Untitled Document
ভাদ্র সংখ্যা ১৪১৮
মূলপাতা শিরোনাম বটতলা পঞ্জিকা প্রদর্শনী
ইমদাদুল হক মিলন
কিছু বলা না বলা কথা
- আবদুল্লাহ আল-হারুন


একটি বিশেষ পরিস্থিতিতে ১৯৭৭ যখন আমি মাতৃভুমি ত্যাগ করতে বাধ্য হই, সত্যি বলতে কি সে সময়ে বাংলাদেশে আমি ইমদাদুল হক মিলন নামে কোন লেখককে চিনতাম না। ঐ সময়ে তার কোন বই বেরিয়েছিল কিনা তাও জানিনা। দেশে তার কোন লেখাও কোথাও আমার চোখে পড়ে নি। পরে জার্মানিতে ১৯৭৯ সালে মিলন আমাকে বলেছে, সত্তর দশকের শুরুতে, বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পরই সে নিয়মিত লেখা শুরু করে। ১৯৭৩ সালে তার প্রথম কিশোরদের জন্য লেখা, ‘বন্ধু’ প্রকাশিত হয় তৎকালিন পুর্বদেশের চাঁদের হাটে। জার্মানিতে আসার আগে তার দুটি বই প্রকাশিত হয়ে গেছে, উপন্যাস, ‘ভালোবাসার গল্প ও গল্পের বই, ‘নিরন্নের কাল (১৯৭৭)’।  
মনে হয় বাংলাদেশের সশস্ত্র ও রক্তাক্ত স্বাধীনতার সংগ্রাম তার অবচেতন মনে লেখার উদ্দীপনার জন্ম দিয়েছিল। স্বাধীন বাংলাদেশের অভুদ্যয় শুধুমাত্র গল্প -উপন্যাস-কবিতারই রেঁনেসা ঘটায়নি, শিল্প- সংস্কৃতির অন্যান্য অঙ্গনেও এর ছোঁয়া লাগে। যেমন মঞ্চ-নাটক, সঙ্গীত। স্বাধীনতার মুল্য বাঙ্গালীরা ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্ত দিয়ে চুিকয়েছে (ব্রিটিশ সাংবাদিকঃ লিফ্টসুজ)। বিনিময়ে আমরা পেয়েছি সারা পৃথিবীর মধ্যে অনন্য একটি স্বাধীন কালচে-সবুজ রঙের পতাকার দেশ, যার উৎস, ১৯৫২ সালের ঐতিহাসিক মাতৃভাষার সংগ্রাম। মুখের ভাষার জন্য স্বাধীন দেশের জন্ম দিয়ে বাঙ্গালীরা পৃথিবীতে এমন একটি বিষ্ময়কর দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে, জাতীসংঘ ২১শে ফেব্রয়ারীকে সারা পৃথিবীর জন্য ‘মাতৃ-ভাষা’ দিবসের ঘোষনা দিয়ে তার যোগ্য স্বীকৃতি দিয়েছে।
বাংলাদেশে স্বাধীনতার পর পরই সাহিত্য-সংস্কৃতির এক অভুতপৃর্ব বিকাশ ঘটে। পাকিস্তানী আমলের শ্ব্সারুদ্ধকর আবহাওয়ায় বাঙ্গালীর আত্মা ছিল বন্দী। পাকিস্তানী শাসকদের অপমান অবমাননার বন্ধনে মাতৃভাষা বাংলা ছিল মুমূর্ষ। কিছু সাহসী সাহিত্যিক এর সেবা শুশ্রষা করতেন কিন্ত তৎকালিন সুযোগ-সন্ধানী অল্প সংখ্যক পকিস্তানী তল্পিবাহক লেখকরা উর্দু-আরবী অক্ষরে বাংলা লেখার ষড়যন্ত্র করে ‘পাকিস্তানী সংহতি’র নামে নিজেদের পকেট বোঝাই করতেন। বাংলা ভাষায় নিরন্তর অপ্রচালিত ও দুর্বোধ্য আরবী-পারসী-উর্দু শব্দের সংযোজন করতেন, গায়ের জোরে।  সাহিত্যিকদের দাস্যবৃত্তির এমন উদাহারন পৃথিবীতেই কম আছে।
স্বাধীনতার সুবাতাসে বাঙ্গালী শিল্প-সংস্কৃতির নবজন্ম হল। নতুন প্রজন্মের একজন উল্লেখযোগ্য কথাশিল্পি, এ বইটির নায়ক- ইমদাদুল হক মিলন। উপন্যাস, নাটক, সিনেমার অর্থে নয়, একজন লেখককে একটি সময়ে অত্যন্ত কাছে থেকে দেখার সময়ে আমার বিশেষ বিশেষ অনুভুতিগুলি এবং দীর্ঘ দিনের ব্যবধানে পুনরায় সাক্ষাতের ব্যথা ও উল্লাসের সংমিশ্রন। আমি তার লেখার একজন মুগ্ধ পাঠকও।
১৯৭৯ থেকে ১৯৮১ (একুশ-বাইশ মাস) সালে আমি ও মিলন জার্মানির ছোট কিন্ত আন্তর্জাতিকভাবে শিল্প -শহর হিসেবে সুপরিচিত, ‘বেঞ্জ-সিটি’, সিন্ডেলফিনগেনে একটি বাড়ীতে একই ঘরে থাকতাম। এ শহরেই সুবিখ্যাত মার্সিটিজ-বেঞ্জ্ গাড়ী তৈরীর মূল ও প্রধান কারখানা, সে থেকেই একে বেঞ্জ-সিটি বলা হয়। আমার পরিবার তখন দেশে। মিলন অকৃতদার। দেশে ফেলে আসা তার প্রেমিকার চিন্তায় প্রায়ই ¤্রয়িমান হয়ে থাকত। দুজনেই তখন পুরোপুরি একা ছিলাম। একাকিত্বের যন্ত্রনাও আমাদের দুজনকে কাছাকাছি আসতে সহায়তা করেছিল।
