Untitled Document
ভাদ্র সংখ্যা ১৪১৮
মূলপাতা শিরোনাম বটতলা পঞ্জিকা প্রদর্শনী
পাহাড়ের টুকরো কথা: বাঘাইছড়ি পর্ব
- বিপ্লব রহমান



প্রায় দেড় বছর আগে ১৯-২০ ফেব্রুয়ারিতে রাঙামাটির দুর্গম বাঘাইছড়ির সংহিংসতার ঘটনাটি কী মনে আছে? সে সময় জায়গা-জমি দখলের উন্মোত্ত সহিংসতার শিকার হয়েছিলেন কয়েকটি গ্রামের আদিবাসী পাহাড়িরা। অন্তত দু-জন আদিবাসীকে সেনা ও সেটেলার বাঙালিরা নির্মমভাবে হত্যা করে। হিংসার অনলে পুড়ে যায় আদিবাসী গ্রাম, বৌদ্ধ মন্দির, স্কুল, হাট-বাজার।...

ঘটনার ১০ দিন পর দুপুরের তীব্র খর রোদে সেখানে পৌঁছে দেখা গেলো, বাঘাইহাট বাজারের রাস্তার দু-পাশে সার সার পোড়া ঘর-বাড়ি। আশ্রয়হীন, বিপন্ন পাহাড়িরা বাজারে এসেছেন সামান্য ত্রাণের আশায়। স্থানীয় যাত্রী ছাউনিটিকে অস্থায়ী ত্রাণ কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। জুম চাষী (পাহাড়ের ঢালে বিশেষ ধরণের চাষাবাদ) চাকমা আদিবাসীরাই বেশী। তবে বেশ কয়েক ঘর মারমা আদিবাসীও আছেন। তালিকা ধরে মাইকে নাম ঘোষণা হতেই একেকজন সুশৃঙ্খলভাবে ত্রাণ নিচ্ছেন। সবার চোখে-মুখে কেমন যেনো চাপা আতঙ্খ, অজানা ভীতি। 

বাজার থেকে একটু দূরেই দেখা যায়, দুজন শহীদের স্মরণে নির্মিত অস্থায়ী স্মৃতির মিনার। সেখানে তীব্র রোদ ও ভ্যাপসা গরম উপেক্ষা করে সেখানে ঘুর ঘুরে করছে ছোট ছেলেমেয়ের একটি দল। বাড়ির বড়রা যখন ত্রাণ নিতে ব্যস্ত, তখন এই সব শিশুর দল পোড়া ও প্রায় পরিত্যাক্ত বাজারে এদিক-সেদিক আপন মনে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সামান্য চাকমা ভাষা সম্বল করে সহজেই কথোপকথন করা যায় শিশুদের দলটির সঙ্গে। 

আলাপচারিতায় জানা গেল, সেনা-সেটেলার সহিংস আক্রমণের বিভীষিকাময় ছাপ পড়েছে কচি শিশুগুলোর মনেও। গোলাছড়ি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্রছাত্রী এসব ছেলেমেয়ের এরই মধ্যে হয়েছে সশস্ত্র আক্রমণের নির্মম অভিজ্ঞতা। কম-বেশি দুই সপ্তাহ জঙ্গলবাসও করেছে তারা। আগুনের কবল থেকে স্কুল ঘরটি রক্ষা পেলেও সবার বসতবাড়ি পুড়ে গেছে। আগুনে পুড়েছে জামা-কাপড়, বই-পত্র সবই। এখনো থাকা-খাওয়ার নিশ্চয়তা নেই। রাতে পরিবারের বড়রা নানা আশঙ্কার কথা বলাবলি করেন। তাই শুনে তারাও ভীত-সন্ত্রস্ত। কেউ জানে না কবে পরিস্থিতি শান্ত হবে, কবে আবার তারা স্কুলে যেতে পারবে।

