Untitled Document
আশ্বিন সংখ্যা ১৪১৮
মূলপাতা শিরোনাম বটতলা পঞ্জিকা প্রদর্শনী
ললিতা সান্যালের উপলব্ধি
- সংহিতা মুখোপাধ্যায়



“প্রাণ ভরিয়ে তৃষা হরিয়ে
মোরে     আরো আরো আরো দাও প্রাণ।
            তব ভুবনে তব ভবনে
মোরে     আরো আরো আরো দাও স্থান”।

          আমি ললিতা সান্যাল। আজগুবি কিংবা কেউকেটা কোনোটাই নই। বলা ভালো আমি- কে, কী, কেমন – কিছুই বুঝিয়ে বলতে পারব না। আমিই “সেই” কিনা টের পাই নি, এখনও। এটুকুই জানি যে আমি আমিই। আমি বাঁচতে ভীষণ ভালোবাসি; রোজ ভীষণ বাঁচার পরেও বেঁচে থাকতে আমার একটুও একঘেয়ে লাগে না। বরং প্রত্যেকটা দিনের আলাদা আলাদা বর্ণ, গন্ধ, শব্দ, স্বাদ, ছোঁয়া আমাকে ভীষণভাবে নাড়া দিয়ে যায়। মনে হয় যে এই অনূভুতিগুলোই আমার দিনটাকে সার্থক করে দিল। এই বোধটুকুই পরেরদিনের অপেক্ষাকে জাগিয়ে তোলে।
এতসব লিখছি আমার মেয়ের জন্য। ও-ই আমাকে অমরত্ব দেবে, আমি চিরকাল বেঁচে থাকব, ওর মধ্যে দিয়ে, ওর মেয়ের অপত্যের মধ্যে দিয়ে। এটা যেই বুঝলাম অমনি ঠিক করলাম যে ও যেন কখনও বাঁচতে ভুলে না যায়, তাই আমার বেঁচে থাকার কৌশলটুকু, যেটা আমার একান্তই সোপার্জিত, সেটাই ওকে দিয়ে যাব। রোজকার মা-মেয়ের জীবনে আঁতের এই কথাগুলো বলাই হবে না হয়তো; আমাকেও তো আমার মা বলেন নি, নিজে নিজেই বুঝতে হয়েছে; তাই ওর জন্য অন্তত এই লেখাটুকু থাক। আমার এই অভিজ্ঞতাটুকুর জোরেই হয়তো আমার থেকেও সহজে ও কাটিয়ে উঠবে ঝড়ঝাপটা। আমরা বেঁচে থাকব আরও আত্মপ্রত্যয়ে, অনেক প্রজন্মে, পৃথিবীজুড়ে।

           “আরো আলো       আরো আলো
এই        নয়নে প্রভু ঢালো।
            সুরে সুরে বাঁশি পুরে
তুমি      আরো আরো আরো দাও তান”।

ভাবে বৈষ্ণব আর অহঙ্কারে বারেন্দ্র ব্রাহ্মণ সান্যাল বাড়িতে তিন প্রজন্মে আমিই একমাত্র মেয়ে। ললিতা নামটা ঠাকুর্দা রেখেছিলেন। আমার আগে কদাদা আর খ দাদা; আমার পরে বুবুন আর ঋক (আমি ডাকি, আর সবাই ছোটন বলে)। কদাদা জ্যাজা মানে বড়জেঠুর ছেলে; খদাদা বুবু (মেজজেঠু, আমাকে উনি বুড়ি বলে ডাকতেন, আমি চেষ্টা করতাম ওঁকে বুড়ি বলেই ডাকতে,পারতাম না, তাই বু-বু)-র ছেলে। বুবুন ছোটকু মানে ছোটকাকার ছেলে, ঋক আমার সহোদর।
আমি স্কুলে যেতে শুরু করার আগেই যেহেতু ঠিক হয়ে গিয়েছিল কদাদা ইঞ্জিনিয়ার, খদাদা ডাক্তার হবে, সুতরাং আমাকে ফিজিক্সের অধ্যাপিকাই হতে হবে। কাম্মা খুব রেগে গিয়েছিল, বুবুনের জন্য কিছুই হাই-ফাই পড়ে নেই দেখে। মানে সত্যি করেই বুবুনের জন্য বাড়িতে কোনো জল্পনা ছিল না। বেচারাকে আমরা বড় দাদা-দিদিরা তৃতীয় পুরুষ বলতাম আদর করে, বাড়ির তিন নম্বর পুত্রসন্তান বলে। আবার মেম্মা মানে খদাদার মা-ও আমাকে পছন্দ করত না। তার অনেক কারণ। এক হলো, তাঁর পরে এসে আমার মা তাঁর থেকেও বেশি আদুরে বৌ হয়ে উঠেছিল আমার জন্ম দিয়ে। তারপর জেম্মা, মানে কদাদার মা, আমাকে নিজের মেয়ের মতো আদর দিত, যেটা আমার বা মায়ের মনে না হলেও মেম্মার “ঢং” বলেই মনে হতো। ফলে বাড়িতে স্পষ্টতই একটা টানাপোড়েন চলত মহিলাকুলে। ঠাম্মা গত হয়েছিলেন আমি জন্মাবার আগেই। তাই এইসব দলবাজি থামার কোনো নামগন্ধ ছিল না। কিন্তু সব মিটে গেল দুম করে ঋকের জন্ম হতে।
