Untitled Document
শ্রাবণ সংখ্যা ১৪১৮
মূলপাতা শিরোনাম বটতলা পঞ্জিকা প্রদর্শনী
বাজারী শিল্পীর বাজারী চিত্রপণ্য ও শিল্পের নির্জন পথ
- শিশির মল্লিক



বহু নামী-দামী প্রতিষ্ঠাপ্রাপ্ত চিত্রকরের সংখ্যা আজ আর কম নয়, নামহীন গোত্রহীনের সংখ্যা বলায় বাহুল্য। চিত্রবিদ্যা চর্চার সরকারী-বেসরকারী প্রতিষ্ঠানেরও কমতি নেই। কর্মক্ষেত্রের তুলনায় কর্মক্ষেত্রে প্রবেশে প্রতীক্ষিতদের সারিও দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হ"েছ দিন দিন। শিল্পী বা শিল্পীর শিল্পকর্ম আজ আর দুর্লভ নয়। রাজধানীসহ অন্যান্য শহরেও কম-বেশি শিল্পকর্ম প্রদর্শনী হয়। এতে দর্শক ও ক্রেতার আনাগোনাও একেবারে খারাপ বলা যাবে না। যাবে না এই অর্থে যে আমাদের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে এর বেশি আশা করা যায় কি?

বিভিন্ন সরকারী বিদ্যালয়, প্রাইভেট ইন্ডাস্ট্রি, মিডিয়া ফার্ম ও হ¯--শিল্পের মত বড় জায়গা জুড়ে আছে চার"শিল্প গ্র্যাজুয়েটরা। যারা এসব ক্ষেত্রে কাজ করছেন কতটুকু নিজস্ব সৃজনশীলতা প্রয়োগ করার মতো পরিবেশ পান তা প্রশ্ন সাপেক্ষ। আমাদের আর্থ-সামাজিক অব¯'ায় নগুরে হাওয়া লাগলেও সারব¯'তে ভূমি ব্যব¯'াপনায় পুরোপুরিভাবে সামš--ীয় অবকাঠামোর বিলুপ্তি না ঘটায় সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের জীবন যাপন, জীবনাচার, জীবনবোধ, কামনা-বাসনা এখনো সেই সামš--ীয় মূল্যবোধের নিগরে আবর্তিত হ"েছ। ফলে বিগত ২৫-৩০ বছরে যে লোক শহরে এসে কাজের সন্ধানে ঘুরেছে। সোনার হরিণ হাতে পাওয়ার মতো একসময়Ñব্যবসায়ী বা শিল্পপতি হয়ে গেছে; তার এ প্রাপ্তি তার বাহ্যিক পরি"ছদ পাল্টে ফেলার সুযোগ করে দিলেও অভ্যš--রীন শাঁস পাল্টে যাবার মতো কোন সামাজিক রূপাš--র ঘটেনি। স্বভাবতই একজন শিল্পী বা সৃজনশীল শিল্প-সংস্কৃতি চর্চাকারী মধ্যবিত্ত মানুষের সামাজিক অসহায়ত্ব আটকা পড়ে ঐ অপরিবর্তিত মানসলোকের অধিকারী কর্তাব্যক্তির উপরই। তার ই"ছা-অনি"ছা, র"চি-অভির"চি সেবায় হ"েছ প্রফেশনাল সেবা। এই সেবায় তার কর্মদিবসে পালন করে যেতে হয় সর্বক্ষণ। অতএব কর্মক্ষেত্রে শিল্পীর সৃজনশীলতার মূল্যায়ণ প্রচলিত প্রাতিষ্ঠানিক ব্যব¯'ার আনুকূল্যে বিবেচিত হওয়ায় স্বাভাবিক। যা বৃহত্তর জনগোষ্ঠির মানসলোকে প্রভাব বি¯--ার বা পরিবর্তন আনয়নে আদৌ কোন ভূমিকা রাখে কিনা সন্দেহ।
অতএব প্রফেশনালদের কাছ থেকে আমাদের প্রত্যাশাও সীমিত। তবে প্রত্যাশা যাদের ওপর সেই প্রত্যাশী চিত্রকরদের বিষয়ে আলোকপাত করা যাক। তারও আগে শিল্পের নির্জন পথে হাঁটার ব্যাপারে একজন শিল্পীর মানসলোক কতটুক ঋদ্ধ সেটা বোঝার আছে। তারও আগে বুঝার আছে সৃজনশীল শিল্প বলতে আমরা কি বুঝি বা বোঝাতে চাই সেটাও। অনেক শিল্পী বুদ্ধিজীবীর সাথে আলাপ করে জানতে চেয়েছি, তারা সৃজনশীলতা বলতে কি বোঝেন বা বোঝাতে চান? সে ক্ষেত্রে যে সব মতামত তারা পোষণ করেন তাহলো Ñ দর্শক বা পাঠককে আকর্ষণ করার মতো চমকপ্রদ, নতুন, র"চিশীল, সুন্দর এবং ব্যতিক্রমধর্মী উপ¯'াপনা হ"েছ সৃজনশীলতা। যাকে ভাসাভাসা বা অস্পষ্টতা ছাড়া আর কিছু বলার নেই।

