Untitled Document
ভাদ্র সংখ্যা ১৪১৮
মূলপাতা শিরোনাম বটতলা পঞ্জিকা প্রদর্শনী
বঙ্গীয় শব্দার্থকোষ বাঙালির জীয়নকাঠি বাঙালির সম্পদ
- তুষার গায়েন


[২৪ অক্টোবর ২০০৯, যাদবপুরের (পশ্চিমবঙ্গ) ইন্দিরাপ্রভা ভবনে অনুষ্ঠিত হল কলিম খান ও রবি চক্রবর্তী প্রণীত ‘বঙ্গীয় শব্দার্থকোষ’(১ম খণ্ড)-এর প্রকাশনা উৎসব। অনুষ্ঠানে ঢাকা, আগরতলা ও পশ্চিম বঙ্গের কলকাতাসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে কবি, সাহিত্যিক, গবেষক ও লিটল ম্যাগাজিনের সম্পাদক ও কর্মীরা এসে জড়ো হয়েছিলেন। এঁদের মধ্যে ঢাকা থেকে মীজানুর রহমানের ত্রৈমাসিক পত্রিকার সম্পাদক প্রয়াত মীজানুর রহমানের স্ত্রী নূরজাহান বকশী ও সংস্কৃতিকর্মী সালাম আজাদ, জামসেদপুর থেকে কবি বারীন ঘোষাল ও লেখক নীলাঞ্জন চট্টোপাধ্যায়, আগরতলা থেকে লেখক নিখিল দেবনাথ, শিলিগুড়ি থেকে নারায়ন চন্দ্র দাস, কলকাতার প্রখ্যাত গান্ধীবাদী ও লেখক শৈলেশ কুমার বন্দোপাধ্যায়সহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন। কলিম খান ও রবি চক্রবর্তীর লেখা ও তাঁদের সাথে দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ পরিচয়ের সূত্রে আমিও আমন্ত্রিত হয়েছিলাম অনুষ্ঠানে; কিন্তু ভৌগলিক দূরত্ব আমাকে সেই সূবর্ণ সুযোগ থেকে বঞ্চিত করেছে। অগত্যা এই প্রকাশনা উপলক্ষে আমি একটি শুভেচ্ছা বার্তা পাঠিয়েছিলাম, যা অনুষ্ঠানে পাঠ করা হয়। এখানে সেই লেখাটি পত্রস্থ করা হ’ল।]

আজ ২৪ অক্টোবর ২০০৯, ‘বঙ্গীয় শব্দার্থকোষ’-এর প্রথম জন্মদিন। এই জন্মদিন এমন এক সমগ্রতা অভিমূখী যা আরো অনেক জন্ম ও মৃত্যুকে অতিক্রম করে এসেছে। যে পথে তার এই চৈতন্যবিহার তা জিজ্ঞাসা ও অনুসন্ধান, সংশয় ও আবিষ্কার, হতাশা ও উল্লাস, বন্ধুত্ব ও বিরোধে পূর্ণ অনেক আলোছায়াময় প্রপঞ্চে ঘেরা। আজ সশরীরে আমার উপস্থিত থাকার কথা, কিন্তু সময় ও ভূগোল আমার সহযোগী নয়। তাই শব্দ দিয়েই স্তব রচনা করার ত্রুটি ও আনন্দ আমি আপনাদের সাথে ভাগ করে নিতে চাই।‘বঙ্গীয় শব্দার্থকোষ’ ও তার রচয়িতাদের নিয়ে কিছু বলার আগে এর প্রেক্ষিত নিয়ে কিছু বলা একান্ত জরুরী!