ঋক আমার থেকে চোদ্দ বছরের ছোট। মা খুব অপরাধীর মতো আমাকে একদিন জানিয়েছিল যে আমার একটা ভাই কিংবা বোন হতে পারে মায়ের একটা অসুখের চিকিৎসার সূত্রে, আমি যেন মন খারাপ না করি, আমার আদর কখনও কম হবে না। শুনে খুব থতমত খেয়েছিলাম; পরে খুব আনন্দ হয়েছিল, কেমন আনন্দ? নতুন পুতুল পাওয়ার থেকেও বেশি আনন্দ। বুবুনের সাথে বড়দের কারণেই একটা দূরত্ব তৈরি হয়ে গিয়েছিল আমার। তারপর দাদাই মানে ঠাকুর্দা মারা যেতে কাম্মা-ছোটকু-বুবুন অন্য বাড়িতে চলে যায়। ততদিনে কদাদা চাকরি নিয়ে ম্যাড্রাস (তখনও চেন্নাই হয় নি) হয়ে সানফ্রান্সিস্কো চলে গেছে। খদাদা বাড়িতে আসে আলে-কালে, হাসপাতালেই থাকে বেশি, শিলিগুড়িতে। তখন আমার খুব একা লাগত। মায়ের কথা শুনে কয়েকরাত ঘুমোই নি; আমি আবার খেলব ছোটবেলার মতো ভেবে, আনন্দে, উত্তেজনায়।
ঋক ছেলে হয়ে জন্মাতে মা বোধ হয় প্রথম বাস্তবে নেমে এসেছিলেন। ছেলেও তাঁরই; মেয়ের সমান কর্তব্য শুধু নয় সমান ভালোবাসারও সে অধিকারী, আর যেই অবহেলা করুক না কেন মা ঋককে অবহেলা করতে পারবেন না। অবশ্য বাবাও অবহেলা করেন নি কখনও ঋককে। তবে ঋকের ভবিষ্যত নিয়েও কোনো জল্পনা ছিল না বাড়িতে।
আমার মাধ্যমিক পরীক্ষার পর কদাদা বাড়িতে এসেছিল। আমার আলমারি ভরে গিয়েছিল বার্বি, বানি, টেডিতে। যাওয়ার সময় বলে গিয়েছিল যে আমার সঙ্গে ওর তবেই দেখা হবে যদি আমি কখনও আমেরিকা যাই। আমি ভেবেছিলাম ঠাট্টা করছে। কিন্তু তারপর থেকে কদাদার ফোন আসা একদম বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। টানা কয়েকমাস ধরে জেম্মার চোখ ফোলা আর হাসিখুশি জ্যাজার গোমড়া মুখ আমাকে বলে দিয়েছিল গণ্ডগোল হয়েছে কিছু একটা।
একদিন কৌতুহল আটকাতে না পেরে মাকে জিজ্ঞেসই করে ফেলেছিলাম যে ব্যাপারটা কী। মা ভারি বুদ্ধিমতী। কিছুই আর ধামাচাপা থাকবে না বুঝতে পেরেছিলেন তিনি; তাই খানিকটা সতর্কতা বাণী জুড়ে নীতিকথার মতো করে ঘটনাটা বলেছিলেন।
কদাদা তার পছন্দের পাত্রীকে বিয়ে করেছিল। পাত্রীটি অবাঙালি, তামিল; অব্রাহ্মণ; অতএব সান্যাল বাড়ির বনেদিয়ানার পাশে ধূলোবালির মতো, যদিও তাঁদের বাড়িশুদ্ধ সবাই অধ্যাপক-গবেষক এবং ভদ্রমহিলা স্বয়ং বেশ নামজাদা বৈজ্ঞানিক। তিনি যখন এশিয়াটিক সোসাইটির অ্যাওয়ার্ড নিতে এসেছিলেন বাবা-মার সঙ্গে কলকাতায়, তখন কদাদাও বাড়ি এসেছিল; সেটাই শেষবার। সেবার কদাদা পাত্রীর বাড়ির সাথে আমাদের বাড়ির সবার পরিচয় করিয়ে দিতে চেয়েছিল এবং সবাইকে সঙ্গে নিয়েই বিয়েটা করতে চেয়েছিল সেই ছুটিতেই। জেম্মা-জ্যাজা কদাদার সিদ্ধান্তটা অবশ্য জানতেন আরও বছর দুয়েক আগে থেকেই; কিন্তু বেচারা কদাদা জন্মেছিল বংশের বড়ছেলে হয়ে। তাই তার হঠকারিতা তার জনক-জননীও মানতে পারেন নি, কিছুতেই; দাদাই থাকলেও নাকি মানতেন না এ বিয়ে, তাই। সেবার কদাদা বিয়েটা সেরেই ফিরেছিল আমেরিকা। সেই থেকে সান্যাল বাড়ির দরজা তার জন্য বন্ধ হয়ে গেছে চিরকালের মতো। যাতে বাড়ির বাকি ছেলেমেয়েরা ওর মতো অবাধ্যতা না করে তাই ওকে সবার থেকে দূরে রাখা হয়েছিল। সে সবার বড় হয়েও নিজের এবং বংশের কল্যাণের পরোয়া তো করেই নি বরং নিজের কামনা-বাসনায় (!) ডুবে এগিয়ে গিয়েছিল অধঃপাতের দিকে;  সেই দৃষ্টান্তে বাড়ির আশু অকল্যাণ প্রতিহত করতে কিংবা বাড়ির বাকি ছেলেপুলেদের বখে যাওয়া আটকাতেই কদাদাকে ছেঁটে ফেলা হয়েছিল পরিবার থেকে।  
