Untitled Document
ভাদ্র সংখ্যা ১৪১৮
মূলপাতা শিরোনাম বটতলা পঞ্জিকা প্রদর্শনী
সংশোধিত সংবিধানে আদিবাসীদের দ্বিমত
- মিথুশিলাক মুরমু



বহুল আকাঙ্ক্ষিত সংবিধান (পঞ্চদশ সংশোধনী) আইন-২০১১ গত ৩০ জুন বিপুল ভোটে গৃহীত হয়েছে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং সহজোটের সংসদ সদস্যদের অনুপস্থিতিতে মহাজোটের ২৯১ সংসদ সদস্যের ভোটের বিপক্ষে স্বতন্ত্র সদস্য ফজলুল আজিম ভোট প্রদান করেছেন। ইতোপূর্বে ৫ জুন সংবিধান সংশোধনে গঠিত জাতীয় সংসদের বিশেষ কমিটি ৫১টি ধারার সুপারিশ পেশ করেছিল। এই ধারাগুলোর বিষয়ে দেশের বিশিষ্টজনরা অত্যন্ত কুশলীভাবে বিশ্লেষণ করেছেন, পক্ষে-বিপক্ষে যৌক্তিক কথা, চিন্তা-ভাবনা তুলে ধরেছিলেন। বিপুল ভোটে পাস হলো অন্যান্য ধারাসহ ২৩ (ক) ‘রাষ্ট্র বিভিন্ন উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের অন্য বৈশিষ্ট্যপূর্ণ আঞ্চলিক সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও বিকাশের ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন।’ কিন্তু দেশে বসবাসরত আদিবাসীরা সংবিধানে এই নামে পরিচিতি বা নামকরণে দ্বিমত পোষণ করে চলেছেন। আদিবাসীরা মনে করেন, এসব শব্দ অবমাননাকর এবং বৈষম্যমূলক। প্রশ্ন হলো_ অস্ট্রেলিয়ার অ্যাবরিজিন, আমেরিকার রেড ইন্ডিয়ান, ভারতের বিভিন্ন সংখ্যালঘু জাতিসত্তা (তাদের ভাষায় জনজাতি) যদি আন্তর্জাতিকভাবে ইনডিজিনাস হিসেবে বিবেচিত হতে পারে, তাহলে আমাদের সংখ্যালঘু জাতিগুলোকে এ পরিচয়ে পরিচিতি দিতে দোষ কোথায়? তাদের আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি প্রদানে যদি এতই অনীহা, তাহলে তাদের নিজ নিজ জাতিসত্তা_ সাঁওতাল, উরাঁও, মাহালী, মু-া, মাল-পাহাড়ি, গারো, হাজং, চাকমা, ত্রিপুরা ইত্যাদি নামেই অভিহিত করা যেত। আদিবাসীদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে উপজাতি অভিধা চাপিয়ে দেয়া হবে অন্যায় এবং তা মানবাধিকার লঙ্ঘনের শামিল। আমরা জেনেছি, সরকার আইএলও সনদ ১০৭-এ অনুসমর্থন করেছে কিন্তু ১৬৯ সনদ অনুসমর্থন করেনি। কিন্তু আমাদের সরকার এদেশে বসবাসরত আদিবাসীদের ১৬৯ সনদের ভিত্তিতেও আদিবাসীদের অবস্থা, অবস্থান প্রভৃতি বিচার এবং পরিচিতি করার জন্য উল্লেখ করছে।
মাতৃভূমিতে বসবাসরত আদিবাসীরা শুরু থেকেই এই চাপিয়ে দেয়া নামে পরিচয়, পরিচিতির প্রতিবাদে রাজপথে মানববন্ধন, সংবাদ সম্মেলন এবং আয়োজিত সভাগুলোতে প্রতিটি অঞ্চলের আদিবাসী নেতানেত্রীরা ক্ষোভ, দুঃখ এবং হতাশা ব্যক্ত করেছেন_ এখনো করছেন। আদিবাসী নেতারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘১৯৭২ সালের সংবিধানে স্বীকৃতি না দিয়ে আদিবাসীদের অনানুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় মূল স্রোতধারা থেকে বিচ্ছিন্ন রাখা হয়েছিল। এবার সরকার জবরদস্তি করে তথাকথিত উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী, নৃগোষ্ঠী ও সম্প্রদায় আত্মপরিচয় চাপিয়ে দিয়ে তাদের আনুষ্ঠানিকভাবে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে’ (প্রথম আলো ০২-০৭-২০১১)।
