Untitled Document
কার্তিক সংখ্যা ১৪১৮
মূলপাতা শিরোনাম বটতলা পঞ্জিকা প্রদর্শনী
পুরাকীর্তির সন্ধানে বাঘায়
- মার্জিয়া লিপি



শরতের সকাল। উপশহর থেকে পদ্মা নদীতে হারানো স্থাপনার সন্ধানে বের হই। যদিও গন্তব্য আরো অনেক দূরে, পাবনার মোকসেদপুর। কয়েক মাস আগে পত্রিকায় প্রকাশিত ছবি দেখে মনে উঁকি দেয় আগ্রহ আর কৌতুহল। বিশাল পদ্মাতে ডুবে থাকা স্থাপনা - পুরাকীর্তির ছাদে দাড়িয়ে জেলেরা জাল দিয়ে মাছ ধরছে। প্রমত্তা পদ্মায় হাটু পানি। বিস্ময়কর! ভাবছিলাম, হয়তো এখানেও থেকে যেতে পারে ওয়ারী বটেশ্বরের মতো কোন বিলুপ্ত জনপদ, নগরী অথবা ভুমিকম্পের মতো দূর্যোগে পুরাকীর্তিটি পানিতে ডুবে আছে। অসম্ভব কিছুই না - ইতালীর ঐতিহাসিক নগরীর অর্ধেকাংশ এরকম দূর্যোগে ডুবে গিয়েছে সমুদ্রের পানিতে।

সূর্য উঠার পর পরই একরাশ উত্তেজনা ও এ্যাডভেঞ্চারের কল্পনা নিয়ে পদ্মা নদীর উপশহর থেকে একটা ছোট সাদা গাড়ীতে চেপে বসি। যাত্রা পথের সবকিছুই  একের পর এক জাল বুনে যাচ্ছে  - গাছ, লতা, পাতা দৃষ্টি সীমার সবকিছু দিয়ে।  শহরের কোলাহলকে পাশ কাটিয়ে কাজলা, মতিহারের রাজশহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ চত্বরকে বা দিকে রেখে এগিয়ে চলি। ঘড়ির কাটার সাথে পাল্লা দিয়ে। চলতি পথ ধরেই রেশম উন্নয়ন বোর্ড। সিল্কের জন্যা বিশেষ খ্যাত এই বিভাগীয় শহর। চোখ জুড়ে আছে সোনালী রেশম। গুটি  থেকে সূতা বের করা হয়। শুককীট হতে মথ পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে রেশম পোকার জীবন চক্র। নির্দিষ্ট বয়সে রেশম গুটি পানিতে সিদ্ধ করে সূতা বের করা হয়- ‘আপনা মাংসে হরিণা বৈরী ।’ লালা নি:সৃত এক প্রকার কষ যা দিয়ে তৈরী হয়        আকষণীয় সোনালী রেশমী সূতা - যে কারণে বিসর্জিত হয় রেশম পোকার জীবন।

কালো পিচের রাস্তা দিয়ে চলতে থাকি। দর্শনীয় নতুন কিছু দেখতেই গাড়ী চালক মান্নান ভাইয়ের কাছ থেকে জেনে নেই এ কথা - ও কথার আদি অন্ত। ঢাকার ব্যস্ততা এখানে কোথাও নেই। সময়ের সাথে গতি ছন্দ রেখেই চলছে। নেই কোন যানজট, হৈচৈ যাতে ছন্দপতন হয়। ভাবছিলাম মনে মনে এখানে জীবন অনেক সহজ, সবুজ আর নিয়ন্ত্রিত। ঘন্টা খানেক পথ চলার পর হঠাৎই দৃষ্টি চলে গেল লাল টেরা কোঠার পুরানো স্থাপনার দিকে। একেবারে হাইওয়ের পাশেই বাঘা মসজিদ কমপ্লেক্স। রাস্তা উপর কিছু দোকান পাট, চা এর স্টল, দর্শনার্থীর জটলা। মনে মনে তাড়া গন্তব্য আরো দূরে, মোকসেদপুর। কিন্তু একবার চোখে পড়ার পর মনে হলো, এখনই দেখে নিই। যদি ফেরার পথে সূর্যের আলো না থকে। তাহলে প্রায় ৫ শত বছরের পুরানো স্থাপনার  অনেক কিছুই হয়ে থাকবে অদেখা, অধরা। রীতিমতো আশ্চর্য রকম সৌর্ন্দয। এখনো অনেক বেশী আনকোরা, টেরাকোঠা স্থাপনাটি।  বাঘা  মসজিদ কমপ্লেক্স ধরে সামনে, পাশে, চারপাশে দেখছি অবাক করা মন্ত্র মুগ্ধ দৃষ্টিতে।

এক সময় বাঘায় গভীর বন জঙ্গলে বাঘের দেখা মিলতো তাই বিভাগীয় শহর রাজশাহী থেকে ২৪ কি. মি. দক্ষিণ পূর্বে বাঘা ওয়াকফ্ এস্টেটের সদর দপ্তর। উপমহাদেশের অনেক জায়গার মতোই সভ্যতার পত্তন হয় এখানে। বাংলার সুলতান গৌড়ের শাসন আমলে ১৫২৩ খৃষ্ট্রাব্দে নসরত শাহ বাঘা মসজিদ নির্মান করেন । ছোট স্বতন্ত্র লাল ইটে নক্স্রা করায় আরবী ক্যালিগ্রাফের শিলালিপির টেরাকোটা এ মসজিদের অনন্য বৈশিষ্ট্য।