    শৈশবের গণ্ডি পেরিয়ে চৈতন্যলোকে প্রবেশের শুরুতেই এক সুষম সমাজ ব্যবস্থার স্বপ্নে অনেকের মতো আমিও আক্রান্ত হয়েছি, আর তাকে প্রত্যক্ষ করার সূবর্ণ সুযোগ আমার এসে যায় কৈশোর অতিক্রান্ত তারুণ্যের শুরুতেই। গত শতাব্দীর মধ্য-আশিতে আমি সোভিয়েত ইউনিয়নে যাই স্থাপত্যবিদ্যা নিয়ে পড়াশুনা করতে। সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার ভিতরে বসে তাকে দেখা – সেই বিশাল দেশের বহুজাতি ও সম্প্রদায়ের সাথে পরিচিত হওয়া এবং তাদের স্বপ্ন ও স্বপ্নভঙ্গের বেদনার সাথে ঘনিষ্ঠ হয়ে আমি উপলব্ধি করি যে, মতান্ধ হওয়ার অবকাশ নেই যদি তা প্রয়োগে চরিতার্থ না হয়। সঙ্গতই প্রশ্ন জাগে, সমস্ত মানবিক প্রত্যয় ও আশাবাদ নিয়েও মতবাদ ব্যর্থ হয় কেন? তখন পেরোস্ত্রোইকার কাল। ফলে ভিতর ও বাইরে থেকে সাধারণ মানুষের সংক্ষোভ ও জিজ্ঞাসা, ভাবুক এবং চিন্তাবিদদের বিশ্লেষণ ও আলোচনার সাথে পরিচিত হয়ে নতুন করে সবকিছু বুঝে নিতে চেষ্টা করি। এর ভেতরেই সবকিছু ভেঙে পড়ে! সোভিয়েতসহ বিশ্বব্যাপী সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার বিপর্যয় আমাকে গভীরভাবে আশাহত ও বিমূঢ় করে দেয়। পড়াশুনার পাট চুকিয়ে নব্বইয়ের শুরুতেই দেশে ফিরে আসি, এবং সে সময়ে আরো এক অনাকাঙ্ক্ষিত উপমহাদেশীয় অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হই। তা’ হল, পারিবারিক সদস্যের চিকিৎসাসূত্রে, বোম্বেতে অবস্থানকালে বাবরী মসজিদ ভাঙাকে কেন্দ্র করে ভারতে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার চাক্ষুষ অভিজ্ঞতা ও তার প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সংখ্যালঘু নির্যাতন ও নিধনের উৎসব! এমনই এক অবস্থায় আমি বইপত্র ঘাটি, অনুসন্ধান করে চলি এইসব বিপুল ধ্বংসযজ্ঞ ও হিংস্রতার সূত্রাবলী উদঘাটনে। তখনই অকস্মাৎ আমার হাতে এসে পড়ে কলিম খানের প্রথম বই ‘মৌলবিবাদ থেকে নিখিলের দর্শনে’। পড়ে আমি অভিভূত হয়ে যাই এবং অনুভব করি মৌলবাদ বলতে আমরা ধর্মীয়, সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে তার বাহ্যিক পরিসর থেকে যা বুঝে থাকি, বাস্তবে এর শেকড় অনেক গভীরে প্রোথিত যা কি না রয়েছে প্রকৃতির স্বভাবধর্মেই এবং তাকে (মৌলবাদ) অতিক্রম করার মধ্য দিয়ে প্রকৃতির উচ্চতর বিকাশের সাধনায়। কলিম খান বইয়ের শুরুতেই জানিয়ে দেন যে, সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার বিপর্যয়ে তিনি হারিয়েছেন তাঁর মানসিক আবাসগৃহ যা তাকে এতকাল সুরক্ষা দিয়ে এসেছে। আর এই ধ্বংসযজ্ঞের কারণ উদঘাটন ও নতুন মানসিক আবাসগৃহ নির্মানের তাগিদে তিনি অনুভব করেন যে, ইতিহাসের অন্ধ গলিপথে এর সম্ভাব্য উত্তর রয়ে গেছে যার পাঠোদ্ধার ব্যতীত সমাধান অসম্ভব। কিন্তু যে ভাষা ও ভূগোলের তিনি অন্তর্গত তার অতীত ইতিহাস অনাবিষ্কৃত, যদিও ইশারা রয়ে গেছে এমন সব বই-পুস্তকে যা আমরা নিতান্তই রূপকথা ও কল্পগল্প হিসেবে জানি। হরিচরণ বন্দোপাধ্যায়ের ‘বঙ্গীয় শব্দার্থকোষ’-এর সন্ধান তাঁকে দেয় নতুন উল্লাস, বাংলাভাষার এক গৌরবময় বিস্মৃত ইতিহাসকে তিনি তুলে আনেন যেখানে ভাষার প্রতীকী শব্দবিধির বিপরীতে রয়ে গেছে ক্রিয়াভিত্তিক শব্দার্থবিধির যাদুকরী সঞ্চালন, যা শব্দের বাইরে থেকে কোন আরোপিত অর্থ নয়, বরং বিশ্বাস করে শব্দের ভিতর থেকে তার অর্থ নিষ্কাশন করার অমোঘ পদ্ধতিতে। এই নিয়মে তিনি যখন রামায়ন, মহাভারত, পুরানাদিসহ প্রাচীন গ্রন্থাবলীর পাঠোদ্ধার করেন এবং তা পাঠকের সামনে হাজির করেন, তখন আমরা বিহ্বল হয়ে দেখি যে, নগদ-নারায়ণকে বিশ্লেষণ করে তিনি উপস্থাপন করেছেন ভারতের ডাস-ক্যাপিটাল ও পুঁজির বিশ্বরূপ দর্শনের কথকতায় অথবা বাৎস্যায়নের কামসূত্রের পাঠোদ্ধার করে দেখান কেমন ছিল প্রাচীন ভারতের ম্যানেজমেন্ট। এইভাবে শুধু প্রাচীন ভারতের ইতিহাস নয়, বরং প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের দর্শন, ইতিহাস ও জ্ঞানশাখার বিভিন্ন মাধ্যমকে পাশাপাশি ও পরিপূরক সত্তায় প্রয়োগ করে তিনি মানব সভ্যতার অনাবিষ্কৃত আদি ইতিহাস থেকে সমকালীন সভ্যতার সংকটকে আশ্চর্য প্রজ্ঞায় উপস্থাপন করেন, যার দ্বিতীয় প্রকাশ আমি পাই তাঁর ‘দিশা থেকে বিদিশায়’ নামক গ্রন্থে।