ঘটনা পরম্পরায় একদিন মিলন অমাদের এ শহরে এসেছিল। প্রথম দিনেই কেন জানি, এ সুদুর প্রবাসে আমাদের বাসায় আমার সাথে থাকার জন্য তার প্রবল ইচ্ছাটি প্রকাশ করেছিল। পদার্থবিজ্ঞানীরা বলেন, প্রায় পনেরো বিলিয়ন বছর আগে একটি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বিন্দু থেকে (সাধারন বিবেচনায় যার কোনই বাস্তবিক অস্তিত্ব প্রমান করা যায় না) বিগ-ব্যাঙ এর বর্ননার অতীত বিস্ফোরনে মহাশুন্য বা স্পেসের শুরু। বিস্ফোরনটি মাত্র কয়েকশ বিলিয়ন এর বিলিয়নতম সেকেন্ডের অংশে (যা লিখে প্রকাশ করতে গেলে পুরো পাতাই শুন্যে ভরে যাায়) ঘটে। এমনি একটি সময় যা আমাদের চিন্তাশক্তির বাইরে। এবং ১০০ সেকেন্ডের মধ্যেই মহাশুন্যের কয়েক মিলিয়ন আলোক বর্ষের বিস্তৃতি ঘটে। এটা এজন্যই বলছি, আমাদের জীবনে বিশেষ ঘটনাগুলি আমরা বুঝে উঠবার আগেই ঘটে যায়। কাজেই আমার ও মিলনের বিগ-ব্যাঙটি আমরা দুজনে বোঝার আগেই ঘটে গিয়েছিল। এবং প্রথম সাক্ষাতের এক সপ্তাহের মধ্যেই সে তার তখনকার আবাসস্থল, ষ্টুটগার্ট ছেড়ে. ওখানকার চাকরীটিও অম্লানবদনে ত্যাগ করে, বাক্স-বিছানা নিয়ে আমাদের বাসায় চলে এল। এসবই পরিশিষ্ট-৩ এ ‘আমাদের সেই দিন’ ও পরিশিষ্ট-১ এ ‘ইমদাদুল হক মিলন ঃ কাছে েেথকে দেখা’ কাহিনীতে বিস্তারীত বলা হয়েছে। পাঠকদের বিরক্তি এড়ানোর জন্য তাই পুনরাবৃত্তি করতে চাই না।
জার্মানিতে ও এসেছে তা আগেই জানতাম। কেন এসেছিল তাও আমি আমার কাহিনীতে বলেছি। কিন্ত প্রথম দিন ফ্রাংকফুর্টে দেখা হবার পর আমি ইচ্ছে করেই তার সঙ্গে আলাপ করিনি। বয়েসের একটা তফাৎ তো ছিলই (প্রয় দশ বছর) এবং তখন সে তার সমবয়েসী কয়েকজন তরুণ (২-৩টি তরুণীও) দের সাথে কথা বলছিণ। ঐ আসরে নিজেকে খুবই বেমানান মনে হয়েছিল। তারপর ষ্টুটগার্টের বাঙ্গালীদের একটি গান-বাজনার আসরে দুর থেকে দেখা হল দ্বিতীয়বার। সেদিনও কথা হয় নি। তৃতীয়বার আমার বাসায় সিন্ডেলফিনগেনে।
প্রায় দু‘বছর একসাথে থাকার পর মিলন একদিন তার বোন, ভগ্নিপতি এবং আরেকজন প্রবাসী বাঙ্গালীর সাথে দেশে  ফিরে গেল। জার্মানিতে অঢেল টাকা কামানোর নানা সম্ভাবনা, অফুরন্ত মদ আর বেসুমার মেমসাহেবদের সঙ্গের লোভ কাটিয়ে মিলনের জার্মানি-ত্যাগটি বাংলাদেশের সাহিত্যের জন্য একটি দুর্লভ ঘটনা। এবং সৌভাগ্যেরও বটে। বাঙ্গালী বহু প্রবাসী সাহিত্যিকই ইউরোপ-আমেরিকার প্রাচুর্যের মোহ ত্যাগ করতে পারেন নি। এখানে তথাকথিত শান্তি আর সুখের পায়রা তাদের পায়ে বিলাসের শিকল পড়িয়ে দিয়েছে। এক সময়ে তারা কলম হাতে নেয়া বাদ দিয়ে দু হাতে পয়সা কামাতে লেগে গিয়ে ঐশ্বর্যবান হয়েছেন ঠিকই কিন্ত সাথে সাথে নিজস্ব প্রতিভাকে অবহেলা ও অস্বীকার করে বাংলা-সাহিত্যের প্রতি অবিচার তো করেছেনই, আমাদের মত যারা এক সময়ে তাদের আগ্রহী পাঠক-পাঠিকা ছিলাম, তাদের নিরাশ করেছেন।
মুলতঃ বাংলা লেখার পরিবেশ ফিরে পাবার জন্যই মিলন যে দেশে ফিরে গিয়েছিল, সে সময় ততটা না বুঝলেও, এখন এটা আমার কাছে খুবই স্পষ্ট। দেশের প্রেমিকার পিছুটান তো ছিলই। আত্মীয়স্বজন, ভাইবোনদের জন্য তার আন্তরিক টানও আরেকটি কারন। দেশে প্রস্দ্ধি একটি সাপ্তাহিকের ভালো চাকরী, লেখালেখির সুযোগ সব ছেড়ে সে একদা জার্মানিতে আনিশ্চিতের পথে পা বাড়িয়েছিল, তাও মুলতঃ তার পিঠাপিঠি প্রিয় বড়বোনের সুখের সন্ধানেই।
