Untitled Document
আশ্বিন সংখ্যা ১৪১৮
মূলপাতা শিরোনাম বটতলা পঞ্জিকা প্রদর্শনী
 
সাক্ষাৎকারঃ কামরুদ্দিন আবসার (গণসঙ্গীত শিল্পী )



কামরুদ্দিন আবসার গণসঙ্গীতশিল্পী। গান গাইছেন ’৭১-এর পর থেকে এখন পর্যন্ত। দীর্ঘদিন বাংলাদেশ লেখক শিবিরের সাথে যুক্ত ছিলেন। বর্তমানে গণসংস্কৃতি ফ্রন্টের একজন সক্রিয় সংগঠক। গণসঙ্গীতদল ’সৃজন’-এর সাথেও কাজ করে যাচ্ছেন অনেকদিন ধরে। তাঁর দীর্ঘ এই গণসঙ্গীত চর্চার জীবনে নিজেও গান লিখেছেন, সুর করেছেন। তবে গণসঙ্গীতের বাইরে তিনি বিপুল সংখ্যক ছড়ায় সুরারোপ করেছেন। আর নিজে গাইতেন প্রধানত হেমাঙ্গ বিশ্বাসের গানগুলো এবং বলা যায় হেমাঙ্গ বিশ্বাসের গান পরিবেশনায় কামরুদ্দিন আবসার বিশেষত্ব অর্জন করেছিলেন। তাঁর সাথে সমগীতের আলাপচারিতার কিছু নির্বাচিত অংশ এখানে পরিবেশিত হলো।

সমগীতঃ আমরা মূলতঃ আপনার কাছে স্বধীনতা উত্তর বাংলাদেশে গণসঙ্গীতের চর্চা সম্পর্কে জানতে চাইবো। তার আগে আপনার কাছে জানতে চাইছি, কোন ধরনের গানগুলোকে আপনি মূলতঃ গণসঙ্গীত বলে মনে করেন? আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময়কার স্বাধীনবাংলা বেতারকেন্দ্রের সকল গানকেই কি গণসঙ্গীত বলা যায়?

কামরুদ্দিন আবসারঃ আমি সেইবস গানকেই গণসঙ্গীত মনে করি যে গানে মার্কসীয়, লেনিনীয় দৃষ্টিকোণ থেকে শ্রমিক-কৃষক-মেহনতী মানুষের সংগ্রামজাত কথাগুলোকে বলা হয়েছে বা বলা হয় সে গানগুলোকে আমার কাছে মনে হয় গণসঙ্গীত। কিন্তু একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময়তো একদম অপরিকল্পিতভাবে যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। এ পর্যায়ে ঊনসত্তরের গণআন্দোলনের গানগুলোকে বেশি গাওয়া হয়েছে। আর একাত্তরে যুদ্ধের সময় যে গানগুলো গাওয়া হতো, আমার মনে আছে রবীন্দ্রনাথের ‘আগুন জ্বালো’, ‘বাঁধ ভেঙে দাও’ এই দুটো গান বারবার ঘুরে ঘুরে আসতো। আর মনে আছে, এক ভদ্রলোক, ইন্ডিয়ায় এখন আছেন, বাংলাদেশেরই ছিলেন, নামটা এ মুহূর্তে মনে পরছে না- ‘একটি ফুলকে বাচাঁবো বলে যুদ্ধ করি’, ‘তীর হারা এই ঢেউয়ের সাগর’ এইসব গানগুলি উনি লিখেছিলেন। কামাল লোহানী আবার এই ধরনের গান সংগ্রহ করে নিয়ে আসতেন, লিখাতেন। আমি এই গানগুলোকে গণসঙ্গীত বলি না। এইটা একটা যুদ্ধের গান। এর মধ্যে আবার বিতর্ক থাকতে পারে। তবে এগুলোকে গণসঙ্গীত নয় বলে উড়িয়েও দেবো না। যেমন ‘ও বিষম দইরার ঢেউ / উথাল পাথাল করে’ কিংবা হেমাঙ্গ বিশ্বাসের ‘নোঙর ছাড়িয়া নায়ের দে দুঃখি নাইয়া’ এইটাকেও তুমি ওইভাবে গণসঙ্গীত বলবে কিনা সেটাও একটা ব্যাপার। যেমন ‘থাকিলে ডোবাখানা জমে কচুরীপানা’ এটাকেও আমি ওইভাবে গণসঙ্গীত মনে করছি না। মার্কসবাদ বা লেনিনবাদের আদর্শিক জায়গা থেকে শ্রমিক-কৃষক-মেহনতী মানুষের কথাটা আসছে না। তবে এই গানগুলো দিয়ে জনগণকে, সাধারণ জনগণকে একটা সংগ্রামের পরিস্থিতি বোঝানো যায়। সেই পরিস্থিতিতে এটাকে গণসঙ্গীত বলা যেতে পারে। একেবারে তো এটাকে আমরা উড়িয়ে দিতে পারি না।

সমগীতঃ ...

