।’
রশিদ ঘরের দাওয়ায় একটা পিড়ির উপর বসে। বসতে বসতে রশিদ জিজ্ঞেস করে ---- ‘কাহা আমাগো নদীতে জল আইবো না আর?’
মিস্ত্রি --- ‘বর্ষা কালে তো আসে। এ নদী মইরা গেছে। কয় দিন বাদেই দ্যাখবা – যারা চর দখল তারা মাছ ধইরাই বসত বাড়ি তুইলা ফেলছে।’
রশিদ ---- ‘তা তো উইঠাই গ্যাছে।’ দেখতে দেখতে কত বাড়ি ঘর উঠল নদীর মাঝে। নদীটা মরলেই যেন হালার পুতেরা বাইচা যায়। ঘর উঠাইয়া খাট পাইতা, নাক ডাইকা ঘুমাইবো। খাইবি ডা কি?’
মিস্ত্রি ---- ‘সে হিসাব কি আর আছে। সিজনে সারা রাইত হ্যাজাক জালাইয়া নৌকা মেরামোতির কাম করছি। শ’য়ে শ’য়ে নৌকা। কই গেল এত নৌকা? গাঙের তুফানের ঠেলায় ঘরের হারি পাতিল কাইপা উঠত। আমাগো বাড়ি নদী ভাঙ্গে নেয়ার পরেই না বাজান এহানে বাড়ি বাধল।’
রশিদ ---- ‘আমরাও তো তাই।’
মিস্ত্রি ---- তোমরা তো আমাগো অনেক আগে। তোমাগে বাড়ি ভাঙছে কবে? আমাগো বাড়ি ভাঙ্গার বছর চারেক আগে।’
রশিদ ---- ‘হ এরকমই হইবো।”

নদী শুকিয়ে যাওয়াতে ধলু মিস্ত্রিরও জীবিকার নতুন পথ খুঁজে নিতে হয়েছে। আজ থেকে ষোল সতের বছর আগে এই গ্রামের অনন্ত ডাক্তারের মৃত্যু হয়। কথায় কথায় তার কথা হর হামেশা ই এখনও উঠে আসে। তার চিকিৎসার খুব নাম ডাক ছিল দশ গ্রামের। অনেক মৃত্যু পথ যাত্রীকেও তিনি বাঁচিয়ে তুলেছিলেন এক রকম বিনা পয়সায়ই তিনি চিকিৎসা দিতেন। একবার ধলু মিস্ত্রির খুব জঠিল রোগে মরনাপন্ন। সেবার অনন্ত ডাক্তার তাকে অনেক পরিশ্রম করে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়েছিলেন।
তারপর থেকে কৃতজ্ঞতা এবং শ্রদ্ধায় ধলু মিস্ত্রি সময় পেলেই অনন্ত ডাক্তারের সাথে সাথে থাকতেন। তাকে সহোযোগীতা করতেন। ধরে ধরে নিয়ে যাওয়া, ব্যাগ বহন করতো -এই সব। আর এরই সাথে সাথে রোগ বালাই সম্বন্ধেও তার একটা জ্ঞান হয়েছে। কি রোগের কি ওষুধ সেটাও বেশ কিছু টা বুঝে নিয়েছে। এখন মিস্ত্রি পেশয় আরন চলছেনা দেখে কবিরাজির দিকে তাই বেশ কিছুটা ঝুকে পড়েছে। তাই রশিদকে দেখে প্রথমে তিনি একটু ভয়্ পেয়েছিলেন।
---- ‘বুঝলা রশিদ আজকাল তো আমাকে কবিরাজি করেই চলতে হচ্ছে। তাই ভোর বেলা তোমারে দেখে ঘাবরে গিছিলাম। ভাবছিলাম তোমার বাবার কিছু হইল কিনা? বাজানের তো বয়স ইইছে। দুর্বল হইয়া পরছে। তয় তার রোগ বালাই তেমন কিছু নাই।’

সারা জীবন প্ররিশ্রম করছে কিনা। শরীরে রোগ বালাই ঢুকবার পারে নাই।

রশীদ ও ধুলা নাওটাকে ঘা মেরে দেখছে কতটুকু কি সারতে হবে। কাঠ পেটানোর শব্দে অনেকেই চরের দিকে আসতে থাকে।

ধলু মিস্ত্রি কয়েক জনকে আসতে দেখে রশীদকে বল ----- ‘রশিদ সবাই খুব আশ্চর্য হইয়া গেছে। অদিনে নাও সারাচ্ছি দেইখা দেখ কত মানুষ আসতেছে।’

রশিদ --- ‘এদের আর চিন্তা কি? নয়া চরে ঘর তুলছে। আর নানান জনের চর দখলে বেগার খাটে। আবার রাইতের বেলা দল পাকাইয়া ডাকাতি করে। গায়ের তেল দেইখা বোঝেন না।’

ধলু ----- ‘চুপ থাক! দেশে খুব খারাপ সময় চলতাছে। এই গ্রামের বড় বড় ধনীরা যারা ঢাকায় থাকে পয়সার দাপটে নদীর চরের সঙ্গে গ্রামের একদল মানুষও তারা কিনে ফেলছে। টাকায় কিনা হয় রশিদ?’