একটানা পঁচিশ বছর জার্মানিতে কাটিয়ে আমি ২০০৮ সালে যখন বাংলাদেশে গেলাম, তখন লেখক-মিলনের অবস্থা তুঙ্গে। যাবার সময় আশা ছিল মনে, খবর পেয়েই প্রিয় মিলন উড়ে আসবে আমার কাছে।! হায়, বুড়িগঙ্গার পানি যে এর মধ্যে এত গড়িয়ে গেছে, তা কে জানত! আমি দেশে যাবার পর সপ্তাহ তিনেক পরে এল আমার কাছে। কয়েক ঘন্টা প্রাণ খুলে আলাপ করলাম দু‘জনে। এরপর আরো ৪-৫ সপ্তাহ ছিলাম। আর দেখা হয় নি। এই আশাভঙ্গের বেদনা আমি পরিশিষ্ট-২ এ কিছু লিখেছি। ‘বড়র পিরীতি বালির বাঁধ’, তা জানতাম। কিন্ত জানা আর ভোগ করা দু‘টি সম্পূর্ণ আলাদা ব্যাপার। সময় যে এতটা ব্যবধান সৃষ্টি করে তা বুঝে উঠতে পারিনি বলেই, বেদনাটি সইতে বেশ সময় লেগেছে।
জার্মানিতে দীর্ঘদিনের বসবাস আমার। এখানকার শিল্প-সংস্কুতির জগত আমার অজানা। কোন গায়ক-বাদক-লেখককের সাথে আমার সম্প্রীতি হয় নি। তার দরকারও হয় নি। এখানে আমার প্রতিবেশ বরাবরই অন্যরকম। আমার উঠাবসা, স্থানীয় কিছু বিকল্প রাজনীতিকদের সাথে। তারা কেউ তথাকথিত সেলিব্রিটি নয়। যখন তখন তারা আসে আমার কাছে, আমিও যাই বিনা নোটিশে। তারপর ১৯৯৭ সাল থেকে আমি হজপিসের সক্রিয় সদস্য। একা যারা মৃত্যুর  যাত্রাপথে, তাদের সঙ্গ দেই। যার সঙ্গ দেই, তার আত্মীয়স্বজনরা, বন্ধুরা সব সময় আমার প্রতি কৃতজ্ঞ। আত্মীয়টি মরে যাবার পরেও যথাসম্ভব যোগাযোগ রাখেন। আমার এই জগতে আমি বেশ জনপ্রিয় এবং সংশ্লিষ্ট সবারই সখ্যতা পেয়ে আদর-আপ্যায়নে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। সেখানে ঢাকায় মিলনের এ হেন ব্যবহার? কিন্ত আমি বোঝার  চেষ্টা করিনি, গত পঁচিশ বছরে তার প্রতিবেশও সম্পূর্ণ বদলে গেছে। সে আর আশী শতকের জার্মানীর শ্রমিক ও সখের তরুন লেখক নেই। এর মধ্যে তার প্রায় আড়াইশ বই প্রকাশিত হয়ে গেছে। গল্প-উপন্যাস ছাড়া, ছোটদের জন্য ভুতের গল্পও লিখেছে। টিভিতে প্রচুর জনপ্রিয় নাটক, সিরিয়ালও। সে সমস্ত বয়েসের পাঠক-পাঠিকাদের প্রিয় লেখক। জার্মানিতে যখন ছিল, বিদেশ বলতে এখানেই তার প্রথম আসা। একান্তই সীমাবদ্ধ প্রবাসী জীবন। এখন প্রতি বছর, আমেরিকা, জাপান যায়। শুধুৃ দেশেই নয়, বিদেশেও তার ফ্যানের অভাব নেই। প্রকাশকদের ভয়ে সে বাড়ী ছেড়ে মাঝে মাঝে পালিয়ে থাকে। ঘরের দেয়াল-টেবিল বাংলাদেশ-ভারতের নানা প্রাইজ, পদক, সন্মানীতে ভর্তি। সে বাংলাদেশের এখন ভিআইপি। মফস্বলে নানা অনুষ্ঠানে নিমন্ত্রিত হয়ে ডাক-বাংলোয় রাত কাটানোর সময় পুলিশ তাকে পাহাড়া দেয়!
জার্মানিতে ফিরে আসার পর, তার এক ভক্ত, আমার প্রিয় নাতি, শিশিরার্দ্র মামুন, তরুন গণ্পকার আমাকে বলল, মিলনভাই যে ঢাকায় আপনাকে একদিন কয়েক ঘন্টা সময় দিয়েছে, তাই আপনার মহাভাগ্য। বই কিনে তাতে তার সই নেবার জন্য বইমেলাতে ধৈর্য ধরে শত শত ভক্ত লাইন দিয়ে এক-দেড় ঘন্টা অপেক্ষা করে। তাকে প্রবাসী বাঙ্গালীরা পৃথিবীর নানা দেশে বেড়াতে আসার সাদর দাওয়াত দিয়ে সাগ্রহে অপেক্ষা করে থাকে, কবে দশর্ন দেবেন!  ‘বসে আছি হে, কবে শুনিব তোমার বানী!’ মামুন নিশ্চয়ই মনে মনে ভেবেছিল, আপনি শুধুমাত্র একটি বই প্রকাশ করেই (তখন আমার প্রথম বই, ‘প্রবাসে দৈবের বশে’ মাত্র প্রকাশিত হয়েছে।) মিলন ভাইয়ের সাথে এক কাতারে দাঁড়াতে চান! আমার মুখের উপরে এ অপ্রিয় সত্যটি বলেনি, কিন্ত আমি ঠিকই বুঝতে পারছিলাম। তার না বলা কথাটি তো চরম সত্য! প্রিয় বা অপ্রিয়, জানি না।
এখন কথা উঠতে পারে, যে মিলনের সাথে আমার ১৯৮২ থেকে ২০০৮, পঁচিশ বছর দেখা হয় নি, যে সময়টা আমি বাংলাদেশে একবারও যাই নি, ঐ সময়ে তার প্রকাশিত বই (সম্ভবতঃ) মাত্র ৪-৫টি পড়েছি, সেখানে তার সম্পর্কে আমি কি লিখব? তাও একটি পুরো বইতে? সিকি শতাব্দির ব্যবধান তো কম কথা নয়। এর মধ্যে মিলন আমাকে এক লাইন চিঠিও লিখেনি। যেমন আমি তার সঙ্গে বাংলাদেশে, সেও তেমনি আমার সাথে জার্মানিতে যোগাযোগের কোন চেষ্টাই করে নি। ব্যাপারটি কিন্ত বেশ অবিশ্বাস্য! কিন্ত  ঞৎঁঃয রং ংঃৎধহমবৎ ঃযধহ ভরপঃরড়হ!