কামরুদ্দিন আবসারঃ ১৯৭২ সালের পরে আলতাফ মাহমুদ সঙ্গীত বিদ্যানিকেতনে যোগ দিলাম। এই বিদ্যানিকেতনের পরিচালক ছিলেন শেখ লুতফর রহমান, আর দিনু বিল্লাহ। আলতাফ মাহমুদ সঙ্গীত বিদ্যানিকেতনÑ এটা প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৭২ সালে। ’৭২ সালের দিকে একটা বাড়ি ছিলো মালিবাগ ১ নম্বরে, যেটা এখন চাইনিজ রেস্টুরেন্ট হয়েছে। ঐ বাড়িটা নন বাঙালির বাড়ি ছিলো। তো, ওরা চলে গেছে। ঐ বাড়িটা পরে নাসিরুদ্দিন বাচ্চু, বেবী, দিনু বিল্লাহ- এরা সবাই ছাত্র ইউনিয়ন করতো, একসাথে ছিলো- ঐ বাড়িটা দখল করে আলতাফ মাহমুদ সঙ্গীত বিদ্যানিকেতনের নামে চলে যায়। কারণ এই পুরো গ্রুপটাই আলতাফ মাহমুদের নিয়ন্ত্রণে ছিলো। আলতাফ মাহমুদ যখন শান্তিবাগে থাকতেন সেই বাসাতে ঐ ওরা, অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধারা আসতো। মুক্তিযোদ্ধারা অস্ত্র লুকিয়ে রাখতো। যার পরিপ্রেক্ষিতে মুক্তিযুদ্ধের সময় আলতাফ মাহমুদকে ধরা হয়েছিল। আলতাফ মাহমুদের চেয়ে লুতফর রহমান অনেক বয়োজ্যেষ্ঠ ছিলেন।
শেখ লুতফর রহমান গোড়া থেকেই পাকিস্তান রেডিওতে চাকরি করতেন এবং মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়েও তিনি পাকিস্তান রেডিওতে চাকরি করেছেন। তবে তিনি মনে-প্রাণে ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে। শেখ লুতফর রহমানকে আমি কখনো নামাজ পড়তে দেখি নাই, কখনো আল্লা-রাসূলের কথাও বলতে শুনি নাই। কিন্তু অনেক হামদ্-নাত আমাদের ক্লাসে শিখাতেন। কামাল লোহানী বা ঐ সময়কার প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর সাথে ওনার একটা পরিচয় ছিলো। মস্কোপন্থি লোকেরা যেমন ওনাকে গ্রহণ করতেন, চীনপন্থিরাও তাকে সমান গ্রহণ করতেন। যেহেতু ওনার গলাটা ঐ সময় চমৎকার ছিলো, এবং গান গাইতে পারতেন- দারণ গণসঙ্গীত গাইতে পারতেন। এবং একথা সত্য যে গণসঙ্গীতের সুরকার হিসেবে শেখ লুতফর রহমান ছিলেন খুবই সফল। তাঁর গানগুলোতে একটা স্পিড ছিলো, একটা ঝোঁক ছিলো। কিন্তু রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে আমর কাছে আলতাফ মাহমুদ অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আর্মিরা যখন আলতাফ মাহমুদকে টর্চার করে তখনকার একটা রেকর্ড পাওয়া গেছে। পরে এটা সংগ্রহ করা হয়েছিলো এবং আমাদের একবার শুনিয়েছিলো। তিনি টর্চারিংয়ের সময় একটাও উর্দুতে কথা বলেননি। যখন ওনাকে বলেছে, ‘এই শুয়ার কী বাচ্চা, কাঁহা হ্যায় তেরা আর আদমী লোক?’ তখন ওনাকে ওরা মারছে। আহ-উহ চিৎকার শোনা যাচ্ছে। তখন উনি আর্মিদের বলছেন, ‘তুই শুয়ারের বাচ্চা, তোর বাপ শুয়ারের বাচ্চা, তোর চোদ্দগোষ্ঠী শুয়ারের বাচ্চা। নইলে তোরা এখানে আসবি কেনো? তোরা ছাড়েখাড়ে উৎখাতে যাবি। মরবি শেষে। আমি একটা নামও বলবো না। সব মুক্তিযোদ্ধাকে আমি চিনি। একটা নামও বলবো না। কি করে নাম বার করবি করা!’ রেকর্ডটা যে এখন কোথায়? মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে থাকতে পারে। ১৯৭৫ সালে যখন জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় আসলো, সেই সময় দিনু বিল্লাহ ও অন্যরা আলতাফ মাহমুদের জন্মবার্ষির্কীতে এটি শুনিয়েছিলো।
এই যে সময়টা যাচ্ছে ১৯৭২ সাল, ৭৩ সাল, ৭৪, ৭৫, ৭৬ সাল পর্যন্ত নতুন গান কিছুই হয়নি। শুধুমাত্র এই দুর্ভিক্ষের সময় কিছু গান এস.এম সোলায়মান তৈরি করেছিলেন। তিনি নাটকও করতেন। তারই লেখা এ গানটি- ’অন্ন চাই, বস্ত্র চাই’ এগুলোকে তুমি গণসঙ্গীত বলতে চাও বলতে পারো কিংবা এটা একটা প্রার্থনা, ভিক্ষার কথা বলতে পারো। তবে এর কথাগুলো ভালো ছিলো। এরকম কয়েকটা গান গেয়ে আমরা ভিক্ষা করতাম। এ গানগুলিও নতুন কিছু নয়, ’৪৩এর মন্বন্তরের সময়েও এরকম প্রচুর গান হয়েছিলো। এই গানগুলির পর আমার জানামতে আর কোনো গান হয়নি। হয়তো কোনো মফস্বলে কেউ কোনো গান কোনো সময় তৈরি করতে পারে কিন্তু সেই সময় গান সংগ্রহ করাতো খুব কঠিন ছিলো- ফলে তার কোনো সন্ধান আমরা পাইনি। সেই রকম সময়ে আমিও কোনো নতুন গান করিনি।

সমগীতঃ আপনাদের স্কুলটা, মানে আলতাফ মাহমুদ সঙ্গীত বিদ্যানিকেতন কেমন চললো?

