Untitled Document
আশ্বিন সংখ্যা ১৪১৮
মূলপাতা শিরোনাম বটতলা পঞ্জিকা প্রদর্শনী
সম্পর্কহীন সম্পর্ক
- শুভ কিবরিয়া


বহুকাল পরে বন্ধু শর্মির সঙ্গে দেখা। শর্মি এখন ইউরোপের নাগরিক। বাংলাদেশের সবুজ পাসপোর্ট আর ব্যবহার করে বাস্তবজ্ঞানেই। সবুজ পাসপোর্ট সারাপৃথিবীজুড়ে যে যে অসুবিধা তৈরি করে, তার অনেকটাই দূর হয়ে যায় ইউরোপের পাসপোর্টে। কিন্তু হৃদয় থেকে শর্মির সবুজতা হারিয়ে যায়নি। এখনো সমান সজীবতা তার কথায় ও আচরণে। শর্মির সংসার এখন ভরাট। তিন সন্তান যে যার মতো উচ্চ বিদ্যায়তনে পড়ছে। স্বামী করিৎকর্মা পুরুষ। এটুকু বলার বলেই থামল শর্মি।
...পুরনো বন্ধুত্ব আর সহপাঠীর আবদার নিয়ে বলল, জানো, কতকাল আমরা একখাটে ঘুমাই না। এক ছাদের নিচে থাকি কিন্তু দুজনের পুরো জগতই আলাদা। বাঙালি সংস্কৃতির পুরনো মিথগুলো টেনে ধরে বলে আমরা বিচ্ছিন্ন হইনি, ডিভোর্স নেইনি। কিন্তু আমাদের চিন্তায়, ভাবনায়, জগতে পুরোটাই বিচ্ছেদ। এক ভুবনে আমরা দুই জগতের বাসিন্দা। শর্মির কথাগুলো খুব ছুয়ে যায়। ওকে জিজ্ঞেস করি কষ্ট হয় না! উত্তরটা এড়িয়ে যায়। বলে কষ্ট কমাতে সংঘাত এড়াই। সংঘাত এড়াতে গিয়ে সতর্ক থাকি। আর সতর্ক থাকতে থাকতেই সম্পর্কগুলো কেমন নি®প্রভ-হৃদয়হীন হয়ে গেছে। বলতে পার সম্পর্কহীন এক সম্পর্কের মধ্যে আছি আমরা। সম্পর্কহীন সম্পর্কই আমাদের দাম্পত্য জীবনের ভাঙ্গা সেতু।
এরপর শর্মি তার দাম্পত্য জীবনের যে কাহিনী শুনিয়েছে তা আর পাঠকদের শোনাতে চাই না। তবে, সম্পর্কহীন সম্পর্কের এই ভাবনাটা আমার মাথায় ঢুকে গেছে।

খ..
রাজনীতি নিয়ে লেখালেখি করি বলে, রাজনীতির মধ্যে এই সম্পর্কহীন সম্পর্কের খোঁজে বের হই। হাল আমলের আওয়ামী লীগ, বিএনপি সর্বত্রই এই সম্পর্কহীন সম্পর্কের খোঁজ পাই। এর মধ্যে আমার হাতে আসে কামরুদ্দীন আহমদের ‘বাংলার মধ্যবিত্তের আত্মবিকাশ’ বইটি। সেটি পড়তে পড়তে ভাবলাম এই বই থেকে কিছু অংশ সাপলুডুর পাঠকদের সঙ্গে শেয়ার করি। বুঝতে পারবেন আমাদের বাংলাদেশি বাঙালির মধ্যবিত্ত কিভাবে বেড়ে উঠেছে ভড়ং, আত্মপরতা আর সম্পর্কহীনতার মোড়কে রাজনৈতিক সম্পর্ক বিনির্মাণ করে।

