Untitled Document
ভাদ্র সংখ্যা ১৪১৮
মূলপাতা শিরোনাম বটতলা পঞ্জিকা প্রদর্শনী
রাস্তা চিন্তা (দ্বিতীয় পর্ব)
- এ,এফ,এম, “শিপু” মনিরুজ্জামান



সত্যিকারের দেশপ্রেমের বহিঃপ্রকাশ কেমন হওয়া উচিৎ সেটা জানা আমাদের জন্য খুব জরুরী। শুধু নিজের ড্রইং রুম আর নিজের গাড়ীর প্রতি ভালবাসা, অথবা নিজের সুবিধামত ট্রাফিক আইন (দেশের যে কোন আইন-কানুন) অথবা যেকোন সমস্যা থেকে নিজের দায়িত্বকে এড়িয়ে সরকারকে দায়ী করা আসলে কোন দেশপ্রেমের উদাহরণ নয়। রাস্তা বন্ধ করে সম্মেলন বা অন্য কিছু করা, যানবাহনে আগুন লাগানো ইত্যাদি বন্ধ করতে হবে। কোন একটি বিশেষ রাজনৈতিকদলের দেশপ্রেম নেই অজুহাত দেখিয়ে তাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে গিয়ে যদি আপনি নিজেই রাস্তা বন্ধ হবার কারণ হয়ে পড়েন অথবা যানবাহনে আগুন লাগান তা’হলে বলব বরং দেশপ্রেম বলতে কি বোঝায় সেটা আপনি নিজেই জানেন না এবং আপনি দেশের আরো অনেক বড় শত্রু। মনে রাখতে হবে যে,  আপনার ড্রইং রুমকে হাজার সুন্দর করে সাজিয়ে রাখলেও যদি আপনি জানালা দিয়ে রাস্তায় ময়লা ছুঁড়ে ফেলেন তবে সেই ময়লাটা আপনার বা আপনার অতিথির পায়ে জড়িয়ে অথবা, পচে দুর্গন্ধ হয়ে বাতাসে ভেসে আপনার ঘরেই ফিরে আসবে।
রাস্তা দিয়ে চলার সময় আমরা যদি শুধু ট্রাফিক এবং নগর আইন গুলো মেনে চলি তাহলেই কিন্তু আমাদের রাস্তার ভোগান্তি অনেক দূর হয়ে যায়। এ আইন গুলো মেনে চলার জন্য আসলে একটু ধৈর্য্য থাকলেই চলে।
যাত্রীভর্তি একটি বাস পানিতে পড়ে ডুবে যাওয়ার পর বাসটিকে পানি থেকে তোলার পরে আমরা দেখতে পাই যে, যাত্রীরা সবাই একসঙ্গে মরিয়া হয়ে জানালা বা দরজা দিয়ে বের হওয়ার চেষ্টা করতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত কেউই আর বের হতে পারেনি এবং সবাই দরজা/জানালায় গাদাগাদি হয়ে আটকে পড়ে মারা গেছে। একজন আরাকজনকে টপকে আগে বের হওয়ার চেষ্টা করতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত কেউই আর বের হতে পারেনি। অথচ পিছনের মানুষরা যদি আগে যাবার চেষ্টা না করে দম বন্ধ রেখে একটু ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে পারত তা’হলে দরজা / জানালার মুখে জ্যামের সৃষ্টি হত না, আগের জন আগে বের হয়ে যেত এবং পরের জন পরে বের হয়ে যেতে পারত।
আমাদের দেশটা আটকে পড়ে থাকার সবচেয়ে বড় কারণ এই একজন আরাকজনকে টপকে আগে যাবার চেষ্টা বা ওভারটেকিং টেন্ডেন্সি। এক্ষেত্রে কবি কবির হোসেন তাপসের ছোট বেলার একটি গল্প আমার মনে পড়ছে। ৮০’র দশকের প্রথম দিকের কথা। ঈদের দিন খুব শখ করে কিশোর তাপস যশোরের ‘চিত্রা’ নামক সিনেমা হলে গিয়েছিলেন ঈদের সিনেমা দেখতে। গায়ে ঈদের নতুন পাঞ্জাবী। টিকিট কাউন্টারের সামনে বেশ ভীড়। কোন লাইন বা সিরিয়াল এর বালাই অবশ্যই নেই। যে যেভাবে পারছে একটু একটু করে আগে যাবার চেষ্টা করছে। ছোট্ট তাপসও আস্তে আস্তে টিকিটকাউন্টারের বেশ কাছাকাছি পৌঁছে গেছেন। আর একটু এগুতে পারলেই তিনি তাঁর স্বপ্নের টিকিটটা কেটে ফেলতে পারবেন। ঠিক এমন সময় ঘটল সেই ঘটনাটি। হঠাৎ একটা ঝোড়ো হাওয়ার মত করে পিছন থেকে কেউ একজন তাঁর ঘাড় ডিঙ্গিয়ে, তাকে টপকে চলে গেল একদম টিকিটকাউন্টারের সামনে। আর সে সাথে ছিঁড়ে দিয়ে গেল কিশোর তাপসের সখের ঈদের পাঞ্জাবীটা। আসলে লোকটি তাঁকে টপকাতে গিয়ে তাঁর পাঞ্জাবীর গলার কাছে পাড়া দিয়ে, পাঞ্জাবীটার গলা থেকে নীচ পর্যন্ত বিশ্রীভাবে ছিঁড়ে দিয়ে গেছে। কিশোর তাপস ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলেন। শোকে পর্যবসিত হল তাঁর ঈদের সকল আনন্দ। সিনেমা আর দেখা হলনা। পাঞ্জাবী সেলাই করা নিয়ে ব্যস্ত থাকলেন সারাদিন।