এদিকে তখন আমার মনেও রামধনু। আমাদের ব্যাচে আমার মতো অঙ্ক কেউ কষতে পারত না। কিন্তু তনুকা ছিল সব বিষয়েই দড়। টপার ছিল অরিত্র। অরিত্র বসু। অরিত্র আমার আর তনুকার দুজনেরই বন্ধু ছিল। কিন্তু আমার প্রতি ওর বিশেষ নজরটুকু ও কোনোদিনই লুকোবার চেষ্টা করে নি। আমি প্রাণপণে তনুকার থেকে ওকে দূরে রাখার চেষ্টা করতাম। কদাদা সংক্রান্ত নীতিকথা শুনে আমার মনের সব রঙ মুছে গেল। এতোগুলো লোকের চোখের মণি থেকে চক্ষুশূল হয়ে যাব অরিত্রর জন্য ভাবলেই ভয়ে হাতপা ঠান্ডা হয়ে যেত। আমি অরিত্রকে দূরে সরাতে শুরু করেছিলাম। সেটা টের পেয়ে আরও বেশি কাছে আসতে চাইত ও। আমার রাগ হতো বুদ্ধিমান ছেলের জেদ দেখে। মাঝে মাঝে বুদ্ধিমান ছেলের অকপটতায়ও রাগ হতো। ওর কী দরকার ছিল আমার মাকে এসে বারবার বলার যে আমিও যেন ওদের মতো জয়েন্ট এন্ট্রাস দি। বিশেষতঃ এটা যখন আমার প্রতি ওর মনোযোগকে মেলে ধরে। আমাকে কয়েকদিন মা বলেছিলেন যে অরিত্র ভারি জ্যাঠা ছেলে, ব্যাঙ্কের কেরানীর ছেলে হয়ে আমার বাড়িতে আসে কিনা জয়েন্ট এন্ট্রাসের ওকালতি করতে। শেষে একদিন ওকেই অপমান করলেন এই বলে, “ললিতার বড়জেঠু যে ডাক্তার সে তো সবাই জানে এখানে; ওর মেজ জেঠু ইঞ্জিনীয়ার; এঁদের ছেলেরা ঠিক উলটো; আমরা তো জানি অরিত্র, রাত-বিরেতে মানুষের  চিকিৎসার ডাক পেলে একটা মেয়ে তো ছুটে যেতে পারবে না, হয়তো তাতে আরেকটা লোকের প্রাণ সংশয় হবে; ইঞ্জিনীয়ারদের কাজের পরিবেশও খুব ভদ্র নয়, বিশেষতঃ আমাদের মতো বনেদী বাড়ির মেয়ের জন্য একেবারেই চলনসই নয় তাকি আমরা জানি না? ললিতা ওর বাবার মতোই ফিজিক্স পড়াবে, কলেজে, ইউনিভার্সিটিতে; ডাক্তার, ইঞ্জিনীয়ারদের জন্য থিওরি বানিয়ে দেবে। না হলে তো কাকার মতো ইংরেজির মাস্টারও হতে পারত”। অর্থাৎ আমাদের পুরুষানুক্রমিক ডাক্তার-ইঞ্জিনীয়ারের বাড়িতে অরিত্রর মতো সেদিনের ছেলের কিসে কী হয় বোঝাবার দরকার নেই, আমি অধ্যাপক-গবেষকদের দলে ভিড়ে এইসব ডাক্তার-ইঞ্জিনীয়ারদের থেকে ওপরে থাকব, তাদের জন্য “থিয়োরি বানিয়ে(!)”। আমি খুব দুঃখ পেয়েছিলাম। অরিত্রে জন্য তো বটেই; ছোটকুর জন্যও। ছোটকু সাহিত্যের অধ্যাপক, তাঁকে হেনস্থা করতে খুব আনন্দ মায়ের, আবার বাবা যে সান্যাল বাড়িতে সেরা তাঁর অধ্যাপণারগুণে সেটা জাহির করাতেই মায়ের আহ্লাদ বেশি; কিন্তু সান্যাল বাড়িএ মধ্যে পৃথিবী বানিয়ে রেখে কোনোদিনই বুঝতে পারেন নি যে এইসব আচরণে নিজেই নিজেকে কতটা নিচে নামান। এই ঘটানার পর অরিত্র আমাদের বাড়ি আসা বন্ধ করে দিতে নিশ্চিন্ত হয়েছিলাম। তারপর ও তনুকার সাথে বেশি মিশলেও আমার কিছু করার ছিল না।