আমার এই লেখার শিরোণামে ফেরা যাক। আমি বাজারী চিত্রপণ্য ও শিল্পের নির্জন পথ দুটো বিষয়ের উলেখ করেছিÑএ দুটো বিষয়ের মধ্যে বিরোধ ও সম্পর্ক বিদ্যমান তবে বিরোধটিই প্রধান। অর্থাৎ প্রফেশনালিজম ও শিল্প সৃষ্টির ব্যক্তিগত প্রেষণা বা কমিটমেন্টের প্রসঙ্গটি সর্বাগ্রে বিবেচনা করতে হবে তবেই সৃজনশীলতার ই"ছা-উদ্দেশ্য সম্পর্কে পষ্টতা অর্জন সম্ভব হবে নতুবা ভাসাভাসা অস্পষ্টতা নিয়ে শিল্পের বিচার দূরূহ এবং বিভ্রাšি--ই কেবল বাড়াবে।

শিল্পীর সৃজনশীলতা বিশেষণে প্রফেশনালিজম কিংবা আমি যাকে নির্জন পথ বলছি অর্থাৎ প্রতিশ্র"তিশীল শিল্পের পথানুসারী কিনা এই সীমারেখার আলোকে মূল্যায়ন করতে হবে। সর্বযুগেই প্রফেশনালিস্ট ধারার প্রভাব বি¯--ার লাভ করে তার সঙ্গত কারণ এই যে, তা চলতি ব্যব¯'ার পক্ষপাতিত্ব বা চাহিদাকে পুরণ করে। ফলে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি, যশ, প্রভাব-প্রতিপত্তি সবই তারা অর্জন করলেও নির্জন পথের শিল্পীরা এই স্রোতের বিপরীতে প্রচলিত ব্যব¯'ার অসংগতি, অন্যায়, জুলুম, মানবিক বিপর্যয়, সংখ্যাগরিষ্ঠ জনতার প্রতিকূলতার বির"দ্ধে সো"চার ও অগ্রগামী ভূমিকায় অবর্তীণ হয়। যা বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর স্বপ্ন আশা আকা*খা ও জীবনের নানা দিককে তুলে ধরে। অতএব এ দুটো ধারার মধ্যেই প্রয়োগগত গুণাগুণ ভিন্ন হওয়ায় স্বাভাবিক। দুটো ধারায় আলেদা বৈশিষ্ট্য ধারণ করে। একটা মেটায় ব¯'গত প্রয়োজন। অন্যটি মেটায় মনোগত তৃষ্ণা। একেবারে প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকেই এ যাত্রা শুর" হয়েছে বলা যায়। শিকারের পূর্বে ছবি এঁকে ইন্দ্রজাল তৈরীর চর্চা থেকে যে যাত্রার শুর"।