    ১১৯৮ সালে আমি কলকাতায় কলিম খানের সাথে সাক্ষাৎ করি যা পর্যবসিত হয় ঘন্টার পর ঘন্টা, দিনের পর দিন রুদ্ধশ্বাস তুমুল আড্ডায়, অধীত পাঠের অন্তরঙ্গ বিশ্লেষণে ও পরম আত্মীয়তায় যা আজ এক দশকেরও অধিক সময়ে সমান উজ্জ্বলতায় বিরাজ করছে। কানাডায় অভিবাসী হবার আগে আমি বহুবার কলকাতা গিয়েছি এবং দেখেছি বস্তুজীবনের মায়া সম্পূর্ণ পরিত্যাগ করে, স্ত্রী ও সন্তানদের সম্মতিতে অর্থকষ্টকে নিত্য সঙ্গী করে এক নিঃশব্দ সাধনায় তিনি নিরন্তর এগিয়ে চলেছেন যে গৌরবের অংশীদার তাঁর পরিবারের সকলেই। এরই ভিতর আবির্ভাব ঘটেছে আরেক মহাত্মার, তিনি রবি চক্রবর্তী; ইংরেজী ভাষা, প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য দর্শনের সুপণ্ডিত যিনি আজীবন বাংলা ও ভারতের অতীত ইতিহাসকে সন্ধান করেছেন, মানে খুঁজেছেন প্রাচীন গ্রন্থাবলীর – এবার তাঁর পথ এসে মিলে যায় কলিম খানের সাথে। শুরু হয় তাঁদের যৌথ রচনার কাল। এতকাল কলিম খান ছিলেন নতুন জ্ঞানের জগতে নিঃসঙ্গ, আওয়াজ করলে তার কাঙ্ক্ষিত প্রতিধ্বনি পাচ্ছিলেন না কোনো প্রাজ্ঞ পাহাড় থেকে, সবসময় যাচাই করা সম্ভব হচ্ছিল না আবিষ্কারের আবেগ থেকে তার যাথার্থকে মুক্ত করে দেখার। এবার রবি চক্রবর্তী তাঁর আজন্ম আবিষ্কারস্পৃহা ও পাণ্ডিত্যের নিরঞ্জন দৃষ্টিতে সে কাজটিই করতে লাগলেন পরম মমতা ও আশ্চর্য কুশলতায়। এটা এক যুগলবন্দী নিরবচ্ছিন্ন সাধনার কাল, যার যৌথ ফসল আজকের এই ‘বঙ্গীয় শব্দার্থকোষ’। আমার সৌভাগ্য যে, এই শব্দকোষ রচনার সিদ্ধান্তের দিন থেকে আজ পর্যন্ত এর প্রতিটি ধাপে ধাপে এই দুই মহান ব্যক্তির সাথে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের মাধ্যমে আমি এর অগ্রগতি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল থেকেছি এবং রবি চক্রবর্তীর মত সুপণ্ডিত ও সহূদয় মানুষের স্নেহ-সান্নিধ্য পাবার সুযোগও লাভ করেছি। এই কাজের ফাঁকে ফাঁকে কলিম খান ও রবি চক্রবর্তী আরো কিছু জরুরী কাজ সেরে ফেলেছেন, যার ভেতর ‘অবিকল্পসন্ধান’ বইটির কথা বলতেই হয়। যে মানসিক আবাসগৃহ ভেঙে যাবার মনস্তাপে কলিম খান