এই অরিত্রই আই আই টি –তে যাবে শুনে, মা আর জেম্মা মিলে তাকে ভুরিভোজ খাওয়ালেন। তনুকাও যাদবপুরে যাচ্ছিল; কিন্তু ওকে ডাকা হয় নি। আমি বুঝলাম, বৈষ্ণব এবং বারেন্দ্র ব্রাহ্মণ পরিবারটি গুণীর কদর করতে জানে দেখাতে অরিত্রকে ডাকা হয়েছিল, যার ভেতরে ভেতরে ছিল অনুকম্পার অহঙ্কার, কিংবা গুণী ছেলেকে যে অপমান করা হয়েছিল তার প্রায়শ্চিত্ত, অথবা দুটোই। তারপর বছর দুয়েক পরে অরিত্র আর তনুকারও ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। আমি দুজনের জন্যই কষ্ট পাই, অথচ অত অল্প বয়সেও ওরা কেউ কাউকে দোষ দেয় নি; ভবিতব্য নয়, ঘটানাটাকে অনিবার্য বলেই মেনে নিয়েছিল।

 

            আরো বেদনা    আরো বেদনা
            দাও মোরে আরো চেতনা।
           দ্বার ছুটায়ে বাধা টুটায়ে
মোরে     করো ত্রাণ মোরে করো ত্রাণ।

     সেই দুবছরে আমার জীবনে অনেক অনেক পরিবর্তন আসে। আমি যদিও অঙ্কেই সবথেকে বেশি নম্বর পেয়েছিলাম, কিন্তু জন্মের আগে থেকে বানানো ঠিকুজি মেনে পড়তে গেলাম ফিজিক্স। না কোনো ভয় বা মালিন্য নিয়ে নয়; শুরু করেছিলাম খুব উৎসাহ নিয়েই। বাবা ছিলেন, বাবার বইপত্র ছিল; বাবার সেরা ছাত্রদের টিউশন ছিল; তবু যেন কী একটা ছিল না। বাবার ছাত্র অঙ্কুরদা একদিন মাকে ডেকে বলে দিয়ে গেল, “লোলোর বোধ আছে, প্রকাশ নেই, তাই বিকাশও হবে না”। মা রেগে গেলেন কিন্তু বাবা মোটেই রাগলেন না। অঙ্কুরদা থার্মোডিনামিক্স পড়াতো; বাবার বিষয় নিউক্লিয়ার ফিজিক্স। বাবা চেষ্টা শুরু করলেন নিজে; অঙ্কুরদার মতো পারতেন না। আমার কোনো উপায় ছিল না। আসলে বাবা-মা-র মিষ্টি ব্যবহার আর আমাকে পড়ানোর দায়িত্ব পাওয়াকে অঙ্কুর পাল অর্ধেক রাজত্ব আর রাজকন্যার আশ্বাস ভেবে বসেছিল। যখন আমাকে দেওয়ালের গায়ে ঠেসে ধরে চুমু খেতে চেয়েছিল, আমার কদাদাসংক্রান্ত নীতিকথা মনে পড়ে গিয়েছিল। আমি বলেছিলাম, “স্যর, আপনি আর আসবেন না”। এই প্রত্যাখ্যানটায় অঙ্কুরদা অপমানিত হয়েছিল, তার শোধ তুলতেই মাকে কড়া কথাগুলো বলেছিল। তাছাড়া এই সব সাহায্যের অপেশাদারিত্ব আমাকে ক্লাসে পিছিয়ে দিচ্ছিল। আসলে জ্ঞানের জন্য পড়া আর পরীক্ষার জন্য তৈরি হওয়া এক নয়। একথাটা প্রমাণ হয়ে গেল প্রথম পরীক্ষার পরই। কিন্তু তবুও নিজেদের পদ্ধতি এবং আমার প্রতি বিশ্বাস্ব ও মমত্বে অটল সান্যাল পরিবার বাবার নিত্যনতুন ছাত্র আমদানী করে চলেছিল। তাঁরা ছাত্র ভালো, কিন্তু আনকোরা মাস্টার। মাস্টারমশাইয়ের সংখ্যাধিক্যে আমার নিজের মতো করে পড়ার, পরীক্ষার প্রিপেরেশনের সময়ও কমে গিয়েছিল। সব মিলিয়ে আমি মনে মনে খুব, খুব ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম। বিএসসি পর্বেই নির্ধারিত হয়ে গিয়েছিল যে আমি কোনোদিনও অধ্যাপণা করতে পারব না।
ক্লাসের সেরা ছাত্ররা সবাই চলে গিয়েছিল ইউনিভার্সিটি। আমি ছোটকুর লাইব্রেরিতে পড়ে থাকতাম সারাদিন। বুবুন আইএসসি পাশ করেই স্যাট দিয়ে আমেরিকা চলে গিয়েছিল ততদিনে। যাবার সময় জেম্মাকে বলেছিল যে মেম বউ নিয়ে ফিরবে। ঠাট্টাই; কিন্তু সান্যাল বাড়ির অহঙ্কারে লাগার জন্য যথেষ্ট। মা আর জেম্মা মিলে অমনি কাম্মার নিন্দে শুরু করে দিয়েছিল। আমি মেতেছিলাম আমার কম্পিউটারে। ছোটকুর লাইব্রেরি থেকেই আসক্তি। ইন্টারনেটেও। বাবা আমার বাইশতম জন্মদিনে তাই এগুলোই উপহার দিয়েছিলেন।