এই দ্বিপাক্ষিক নিরবতার কারন দু‘টি। ২০০২ সালে এক ঝড়ো হাওয়ায় জীবন আবার উলটৈপালট হয়ে যাবার পর থেকে আজ পর্যন্ত আমি নিয়মিত সাইকোলজিষ্টের পরামর্শ নিয়ে ডুবে যাওয়া জীবননৌকাটি আবার কোনমতে ভাসিয়ে রাখার চেষ্টা করি। তার মতে আমি পুরোপুরি একজন ‘বর্তমান’ এর মানুষ। আমার কাছে অতীত শুধু দুুঃখের স্মুতিচর্চা। এ থেকে শিক্ষা নেবার যে রেওয়াজ প্রচলিত আছে, তা আমার জীবনের নীতিমালায় নেই। ভবিষ্যত আমার কাছে কোনই গুরুত্ব বহন করে না। আমি শুধু ‘এই মুহূর্তে’ই ব্েেচ থাকি। এ ধরনের মানুষদের জীবনে কোন স্বপ্নই সফল হয় না। কারন তারা বাস্তবের ধারঘেঁসা কোন স্বপ্নই দেখে না। যার দরুন এদের পদে পদে শুধুই ব্যার্থতা আর আশাভঙ্গের যাতনা। নিজেদরে দোষেই তারা উপেক্ষা আর অবহেলার নিত্য শিকার। 
যাক, এসব ষাটোর্ধ জীবনে ভেবে আর কি লাভ। সময়ের চাকা তো আর ঘোরানো যাবে না। আমি আমার মনচিকিৎসকের সব কথাই নতমস্তকে মেনে নিয়ে তার পরামর্শমত নিয়মিত টেবলেট খাই, তার সাথে লাল-কাউচে বসে কথা বলি ও লেখালেখি করি। তার মতে এটাই আমার জন্য এখন মহৌষধ। এ কথাটি ঠিক। যখন কিছু লিখি, স্মৃতির যন্ত্রনা থেকে দুরে সরে গিয়ে  খুব ভালো থাকি। 
দেশে থাকতেও আমি রাজনীতি এবং সাহিত্যের মধ্যে কোনটা ঠিকমত ধরবো, সিদ্ধান্ত নিতে পারিনি। পুরোনো একটা ক্ষত ছিল। বাবা আমাকে ইঞ্জিনীয়ার বানানোর অপচেষ্টায় জোর করে আইএসসিও পড়িয়েছিলেন। কাজেই প্রযুক্তি, সাহিত্য আর রাজনীতির টানাপোড়েনে ১৯৭৭ সালে (অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতিতে) দেশ ত্যাগ করতে পেরে কিছুটা হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছিলাম। ত্রিশ বছর দেশে না যাবার পেছনে এসব তিক্ত অভিজ্ঞতাই কাজ করেছিল। তবে এর মধ্যে আশী দশকের শুরুতে প্রায় দু‘বছর মিলনের সান্নিধ্যটি আমি খুব উপভোগ করেছি। নির্মম ও সশ্রম কারাদন্ড প্রাপ্তির পর ওটাই আমার প্রথম (সাময়িকভাবে) প্যারোলে মুক্তিলাভ! এই সময়টিতেই আমার লেখকজীবনের বীজটি প্রথম মাটির নিচে যেতে পেরেছিল। যার অংকুরোদগম হল দীর্ঘ প্চিশ বছর পরে! 
মিলনের দেশে ফিরে যাবার পরের দু‘বছর আমার খুবই যন্ত্রনায় কেটেছে। ১৯৮৪ তে যার উপশম হল, জীবনে জার্মান-সঙ্গিনীর আগমনে। ব্যস হয়ে গেল আবার! অতীত গেল চুলোয়। বর্তমান তার রঙিন আর প্রলোভনের দ্বার উন্মুক্ত করে দিল। কিছুটা কাকের ময়ুরপুচ্ছ ধারন করার মত আমি তার পরের আঠারোটি বছর জার্মানির সমাজ ও সামাজিকতায় মিশে যাবার (ব্যর্থ) চেষ্টায় ব্যস্ত থেকেছি। এক সময়ে আরেক কঠোর থাক্কায় নিজকে ‘না ঘরকা, না ঘাটকা’ অবস্থায় দেখে কিছুটা লজ্জা পেয়েই (মুখ লুকানোর জন্য) ২০০২ সালে সুইটজারল্যান্ডে পালিয়ে গেলাম। ওখানে থেকেছি তিন বছর। প্রিয় সঙ্গিনীর সাথে আঠারো বছর বসবাসের সময় আমি ্এখানকার পরিচিত বাঙ্গালীদের কাছ থেকেও দুরে সরে গিয়েছি। এক সময়ের দেশী আপজনজনেরা, কিছুটা ঘৃণার সাথেই আমাকে ত্যাগ করেছিলেন। আজও এ ব্যবধান দূর হয় নি। আমি সেই একাই রয়ে গেছি।
এই আঠারো বছর আমার কাছে বাংলাদেশ, বাংলাভাষা, বাংলা গান সবই ছিল দুর অতীত। কখনও এসবের আর প্রযোজন হবে, তা ভাবি নি। ‘সব পেয়েছির দেশে’ পৌছে গিয়েছিলাম, জার্মানিতে! আমার জীবনের প্রায় ৯০% ঘটনার মতই এটাও ছিল একটা মায়া, ওষষঁংরড়হ!      