সুনীল কুমার চাকমা নামের এক শিশু ২০ ফেব্রুয়ারির (২০১০) ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বলে, গুলি শুরু হতেই মা আমাকে নিয়ে হাত ধরে জঙ্গলের দিকে পালাতে থাকেন। দূরে বাঙালি সেটেলারদের দা হাতে আমি আমাদের গ্রামটির দিকে দৌড়ে আসতে দেখি। ভয়ে আমি তখন চিৎকার করে কাঁদছিলাম।

পরান থু চাকমা বলে, জঙ্গলের ভেতরে অনেক পাহাড়িসহ আমরা ১০-১৫ দিন লুকিয়ে ছিলাম। সেখানে একদিন-একরাত ভাত-পানি কিছুই খাইনি। পরদিন মা জঙ্গল থেকে বুনো আলু এনে খাইয়েছেন।

অনিশ্চয়তার ভেতরে অভুক্ত অবস্থায় জঙ্গলে লুকিয়ে থাকার অভিজ্ঞতা হয়েছে একই শ্রেণীর ছাত্রী কমলা রানি চাকমারও। সে বলে, জঙ্গলের ভেতর খিদের জ্বালায় আমরা অনেকে কান্নাকাটি করছিলাম। বড়রা সবাই লাঠি নিয়ে আমাদের পাহারা দিচ্ছিল। তারা বারবার আমাদের কান্না করতে নিষেধ করছিল। তারা বলছিল, কান্নার শব্দে হয়তো সেটেলার বাঙালিরা আমাদের অবস্থান জেনে ফেলবে; তখন তারা জঙ্গলের ভেতরেই দা দিয়ে কুপিয়ে খুন করবে আমাদের।

কনক বিকাশ চাকমা বলে, আমাদের ঘরবাড়ি, বই-পত্র, জামা-কাপাড় সব আগুনে পুড়ে গেছে। এক জামা-কাপড় পরে থাকতে ভালো লাগে না। আবার স্কুলে যেতে ইচ্ছে করে। আগের মতো খেলাধুলা করতে ইচ্ছে করে।...

আরো তথ্য সংগ্রহ, আরো আলোকচিত্র গ্রহণ করে সে সময় একের পর এক সরেজমিন তাজা সংবাদ প্রকাশ করা হয়। পাহাড়ের গণহত্যা, গণধর্ষন, ত্রিপুরার শরণার্থী শিবির, কল্পনা চাকমা অপহরণ, মেশিন গানের গুলির ভেতর পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের মিছিল-- আরো অসংখ্য রক্তাক্ত অতীত স্মৃতি একের পর এক সিনেমার স্লাইডের মতো চোখের সামনে ভেসে উঠতে থাকে। এরই মধ্যে বার বার হানা দেয়, বাঘাইছড়ির সেই আশ্চর্য দেবশিশুর দল।...

বন পোড়া হরিণ-শাবকের যন্ত্রণা বুকে নিয়ে এইসব শিশু একদিন বড় হবে। তখন কী হতে পারে তাদের মনের ভাবনা? তখন কী হবে তাদের দেশচিন্তা? যুগের পর যুগ এতো রক্তক্ষরণ, এতো দাবানল, এতো সহিংসতা দেখে তখনও কী তারা গাইবে 'আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালবাসি'? তারা কী কখনো ভালবাসতে পারবে তাদের জন্য অশেষ দুঃখের কারণ সংখ্যাগুরু বাঙালিদের? নাকি একেকটি হিংসা জন্ম দেবে আরো অনেক প্রতিহিংসার? ...
---
ছবি: নিহতদের স্মরণে স্মৃতির মিনার এবং আশ্রয়হীন শিশুর দল, বাঘাইছড়ি, মার্চ ২০১০, লেখক, উইকিপিডিয়া।[লিংক-১]   [লিংক-২] 
---
আরো পড়ুন: পাহাড়ে কেন এত সহিংসতা[লিংক-৩]

     
Untitled Document
প্রদর্শনী

বাংলার জল-ছবি
তন্দ্রা মুখার্জী

video video
Copyright © Life Bangladesh
সাপলুডু মূলপাতা | মতামত Contact : shapludu@gmail.com