১.
ঢাকার মধ্যবিত্ত মুসলমানদের মধ্যে তখনো রাজনৈতিক চেতনার উন্মেষ ঘটেনি। যদিও কিছু কিছু মুসলমান ছেলে সন্ত্রাসবাদী দলে অথবা কম্যুনিস্ট পার্টিতে যোগ দিয়েছিল। বাকি রাজনীতি আহসান মঞ্জিলের চৌহদ্দির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। ওখান থেকেই পরিষদ সদস্য, জেলা বোর্ড সদস্য, মিউনিসিপ্যালিটি নির্বাচন প্রার্থী ঠিক করা হত। এক কথায় সিপাহী বিদ্রোহ দমনে সাহায্য করার জন্য নবাব উপাধিতে ভূষিত নবাব আবদুল গনি সাহেব এবং তার পুত্র নবাব খাজা আহসানউল্লাহ ব্রিটিশকে সাহায্য করে যাচ্ছিল। লর্ড কার্জন যখন খাজা আহসানউল্লাহর পুত্র নবাব সলিমুল্লাহকে বঙ্গ-ভঙ্গ সমর্থন করতে বললেন তখন তিনি রাজী হলেন এই শর্তে যে তার চৌদ্দ লক্ষ টাকা ঋণ ব্রিটিশ সরকার পরিশোধ করবে। সেই থেকে ব্রিটিশ রাজের অনুগ্রহে বাংলার মুসলমান সম্প্রদায়ের নেতৃত্ব আহসান মঞ্জিলের চার দেয়ালের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রইল বহুকাল।

২.
১৯১১ সনে বঙ্গ-ভঙ্গের প্রথম প্রস্তাব রহিত করে যখন বাংলাকে ভাষা-ভিত্তিক করা হল- যার ফলে ঢাকা আর রাজধানী থাকল না। তখন আহসান মঞ্জিলের নেতৃত্বে প্রথম ফাটল ধরল। স্যার সলিমুল্লাহ অভিমান করে রাজনীতি থেকে অবসর গ্রহণ করেন। ভাঙ্গা হৃদয় নিয়ে ১৯১৫ সনে মৃত্যুমুখে পতিত হন। ব্রিটিশ সরকারের অনেক অনুরোধ সত্ত্বেও তিনি তখন আর রাজনীতিতে ফিরলেন না- তখন ব্রিটিশরাজের পক্ষে নবাবদের বাদ দিয়ে কন্যাপক্ষের সন্তানদের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে মনস্থ করলেন। যার ফলে শহর বানুর ছেলে নাজিমুদ্দীন ও শাহাবুদ্দীনের নেতৃত্বের দুয়ার খুলে গেল।

৩.
খাজা আহসানউল্লাহর ও নবাব স্যার সলিমুল্লাহর ধারণা ছিল যে মেয়েদের অশিক্ষিত ও বোকা লোকের সঙ্গে বিয়ে দিলে তারা জমিদারীর ভাগ চাইবে না এবং ঘরজামাই হয়ে দুটো খেয়ে-পরে খুশী থাকবে। কিন্তু কালের চক্রে খাজা হাবিবুল্লাহকে পিছে ঠেলে ফেলে সেই বোকাদের ছেলেরাই অর্থাৎ শহরবানু ও আমিনা বিবির পুত্ররা রাজনৈতিক আঙ্গিনায় নেতা হয়ে বসলেন। অর্থাৎ নাজিমুদ্দীনকে বাংলার নেতৃত্বে সমাসীন রেখে খাজা শাহাবুদ্দীন ঢাকা শহর ও ঢাকা জেলাকে করতলে রাখার ব্যবস্থা করলেন। নাজিমুদ্দীন, শাহাবুদ্দীনের ব্যক্তিত্ব বৃদ্ধি করার জন্য তাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার এবং তিনি হজ্বে গেলে গভর্নরকে বলে খাজা শাহাবুদ্দীনকে তার স্থলে একজিকিউটিভ কাউন্সিলর করে গেলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-চ্যান্সেলর পদেও তিনি কিছুদিন কাজ করলেন অর্থাৎ প্রবেশিকা পরীক্ষা পাশ না করেও বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ পদে অধিষ্ঠিত হলেন। ক্ষুরধার বুদ্ধি প্রয়োগ করে বিরোধী দলের লোকের উপর প্রতিহিংসা চরিতার্থ করে মধ্যবিত্তের মনে ভয় সৃষ্টি করেছিলেন খুবই তার উপর এখন যোগ হল ব্যক্তিত্ব। তার বিচক্ষণতা ক্রমাগত প্রকাশ পেতে লাগল।