……  আজকাল হয়ত কিছু কিছু সিনেমা হলের টিকিট কাউন্টার বা বাস কাউন্টার এই অসভ্য বর্বরতা থেকে মুক্ত হয়েছে; মানুষ লাইন দিয়ে দাড়াবার মত বুদ্ধিমত্বাও অর্জন করেছে তবে রাস্তার দৃশ্য কিন্তু এখনো সেই একই রকম বর্বর।
পাঠক, আমরা রাস্তার জ্যাম নিয়ে এখন বেশ উদ্বিগ্ন। এ নিয়ে বহুরকম পরিকল্পনা, আলোচনা ইত্যাদি চলছে আমাদের দেশে। কিন্তু আমার প্রশ্ন হচ্ছে আমাদের সমস্যা কি আসলে এই জ্যাম না কি অন্য কিছু? শুধু জ্যামই যদি আমাদের সমস্যা হত তা’হলে ধরে নিতাম জ্যামের কারণে আমাদের সময় নষ্ট হওয়াটাই আমাদের সমস্যার কারণ। কিন্তু ভালকরে হিসেব করে দেখুন জ্যামের কারণে সময় নষ্ট হওয়াটা কিন্তু আমাদের কাছে আসলে প্রকৃত সমস্যা হয়ে দাড়ায়নি। এর থেকেও আমাদের কাছে যে সমস্যা আরো অনেক বড় হয়ে দাড়িয়েছে তা’হল বাসে সিট না পাওয়া বা বাস না থাকা, সিএন,জি না পাওয়া, রিক্সা না পাওয়া, ভাঙ্গাচোরা রাস্তাতে দীর্ঘ সময় গাড়ীর ধোঁয়ার মধ্যে ঘর্মাক্ত শরীরে অবস্থান করা, বাসের কন্ডাক্টারের সাথে ভাড়া নিয়ে মারামারি করা, সহ-প্যাসেঞ্জারের সাথে কথা কাটাকাটি করা, বাসে ঝুলে থাকা, সি,এন,জি’র ড্রাইভারের সাথে অহেতুক ভাড়া নিয়ে যুদ্ধ করা এবং তারপর খাঁচার মধ্যে দম বন্ধ করে বসে থাকা, রিক্সাতে চড়লে এ পথ সে পথ ঘুরে ঘুরে এক দিকে রিক্সা ছেড়ে রাস্তা পার হয়ে আরাকদিকে গিয়ে আরাকটা রিক্সা নেয়া অথবা ভাঙ্গা ফুটপাথ দিয়ে হেঁটে চলা (যেখানে কিছুক্ষণ পরপর পিছন থেকে মোটরসাইকেল এসে কাণ ফাটিয়ে হর্ণ দেবে), এভাবে চারিদিকে কাণ ঝালাপালা করা হর্ণ শুনতে শুনতে, কালো ধোঁয়া এবং ডাস্টবিনের পচা দুর্গন্ধের মধ্য দিয়ে নিশ্বাস নিতে নিতে, ভাঙ্গা রাস্তা, ধুলা,ময়লা, কাদা, দুর্গন্ধ ইত্যাদি সম্বলিত রাস্তায় দীর্ঘ সময় থাকতে থাকতে আমরা ক্লান্ত হয়ে পড়ি। শুধু ক্লান্ত নয়, আমাদের ইন্দ্রিয়ে ক্ষোভ, হিংস্রতা, ইত্যদিরও জন্ম হয় প্রতি মূহুর্তে। যার কারণে আমারা অহেতুক রিক্সাওয়ালা, দোকানদার, পথচারী, সহকর্মী, আত্মীয় বা নিজের সাথে কলহে জড়িয়ে পড়ি। পিছিয়ে যায় আমাদের জীবন। প্রতিদিন নরকের দিকে এগুতে থাকি আমরা।
রাস্তায় জ্যাম থাকলেও যদি অহেতুক কোন শব্দ-ধোঁয়া-দুর্গন্ধ-অনিয়ম ইত্যাদি রাস্তায় না থাকত অথবা পর্যাপ্ত বাস বা অন্যান্য যানবহন এবং সহজে হাটার মত ফুটপাথ আমাদের রাস্তায় থাকত তা’হলে আমদের জীবন কিন্তু অনেক সহজ ও সুন্দর হত। একটু কল্পনা করে দেখবেন কি রাস্তার সময়টুকু যদি আমরা নিশ্চিন্তভাবে কাটাতে পারতাম তাহলে কেমন হতে পারত আমাদের জীবনটা?
সুন্দর জ়ীবন উপভোগ করতে হলে আসলে দরকার সুন্দর রাস্তাপরিবেশ। আর সে রাস্তাপরিবেশ কিন্তু আমারাই তৈরী বা রক্ষা করতে পারি অনেক সহজেই। তার জন্য দরকার শুধু ছোট ছোট কিছু বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে পালন করা। …
(চলবে)…
     
Untitled Document
প্রদর্শনী

বাংলার জল-ছবি
তন্দ্রা মুখার্জী

video video
Copyright © Life Bangladesh
সাপলুডু মূলপাতা | মতামত Contact : shapludu@gmail.com