একদিন ঘোর যখন কেটে গেল, মরীচিকার পেছনে দৌড়ানোর অবসান হল, নিজেকে দেখলাম, ‘দু‘দেল বান্দা কাফন চোর, না পায় শশ্মান না পায় গোর!’
ওই আঠারো বছর মিলনের বই পড়া তো দুরের কথা আমি বাংলায় কথা বলারও সুযোগ পেতাম না! এটাই দ্বিতীয় কারন। যারা বাংলা বই পড়তেন, তারা সবাই দুরে। আমারও আগ্রহ নেই। এক সময়ে আমি বাংলা বই পেলে সবকিছু ফেলে গোগ্রাসে গিলতাম, সে এতটা বছর একটাও বাংলা বই বা পত্রিকার পাতা উল্টে দেখেনি, ভাবলে আমার নিজেরই এখন বিশ্বাস হয় না। এখন তো ধরতে গেলে দৈনিক ১২-১৩ ঘন্টা বাংলায় (কম্পুটারে ) লিখি। সেই ২০০৬ সাল থেকে। তবে প্রচুর জার্মান বই এবং অনেক ইংরেজী বই পড়েছি যা এখন লেখায়  খুব কাজে আসে। এগুলোর সাথে দু‘বার বাংলাদেশে গিয়ে আনা বেশ কিছু বাংলা বইও এখন আমার ঘরে। সব সংকটেই একটা নতুন প্রারম্ভ লুকিয়ে থাকে। শুধু খ্ুঁজে নিতে হয়।
আঠারো বছরের ‘আইয়্যামে জাহেলিয়াত‘ থেকে বের হয়ে তিন বছর সুইটজারল্যান্ডে দ্বিতীয় প্রবাস জীবন থেকে ফিরে এসে বাংলামায়ের শরণাপন্ন হলাম। ২০০৮ এ প্রথম বই প্রকাশ হল ঢাকায়। ঐ বইয়ের মুখবন্ধ (পরিশিষ্ট-৩) লেখার জন্য প্রকাশক আসিফ হাসান মিলনের সাথে যোগাযোগ করার পরই পঁচিশ বছর পরে আমাদের পুরানো ও মৃত সম্পর্কটির নতুন করে ঘন্টা বেজে উঠল। আসিফ ওর সাথে দেখা করার সময় ফ্রাংকফুর্ট থেকে প্রকাশিত ত্রৈমাসিক ‘নিঃশ্বন’ সাথে নিয়ে গিয়েছিল। যাতে আমার ‘ইমদাদুল হক মিলন ঃ কাছে থেকে দেখা’ (পরিশিষ্ট-১) রচনাটি ছিল। লেখায় লেখায় শুরু হল নতুন যুগের সূচনা। ২০০৮ সালে দীর্ঘ পঁচিশ বছর পরে ঢাকায় মিলনের সাথে আবার দেখা হবার কথা, আশাভঙ্গ, উল্লাস, বিষাদ এসব, পরিশিষ্ট-২ পড়লেই জানা যাবে।
এ বইটি লেখার পরিকল্পনা হয় ২০০৮ এ আমি যখন (দ্বিতীয়বার) দেশে গেলাম। মিলনের সাথে ঢাকায় এবারে কয়েকবারই দেখা হয়েছিল। প্রথমবারের ‘মাত্র একবার’ ভালই উশুল হয়েছিল। কথায় কথায় আমি যখন তার নূরজাহান-১ ও ২ পর্ব ইংরেজীতে অনুবাদ করার প্রস্তাব করলাম, ও সানন্দে রাজী হল। ‘অপু ও নূরজাহান’ অধ্যায়ে আমি এর কারন উল্লেখ করেছি। সে সময়েই সে বলল, ‘মামা (মজার ব্যাপার, আমার প্রয়াত ভ্রাতা, আবদুল্লাহ আল-মামুনকে সে বলে মামুনভাই!) আপনি আমাকে নিয়ে একটা বই লিখেন। জীবনী নয়, আমার গল্প-উপন্যাস বা অন্য কোন লেখার কোন আনূপূর্বিক সমালোচনা বা বিশ্লেষন নয়। আপনাকে আমি যে সেই ১৯৭৯-৮১ সালে খুবই একান্তে পেয়েছিলাম এবং আমাকে যে সময়ে আপনি একবারে আপন করে নিয়েছিলেন তা ভিত্তি করে। এখন পঁচিশ বছর পরে যে মিলনকে দেখছেন তাকে নিয়ে। আমার এতগুলি বই প্রকাশিত হয়েছে, দেশে-বিদেশে অসংখ্য পাঠক-পাঠিকা, আমাকে নিয়ে অনেকে্েই অনেক কিছু লিখেছে, কয়েকটি বইও বেরিয়েছে। কিন্ত এত সব কিছুর পরেও, আমার মনে হয় আমাকে নিয়ে অনেক কথাই বলা হয় নি। আমার সঠিক মুল্যায়ন হয় নি। আমার বিশ্বাস, আপনি এটা পারবেন। কারন আপনি আমাকে ঐ সময়ে দেখেছেন যখন আমি সারাদিন রেষ্টুরেন্টে রান্নাাঘরে ‘আবদুল’ হিসেবে অমানুষিক পরিশ্রমের কাজ করে, সারা রাত আপনার সাথে কথা বলতাম, লেখার চেষ্টা করতাম। আমার সেই ‘হাটি হাটি পা পা’ করে লেখক হবার অসম্ভব সাধনার আপনি চাক্ষুস সাক্ষী। আপনিই পারবেন আমার বিবর্তনের কাহিনীটি