খোঁজখবর নিয়ে আমি বাবাকে জানিয়েছিলাম ইগনু-র মাস্টার্স প্রোগ্রামগুলোর কথা। সব নেড়ে ঘেঁটে খুব অনিচ্ছে নিয়েও বাবা এমসিএ-র অনুমতি দিয়েছিলেন। বাবার থেকেও বেশি দুঃখ ছিল এই সময়ে মায়ের। বাবার অধিকাংশ বন্ধুর ছেলেমেয়েরা বিদেশে; কদাদা, খদাদা, বুবুন এমনকি মায়ের তুতো ভাইবোনেদের ছেলেমেয়ারাও কেউ কেউ বিদেশে; তনুকা, অরিত্রও বিদেশে। অথচ মা কখনও ভাবেনই নি যে সান্যাল বাড়ির ঘেরাটোপের বাইরে, আর পাঁচটা সাধারণ মেয়ের সাথে মিশে আমি বিদেশে সসম্মানে সুরক্ষিত থাকব; একলা মেয়ের চরিত্র নিয়ে কোনো প্রশ্ন উঠবে না বা চরিত্রে কোনো দাগ লাগবে না। চেনাশোনা অনেকগুলো ছেলেমেয়ে বিদেশ যাওয়াতে মায়ের মনে হতে লাগল আমাকে বিদেশে পাঠালেই সান্যাল বাড়ির টলে যাওয়া সম্মান ফিরে আসবে স্বস্থাণে। তবে কিনা আমাকে তো আর হাভাতের মতো চাকরির ধান্দায় পাঠাবেন না, ছাত্র করে পাঠাবার কথা মনেও আসে নি তাঁর; সেসব কাম্মার মতো জাঁহাবাজদেরই মানায়; তাই প্রতি রবিবার পাত্রী-চাই কলামে কেবল এনআরআই পাত্রের খোঁজ শুরু করেছিলেন। তারপর প্রকৃত সৌন্দর্যে আটকাবে না জেনেও মা হাত কামড়াতে শুরু করেছিলেন আমাকে কেন কনভেন্টে পড়ান নি বলে। কিন্তু সান্যাল বাড়ির অবাক হতে আরও, আরও অনেক বাকি ছিল। যে বনেদী এনআরআই বারেন্দ্র লাহিড়ীরা কনভেন্টের ছাত্রীকে পাত্রী হিসেবে চান নি, তাঁরা বলে গেলেন, “আমাদের তাড়া নেই, আমরা আরেকটু ফর্সা, আর পানপাতার মতো মুখের মেয়ে খুঁজছি; এতটা লম্বা মুখের মেয়ে আমাদের চাই না”। মায়ের উদ্যম দ্বিগুণ হয়ে গেল; পরের সপ্তাহেই রায় বংশজাত বনেদী বারেন্দ্র এনআরআইয়ের সাথে কথা পাকা করে একমাসের মধ্যে ফাল্গুণের সন্ধ্যেবেলা আমার বিয়ে দিয়ে দিলেন। বিয়ের দশদিনের মাথায় ছুটি শেষ হয়ে গিয়েছিল বরের; সে ফিরে গিয়েছিল হ্যুস্টনে, তার দিদি ফিরে গিয়েছিল মুম্বাই, আমি ফিরে গিয়েছিলাম সান্যালবাড়িতে। ঠিক ছিল মাস তিনেক পরে পাসপোর্ট-ভিসা সব হলে আমি বরের কাছে যাব।
তারপর মাসখানেক রাতে ঘুমোতাম না। রয়বয়ের সঙ্গে চ্যাট করেই কেটে যেত। একপশলা জ্বর কাটিয়ে উঠে একদিন দেখলাম কাঙ্খিত আইডি-র পাশে অফলাইন আইকন। বাজ করে করে, পিং করে করে, মেল করে করে সাড়া নেই। ভিসা দরখাস্ত জমা দেওয়ার জন্য ভদ্রলোকের ঠিকানা চাইছিলেন বাবা; আমি দিতে পারছিলাম না। মা জানতে চেয়েছিলেন ঝগড়া করেছি কিনা। ওঁদের আঘাত দিতে চাই নি; কিন্তু মাসাধিক আমি তাঁর সাথে যোগাযোগ করতে পারি নি, সে কথা লুকোবার কোনো উপায়ই ছিল না আর। কোথা থেকে খুঁজবেন তাঁকে বাবা-জ্যাজা-বুবু? তাড়াহুড়োতে ভদ্রলোকের হ্যুস্টনের, তাঁর দিদির মুম্বাইয়ের - কোনো ঠিকানাই নেওয়া হয় নি। যে ফ্ল্যাটে গিয়ে উঠেছিলাম বিয়ের পর সেটা নাকি ওঁরা একমাসের জন্য ভাড়া নিয়েছিলেন। আগরপাড়ায় মামারবাড়ি, বর্ধমানে কাকার বাড়ি গিয়ে দেখা গেল সেই সব ঠিকানাই নেই। আত্মীয়স্বজনেরাও হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে। মিলিয়ে গেছে পঞ্চাশ ভরি সোনার গয়না, নগদ দশ লাখটাকা বিদেশে ঘর সাজানোর যৌতুক, নিউ আলিপুরের ফ্ল্যাটের খাট, বিছানা, সোফা, আলমারি, ড্রেসিং টেবিল।
