Untitled Document
কার্তিক সংখ্যা ১৪১৮
মূলপাতা শিরোনাম বটতলা পঞ্জিকা প্রদর্শনী
গুচ্ছ কবিতা
- আফরোজা সোমা


মনোলগ

আরবীয় ঘোড়ার পিঠে চড়ে
আসছে মেঘের দল; মেঘের মাথায়-
হাজার রঙের ছটা; মেঘের মাথায়-
পেখম খোলা একশ ময়ূর নাচে।
কিন্তু পেখম বন্ধ ছিলো পিপাসার্ত তার;
অফিস থেকে বেরিয়ে সে
নামলো পথে একা-
একা একা একা একা
একা একা শহর ঘুরে সে-
সে আর তার চুলের ঝুটি
সে আর তার চটি জুতো
সে আর তার একলা গলার গান;
এসব নিয়ে ঘুরছে শহর, হাঁটছে পথে
জন্মদিনে বন্ধুর ফোনে দিচ্ছে এসএমএস;
একা একাই বলছে কথা
নিজের দিকেই ছূঁড়ছে বিষের তীর
বিষাদ-মনে নিজেই আবার একা
হেসে উঠছে মেঘভাঙা রোদ হয়ে।

এভাবেই তার গল্প চলে,
গল্প চলে- এক পা হেঁটে এগিয়ে গিয়ে
এক পা থেমে থাকার;
থামছে এবং চলছে এবং থামছে এবং
এভাবেই তার চলছে মনোলগ।

মনোলগে বাবা আসে,
মনোলগে মা; মনোলগেই
হারানো সে মুখের আদল
হারিয়ে যাওয়া দিন; হারানো সে
অন্ধবুড়ির রঙীন-গীতি
হারানো সে স্থিতি-

তবু কিচ্ছু হারায় নি তো, আছে-
কিছু গিয়ে কিছু আছে-
সুরা এবং শরীর রাখার স্মৃতি।

তবু কিচ্ছু হারায় নি তো, আছে-
আজকে রাতে অফিস থেকে
পথে নামার পর:
ওরা সবাই সঙ্গী হলো;
মহুয়া দিলো, আদর দিলো,
ঝগড়া হলো, মিটমাট হলো-
চলছে মনোলগ।

মনোলগ তো ভালোই ছিলো,
বৃষ্টি কেনো এলি!
বৃষ্টি ভেজা চুল হলেই যে
সে এসে যায় ঘরে
বৃষ্টি ভেজা বুকের পশম
সে এসে যায় বুকে
বৃষ্টি ভেঁজা চটি-জামা
সে এসে যায় মনে।

মনে মনের আসা-যাওয়া,
পেরিয়ে যাওয়া পুলসিরাতের পুল,
মনে মনেই দোজখে পড়ে কাঁদা
এর কি কোথাও আদি-অন্ত আছে?
চলতে থাকে, চলতে থাকে,
চলতে থাকে অশেষ মনোলগ।

আজকে আমায় মুক্ত করো- ও সোয়ারী মেঘ,
আজকে আমায় মুক্ত করো
বাড়ি থেকে পালিয়ে আসা প্রেমান্ধ যুগল,
আজকে আমায় মুক্ত করো
না-ঈশ্বরে আস্থা রাখা প্রাণ।
মাটির পুতুল সুখে ছিলো
বোল্ ছিলো না মুখে
নয়ন ঠারে দিলের কথা
পৌঁছে যেতো দিলে।
এই যে আজ বোল্ ফুটেছে
কী বা হলো তাতে?
সে তো এখন ঠার পুছে না
দৃষ্টি ভিঁজে জলে;
জলের এই টাপুর টুপুর
তবু ওহে- ‘নদেয়’ নেই ‘বান’।

আজকে এখন বান ছুটে আয়,
রুদ্র-রোষে ক্ষেপে এসে
ভেঙেচূরে রিক্ত করে
আমায় তবু পূর্ণ করে যা;
ভিড়ের মাঝেও এই মনোলগ!-
থামিয়ে দিয়ে যা।

আরবীয় ঘোড়ার সহিস আয়,
আয়, নিয়ে যা, দূরের দেশে-
তেপান্তরের মাঠ পেরিয়ে
ঘাট পেরিয়ে, বন পেরিয়ে,
গাজি-কালু-চম্পাবতীর দেশ ছাড়িয়ে
দূরে কোথাও শূন্যে নিয়ে যা।

শূন্যের ভেতর ‘তুমি-আমি’, ‘আলো-আধাঁর’ নেই;
শূন্যের ভেতর ‘বিশ্বমাতা’র নাম পরিচয় নেই।

শূন্যস্থানে নতুন করে-
মাটির পুতুল হবে মূর্তিময়
শূন্যস্থানে কুমোর-যুবক
নতুন করে ডলবে মাটি,
আঁকবে দেহের ভাঁজ;
শূন্যস্থানে পিপাসার্ত সেই তরুণটি-
অফিস শেষে পথের বাঁকে
রোদ্র-বাড়ি পাবে, সিঁড়ির গোড়ায়
সন্ধেবেলা সন্ধ্যামণি পাবে;
মনোলগে ঘুরে এসে
একদিন এক সন্ধ্যেবেলা
দ্ইু দিকে দুই জোনাক চিঠি উড়িয়ে দিয়ে
শূন্যস্থানে বাক্য রেখে যাবে...