ঠিকমত তুলে ধরতে। আমি মাঝের পঁচিশ বছরের ব্যবধানটির কথা তুলতেই বলল, আপনার জন্য এটা কোন সমস্যা নয়। আপনি ঠিকই পারবেন, এ সময়টির একটা সজীব এবং নিরপেক্ষ চিত্র তুলে ধরতে। তবে আপনি আমার কিছু বই জার্মানিতে নিয়ে যান। এগুলো পড়লে, আমার বিভিন্ন লেখার ও পেরিয়ে আসা ধাপগুলি বুঝতে পারবেন। আপনি যখন নূরজাহান অনুবাদ করবেন, তখন আরও ভালো উপলদ্ধি করতে পারবেন। কারন ওই বইটি আমি খুব যতœ করে লিখেছি। কাহিনীতে একটি বাস্তব ঘটনার অলোকপাত আছে। দুই বাংলাতেই সমান আদৃত হয়েছে।
ওর কথাগুলি ঠিক। আমি যে মিলনকে, জার্মানিতে ‘আমাদের সেই সব দিন’ এ খব কাছে থেকে দিবারাত্রির সংস্পর্সে দেখেছি, চিনেছি, আর তার তখনকার লেখাতেই ভবিষ্যতের একজন জনপ্রিয় লেখকের ছায়া দেখতে পেতাম, তা আমিই হয়ত আর দশজনকে বিশদ জানাতে পারি। মিলনের আজকে যে হাজার হাজার ভক্ত, তাদের এসব জানার অধিকার আছে। কারন লেখককে ব্যক্তি হিসেবে জানতে পারলে তার লেখাকে আরো ভালোভাবে বোঝা যায়, উপভোগ করা যায়। বিখ্যাত ব্যক্তিদের জীবনী লেখার ঐতিহ্য এ সত্যতেই নিহিত। নিশ্চয়ই আজকের তরুন লেখক-লেখিকারা ্এ বই পড়ে উৎসাহিত হবেন।
মিলনের প্রতি আমার অনেক ঋণ আছে। প্রায় দু‘টি বছর তার ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্য, তার প্রীতি ছাড়াও সে সময়ে তার নতুন লেখার কথা আলোচনা করার সময়, দেশী-বিদেশী সাহিত্যের কথা উঠতো প্রায়ই। শৈশব থেকেই অক্ষরজ্ঞান হবার পর থেকে আমি সাহিত্য-অসাহিত্য হাতের কাছ্ েপেলেই পড়তাম। সেই সব বইপুস্তকের কথা মনে হত। বাংলার সব দিকপাল সাহিত্যিক, কবিগুরু থেকে শুরু করে, মাণিক বন্দোঃ, বিভৃতিভুষন, প্রেমেন্দ্র মিত্র, সমরেশ বসু, তারাশংকর, যাযাবর, জরাসন্ধ, বনফুল, শংকর এরা সবাই কথায় কথায় এসে যেতেন। বাংলা ছাড়াও, ইংরেজী ও আরো অনেক খ্যিাত বিদেশী লেখকদের প্রসঙ্গেও তুমুল আলাচনা চলত আমাদের। আমি দেশে পেশায় ছিলাম ইংরেজীর শিক্ষক। এম এ পাশ করার জন্য মনে থেকে না চাইলেও আমাকে ইংরেজী সাহিত্যের অনেক বিখ্যাত সব বইপত্র পড়তে হয়েছিল। সেসবই এসব আড্ডায় কাজে লেগে গেল। মিলনও সর্বভুক পাঠক। এখন মনে হয়, এক ধরনের পুনর্জন্ম  হয়েছিল আমার।। ১৯৭৭ সালে দেশত্যাগ করার পর ক্রমাগতই বুদ্ধিমত্তার বিচারে তলিয়ে যাচ্ছিলাম। চারদিকে মুর্খ পাকিস্তানী, ভারতীয়, তারা যতটা পারে কাজ করে দিনরাত টাকা রোজগারের ধান্দায় মত্ত। গুটিকতক বাঙ্গালীরও একই দশা।  আনেকেই মেট্রিক পাশও করে নি। প্রচুর কামাই! সর্বত্র সস্তা মদের ছড়াছড়ি। বারে-ডিস্কোতে গিয়ে মেমনাহেব শিকার করাটি তো রাজামহারাজদের মৃগয়ার মত উত্তেজনার ব্যাপার। এবং বাসায় যতক্ষন, ভিডিওতে রিন্তর হিন্দি ফিল্ম চলছে। আমিও তাদের সাথে সামিল হয়ে হিন্দি ছবির বন্যায় ভেসেই গিয়েছিলাম, মিলন এসে রক্ষা করল। ও আসার পর ওর সাথে হিন্দি ছবি দেখা, গান শোনা এবং (অন্য পরিবেশে) মদপান শুরু হল। সাথে সাহিত্যালোচনা আর তুমুল ও নির্দোষ আড্ডা। আরেকটি জিনিষ নতুন করে আবিস্কার কললাম ওর মাধ্যমে। রবীন্দ্র সঙ্গীত। মিলন ভীষন ভক্ত। আমিও পছন্দ করতাম, কিন্ত পাগলের মত শুনতাম না!  ধীরে ধীরে ওর সাথে গুরুদেবের গান ও গানের কথা বিশ্লেষন করে করে এখন আমি আসলেইা রবীন্দ্র সঙ্গীতের পাগল! দিনরাতই শুনি। 