কামরুদ্দিন আবসারঃ মুজিবর রহমান স্কুলের জায়গাটা দিয়ে গিয়েছিলেন। জিয়াউর রহমান এসে বছরে চল্লিশ হাজার টাকা করে দিতো। এরশাদ এসে আশি হাজার টাকা করে দিলো। এর কিছুদিন পরেই মানে ১৯৮৪ সালে এরশাদ সরকার ঐ জায়গা থেকে আলতাফ মাহমুদ ... নীচতলায় ব্যবহৃত হতো স্কুলের জন্য আর উপর তলায় থাকতেন আলতাফ মাহমুদের স্ত্রী। এরশাদ তখন আলতাফ মাহমুদের স্ত্রীর জন্য মোহাম্মদপুরে একটা বাড়ি দিয়ে দিলেন। আর এ বাড়িটি বিক্রি করে দিলেন না কি করলেন তার আর কিছু জানি না। আর আমরা স্কুল নিয়ে চলে গেলাম খিলগাঁয়ে।

সমগীতঃ সেই সময়ে আপনারা গণসঙ্গীত কিভাবে গাইতেন?

কামরুদ্দিন আবসারঃ আমাদের স্কুলের ব্যানারে থেকে। আমাদের কোনো সংগঠন ছিলো না। উদীচী ছিলো। উদীচী গাইতো। উদীচীর সাথে আমার কোনো পরিচয় ছিলো না। আমি গিয়েছি সেই সময় উদীচীর অফিসে কিন্তু কয়েকদিন গিয়েই আর যাইনি। ভালোলাগতো না। সত্যেন সেনের সাথে আমার কোনো যোগাযোগ হয়নি। ওনাদের কথা শুনে গিয়েছিলাম কিন্তু আমাকে ঠিক গ্রহণ করেনি বা এমনও হতে পারে ওদের মনে হয়েছে আমি একজন আনফিট লোক।
জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসে রেসকোর্স ময়দানে যে মুক্তিযোদ্ধা সমাবেশ করেছিলেন সেইখানে আমরা আলতাফ মাহমুদ সঙ্গীত বিদ্যানিকেতন থেকে গিয়েছিলাম গান করতে। লুতফর রহমান নেতৃত্ব দিলেন। আমরা ছেলেরা ছিলাম দশজন, মেয়েরা ছিলে দশজন। দুইজন তবলা বাদক ছিলো। দিনু বিল্লাহ ছিলো, শিমূল ইউসুফ, খসরু জাহাঙ্গীর- এরা ছিলো। আসলে আলতাফ মাহমুদ সঙ্গীত বিদ্যানিকেতন থেকে গণসঙ্গীত যারা গাইতেন পরবর্তী পর্যায়ে তারা আর কেউ গণসঙ্গীতকে ধরে রাখেনি।
জিয়াউর রহমান আসলেন যখন, আমাদের মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার, কমান্ডার বলতে বেবী, নাসিরুদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু, আসাদ- এরা সবাই মিলে এই মুক্তিযোদ্ধা সমাবেশের আয়োজন করে এবং জিয়াউর রহমানকে এই মঞ্চে নিয়ে আসে। পরবর্তী পর্যায়ে আমি বুঝতে পারলাম, এরাই আসলে এর পেছনে ছিলো। নাসিরুদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু ছাত্র ইউনিয়ন করতো। অনুষ্ঠানে জিয়াউর রহমান বক্তৃতা দেয়ার পর আমরা গান করতে উঠেছি। আমার মনে আছে, সেই শেষ গানটা আমরা করলাম ‘এই পথে সূর্যোদয়’। আমি এখনো বুঝতে পারি না, আমরা এই গানটা কেনো করলাম। এই সামরিক বাহিনীর পথেই কি সূর্যোদয় হবে? যাই হোক এটা আমরা করেছিলাম। এ অনুষ্ঠানে লিড দিয়েছিলেন শেখ লুতফর রহমান। ইউসুফ ভাই এরা নিয়মিত যেতো আমাদের ওখানে। রিহার্সেল কি হতো না হতো তার খোঁজখবর নিতো নিয়মিত। তবে একটা কথা সত্য, অসম্ভব সুন্দর গান হয়েছিল। সব থেকে ভালো পারফরমেন্স।
তখন আমরা এই প্রেসক্লাবে ফেব্রুয়ারির ২০ তারিখ গান গাইতাম। বিজেএমসি’র ওখানে। বিজয় দিবস, শহীদ দিবস এইসব দিনগুলোতে গণসঙ্গীত করতে আমাদের ডাক পড়তো। তখন গণসঙ্গীতের তেমন কোনো গ্রুপ সেরকম ছিলো না, উদীচী ছিলো। আর হ্যাঁ, ক্রান্তি ’৬৭ সালে তৈরি হলেও ৭১,৭২,৭৩ সাল পর্যন্ত রিহার্সেলই আমরা করেছিলাম। কিন্তু এর কোনো পারফরমেন্স আমরা করতে পারি নাই। রিহার্সেলই করেছি, রিহার্সেলই করেছি, চা খেয়েছি নিজেরা নিজেরা। তারপর দেখা গেলো এক পর্যায়ে ক্রান্তি শেষ, ক্রান্তিরও কোনো আওয়াজ নাই।
মুক্তিযোদ্ধা সমাবেশের সেই অনুষ্ঠানটা সম্পর্কে আমি লুতফর রহমানকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘স্যার, এখানে আমাদের এ গণসঙ্গীত গাওয়ার কি দরকার ছিলো?’ তো উনি বললেন, ‘আমারাতো জিয়াউর রহমানের জন্য গান গাই নাই রে, মুক্তিযোদ্ধা সম্মেলনে যুক্তিযোদ্ধাদের জন্য গেয়েছি।’ আমি আবার প্রশ্ন করি, ‘তো, মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মেলনে জিয়াউর রহমান আসলো কেনো প্রধান অতিথি হয়ে?’ - ‘তারা এসেছে তার আমরা কি করবো!’ ‘তাহলে আমাদের কি এইসব গান গাওয়া ঠিক হলো?’- আমি বলি। উত্তরে লুতফর রহমান বলেন, ‘তুই আমাকে যেটা বলেছিস, বলেছিস। আর কখনো এরকম কথা চিন্তা করিস না। দেশের অবস্থা খুবই খারাপ। এইগুলি নিয়ে কোনো চিন্তা ভাবনা করিস না। এটা একটা ইনস্টিটিউট, এটা কোনো সংগঠন নয়। যেখানে পয়সা দিবে সেখানে গান গাবি।’ অনেক টাকা দিতো। সেই সময়েই প্রেসক্লাব আমাদের একটা গণসঙ্গীতের প্রোগ্রামের জন্য ২০ হাজার টাকা দিতো। পরেও আমরা এরকমই গান গেয়েছি। বিজেএমসি’র চটকল সমিতির অনুষ্ঠানে, তারপর আদমজীর শ্রমিক এলাকায়ও গিয়েছি আলতাফ মাহমুদ সঙ্গীত বিদ্যানিকেতনের পক্ষ থেকে গান গাইতে।