মকবুল অনেক বছর পর আবার গ্রামে বসবাস করছে। ঢাকায় থাকত। এগ্রামে তার পরিচয় একজন দালাল হিসেবে চোর ডাকাতি হিসেবেও নাম আছে তার। গ্রামের মাতব্বর গোছের ব্যাক্তিদেও সাথে তার ওঠা বসা। আসতে আসতে দূর থেকেই সে ব্যাঙ্গ করে। কি রশিদ গাঙে জোয়ার আসছে? নাকি নৌকায় চাক্কা লাগাইতাছ। ভাবসাব তো ভাল ঠেকতাছে না।
রশিদ ও বুদ্ধি করে উত্তর দেয় জোয়ার আইতে কতক্ষণ। গাঙে ঘর উঠাইয়া মৌজে আছ।

তা সাড়াও সাড়াও ভাইসা গেলে তোমার নৌকায় উঠুম। তা কও দেহি ঘটনাটা কি? রশিদও এবার ঠিকঠাক উত্তর দেয়। নাও লইয়া বড় নদীতে যামু।’
ও আচ্ছা তা অতদূর নিবা কেমনে ও তোমার তো ভ্যান আছে।

ধলু মিস্ত্রি এতক্ষণে কথা বলে ----- ‘ঐ বেটা ভ্যানে এই নৌকা যাইব?’
---‘যাইব যাইব, রশিদের ভ্যান পোক্ত আছে। আড়া আড়ি কইরা লইলেই নিতে পারবো। একটু সাবধানে টানতে হবে।’

ধলু মিস্ত্রি বলে --- ‘রশিদ কতাডা কিন্তু খারাপ কয়নাই।’
---- ‘আমার তো মনে হয় কলা গাছ দিয়া ঠেইলা অত দূর নেয়ার চাইতে ভ্যানে উঠাইয়া নেইয়াই ভাল।”

রশিদ চিন্তিত ভাবে বলে --- ‘তিমুখী পর্যন্ত গেলেই মরগাঙ্গিতে হাত খানেক পানি। তখন রশি বাইধা টাইনা লয়ে যামু।’

অনেক বছর পর এই গ্রামের মানুষ আলকাতরার গন্ধ পাচ্ছে। এ নিয়েও অনেক স্মৃতিচারণ মানুষের।

নৌকায় আলকাতরা দেওয়া হইয়েছে বেশ কয়েক দিন। এরই মধ্যে শুকিয়ে ও গেছে। গ্রামের মানুষ জন নিয়ে রশিদ ভ্যানের উপর নাওটাকে উঠিয়ে আড়াআড়ি করে ভাল ভাবে বাধে। তারপর সবাই মিলে ধরাধরি করে ভ্যানটাকে নিয়ে নামে নদীর মাঝে। রশিদ ভ্যানের হাতল ধরে আছে। আর পিছন থেকে সবাই ধিরে ধিরে ঠেলে নিচ্ছে ভ্যানটাকে। রহমত মাঝি বট গাছের নিচে বসে কি সব হাঁক পাড়ছে। তা কেউ শুনতে ও পাচ্ছে না।

এদিকে ঘটছে আরেক কান্ড। জব্বর বয়াতি ভ্যান ঠেলতে ঠেলতে হঠাৎ ধরে বসে একটা বাইচের গান। ---
সবাই গান ধরে তালে তালে এগিয়ে যাচ্ছে তিমুখীর দিকে। রশিদের দু’চোখ থেকে দর দর করে জল গড়িয়ে নামে। ও একটা চিৎকার করে বলে -----‘মরগাঙ্গির শেষ বাইচ, দেইখা যাও সবাই।’
গান চলতে থাকে। বট গাছের নিচে হাউমাউ করে কাঁদে রহমত মাঝি। -----

বাইচের পাল্লা কোন দিন ও দিকে যায় নাই। গেছে গঞ্জের দিকে। আইজ বাইচের নৌকা উল্টা যায়। যাবার বেলায় এই ছেল দেখার বাকি। মরগাঙি থেইকা বাইচের বিদায়।

বাইচের গানটা গ্রাম থেকে ধীরে ধীরে দূরে মিলিয়ে গেছে। শেষ হল মরগাঙির শেষ বাইচ। দু’এক দিন বাদে দূরের নদীর গল্প গান নিয়ে ফেরে রশিদ মাঝি। সে গল্পে কারো মন নেই।

মরগাঙির চরে লাশ পরছে। চলছে থানা পুলিশ। গ্রামের মানুষ সেই সব কানাকানি করছে। রশিদ মাঝি যেন দূরের নদীর মাঝি। এগ্রামের কেউ নয়।
     
Untitled Document

পুঁতিফুল
Total Visitor: 708307
সাপলুডু মূলপাতা | মতামত Contact : shapludu@gmail.com
Copyright © Life Bangladesh Developed and Maintained By :