প্রবাসে দৈবের বশে প্রকাশ উপলক্ষে ২০০৮ এর বইমেলায় ঢাকা যাবার পরে ওর সাথে আমার যে মাত্র একবার দেখা হয়েছিল, সে সময়ে লেখার ধরনধারন নিয়ে আমাদের তেমন কথা হয়নি। পরেরবার দেখা হবার সময় একদিন  কথায় কথায় বলল, মামা, আপনার লেখার হাত অত্যন্তÍ চমৎকার। ‘প্রবাসে দৈবের বশে’ আমি দু‘বার পড়েছি। খুবই ভালো লিখেছেন। সেই আশী সালে জার্মানিতেই আমি বুঝেছিলাম, আপনি লিখলে, খুব ভালো লেখক হতে পারেন। কিন্ত আপনার লেখায় কিছু পুরোনো ধাঁচ রয়ে গেছে। আপনি তো বংকিম-বিদ্যাসাগর থেকে পাঠ শুরু করেছিলেন। এবং আপনাদের সময়ে কঠিন শব্দ ব্যবহার করাটি ছিল, শুদ্ধ ও আদর্শ বাংলা লেখার পূর্বসর্ত। এখন যুগ পাল্টে গেছে। এখনকার প্রজন্মের পাঠক-পঠিকারা অনেকেই বংকিমি শব্দের অর্থ জানে না। কঠিন ও অপ্রচলিত শব্দ থাকলে, লেখার গতিও বিঘœ হয়। পড়তে ভালো লাগে না। তাই আপনি যে ভাবে এখন আমার সাথে কথা বলছেন, সেভাবে লিখবেন। একদম সহজ, সরল। যেমন ‘প্রাত্যহিকে’র বদলে ’দৈনন্দিন’ বা ‘সবসময়ের’। যেখানে এড়ানো যায়, একটি বাক্যের মধ্যে ব্রাকেট দিয়ে আরেকটি বাক্য লিখবেন না। এতে পাঠকরা রিবক্ত বোধ করবেন। শেষ কথা, ‘যে’. ‘উনি’, ‘যা’ জাতীয় শব্দগুলি যথাসম্ভব বাদ দেবেন লেখার সময়। ‘যে’ দিয়ে দুটি বাক্য যোগ করলে, গোটা বাক্যটির মাধুর্য প্রায় লোপ পায়। যেখানে এড়ানো যাবে না, সেখানের কথা আলাদা। অনেক জায়গায় এটা আবার জরুরী।
সব কথাগুলিই ঠিক। স্বাধীনতার পর, ১৯৭২ থেকে তার সাহিত্যিক-জীবনের শুরু ধরলে, ২০০৬ সালে (যে সময়ে আমার লেখার প্রথম হাতে খড়ি) তার ৩৪ বছর পেরিয়ে গেছে। সাহিত্যিক হিসেবে এতটা বছরই সে আমার সিনীয়ার।  কাজেই তার লেখার ব্যাপারে আমাকে কিছু কার্যকরী উপদেশ দেবার পূর্ণ অধিকার আছে। ওর কাছে এসব শোনার পরই আমি আমার লেখার অনেক ভোল পাল্টে ফেলেছি। কঠিন শব্দ পারতপক্ষে ব্যবহান করি না। বাক্যে ব্রাকেট এড়িয়ে যাই। যারা আমার প্রথম দিককার লেখা (বা ‘প্রবাসে দৈবের বশে’) এবং গত দু বছরের লেখা  বা শেষ বই, (অঙ্গবিহীন আলিঙ্গন’) পড়েছেন, তারা পরিবর্তনটি টের পাবেন,আশা করি।
দ্বিতীয়বার দেশে গিয়ে গতবছর (২০০৯) মার্চে জার্মানিতে ফিরে এসে ওর বই পড়া শুরু করি। ওর পছন্দ করা মোট আটটি বই দিয়েছিল (নূরজাহান-১ ও ২ বাদে) আমাকে। নুরজহান-১ অনুবাদ শুরু করি এ বছর (২০১০)ফেব্রয়ারী।
শেষ হয় অগাষ্টে। আপাতত নূরজাহান-২ অনুবাদ করছি না। সামনের বছর শুরু করব।
নূরজাহান-১ অনুবাদ করার সময়ই লেখক ইমদামুদল হক মিলনের ভেতরের অন্য একটি রূপ ভেসে উঠতে থাকে। সে মুলত শহুরে নাগরিক নয়। আসলেই একটা ‘গ্রাম্য’ লোক। নাগরিক জীবন নিয়ে যতই হালকা উপন্যাস লিখুক না কেন! বাংলাদেশের গ্রামীন সমাজ, রীতিনীতি, সাধারন নিগৃহিত, শোষিত কৃষক, কামিন-মজুরদের নিত্যদিনের সুখদুঃখ, নূরজাহানের প্রতিটি লাইনেই সুস্পষ্ট হয়ে ধরা দিয়েছে। আমি ‘পরিশিষ্ট-২’ এ তাকে এ অনুরোধই করেছি, গ্রাম-বাংলার যে আদি রূপটি আজ বিশ্বায়নের তান্ডবে ক্রমেই বাংলাদেশ থেকে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে, তা যেন ও তার শৈশবের স্মৃতি থেকে তার লেখায় ধরে রাখে, আগামী প্রজন্মের জন্য। এত সুন্দর বর্ণিল ও সঠিক গ্রামবালার চিত্রন আমি বিভুতিভুষনের ‘পথের পাঁচালির’ পর আর কোথাও পাই নি। সে জন্যই অন্য একটি অধ্যায়ে আমি ‘নূরজাহান ও অপু’র একটি  তুলনামুলক আলোচনা করেছি। ‘কালোত্তীর্ন নূরজাহানে’ এ উপন্যাসটির চরিত্র, কাহিনী ও প্রেক্ষাপট নিয়ে কিছু অলোচনা করা হয়েছে। 