সমগীতঃ লেখক শিবিরে গণসঙ্গীতের যাত্রা কিভাবে হলো?

কামরুদ্দিন আবসারঃ পিন্টু ভট্টাচার্যকে লেখক শিবিরে নিয়ে আসা হয়েছিলো। শাহরিয়ার কবির মূলতঃ গণসঙ্গীতকে লেখক শিবিরের মধ্যে যোগ করেন। ’৭৭ সালে আমি লেখক শিবিরের আলোচনা ও গান শুনি। তারপরে আমি যখন লেখক শিবিরে যোগ দিতে চাই, লেখক শিবিরওয়ালারা আবার আমাকে নিচ্ছে না। তারা আমাকে কোনো পাত্তাই দেয় না। শাহরিয়ার ভাইয়ের সাথে যোগাযোগ করলাম। শাহরিয়ার ভাই বললেন, ‘আচ্ছা, ঠিক আছে। আপনার ঠিকানা রেখে যান। আমরা পরে যোগাযোগ করবো।’ ঠিকানা রেখে গেলাম কিন্তু কোনো যোগাযোগ করলো না।
১৯৭৮ সালে আমি একবার উমর সাহেবের বাসায় গেলাম। উমর ভাই আবার বিয়ে করেছেন আমার বড় চাচার মেয়েকে। বড় চাচার বড় মেয়ে। একদম বড় দুলাভাই। একদিন দেখি কি, উমর ভাইয়ের মেয়ে যাচ্ছে রাস্তা দিয়ে। তো তাকে জিজ্ঞেস করি, কই যাও? সে বলে, ’ইউনিভার্সিটি। আমাদের লেখক শিবিরের গণসঙ্গীতের রিহার্সেল’ আমি বললাম, তো চলো আমিও যাবো তোমার সাথে। গেলাম। দেখি টিচার্স ক্লাবের উপরের তলায় রিহার্সেল করছে। টিচার্স ক্লাবে রিহার্সেল করছে এই জন্য যে, তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মোটামুটি সব শিক্ষকই লেখক শিবিরের সদস্য। টোটাল লেখক, প্রগতিশীল, যে একটু চিন্তাভাবনার সাথে আছে ম্যাক্সিমাম লেখক শিবিরের সদস্য। ১৬০ জন শিক্ষক লেখক শিবিরের সাথে যুক্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। টিচার্স ক্লাবে আমরা রিহার্সেল করি, ওয়ার্কসপ করি, এই করি ... সব করি ওখানেই, যেনো আমাদের অফিস ! আহমদ শরীফ বাংলা বিভাগের ডিন ছিলেন। তো ওনার অফিসের মধ্যে আমরা কেন্দ্রীয় কমিটির মিটিং করি।
তো সেই লেখক শিবিরে ঢুকেই কিন্তু গ্রুপিংয়ের মইধ্যে পইরা গেলাম। শাহরিয়ার ভাই আমাকে নিয়ে গেলেন একদিন তার বাসায়। লেখক শিবির কি, লেখক শিবির কি পরিস্থিতিতে আছে, কেনো এটা হচ্ছে, কি কাজ হচ্ছে না হচ্ছে, পরিস্থিতি আমাকে বুঝিয়ে বলছেন। আজফার আজিজ নামে একজন যিনি আছেন, তাঁর মাথায় একটু ছিট আছে, যখন তখন সে ধাম করে বেরিয়ে চলে যায়, গান গাইতে যেয়ে সে হঠাৎ করে বলে, আমি গান গাইবো না- ঐটা একটা হয়? আপনি গানগুলো একটু ধরে নিয়েন, হারমোনিয়ামটা বাজানো একটু ভালো করে শিখে নিয়েন। আমি বললাম, অসুবিধা নাই শাহরিয়ার ভাই, ও এখন লিড করছে, করতে থাকুক। আমি এটা করতে পারবো। এইগুলি গান আমি করেছি। সে প্রশ্ন করে, কোথায়? আমি বলি, আলতাফ মাহমুদ সঙ্গীত বিদ্যানিকেতনে। আরো আগেই আমি ক্লাসিক্যাল শিখতাম। আমি ওস্তাদ ফুল মোহাম্মদ মুন্সি রইসউদ্দীনের ছাত্র। ‘ও, তাহলে তো আপনি ক্লাসিক্যাল জানেন, ভালো হয়েছে আপনাকে পেয়ে। এই ধরেন...’ বলে আমাকে দু’টি স্বরলিপি দিলেন। চারটি গানের স্বরলিপি- জন হেনরী, শঙ্খচিল, আমরাতো ভুলি নাই শহীদ আর কাস্তেটারে দিও জোরে শান। স্বরলিপি করেছিলো হেমাঙ্গ বিশ্বাসের গ্রুপেরই কেউ এবং নিচে হেমাঙ্গ বিশ্বাসের স্বাক্ষর ছিলো। হাতে লেখা। অরিজিনাল কপি। শাহরিয়ার কবিরের সাথে হেমাঙ্গ বিশ্বাসের যোগাযোগ ছিলো। হেমাঙ্গ বিশ্বাসের কাছে যেতো-আসতো। গানের ক্যাসেট করে নিয়ে আসতো। স্বরলিপি নিয়ে আসতো।

সমগীতঃ তখন আপনারা কি কোনো নতুন গান তৈরি করেননি?

কামরুদ্দিন আবসারঃ আসলে যে জিনিসটা হলো, আমরা নতুন গান আর পেলাম না। আজফার আজিজকে বলে বলে কিছু গান লেখানো হতো। একটা পর্যায়ে লেখক শিবির আজফার আজিজ, তারেক মাসুদ, পিয়াস করিম, শামীম আক্তার, অমুক-তমুক- বিশ্ববিদ্যালয় পুরা কমিটির এগারো জনকে বহিষ্কার করে দেয়। যার কারণ আমি আজও জানতে পারলাম না। লেখক শিবিরের সম্পাদক ছিলেন আবরার চৌধুরী। কিন্তু টোটাল লেখক শিবির নিয়ন্ত্রণ করতেন শাহরিয়ার কবির। কিছু বহিষ্কার করার পর লেখক শিবির আরেকটু ছোট হয়ে গেলো এবং নতুন কমিটিতে আমি সরাসরি সঙ্গীত ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক হয়ে গেলাম।
একটা পর্যায়ে আমার সবচেয়ে বেশি যেটা বিরক্ত লাগতো লেখক শিবিরের সেটা হচ্ছে- এরা সিলেকশন করে দিতো কি গান গাইবো। লেখক শিবির মানেই আমরা নই, আমরা ছিলাম যেনো শুধুই পারফরমার। শাহরিয়ার কবির কিংবা বদরুদ্দীন উমর- এরাই গান নির্দিষ্ট করে দিতেন। এমনকি সিরিয়াল পর্যন্ত ঠিক করে দিতেন। তারা বলতেন, দর্শকদের তো টেনে এগিয়ে নিয়ে আসতে হবে। শুধু দর্শকের দিকে চলে গেলেতো হবে না। যে কারণে তারা গানগুলোর সিরিয়াল করে দিতো, এ গানের পর এ গান, এ গানের পর এই গান হলে একটা বক্তব্য দাঁড়ায়। কিন্তু বিচ্ছিন্নভাবে গাইলে যার কোনো অর্থ দাঁড়ায় না। কিন্তু সত্যিকার অর্থে গণসঙ্গীতকে যেভাবে লেখক শিবির দাঁড় করাতে পারতো, যেভাবে গণসঙ্গীত নতুন করে নিতে পারতো, গণসঙ্গীতের ক্যাসেট করতে পারতো, গণসঙ্গীতের ওয়ার্কশপ করাতে পারতো, শিক্ষকদের দিয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণ দিতে পারতো, সে জিনিসটার দিকে একদম মনোযোগ ছিলো না।