তখন মাঝরাতে ঘুম ভেঙে যেত, মার কান্না ভিজে গালের ছোঁয়ায়; মা আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতেন আর বলতেন, “ভাগ্যিস, আমার মেয়েটাকে নিয়ে যায় নি ডাকাতগুলো!” বার চারেক আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলাম। সফল হতে পারি নি, টেকনিক্যালি, খানিকটা ইমোশনালিও।

            আরো প্রেমে    আরো প্রেমে
মোর      আমি ডুবে যাক নেমে।
            সুধাধারে আপনারে
তুমি      আরো আরো আরো করো দান।

কাম্মা আর ছোটকু আমাকে নিয়ে বেড়াতে গেলেন মানালি। জেম্মা, জ্যাজা বাবা-মাকে নিয়ে ঘুরে বেড়াতে লাগলেন নানা মন্দিরে, দরগাতে। একসময় জেম্মা-জ্যাজা গয়া গিয়েছিলেন, কুসন্তানের পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে; কদাদার পাপেই নাকি আমাদের বংশে এরকম বিপদ নেমে এসেছিল; সেবার ওঁদের সাথে বুবু আর মেম্মা গিয়েছিলেন। ফিরে এসে মেম্মা খুব কান্নাকাটি করে জানিয়েছিলেন যে অনেক সাধ্য-সাধনা করে জেম্মা-জ্যাজাকে তিনি রুখেছেন কদাদার শ্রাদ্ধ করার থেকে। তাই শুনে আবার মা বলেছিলেন, “নিজের তো আর আঁচ লাগেনি, আটকাবেই তো শ্রাদ্ধ, ক্ষতি যা হবার হলো আমার মেয়েটারই, কোনোদিনই দেখতে পারত না যে ওকে”। মেম্মা মায়ের এই গজগজ শুনে একটা কথাই বলেছিলেন, “মাথা ঠাণ্ডা করে আমাদের ভুলগুলো শুধরে নেওয়ার সময় হয়েছে রে, না হলে আমাদেরই দু-দুটো ছেলেমেয়ে এমন না মরে বেঁচে আছে কেন?” অবাক হয়ে ভাবতাম মেম্মাও এতো সহানুভূতিশীল, আগে কখনও বুঝিনি তো!
ঋক কি বুঝত জানি না, তবে থেকে থেকে বলত, “দিদিভাই, তোর বর আসবে, এই ডাকাতটা নয়, অন্য বর, দেখিস”। আমি ওকে পড়াতে ভুলে যেতাম। বর, বিয়ে, কম্পিউটার চ্যাট সব ভুলে গিয়েছিলাম। সম্বিত ফিরল পরীক্ষার অ্যাডমিট কার্ড পেয়ে। মেশিনটার ধুলো-টুলো ঝেড়ে বসলাম। বুবুন মেল করেছে। গ্রীটিংস কার্ড পাঠিয়েছে। রিপ্লাই করলাম। একটা অচেনা আইডি থেকে আসা মেলটা স্প্যামে দেবো না মুছে দেবো ঠিক করার জন্য সাবজেক্ট লাইনে চোখ রাখতেই দেখি “ফ্রম কদাদা”। চোখে সেদিন জল এসে গিয়েছিল। ছোট্ট মেলে লিখেছিল, “এবার ললিতা হয়ে ওঠ, সান্যালটা রাখবি না ফেলবি সেটা তোর ব্যাপার, কিন্তু ললিতাকে প্রতিষ্ঠিত করার দায়িত্ব একলা তোর,”।
এরপর পরীক্ষা, রেজাল্ট আর বাবার সাথে ঝগড়া করে প্রফেশনাল টিউটরের কাছে যাওয়ার ফাঁকে অগুণতি কাগজে সই করতে করতে কখন শুনলাম আমার ডিভোর্স হয়ে গেছে। শাঁখাজোড়া হাইড্রেনে ফেলে দিয়েছিলাম তারপর কোনো একসময়। সিঁদুর লাগানো বন্ধ করে দিয়েছিলাম কবে মনে নেই আর।
