Untitled Document
ভাদ্র সংখ্যা ১৪১৮
মূলপাতা শিরোনাম বটতলা পঞ্জিকা প্রদর্শনী
‘ঢাকায় আইলে মনে হয় কী জানি নাই,
কী জানি একটা থুইয়্যা আইসি বাড়িতে!’
- আফরোজা সোমা



ধানমন্ডি ছয় নম্বর মোড়ে, গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতালের উল্টো দিকে একটি ছোট্ট দোকান। নাম সারেগামা। গানের সিডি, সিনেমার সিডি, ডিভিডি বিক্রি হয় এখানে। এখানেই সকাল থেকে রাত অব্দি আজগরের ঠিকানা।
-আজগর, এই ব্যবসায় কদ্দিন হলো আপনার?
-বহুদিন। অনেক বছর আগে শুরু করছি, এখন প্রায় আট বছর।
-আট বছর আগে কী করতেন?
-অন্য ব্যবসা করতাম। কিন্তু সেইগুলো ভালো লাগে নাই। তাই এই ব্যবসায় আছি। ভালোই লাগতেসে আপাতত।
- আপাতত কেন? এটাও পাল্টাবেন নাকি?
- হ্যাঁ, ভাবতেসি। মানে, আমার এক ভাই থাকে মালয়েশিয়া আর আরেক ভাই থাকে দুবাই। দুই ভাই দুই দেশ থিইক্যা চেষ্টা করতেসে। হয়তো আমারো চইল্যা যাইতে হবে কোনো একটা দেশে। আমার পাসপোর্টও হইয়া গেছে। কিন্তু এই যাওয়াটা নিয়াই বেশ দোনামোনায় আসি।
-কিসের দোনামোনা?
- দোনামোনাটা হইলো গিয়া, যে, আমি হইলাম খুব মা ভক্ত। মানে মা নেওটা মানুষ আরকি। এইহানে তো যখন ইচ্ছা দৌড় দিয়া যাইগা চাঁদপুর। গিয়া মায়ের কাছে কয়দিন থাইক্যা আসি। মনটা শান্ত হয়। কিন্তু বিদেশ তো অনেক দূর। অতো দূরের দেশ থিইক্যা তো চাইলেই আসা যায় না। অনেক টাকার মামলা। অতো টাকা খরচ কইরা তো আর যখন তখন আসা যায় না। তাই মনটা দোনামোনায় আছে। আর এইটা ছাড়া আরেকটা কারণও অবশ্য আসে।
- সেই কারণটা কী?
- সেইটা হইতাসে গিয়্যা, যে, ধরেন, এইটা হইলো আমার নিজের দেশ। আর যেখানে যামু, সেইটা হইলো গিয়্যা পরের দেশ। পরের দেশে যামু নাকি নিজের দেশেই থাইক্যা যামু, একটু বেশি কইরা পরিশ্রম করমু- তাই ভাবি। ভাবি যে, পরিশ্রম করলে তো উন্নতি হইবোই। তাইলে আর পরের দেশে গিয়া কাম কী?
-হ্যাঁ, তা-ও তো কথা ঠিকই বলছেন। নিজের দেশ আর পরের দেশে তো পার্থক্য আছেই।
-হেল্লিগ্যাই আমার দোনামোনা। রাইতে যখন শুইয়্যা ভাবি, তখন মনে হয়- কী আছে জীবনে, যাইগ্যা বিদেশ। কিছুদিন কষ্ট কইর‌্যা কিছু টাকা কামায়া আসি। আবার যখন সকাল হয়, ঘুম থেইক্যা উঠি, তখনই মনটা ঘুইরা যায়। মনে হয়, আরে ধুর! পরের দেশে কেন যামু। আমার দেশে যদি আমি ভালো মতো, দিল লাগাইয়া পরিশ্রম করি তাইলে তো আমি এইখানেই উন্নতি করতে পারি।
-হ্যাঁ, পারেন তো। পরিশ্রম করলে তো হবেই।

বাইশ বা চব্বিশ বছর বয়সী আজগর পাটোয়ারি। নিজের উন্নতি নিয়ে বেশ চিন্তিত এবং দেশে থাকা না থাকা নিয়ে যে দোনামোনায় আছে; বেশ ধরি লয়ে, শান্ত স্বরে কথা বলেন সে। যেনো তার কোনো তাড়া নেই। সেই তাড়াহীন ভঙ্গিতেই বলেন, ‘ধরেন, আপনের একটা ইরি ক্ষেত আছে। কিন্তু আপনি যদি এইটাতে খুব ভালো মতো শ্রম না দেন, চাষ না দেন তাইলে তো ফসল খারাপ হইবোই। আর যদি ভালো চাষ দেন ফলনও হইবো ভালো। মাইনষের জীবনটাও তো ইরি ক্ষেতের মতোই। ভালো পরিশ্রমে ভালো ফলন। আর খারাপ পরিশ্রমে জীবনে চিটাধান বেশি হইবো।’