সমগীতঃ কিন্তু আপনার গানের ক্যাসেট ‘মে দিবসের গান’টি তো লেখক শিবির থেকেই প্রকাশ করা হয়।

কামরুদ্দিন আবসারঃ আমার ক্যাসেটটা বের করেছে- এটা লেখক শিবির নয়। এটার গায়ে ঠিকই লেখা আছে লেখক শিবিরের কথা কিন্তু লেখক শিবির নয়। আমাদের একজন বন্ধু ছিলেন কাজী মোমেন। তিনি লেখক শিবির করতেন। ঘুমের মধ্যেই হঠাৎ মৃত্যু হয় তাঁর। টের পায়নি কেউ। ওর খুব একটা ইচ্ছে ছিলে একটা ক্যাসেট করবার। যাই হোক, মোমিন তো মারা গেল। আমাদের আরেক বন্ধু লেখক শিবির করতো। নাম ছিলো রফিক। সে আমাদেরকে বললো, যতো টাকা লাগুক মোমিন আমার বন্ধু, ও মারা গেছে কিন্তু ওর একটা ইচ্ছা পূর্ণ করবো। ক্যাসেট একটা করবোই। তখন আমি বললাম, ঠিক আছে। ফার্মগেটের ঝংকার নামে একটা স্টুডিওতে খুব কম পয়সায় বন্ধের দিনে সকাল থেকে রাতের মধ্যে ১৩টা গান সাদামাটাভাবে রেকর্ড করালাম। ঐ হলো আর কি! কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার এই যে আমরা স্টুডিওতে গেছি গান রেকর্ড করতে, লেখক শিবিরের কোন লোকজন কিন্তু যায় নাই। তারা ক্যাসেটের কোন দায়দায়িত্ব নেয় নাই।

সমগীতঃ হেমাঙ্গ বিশ্বাস যখন ঢাকায় আসেন, তখন আপনি তো তাঁর সাথে সময় কাটিয়েছিলেন। এ প্রসঙ্গে কিছু বলুন।

কামরুদ্দিন আবসারঃ ১৯৮১ সালে হেমাঙ্গ বিশ্বাস ঢাকায় আসল। শাহরিয়ার কবির হেমাঙ্গ বিশ্বাসের জন্য স্পনসরশিপ জোগার করেছিলো। ছয়জনের নামে। দু’জন মহিলা, দুইটি ছেলে, একজন তবলা বাদক আর হেমাঙ্গ বিশ্বাস। শাহরিয়ার কবির আমাকে পরিচয় করিয়ে দিলেন হেমাঙ্গ বিশ্বাসের সাথে। হেমাঙ্গ বিশ্বাস বললেন আমি ঢাকায় যে কয়দিন প্রোগ্রাম করি, তুমি আমাদের সাথে সাথে থাকো। ঐ সময় হেমাঙ্গ বিশ্বাস আমাদের এখানে বিস্তর প্রোগ্রাম করেছেন। সকালে দুপুরে বিকালে রাতে- এতো প্রোগ্রাম যে কেমনে করলো, সে এক বিস্ময়কর ব্যাপার। আমিও তাদের পাছ ছাড়িনি। সবসময় সাথে থাকতাম। তাতে করে আমার যে সুবিধা হয়েছে যে, স্বরলিপির বাইরেও আমি হেমাঙ্গ বিশ্বাসের অনেক গান শিখে নিয়েছিলাম। আর একটা বিষয়, হেমাঙ্গ বিশ্বাসের গানগুলো গাইতো না। হেমাঙ্গ বিশ্বাসের গানগুলো আমাদের কাছেই আসতো। পরে হেমাঙ্গ বিশ্বাসের একটা গানের বই বেরিয়েছিল। এর সাথে সাথে একটা স্বরলিপির বইও চলে আসলো। শঙ্খচিলের গান শিরোনামে। আমরা সেই স্বরলিপি থেকে গান তুলে তুলে গাইতাম।
হেমাঙ্গ বিশ্বাসের সাথে প্রোগ্রামে প্রোগ্রামে ঘুরবার সময়ে একদিন এক ফাঁকে আমি হেমাঙ্গ বিশ্বাসকে একটা কথা জিজ্ঞেস করেছিলাম যে, দাদা আমি তো দেখতে পাচ্ছি যে আপনার জীবনের সবই সফল। একটা মানুষের সবকিছুই তো আর সফল থাকে না, কিছু ব্যর্থতাও আছে। তিনি বললেন, ‘অবশ্যই।’ আমি বললাম, তাহলে আপনার ব্যর্থতা কোনটা? হেমাঙ্গদা তখন বললেন, ‘আমার একটা দারুণ ব্যর্থতা আছে। সেটা হলো যে, আমার পরিবার, আমার সন্তান। তারা কেউ আমার গানটান গায় না। অনেক ছেলেমেয়েকে আমি গানের দুনিয়াতে আনতে পেরেছি, কিন্তু ওদের আনতে পারি নাই।’
হেমাঙ্গদা গান গাওয়ার আগে সবসময় কিছু কথাবার্তা বলে নিতেন। এতে দর্শক শ্রোতা আরো ভালোভাবে গানের সাথে কমিউনিকেট করতে পারতো। এইটা আমার খুব ভালো লাগতো। ওনার সাথে থাকতে থাকতে আমার মনে হয়েছিলো তাঁর সঙ্গটা যদি আমি আরো আগে থেকে পেতাম, তাহলে হয়তো আমিও কিছু করতে পারতাম। আমার তো মনে হয়, এই দেশে ’৭১-এর পরে তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য গণসঙ্গীত হয়নি। এটার কারণ হিসেবে আমার যেটা ধারণা, বাম রাজনৈতিক দলগুলিও তেমন কিছু করতে পারেনি। আর আমরা যারা সাংস্কৃতিক সংগঠন করতাম, তারা সবসময় রাজনৈতিক দলগুলোর মুখাপেক্ষি হয়ে থাকতাম। সাংস্কৃতিক সংগঠনের যে নিজস্ব আয়োজন করে গান করা- এটা আমরা কখনোই পারি নাই। লেখক শিবিরে যখন ছিলাম, লেখক শিবিরও আলাদা গণসঙ্গীতের প্রোগ্রাম- এমন কিছু করে নাই। যার পরিপ্রেক্ষিতে আমি অনেক চেষ্টা করে একটা গণসঙ্গীতের স্কুল খুলেছিলাম।