একটা বিষয় উলেখ্য যে, তখন মানুষের লড়াই ছিল প্রধানত প্রতিকুল প্রাকৃতিক পরিবেশের বিরূদ্ধে সংগঠিত গোত্র বা গোষ্ঠির লড়াই। মানুষ যতই প্রকৃতির বিরূদ্ধে লড়াইয়ে বিজয়ী হয়েছে বা হ"েছ ততই মানুষের লড়াইটা মানুষের বির"দ্ধে কেন্দ্রীভূত হয়েছে বা হ"েছ। অর্থাৎ সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর সাথে সংখ্যা লঘিষ্ঠ কৃতৃত্বকারী দল বা গোষ্ঠির লড়াই। আরো পরিষ্কার করে বললে এ লড়াই আজকের যুগে সরাসরি সাম্রাজ্যবাদ-পুঁজিবাদ তথা ব্যক্তিতান্ত্রিক মালিকানার বিপরীতে শ্রমিক-কৃষক-মধ্যবিত্ত, পেশাজীবী, বুদ্ধিজীবী নিপীড়িত মানুষের সংগ্রামে পরিণত হয়েছে। এই চিরাচরিত লড়াই-সংগ্রাম; এক একটি যুগেরই দাবী। একে অস্বীকার করার কোন উপায় নেই। যারা এই বা¯--বতা অস্বীকার করেন সজ্ঞানে বা অজ্ঞানে তারা বাজারী শিল্পের তালিকাকে দীর্ঘ করেন বৈকি।

আমাদের বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্মের পর থেকে এ পর্যš-- চিত্রকলা চর্চার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে আমরা কোন পথে হেঁটেছি বা হাঁটছি তা লক্ষ্য করা যাবে। একটা প্রফেশনাল ধারা চর্চিত হয়ে আসছে এবং এ ধারাটি একটি জেনারেশন প্রতিনিধিত্ব করছেন যারা ’৬০/’৭০ দশক থেকে যাত্রা শুর" করেছেন। পরের জেনারেশনের অনেকেই এ পথে এগুলেও প্রফেশনালিস্ট ধারাকেও যথেষ্ট শক্তিশালী বলা যাবে নাÑ তার অনেকগুলো কারণ রয়েছে, এর মাঝে অন্যতম কারণ আমাদের আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক অব¯'া।

উন্নয়ণশীল দেশের উপাধি ঘাড়ে নিয়ে বৈদেশিক সহায়তায় আত্ম-উন্নতির লক্ষ্য জাতীয় উন্নতির বিপরীতে একটি সংখ্যালঘিষ্ঠ দুর্নীতিপরায়ণ শাসক-শোষক গোষ্ঠীই লালিত হ"েছ। যাদের পৃষ্ঠপোষকতায় বিপুল সম্ভাবনার এই দেশ নিতাš--ই অন্ধকারে পথ হাতড়া"েছ।

পুঁজিবাদ বিকাশের জন্যেও যা যা করণীয় বা দরকার তাও দেশীয় শাসক গোষ্ঠী বিগত বছরগুলোই সুদূরপ্রসারি কোন লক্ষ্য নিয়ে আগায়নি। আভ্যাš--রীন চাহিদাকে সামনে রেখে সে লক্ষ্যে উৎপাদন; উৎপাদনে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা দান, প্রযুক্তিকে নিজস্ব সামর্থের মাঝে ব্যবহার করা, প্রযুক্তিগত উন্নয়নের জন্যে শিক্ষাব্যব¯'াকে ঢেলে সাজানো কোনটাই না। ফলে এক টানাপোড়েনের রাজনীতি-অর্থনীতি, সংস্কৃতি অব্যাহত রয়েছে। সাধারণের জীবনে মনোবিলাসের দেশীয় সংস্কৃতির বিপরীতে বাণিজ্যিক সংস্কৃতি ঢুকে পড়েছে যা মূলত প্রযুক্তি নির্ভর। ফলে প্রফেশনালিজেমেরও তেমন বিকাশ ঘটেনি অদূর ভবিষ্যতেও সে সম্ভাবনা ক্ষীণ।