৪.
এ সময় ঢাকার নতুন বুর্জোয়া মুসলমানদের মধ্যে রাজনৈতিক চেতনা দেখা দেয়। এদের মধ্যে কেউ কেউ শাহাবুদ্দীনের দলে ভিড়েন এদের মধ্যে নাম করা যায় জিন্দাবাহারের ডাক্তার মইজুদ্দীন, সুলতানউদ্দীন আহমদ (পরবর্তীকালে রাষ্ট্রদূত), রেজাই করিম (প্রথম জীবনে খাজা নাজিমুদ্দীন সাহেবের প্রাইভেট সেক্রেটারি ও পরে ‘কাউন্সিল অব স্টেটে’র সদস্য), খানবাহাদুর আবদুর রশিদ (প্রথম জীবনে স্কুলের শিক্ষক ও পরবর্তী কালে জমিদার, আপার কাউন্সিলের সদস্য ও প্রভিন্সিয়াল লাইব্রেরীর মালিক), ফজলুর রহমান উকি (পরবর্তীকালে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী), অন্যদিকে ছিলেন বেচারাম দেউরীর জমিদার আবুল খয়রাত মোহম্মদের ছেলে আবুল হাসনাত আহমদ (ঢাকা মিউনিসিপ্যালিটির ভাইস চেয়ারম্যান হয়েছিলেন), মোহাম্মদ ইব্রাহিম (পরবর্তীকালে হাইকোর্ট জজ ও আয়ুব খানের মন্ত্রী), জনাব কফিলউদ্দীন চৌধুরী (পরবর্তীকালে জেলা বোর্ডের ভাইস চেয়ারম্যান ও মন্ত্রী), আরো দুজন ছিলেন যারা দু’দিকেই সমানভাবে থাকতেন তারা হলেন- মীর্জা আবদুল কাদের সর্দার ও শেফাউল মুলক্ হেকিম হাবিবুর রহমান। রেজাই করিম সাহেবও পরবর্তীকালে ঐ পথ গ্রহণ করেছিলেন। এরা আবার খাজা শাহাবুদ্দীনের দলে পুরোপুরি যেতেন না বলে শাহাবুদ্দীন এদের ক্ষতি করতে পারে তাই এরা নবাব খাজা হাবিবুল্লাহর সমর্থক বলে নিজেদের পরিচয় দিতেন- যদিও নবাব ১৯৩৬ সনের পূর্বে রাজনীতির আসরে সরাসরি আসনেনি।

৫.
সে যুগে ঈদের দিনে বিকেল বেলা অভিজাত মুসলমান নাগরিকরা ‘আহসান মঞ্জিলে’ মিলিত হত। বাইশ পঞ্চায়েতের সর্দারদের দাওয়াত করা হত সে সুধি মজলিশে। সাধারণ মুসলমান অর্থাৎ যাদের কুট্টি বলা হত তাদের সেখানে কোন স্থান ছিল না। এ ব্যবস্থা বহুকাল প্রচলিত ছিল।

৬.
১৯৩৪ সনে ঈদের মিলন উপলক্ষে যখন সকল অভিজাত মুসলমান নাগরিকরা আহসান মঞ্জিলে সমবেত হয়েছেন তখন দেখা গেল যে খাজা সাহেব ও তাদের আত্মীয়দের জন্য খাবারের পর গোল্ড ফ্লেক সিগারেট আর অতিথিদের জন্য ব্যবস্থা হয়েছে পাসিংশো ও ট্যটলার সিগারেট-অর্থাৎ তারা খাবে বেশি দামী সিগারেট আর অন্যেরা কম দামের সিগারেট। নিমন্ত্রিত আধা সামন্তবাদী বুর্জোয়া মুসলমান ভদ্রলোকেরা এটাকে চরম অপমান বলে মনে করে সেখান থেকে চলে এলেন এবং ঐদিনই আহসান মঞ্জিলে ঐ ধরনের ঈদের মিলন শেষ হল।
     
Untitled Document
প্রদর্শনী

হরে রাম

video video
Copyright © Life Bangladesh
সাপলুডু মূলপাতা | মতামত Contact : shapludu@gmail.com