সমগীতঃ কিন্তু সেই লেখক শিবিরও আপনি শেষ পর্যন্ত ছাড়লেন। তার কারণ কি?

কামরুদ্দিন আবসারঃ আসলে আমি নিজে থেকে লেখক শিবির ছাড়ার আগে কমিটি আমাকে তিনবার বহিঃস্কার করেছিল। একবার সিলেটে লেখক শিবিরের অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম গান গাইতে উমর ভাইয়ের সাথে। শাহরিয়ার ভাইরা তখন ছিলো না। গান গাইতে গেছি- আমাকে লিস্ট করে দেয়া হলো- এই গানগুলি গাইবেন। সে প্রোগ্রামে রেডিওর আর্টিস্ট-শিল্পীরা প্রথমে গান গাইলো। এমনকি এক ভদ্রলোক ছিলেন- মাজারকেন্দ্রিক গান করেন। ‘শাহজালাল আউলিয়া’ বলে নাইচা গান করেন। ঐ লোকের পরে দিছে আমারে গান গাইতে। আমি গান গাই- আমার গান কেউ শুনে না। তখন আমি লিস্টেরই গান আগে-পরে করে কোনরকমে গেয়ে এসেছিলাম। এবং আমি যখন গান গেয়ে স্টেজ থেকে নেমে আসি- শ্রোতাদের কেউ কেউ হয়তো ভেবেছে ঢাকা থেকে এসেছি- কোন্ বড় শিল্পী জানি আমি। আর কিছু লোক আছে জানোই তো, বুঝে না বুঝে অটোগ্রাফ নিতে চায়। এমন কয়েকটা ছেলেমেয়ে আমাকে এমনভাবে ধরলো যে আমি ওদের হাত থেকে অটোগ্রাফ দিয়ে তবে ছাড়া পেলাম। এইটা আবার কেন্দ্রীয় কমিটির লোকজন দেখেছে। এবং আসার সময় ট্রেনেও আমাকে কিছু বলা হয় নাই। ঠিক লেখক শিবিরের কেন্দ্রীয় কাউন্সিলে তোলা হলো সেই প্রসঙ্গ যে, কামরুদ্দীন আবসার লেখক শিবিরের সমস্ত ধ্যান ধারণা বাদ দিচ্ছে। সে অটোগ্রাফ পাওযার লোভে আমাদের লিস্টের গান উপেক্ষা করে বাইরের গান গেয়েছে। আমি বললাম, না, এটা ভুল কথা। আমি লিস্টের গানই গেয়েছি। তবে আগে-পিছু করে গেয়েছি। তারা তো আমার যুক্তি মানে না! তখন আমি বললাম, বেশ আপনারা লিস্ট নিয়ে থাকেন, আমি চললাম। আমি আর কোন অনুষ্ঠানে লিস্ট ধরে গান গাইতে পারবো না। আবার ’৮৪ সালে আরেকটা ঝামেলা হয়েছিল। এরপরে ‘সংস্কৃতি’ পত্রিকার হিসাব নিয়েও ঝামেলা হয়েছিল। সেসব তো মেলা কিচ্ছা-কাহিনী! তবে আমি চূড়ান্তভাবে লেখক শিবির ছাড়ি ’৯২-’৯৩-এর দিকে।