মিলনের লেখা প্রকাশিত যে বইটি আমি প্রথম পড়েছি তা হল, ‘পরাধীনতা’। অনেক আগে। সম্ভবতঃ ১৯৮৬ সালে।  তবে এর আগে ১৯৮৪ সালে তৎকালিন বিচিত্রার ইদ-সংখ্যায় পড়েছিলাম, ‘পরবাসে’। পড়ার পরই বুঝতে বাকি রইল না, এটার নায়ক আমি নিজেই। এক সময়ে আমি বাংলাদেশে কলেজে ইংরেজী পড়িয়েছি। সে আমাকে অধ্যাপক আবদুল্লাহ নামেই বইতে নাম দিয়েছে। কিন্ত ইংরেজীর বদলে বাংলার অধ্যাপক বানিয়েছে। কোন ব্যাপার না, দুটিই তো সাহিত্য। এ দুটি বই নিয়ে আমি আলাদাভাবে অলোচনা করেছি। পরবাসের মূল বইটি (বাংলায়) এখন আর নাকি পাওয়া যায় না। ওটার ইংরেজী অনুবাদটি আমি গতবছর সাথে করে এনেছিলাম। অন্য ভাষায় আবার পড়া হল। এ দুটি বই ও বিশেষ করে নূরজাহান ছাড়াও একটি আলাদা অধ্যায়ে ওর আরো কয়েকটি বইয়ের উপর আমার ভালোমন্দ লাগার কথা বলেছি। 
আমি বাংলাদেশের সমকালীন কোন উপন্যাসিক বা গল্পকারকে আমার এ বইতে উল্ল্খে করা থেকে বিরত থেকেছি। এটি নিতান্তই ইমদাদুল হক মিলনকে নিয়ে একটা ব্যক্তিগত কথাবার্তা। ব্যক্তি-মিলনকে আমি লেখক-মিলনের চেয়ে বেশী গুরুত্ব দিতে সচেষ্ট থেকেছি। আমি একজন উন্মত্ত পাঠক। সেই সব লেখককের বই আমার ভালো লাগে, যারা আমার হৃদয়ের কাছাকাছি, যাদের লেখায় আমার বোধ ও চেতনার সাক্ষাত মেলে। বাংলাদেশের অনেক কবি-সাহিত্যিককেই আমি এক সময়ে ব্যক্তিগতভাবে চিনতাম। তবে এখন আর কাউকে বন্ধু বলতে পারি না। কারন দেশত্যাগের পর প্রায় সবার সাথে এখন আমার সমস্ত যোগাযোগই বিচ্ছিন্ন হয়ে েেগছে।
মিলনের কথা আলাদা। জার্মানিতে অতি স্বল্প সময়ে আমরা একে অপরের সাথে খুবই আপন হয়ে গিয়েছিলাম। এটা দেশে থাকলে হতো কি না জানিনা। হয়ত আট হাজার মাইল দুরত্বে, বিজন প্রবাসে এবং দুজনের একাকিত্বের জন্যই এটা সম্ভব করেছিল। সে সময়ে আমরা কোথাও আমাদের মনমত সঙ্গী পাই নি। সেই তখন থেকেই আমি তাকে অনুজসম তরুন বন্ধু মনে করি। মাঝে যতই ব্যবধান হয়ে থাক না কেন।
একটা সত্যি আমার মনে নিত্য দোলা দেয়। আশী শতকের শুরুতে যদি মিলনের সাথে জার্মানিতে আমার দু‘বছরের একটা নিকট সখ্যতা না ঘটতো, আমি জীবনসায়াহ্নে (হয়ত) কখনই লেখালেখি শুরু করতাম না। সামান্য যে কিছু ্এখন লিখতে পারি, তার সূচনা সে সময়েই হয়েছিল। মাঝে অনেক ক‘টি বছর আমি বাংলা-বৃত্তের বাইরে ছিলাম। একটা কৃত্রিম জীবনে জোর করে প্রবেশ করতে গিয়ে আত্মপরিচয় বিস্মৃত হয়েছিলাম। পথভ্রান্তি তো এটাই! সে শাপ থেকে মুক্তি হবার পর, অবচেতন মনে লেখার যে আকাংখাটি সুপ্ত হয়েছিল তা আবার আত্মপকাশ করতে চাইল। এ আকাংখার সবচেয়ে বড় জুড়িদার মিলন। এ গানটি কোনদিনই গাওয়া হত না আমার যদি, ‘আমাদের সেই দিন’ গুলিতে এর সুরটি বেঁধে দিয়ে না যেত। এ বইটি সেই মধুর সুরের স্বীকৃতি।

নভেম্বর, ২০১০
নয়ে ইজেনবুর্গ, জার্মানি
     
Untitled Document
প্রদর্শনী

বাংলার জল-ছবি
তন্দ্রা মুখার্জী

video video
Copyright © Life Bangladesh
সাপলুডু মূলপাতা | মতামত Contact : shapludu@gmail.com