পুরোন কারুর সাথেই স্বচ্ছন্দে মিশতে পারতাম না। সবার আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে চলতে চাইতাম। সম্ভব ছিল না। ফাইনাল ইয়ার প্রজেক্ট করছিলাম যে কোম্পানিটায় সেটার প্রজেক্ট ম্যানেজার দিব্যেন্দুদা একদিন ডেকে বলেছিলেন, “আমাদের কিছু ওপেনিং আছে, এখন প্রজেক্ট বেসড, পরে পার্মানেন্ট হতে পারে। তুমি অ্যাপ্লাই করতে চাইলে আমি রেকমেণ্ড করে দেব”।
আমার দ্বিধার প্রশ্ন ছিল না। সান্যাল বাড়ির থেকে বেরোনোর এটাই প্রথম সু্যোগ ছিল। বছরখানেক পরে ডিগ্রিও পেয়ে গেলাম। বড় কোম্পানিতে পার্মানেন্ট চাকরিও। আসলে দিব্যেন্দুদা তখন ওই কোম্পানিতে চলে গিয়েছিলেন। সময় মতো খবরও দিয়েছিলেন। এবার আর রেকমেণ্ডশনের দরকার হয় নি। এক্সপেরিয়েন্সেই হয়ে গিয়েছিল।
আস্তে আস্তে আমি সব প্রায় ভুলেই গেছি। সপ্তায় একদিন যেতাম মাদার্স হোমে, ভলিন্টিয়ারিং করতে। অনেককে দেখে আমার মনে হতে লাগল যে অন্তত আমার বাড়িতে সবার কাছে আমি খুব আদর পেয়েছি, শুধু মেয়ে বলেই; আমি তো দুর্লভজনক ভাগ্যবতী; শুধু মেয়ে বলেই কতজনকে ডাস্টবিনে ফেলে দিয়ে গেছে বাবা-মা, বা অন্য আত্মীয়। কিন্তু বাড়িতে ঋক ছাড়া বাকি সবাই আমাকে সন্দেহ করতে শুরু করেছিল। এড়িয়ে চলতে শুরু করেছিল। কারণ পুরোন বন্ধুদের সাথে সোশাল নেটওয়ারকিং সাইটে মেতে থাকতাম অফিসের পরের সময়টুকু; বাড়ির কারুর সাথে বিশেষ আড্ডা দিতাম না। ছুটির দিনে ঋকের সাথে গেমস নিয়ে মজে থাকতাম। মাঝে মাঝে মেসেও থাকতাম। তখন বড়দের মধ্যে কেবল কদাদাই নিয়মিত যোগাযোগ রাখত, (এখনও রাখে)। খদাদা আর বুবুনও রাখত, তবে কদাদার মতো নয়। সে সময়কার একটা কথা মনে পড়লে এখনও খুব হাসি পায়; তখন  খদাদা থেকে থেকেই হুমকি দিত আমাকে যে বাড়ির বাধ্য মেয়ে হয়ে ওর সাথে ওর বিয়ে নিয়ে কথা বললে ও যোগাযোগই রাখবে না। সান্যাল বাড়িতেও প্রবল গুজব তখন, খদাদা নাকি গে।
তারপর আমার জীবনে এলো নতুন প্রজেক্ট লিডার কোরক। কোরক দত্ত। তনুকার ক্লাসমেট। বয়স এবং তনুকার সূত্র আমাদের বেশ জলদি বন্ধু করে দিয়েছিল। কোরকের বাড়িতেও যাতায়াত শুরু করেছিলাম আমি। ওর বাবা-মা-র সাথেও বেশ আলাপ হয়ে গেছিল। কোরক আমার প্রথম বন্ধু আমি যার বাড়িতে গিয়েছিলাম। এর আগে কোনোদিন কোনো বন্ধুর বাড়িতে যায় নি সান্যাল বাড়ির একমাত্র মেয়েটি। আমি টের পাচ্ছিলাম যে আমি ললিতা হয়ে উঠেছি। একদিন কদাদাকে সে কথা বলতে ও তো আমার সেলফোনে কলই করে বসল, প্রমাণ নিতে। কদাদার ছেলে, মেয়ে, বৌদি সবার সাথে গল্প শুরু হলো। শনিবার শনিবার রাত জাগা গল্প। মায়ের ভ্রূ কুঁচকে উঠছিল, বলেছিলেন, “পাশের বাড়ির টুকুনের মার রাতে ঘুম ভেঙে যায় তোর বন্ধুর ফোন এলে”। আমি ভাবছিলাম আমার বন্ধুই বটে; তোমাদের জন্য তো কবেই মরে গেছে সে; কিন্তু সে চোখ মেলে, বুক পেতে দাঁড়িয়ে আছে; তোমরা মাথা রাখলেই আপন হতে পারবে; সে তোমাদের কখনও পর করে দেয় নি।