বাঘা মসজিদকে ঘিরে রয়েছে নানা রকম কিংবদন্তী। নির্মান কাজের এক পর্যায়ে সন্ধ্যায় গম্বুজের কাজ অসমাপ্ত রেখে রাজমিস্ত্রিরা চলে যান। কিন্তু পরদিন সকালে দেখা যায় গম্বুজটি পূর্ণ সমাপ্ত অবস্থায়। হযরত শাহদৌল্লা ও ৫ জন আত্মীয়ের মাজার মসজিদের সাথেই। আরেক পাশে রয়েছে বিশাল সাগরের মতো দীঘি। মিথ থেকে শোনা যায় - অনেক বছর আগে দিঘীতে রক্ষিত বিশাল হাড়ি ও বাসনপত্রে রান্না ও খাওয়ার পর্ব চলতো ওরসের মেলায়। ওরস শেষে হাড়ি ও বাসন পত্র দিঘীতে ফেরৎ প্রদান করা হতো। এ রকমই রেওয়াজ ছিল। এ ভাবেই চলতে থাকে বছরের পর বছর। কিন্তু কলি কালে এমনটি আর হচ্ছেনা । শোনা কথা, হয়তো কারো বিশ্বাস ভঙ্গের কারণে এমনটি হয়েছে। ওরসের সময় ছাড়াও প্রায়ই মানত হিসেবে দূর দূরান্ত থেকে টাকা, ছাগল, মোমবাতি. আগর বাতিসহ আরো অনেক কিছু নিয়ে আসেন দর্শনাথীরা। মহাসড়কের পাশে ৪৮৭ বছরের পুরানো বাঘা মসজিদ কমপ্লেক্স যা বর্তমানে প্রতœতাত্মিক বিভাগের সংরক্ষণে রয়েছে।

মসজিদের স্থাপত্যবীতির সাথে মিল রেখে নির্মিত হয়েছে তোরণ যার পাশে সিড়ি দিয়ে নেমে বাঘার বিশাল দিঘী। বসে থাকা স্থানীয় কয়েকেজনের কাছে জিঞ্জেস করে অল্প দূরে পদ্মা নদীতে ডুবে থাকা পুরাকীর্তির কথা জানতে পারি। খুব উছি¡সিত হয়ে স্থানীয় ভাষায় বলেছিলেন- ‘‘আফা, আফনে কোন পত্রিকার লোক?’’ তারা ধরেই নিয়েছে আবারও পানিতে ডুবে থাকা পুরাকীর্তি পত্রিকায় খবর হতে যাচ্ছে। হাত সময় কম থাকায় আড্ডাটা খুব একটা জমে ওঠেনি। বলতে বলতেই কল্পনার জালে হারানো ইতিহাস বার বারই যেন আটকাচ্ছিলো। একেবারে বাংলাদেশের অন্যান্য পাড়াগায়ের ভূ-দৃশ্য, সবুজ, শ্যামল, নিরব, স্নিগ্ধ। আশে পাশের জমিতে হাল দিচ্ছে ব্যস্ত কৃষাণ, কোথাও ধান কাটার পর খালি জমি পড়ে আছে। এক পাশে ক্ষেতে আল ধরে সারি সারি কলা গাছ । পথের পাশেই একটা গরুর পিঠে কালো - ফিঙ্গে বসে আছে, লেজ দিয়ে ফিঙেটিকে তাড়ানোর দৃশ্য। কোথাও ফসল বোনার জন্য সমান দূরত্বে  উচু করে মাটির ঢেউ এর পর ঢেউ। সবুজ ঘাসের উপর হলুদ প্রজাপতির চঞ্চল ডানায় ভর করে উড়ে উড়ে বেরাচ্ছে। মাটির পথ ধরে কিছু দূরে ছোট চাতালে ধবধবে সাদা ২টি বক ডানা মেলে উড়ছে কিসের সন্ধানে কে জানে তবে এক সময় প্রমত্তা পদ্মায় এসে যখন পৌছালাম তখন দৃষ্টি সীমায় পুরাকীর্তির কোন চিহ্ন দেখছিলাম না । একপাশে চর, ধানক্ষেত, জাল দিয়ে মাছ ধরায় ব্যস্ত জেলে। কল্পনায় মিলিয়ে দেখছিলাম মাঝনদীতে জেলে পুরাকীর্তির ছাদে দাড়িয়ে জাল মেলে মাছ ধরছে। জেলেরাও জানালেন এমনটিই করছিলেন তারা চৈত্র বৈশাখ মাসে যখন নদীর পানি কম ছিল। মাছ ধরা ছাড়াও তখন শ্যাওলা ধরা ছাদের পাশে দাড়িয়ে হাত স্পর্শ করছিলেন পুরাকীর্তিটির দরজা জানালায়।
     
Untitled Document

তিন পাপড়ির ফুল
প্রদর্শনী

চাঁপাইনবাবগঞ্জ ফটো ক্লাব
Copyright © Life Bangladesh
সাপলুডু মূলপাতা | মতামত Contact : shapludu@gmail.com