সমগীতঃ নব্বইতে এরশাদবিরোধী মুভমেন্টে তো আমাদের রাজনৈতিক আন্দোলনের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক আন্দোলনেরও ব্যাপক জোয়ার সৃষ্টি হয়েছিল। ঐ সময় কি উল্লেখযোগ্য কোন গণসঙ্গীতের কাজ হয়েছিল?
কামরুদ্দিন আবসারঃ এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে কিছু গান যে তৈরি হয়নি- তা না। হয়েছে। কিন্তু সেগুলোকে আমি মোটেই গণসঙ্গীত মনে করি না। সেগুলো হয়েছে স্রেফ শ্লোগান স্যাটায়ার ছাড়া আর কিছু না। যেমন আমিও গান করেছিলাম, একদফা একদাবী / ও রাজা তুই করে যাবি। এসব তো আর গণসঙ্গীত না ... হা হা হা! তবে সোভিয়েত ইউনিয়ন পতনের পর অনেকেই আমার বন্ধুবান্ধবরা আমাকে ঠাট্টা করতো, ঐসব লালাপতাকা-টতাকায় কিছু হবে না। ঐগুলি ছাইড়া এখনো সময় আছে, আমগ দলে চইলা আসো- তখন আমি একটা গান লিখলাম- কারা বলছো সামনের পথ অন্ধকার? পৃথিবীর বুকে সূর্যটাকে টান টান করে বেঁধে / আমরা পথ হাঁটি / তোমরা যদি বলো / মাথা নিচু করে বাঁচা যায় / আমি মানবো না / আমি মানবো না। এসকল গান আর গাওয়া হয় না। অনেক গান সুর করেছিলাম। আমি একটা গান সুর করে পরে সংগঠনের বন্ধুদের শেখাতে গেলে, ওরা আমার গান শিখবে কি!... একজন বলে, এই জায়গাটা কিরকম হইছে। আরেকজন বলে, এই জায়গাটা একটু এইরকম করে দিন। অমুক তমুক। একবার এইরকম গান সুর করে নিয়ে গিয়ে বললাম, এইটা সলিল চৌধুরীর গান। বলে- বেশ ভালো গান তো! পরে আমার, আসলে আমার এমন অনেক গানেই হয়েছে যে সুর করে বলিনি যে- আমার সুর। অমুক তমুকের বলে চালিয়ে দিয়েছি। ‘ওরা মোর ঘর ভেঙ্গেছে স্মরণ আছে’- গানটির বেলাতেও একই ঘটনা ঘটেছে। সুকান্তের ‘ছাড়পত্র’ কবিতাতেও নিজের মতো করে সুর দিয়ে গেয়েছিলাম। নব্বই দশকের পরে আর বেশি কিছু করা হয়নি। তবে তখন থেকে এখন পর্যন্ত আমি নিয়মিত ছড়া গানে সুর করে যাচ্ছি। অসংখ্য। এযাবৎ প্রায় দেড়শ থেকে পৌনে দু’শ তো হবেই। শামসুর রাহমান, ফয়েজ আহমেদ, লুৎফর রহমান রিটন, সুকুমার বড়–য়া, রবিন আহসান এমন বহু ছড়াকারের ছড়াতেই আমি সুর করেছি। কিন্তু এখন পর্যন্ত ছড়াগানের একটি ক্যাসেটও আমার করা হলো না। একবার এক লোককে বলেছিলাম, পঁয়ত্রিশ হাজার টাকা হলেই একটা ছড়ার ক্যাসেট করা যায়। ঐ লোক রাজিও হয়েছিল। আমি বেশ কিছুদিন ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে রিহার্সেলও করেছিলাম। পরে ঐ লোক আর টাকা পয়সা দেয়নি। আমার ছড়াগানের ক্যাসেটটাও করা হয়নি।

সমগীতঃ আবসার ভাই, আর একটি প্রসঙ্গ দিয়েই আমরা আপনার সাথে আলোচনা আজকের মতো শেষ করতে চাইছি। বিষয়টি হল, আপনাদের পরে, এখন আবার তরুণদের মধ্যে থেকে কেউ কেউ নতুন করে গান করছে। যাদের সব গানকে মোটাদাগে চল্লিশের গণসঙ্গীতের সংজ্ঞায় ফেলা যায় না। সামগ্রিকভাবে এখনকার গান নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কি?

কামরুদ্দিন আবসারঃ এটা তো একটা উল্লেখযোগ্য ব্যপার। সারা জায়গায় যখন গণসঙ্গীত নিয়ে কিছু হচ্ছে না... তোমরা যে স্বপ্ন নিয়ে কাজ করছো- তোমাদের গানগুলো, কফিলের গান, তোমাদের সমগীতের গান, গানের কথাগুলো আমার ভালো লাগে। তবে তোমাদের গান যতোটা সহজবোধ্য, কফিলের গান ততোটা সহজবোধ্য নয়। কফিলের নাম তো আমি অনেক আগে থেকেই শুনতাম, আজফার আজিজের মুখে। কফিলের গার্মেন্ট শ্রমিকদের নিয়ে যে গানটা আছে না, ‘আমারে তালাবদ্ধ রেখে’ ঐ গানটা আমার খুব ভালো লাগে। কফিলের গান গাওয়ার ভঙ্গিটাও খুব মনকাড়ে। সব মিলিয়ে কফিল এবং তোমাদের গান আমার ভালো লাগে। আমি তোমাদের প্রতি আশাবাদী।

সমগীতঃ আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।


সমগীত
প্রথম র্বষ প্রথম সংখ্যা
বৈশাখ ১৪১২
     
Untitled Document
প্রদর্শনী

হরে রাম

video video
Copyright © Life Bangladesh
সাপলুডু মূলপাতা | মতামত Contact : shapludu@gmail.com