১. জাতীয় আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক বলেন, কোন রাষ্ট্র বা সরকার কোন জাতির সংস্কৃতি বা পরিচয় বদলে দিতে পারে না। দেশে বসবাসরত পাহাড়ি ও সমতলের বিশেষ জনগোষ্ঠী আদিবাসী স্বীকৃতির দাবি জানিয়ে এলেও তা প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। আমরা মর্মাহত, দুঃখিত ও ক্ষুব্ধ। আমরা সংবিধানে আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি চেয়েছিলাম। সরকার আদিবাসী শব্দের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে আমাদের উপজাতি, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী হিসেবে আখ্যায়িত করল’ (যুগান্তর ০১-০৭-২০১১)।
২. আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতির দাবিতে ময়মনসিংহ প্রেসক্লাবের সামনে স্থানীয় আদিবাসীরা মানববন্ধন করেছেন (কালের কণ্ঠ ০১-০৭-২০১১)।
৩. সুনামগঞ্জে অনুষ্ঠিত স্থানীয় আদিবাসীদের সভায় আদিবাসী নেতারা দাবি উত্থাপন করে বলেন, ‘এ জেলায় বসবাসরত আদিবাসীরা দিন দিন সম্পদ হারিয়ে দেশান্তরী হচ্ছেন। সংবিধানে আদিবাসীদের স্বীকৃতি দেয়ার দাবি করেন তারা’ (কালের কণ্ঠ ০১-০৭-২০১১)।
৪. নাগরিক কমিটির বান্দরবান জেলা শাখার আহ্বায়ক নুশৈ প্রু চৌধুরী বলেন, ‘রাষ্ট্রের সংবিধানে বর্ণ, ধর্ম, জাতি-নির্বিশেষে সব জনগোষ্ঠীর মানুষের ইতিহাস-ঐতিহ্য, কৃষ্টি-সংস্কৃতি, মূল্যবোধ ও পরিচয়কে ধারণ করাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেটা না করে জাতি পরিচয়ে বাঙালি অভিহিত করে আদিবাসীদের অস্তিত্বকে অস্বীকার করা হয়েছে’ (প্রথম আলো ০২-০৭-২০১১)।
৫. পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক কমিটি রাঙামাটি জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক রকি চাকমা বলেন, ‘সংবিধান সংশোধনকালে পার্বত্য চুক্তিসহ পার্বত্য চট্টগ্রামের জন্য প্রণীত বিশেষ আইনগুলোর সাংবিধানিক সুরক্ষার ব্যবস্থা রাখা হয়নি’ (প্রথম আলো ০২-০৭-২০১১)।
৬. পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক কমিটির রাঙামাটি জেলা শাখার সভাপতি মংসানু চৌধুরী ও প্রবীণ আইনজীবী জ্ঞানেন্দু বিকাশ চাকমা বলেন, ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক কমিটিসহ আদিবাসীদের বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দেয়া হলেও সংবিধান সংশোধনবিষয়ক বিশেষ কমিটি কোন প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত করেনি। আমরা আশা করেছিলাম, সংসদের আদিবাসী প্রতিনিধিরা সাংবিধানিক স্বীকৃতির বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন। কিন্তু তারা সেটা করেননি’ (প্রথম আলো ০২-০৭-২০১১)।
৭. হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ ও আদিবাসী ফোরামের নেতারা ‘… আদিবাসীদের আদিবাসী হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতির দাবি অগ্রাহ্য করে বৈষম্যমূলক সাম্প্রদায়িক সংবিধান সংশোধনী আইন সংসদে গৃহীত হওয়ার প্রতিবাদে কালো পাতাকা মিছিল করেছে’ (কালের কণ্ঠ ০২-০৭-২০১১)।
৮. ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত আদিবাসী ছাত্রছাত্রীরা ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী কিংবা উপজাতি নয়, আদিবাসী হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি ও প্রথাগত ভূমি অধিকারের দাবিতে মানববন্ধন করেছেন’ (কালের কণ্ঠ ০২-০৭-২০১১)।