মানব জীবন সম্পর্কে এমন দার্শনিক উক্তির পর একটু যেনো নীরবতা নেমে আসে। কয়েক মিনিটের একটা বিরতির পর আবার কথা শুরু হয়। অনেক কথা। আজগরের পরিবার, পছন্দ-অপছন্দ ইত্যাদি নানা বিষয়ে আমরা আলাপে জড়াই। জানা যায়, সিডি-ডিভিডি বিক্রি করার পেশায় আছেন বটে, কিন্তু সিনেমা-টিনেমা দেখার অভ্যাস তার নাই। তবে গান শোনে। যখন যেটা ভালো লাগে সেই গানই শোনে। এখন বেশি শোনা হয় হাবীব, বালাম এবং নতুন কয়েকজন শিল্পীর গান। আর আজগর যে এই দোকানে কাজ করছে সেটিও তার নিজের নয়। বোন জামাইয়ের দোকান। বোন জামাইয়ের আরো অন্য কাজ আছে। তাই এই দোকানে কাজ করছে আজগর।

আবার তার পরিবারের কথায় ফিরি। আজগররা পাঁচ ভাই, দুই বোন। দুই বোনেরই বিয়ে হয়ে গেছে। ভাইদের মধ্যে দুই ভাই থাকে বিদেশে। এক ভাই গ্রামের বাড়ি থাকে বাবা-মায়ের সাথে। আরেক ভাই অনার্সে পড়ছে ঢাকার তিতুমীর কলেজে। মা প্রসঙ্গে কথা এলেই আজগরের দূর্বলতা প্রকাশ হয়। ঢাকায় মনটা খরাপ লাগলেই মায়ের কাছে চলে যায় সে। বাড়ি গিয়ে মায়ের সাথে খুনসুটি, দুষ্টুমি, মায়ের রান্নার চুলার পাশে বসে থাকা, গল্প করার পর মনটা আবার সতেজ, চাঙ্গা হয়ে ওঠে। কিন্তু মাকে ছেড়ে, বাড়ি থেকে ঢাকা আসার সময়ই বুকটা ফাঁকা ফাঁকা লাগে আজগরের। তিনি বলেন, ‘জানি না, সবার এইরকম হয় কি-না। কিন্তু বাড়ি থিইক্যা ঢাকা আসার সময় আমার মনে হয়, কী জানি একটা নাই, কী জানি একটা থুইয়া আইসি বাড়িতে।’

হৈ-হুল্লোর, হট্টগোল, কোলাহল পছন্দ নয় আজগরের। তাই মেসে না থেকে এখন নিজে একটা রুম ভাড়া করে আছেন সেন্ট্রাল রোডে। একা একা থাকার একটা আনন্দ আছে আজগরের কাছে। দোকান থেকে বাসায় এসে তিনি সবসময়ই টিভি ছাড়েন। কারণ খবর দেখতে ভালোবাসেন তিনি। বিভিন্ন চ্যানেলের খবর ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখার অভ্যাস তার। আর খবর দেখার জন্যই ২১ ইঞি একটা নতুন বড় টিভি কিনেছেন ক’দিন আগে।
- আপনি তো খবর দেখেন অনেক। দেশের রাজনীতি নিয়া কি কিছু ভাবেন?
- ‘না, রাজনীতি নিয়া ভাবি না। ভাইব্যা কোনো লাভ নাই। যেমনে চলতেসে তেমনেই চলবে।’

এইটুকু বলে সে মিনিটখানিকের নীরবতা নেয়। আবার বলে, ‘তবে আপা, একটা কথা ঠিক, আমি ভাবি না সত্য। কিন্তু আমরার মতো তরুণরারইতো ভাবা দরকার। ভাবলে কিন্তু দেশটা আরো ভালা থাকতো।’এই পর্যন্ত বলে সে আরো মিনিট খানেক সময় নেয়। তারপর বলে, ‘যেহেতু রাজনীতি নিয়া, দেশ নিয়া ভাইব্যা কোনো লাভ নাই, কিছু করার কোনো উপায় নাই, তাই নিজেরে নিয়াই ভাবি। পরিবার নিয়া ভাবি। মা-বাবা ভাইবোন সুখে থাকলেই আমার সুখ।’
     
Untitled Document
প্রদর্শনী

বাংলার জল-ছবি
তন্দ্রা মুখার্জী

video video
Copyright © Life Bangladesh
সাপলুডু মূলপাতা | মতামত Contact : shapludu@gmail.com