যাত্রা শুরু করেছিলেন ও অনুরূপ আকাঙ্ক্ষায় রবি চক্রবর্তী এসে জড়ো হয়েছিলেন তাঁর সাথে, এই বইয়ে তাঁরা তাঁদের মানসজাত সেই আবাসগৃহের সন্ধান দিয়েছেন। তাঁরা উপস্থাপন করেছেন নতুন ধরণের সমাজ ও যোগাযোগ ব্যবস্থা, উৎপাদন ব্যবস্থা ও উৎপাদন সম্পর্কের কথা যার মাধ্যমে মানবসভ্যতার রাহুমুক্তির প্রত্যাশা তাঁরা করেন। আর এই কাজে তাঁদের সহায়ক হয়েছে বাংলা ভাষার ক্রিয়াভিত্তিক শব্দার্থবিধির ব্যবহার। এই বিস্মৃত ক্রিয়াভিত্তিক শব্দার্থবিধির ধারাতেই নতুন নতুন আবিষ্কার ও সংযোজনার মাধ্যমে, অতলস্পর্শী ব্যাখা ও বিশ্লেষণ সহযোগে যে শব্দকোষ তাঁরা পাঠকের সামনে উপস্থাপন করেছেন তা শুধু বাংলাভাষী পাঠকের কাছেই নয়, বিশ্বের সব ভাষাভাষী পাঠকের কাছে এই বার্তাই পৌঁছে দিলেন যে, প্রত্যেক জাতিই তার ভাষার বিস্মৃতপ্রায় ক্রিয়াভিত্তিক শব্দার্থবিধির পুনরুদ্ধার ও প্রয়োগের মাধ্যমে প্রাচীন গ্রন্থাদির অর্থ নতুনভাবে সনাক্ত করতে পারবে যা মানব সভ্যতার আদি ইতিহাস পুনরুদ্ধারের কাজে সহায়ক হবে, এবং এর অভাবে আগামী পৃথিবীর কাঙ্ক্ষিত রূপসঞ্চালনে আমরা ব্যর্থ হব। আর বিশেষভাবে বাঙালি, ঔপনিবেশিক কালপর্বে আত্মবিচ্ছেদের ফলে নিজের ভাষা ও সংস্কৃতির যে বিপুল গৌরব থেকে বিচ্যুত হয়েছিল, তাকে পুনরুদ্ধার করে সাংস্কৃতিক হীনমন্যতা থেকে মুক্তি খুঁজে পাবে যা প্রকৃত বঙ্গমানসকে সনাক্ত করে সর্বপ্রকার ঔপনিবেশিক শাসনের স্মৃতি ও রক্তচাপ পিছনে ফেলে অগ্রসর হবে সুষম ও সামঞ্জস্যপূর্ণ সমাজের দিকে যার জন্য হাজার বছর ধরে আমরা নিরন্তর হেঁটে চলেছি।

জয় হোক বঙ্গীয় শব্দার্থকোষের! দীর্ঘজীবি হোন কলিম খান ও রবি চক্রবর্তী!!

ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন! সবাইকে শুভেচ্ছা!!`

 

টরন্টো, কানাডা
অক্টোবর ২৪, ২০০৯

 

পুনশ্চ: ইতোমধ্যে ‘বঙ্গীয় শব্দার্থকোষ’ – ২য় খণ্ড প্রকাশিত হয়েছে, জানুয়ারি ২০১১ সালে।
     
Untitled Document
প্রদর্শনী

বাংলার জল-ছবি
তন্দ্রা মুখার্জী

video video
Copyright © Life Bangladesh
সাপলুডু মূলপাতা | মতামত Contact : shapludu@gmail.com