এখন সমাজে শিল্প-সাহিত্য, সংস্কৃতিতেও এর প্রভাব বেশ ভালভাবেই পড়ছে। শিল্পী বুদ্ধিজীবীরা কোনরকম খায়-দায়-বাঁচি ধাঁচের শিল্প চর্চায়ই মত্ত হয়েছেন। কেউ কেউ বলেন এটি দোষের কি? সমাজ পৃষ্ঠপোষকতা না দিলে শিল্পী বুদ্ধিজীবীরা বাঁচবে কিভাবে? প্রশ্নটি আপাত যৌক্তিক মনে হলেও এটি মূলত একজনের অসহায়ত্বকে প্রকাশ করে। এটি সৃজনশীল মানুষের বক্তব্য হতে পারে না। সৃজনশীল মানুষ কারো মুখাপেক্ষি নন। তিনি জানেন প্রতিকূলতার বির"দ্ধে লড়ায়ই তার আদিম স্বভাব। সবকিছু যদি ঠিকই থাকে তবে সৃষ্টি করার থাকে কি? আরো একটি বিষয় উলেখ্য যে, পৃষ্ঠপোষকতার যারা প্রত্যাশা করেন তারা তো বাজারের জন্যে ছবি আঁকতে বাধ্য হবেন; নির্জন পথে হাঁটার সাহস তিনি কোনও দিনই পাবেন কি?

আর পৃষ্ঠপোষকতা যাদের কাছ থেকে প্রত্যাশা করেন তারা কারা? তাদের শ্রেণী চরিত্র কি? তাদের ব্যাকগ্রাউণ্ড কি? তারা তো তাদের মর্জি বা র"চি অনুযায়ী ছবি কিনবেন বা ছবির প্রশংসা করবেন। অতএব তাদের পৃষ্ঠপোষকতায়ই যদি শিল্পী বা শিল্প বিকাশের মানদণ্ড হয়, তবে সেই শিল্প বা শিল্পী কি যথার্থ অর্থেই তার সৃজনশীলতাকে তুলে ধরতে পারেন? Ñ এ প্রশ্নটি থেকেই যায়।

শ্রেণীগত কারণেই শাসক বা শোষক গোষ্ঠী তার সমালোচনা বা তাকে প্রশ্নের সম্মুখীন করে অথবা তাদের ব্যব¯'াধীনে নিষ্পেষণ বা অন্যায়ের অভিব্যক্তি ফুটে ওঠা শিল্পের পৃষ্ঠপোষকতা না দেওয়ায় স্বাভাবিক বরং তার চেয়ে প্রকৃতি, ফুল, পাখি, প্রেম, তথা বিমূর্ত, কম্পোজিশন ধর্মী, টেকনিক্যাল কলাকেই চমৎকার শিল্প বলে প্রশংসা বা পৃষ্ঠপোষকতা দুটোই দিতে পারেন। কেননা এধরনের শিল্প তার সুন্দর প্রাসাদোপম অট্টালিকা অলংকরনের অনুসঙ্গও বটে। এখন একজন শিল্পীকেই বুঝতে হবে কোন সৃষ্টি তার মৌলিকত্বকে তুলে ধরে কোনটি ধরে না। এবং কোন পথটি তিনি বেচে নেবেন।
মানুষ মাত্রই আনুকূল্য প্রত্যাশী। কে চায় যেচে কষ্ট বা দুর্ভোগকে বরণ করে? কিš' এটি সাধারনের জন্য সত্য হলেও সৃজনশীল মানুষের জন্যে নয়। যুগে যুগে সৃজনশীল অনুসন্দিৎসু মানুষ তার স্বপ্নকে বুকে নিয়ে কর্মযজ্ঞে ধ্যানী থেকেছেন। দুর্ভোগকে মাথা পেতে নিয়েছেন। নিজের অভীষ্ট লক্ষ্যে সফলকাম হয়েছেন। অবশেষে মানব সমাজে বরণীয় স্মরণীয় হয়ে থেকেছেন। যার সুফল ভোগ করছে প্রজন্মের পর প্রজন্মের মানুষেরা।

সেই পথই অনুস্মরণীয় হয়ে উঠুক আজকের বাংলাদেশের তর"ণ নবীণ প্রজন্মের কাছে। একটি বন্ধ্যা সময় বা কালকে অতিক্রমনে নতুন যুগের নবীণেরা জেগে উঠুক! জেগে উঠুক বি"িছন্ন-আত্মকেন্দ্রিক-ভোগবাদী-উপযোগিতাবাদী বাণিজ্যিক বাজারী সংস্কৃতির বিপরীতে দেশ মাতৃকার প্রতি ভালবাসার অঙ্গিকারে!
     
Untitled Document

পুঁতিফুল
Total Visitor: 709038
সাপলুডু মূলপাতা | মতামত Contact : shapludu@gmail.com
Copyright © Life Bangladesh Developed and Maintained By :