বছর দেড়েক পরে এক সন্ধেবেলা আমার প্রমোশন সেলিব্রেট করতে গিয়েছিলাম কোরকের সাথে। বাড়িতে তো কেউ এসব বেলেল্লাপণা, ধিঙ্গীপণা, বাড়ির মেয়ের আপিসে কাজ করে প্রমোশন পাওয়া সেলিব্রেট করতে যাবে না। তাই আমার বন্ধু বলতে যেহেতু একমাত্র কোরক তাই ওর সাথেই সেলিব্রেট করতে গিয়েছিলাম। সেদিন কোরক প্রোপোজ করেছিল। আমি ভাবছিলাম কবে করবে, এতো ভালো লাগে ওর সাথে সময় কাটাতে, ওকে তো বিয়ে করতেই পারি। আমি উত্তরে বলেছিলাম, “কোনটা তোর ভালো লাগবে, এক্ষুণি হ্যাঁ করে দিলে নাকি ভেবে দেখছি বলে দু-তিন দিন কিংবা দু-তিনবার ঘোরালে?” কোরক ছদ্মরাগে বলেছিল, “আমার পরোয়া আর করলি কই? সবই তো বলে দিলি”। তারপর আমরা ওয়াইনের পুরো বোতলটা শেষ করেছিলাম; হাত ধরাধরি করে গঙ্গার ধারে হেঁটেছিলাম; এবং চুমু খেয়েছিলাম। আমার জীবনের প্রথম চুমু। কোরক শুনে বলেছিল, “তোর মতো মফস্বলের ভালোমেয়ের থেকে আর কিই বা আশা করা যায়!” উত্তরে বলেছিলাম, “ভুল করছ, শহুরে চালাকচতুর, তোমার প্রেমিকা কিংবা বাগ্‌দত্তাটি ডিভোর্সি”। চালাকচতুর স্বভাবসিদ্ধ বাগ্মিতায় বলেছিল, “তুই থুতু ফেলে ডুবে মর, বিয়ে করেছিলি আবার চুমুও খাস নি! কী ভালো মেয়ে রে, নেকুপুশুমুনু!” হঠাৎ নেশানেশা ঘোরটা কেটে গিয়েছিল, বলেছিলাম, “তুই কি আমাকেই দায়ী করছিস?” কোরকেরও নেশা কেটে গিয়েছিল; ও জবাবে বলেছিল, “লেট বাইগোনস, বি বাইগোনস। লেটস্‌ থিঙ্ক কবে করব বিয়ে, কীভাবে করব, তার আগে বাড়িতে জানাবো কবে, কবে বাড়ির লোকেদের মিট করাব... অনেক কাজ খুকি, বাড়ি যাও, ঘুমোও, কাল থেকে আপিসের পর একঘন্টা করে লিস্টি ধরে বিয়ের যোগাড়ে নামবে বুঝলে”। আমি ভীষণ খুশি হয়েছিলাম পুরো ব্যাপারটায় কোরকের নিয়ন্ত্রণ দেখে।
সে রাতে ওয়াইনের নেশা গায়েব হয়ে গিয়েইছিল। সারারাত ঘুমোতে পারি নি অন্য আরেক নেশা, নেশা উত্তেজনায়। সে সপ্তাহের পুরোটা মেসেই ছিলাম, কোরকের সাথে রোজ দেখা করব বলে। সে কারণে পাহাড়প্রমাণ কাজ তরতর করে এগিয়েছিল। ওর বাড়িতে আমাদের বিয়ের প্রোপোজাল পাশ হলো স্মুথলি; সান্যাল বাড়িতে ডিভোর্সি মেয়ের বিয়ের প্রশ্নই ওঠে না; তাও বেনের ছেলের সাথে! অতএব আমার বাড়ির বলতে বিয়েতে যাঁরা সাক্ষী ছিলেন তাঁরা হলেন কদাদা, খদাদা, বুবুন, কাম্মা, ছোটকু। সোনা ছিল না, নগদ ছিল না, ফার্নিচার ছিল না, উলু, শাঁখ, সিঁদুর – কিচ্ছু ছিল না। তবু আমার রাগ হয় নি কারুর ওপর। অভিমানকেও বাসা বাধতে দিই নি কদাদার সহনশীলতার কথা ভেবে।
পাসপোর্টের ললিতা সান্যাল আর আমি একই মানুষ। আর পৃথিবীজোড়া মানুষের ভিড়ে আমার কোনো আলাদা পরিচয় নেই, ভিড়ের একজন। তাও আমি বেঁচে থাকব মেধাতিথি, আমার মেয়ের মধ্যে দিয়ে, তার অপত্যদের মধ্যে দিয়ে। আমিও অমরত্ব পাব, ভিড়ে মিশে থাকা প্রত্যেকের মতোই। কোনো অহঙ্কার আমাকে আলাদা করতে পারবে না এই অস্তিস্বের সমুদ্র থেকে। মেধাতিথি সে কথাটাই জেনে যাবে সোজাসুজি এই লেখাটুকুর মধ্য দিয়ে; অহঙ্কারের চোরাবালির সাথে লড়াইয়ের দরকার হবে না তার। শুরুর থেকেই, ভিড়ের একজন হয়েই সে অমরত্বের সন্ধান পেয়ে যাক, নিজেকে নিয়ে সচেতন না হয়ে, সচেতন হয়ে বেঁচে থাকুক রোজ রোজ, নতুন, নতুন দিনে, মানুষ আর বেঁচে থাকাকে ভালোবেসে।
     
Untitled Document
প্রদর্শনী

হরে রাম

video video
Copyright © Life Bangladesh
সাপলুডু মূলপাতা | মতামত Contact : shapludu@gmail.com