৯. ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ) সভাপতি প্রসিত খীসা এবং সাধারণ সম্পাদক শংকর চাকমা এক বিবৃতিতে তড়িঘড়ি করে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী বিল পাস করায় সরকারের কঠোর সমালোচনা করে সংশোধিত বিলে সই না দেয়ার জন্য রাষ্ট্রপতির প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন (কালের কণ্ঠ ০২-০৭-২০১১)।
১০. তিন পার্বত্য জেলার আদিবাসীরা আদিবাসী হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতির দাবিতে তিন পার্বত্য জেলায় ২০ ও ২১ তারিখ সড়ক ও নৌপথ অবরোধের ডাক দিয়েছেন (প্রথম আলো ১৫-০৭-২০১১)।
১১. পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিলের দাবি আদিবাসী নেতাদের (প্রথম আলো ২৫-০৭-২০১১)।
আমাদের গণতান্ত্রিক সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে মনে হয়েছে, উপজাতি শব্দটির ইংরেজি প্রতিশব্দ হচ্ছে ট্রাইবাল। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ট্রাইবাল শব্দটিও মূলত উপজাতি কথাটির প্রতিশব্দ বা সমার্থক শব্দ নয়। ট্রাইব হলো কোন জাতির ক্ষুদ্র অংশ, যেমন_ আরব দেশগুলোর মানুষ জাতিতে আরব হলেও তাদের মধ্যে বিভিন্ন গোত্রের উপস্থিতি দেখা যায়। দক্ষিণ আফ্রিকাসহ আফ্রিকা মহাদেশের বিভিন্ন দেশেও এমনটি রয়েছে। অন্যদিকে এদেশের সংখ্যালঘু জাতিগুলো প্রতিটি পৃথক পৃথক জাতিসত্তা। তারা কোন জাতির ক্ষুদ্র অংশ নয়। তাদের রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন ভাষা, সংস্কৃতি, সমাজ ও জীবনযাপন পদ্ধতি এবং তারা দেশের মূল স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। এগুলোই আদিবাসী বা ইনডিজিনাস পিপলসের বৈশিষ্ট্য।
সর্বশেষ আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার প্রতিনিধি ও কূটনীতিকদের বারণ করে দিয়েছেন তিন পার্বত্য জেলার অধিবাসীদের আদিবাসী হিসেবে সম্বোধন করার জন্য। সঙ্গে সঙ্গে তিনি এ-ও বলেছেন, বিষয়টিকে নিয়ে বিতর্ক উসকে দেয়া হলে তা পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করবে (প্রথম আলো ২৭-০৭-২০১১)। সত্যি সত্যি এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক, কষ্টের এবং হতাশার। তাহলে প্রশ্ন দাঁড়াচ্ছে, অন্য অঞ্চলের আদিবাসীদের ক্ষেত্রে সরকারের কী মনোভাব? বিষয়টি শুধু সরকারের স্থানীয় প্রশাসনের জন্য নয়, সমতল অঞ্চলের আদিবাসীদের জন্য জানা আবশ্যক। আদিবাসীরা যে নামে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে, হৃদয়ে যে নামটিকে ধারণ করেছে; সেক্ষেত্রে সরকারের প্রদত্ত পরিচিতিতে কি-বা যায় আসে! আদিবাসীরা সরকারের এরূপ চাপিয়ে দেয়া নামে একটি সুদূরপ্রসারী দুরভিসন্ধিমূলক নীলনকশাকে ইঙ্গিত করেছেন। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিশেষ সহকারী চাকমা রাজা ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায়ের ভাষায় বলতে চাই_ রাষ্ট্রীয় আইনে যা-ই থাকুক না কেন, আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় যারা আদিবাসীর আওতায় পড়ে, সেই প্রেক্ষাপট তো আর পাল্টাবে না।

ছবি: চাকমা আদিবাসী ছাত্র-ছাত্রী, খবংপুইজ্যা, খাগড়াছড়ি, বিপ্লব রহমান, উইকিপিডিয়া। [লিংক]
---
লেখাটির উস:আদিবাসী বাংলা ব্লগ[লিংক]
     
Untitled Document
প্রদর্শনী

বাংলার জল-ছবি
তন্দ্রা মুখার্জী

video video
Copyright © Life Bangladesh
সাপলুডু মূলপাতা | মতামত Contact : shapludu@gmail.com