মনোলগ-২

সে বলে, আমিও
আমি শুনি, সেও
মনে মনে, অনুচ্চারে- এভাবেই
ক্রমাগত গীত হয় কথা-
মানে সংলাপ;
ছায়া-সংলাপে পাশাপাশি
বসি পরস্পর, বৃষ্টির পর
গাছটি কী ভীষন সবুজ দেখায়
তাই নিয়ে কথা হয়;
রাস্তায় হাঁটার জো নেই
ফুটপাথে ভীড়-
তবুও, খুব উজ্জ্বল রোদে
ঝলমলিয়ে উঠলে
লেকের জল- ট্র্যাফিক জ্যাম
সে-ও যেনো হঠাৎ সুন্দর!-
এই সব, যাবতীয় খুচরো বিষয়
উঠে আসে সংলাপে,
আমরা এগিয়ে যাই
মনে মনে, অনুচ্চারে।

লেকের পাড়ে বসে আছে
একটি মেয়ে, সাদা জামা গায়
হাতে কলম, কোলে খোলা খাতা-
এই পথে আমি নিয়মিত হাঁটি
এমনটা চোখে পড়ে না
সচরাচর; এই ঘটনায়
তার দিকে আগ্রহে ফিরি
না চাইতেও দেখি
পাতায় লিখেছে সে:
‘আমি বসে আছি’
এটি তার প্রথম লাইন
লাইনের পর দাড়ি;
আরো যেনো কী সব লেখা-
পড়ি নি।

সে বসে আছে
আমি হাঁটছি-
আমার মাথায় সে
‘আমি বসে আছি’;
তার মাথায় রোদ
‘আমি বসে আছি’
আরো যেনো কী কী সব...
আমি পড়ি নি।

সে এবং আমি
বিচ্ছিন্ন ঘটনা মাত্র
শুধুই কাকতাল-
পরস্পর জানি না কেউ
; তেমনি আমরা- মানে
আমার সঙ্গী, ছায়াসংলাপ।
আমি ও আমার সাথী
আমরা দু’জন
দু’য়ে মিলে এক;
একের দ্বিধা, দু’য়েরো
দু’য়ে সমাধান, একেও;
তবু এই দুপুরে
রাধাচূড়া গাছের ছায়ায়
কী যেনো এক ঘটনা
কী যেনো এক খটকা
ঝুনঝুনি বাজায়,
ফেরীওয়ালার মতো
প্রলম্বিত লয়ে ফুরররররর....
শব্দে ঘোষণা করে
নিজের অস্তিত্ব;
এ দেখছি জটিলতা হলো বেশ-
যে নেই সে-ই আছে
যে আছে, সে নেই;
নারীটি ফোনে কথা বলে
বলে এই এতোক্ষণ ধরে
সে কথাই বোঝাতে চাইছে!
পাবলিক প্লেসে কে শুনছে
তাদের ফোনালাপ,
লোকে কী ভাবছে
এ নিয়ে সে মোটেও চিন্তিত নয়-
মোবাইল ফোনের ওপারে
সে প্রাণপন বোঝায় শুধু -
যে নেই, কীভাবে সে
হয়ে ওঠে এমন অস্তিত্বময়;
যে আছে, কীভাবে
সে এমন কর্পুর-
হাওয়ায় মিলায়!
শুধু টের পেতে হয়
নিতে হয় শ্বাসে টেনে
চাইলেও, হাত ভরে তুলে
রাখা যায় না পূজোর থালায়!

বায়ু বয়, অনুচ্চারে-
মনে মনে সংলাপ:
দিন কি ফুরলো বৃথা,
একাকী, একা একা-

ঘুঘু

গান্ধীর কপালে একটা কাক
মাথায় সোনার টোপর
বুকটা ঘুঘুর মতো-
সুডৌল, মায়া-মায়া;
মায়ার দিকে তাকালে
দু’চোখে দুপুর নেমে আসে;
ঝুম দুপুরে রোদ্দুরে
ডাকে ঝিঁঝিঁ পোকা
রোদের সঙ্গে খেলে
হাওয়া ও কাঁঠাল পাতা
আলো-ছায়া- ;
ঝুম দুপুরে পুকুর পাড়ে
জলের ওপর বেঞ্চের মতো
নুয়ে আছে একটা তাল গাছ
একটি শিশু সে গাছ থেকে
জলে ঝাঁপাচ্ছে;

পুকুর পাড়ে আলো-ছায়া
ঝিঁঝিঁ পোকার গান;

বেপথু বাতাস পুকুর পাড়ে;

পুকুর পাড়ে একটা ঘুঘু
ডেকে ওঠে দুপুর বেলায়।

বৃষ্টিতে ডাক-বাক্সো

বহু বছর এক সাথে,
এক সঙ্গে রিকশায়
মেন্যু হাতে রেস্টুরেন্টে
বহু দিন, ঘুরে ঘুরে বহু ঋতু
চলে যাবার পর এবারের বর্ষায়
ধানমন্ডি লেকে কদম যখন ফুটেছে
তখন ছেলেটির মনে হলো:
মেঘলা দুপুর তাকে সায় দিচ্ছে
এইবার বলে দেয়া যায় সমস্ত রূপকথা।

গাছের পাতায় তখন বৃষ্টির দোল
বৃষ্টিতে স্কুলড্রেসে রিকশায় হুট ছাড়া
দু’টো কিশোর খিলখিল হাসছে
জাদুঘরের সামনে বিদ্যুতের তারে
একঝাঁক কাক গলা ছেড়ে করছে গান।

এমন সময়, যাবতীয় লক্ষণ বিবেচনার পর
কথার ভাঁজ খুলে দেখে
চিঠিহীন একটি ডাক-বাক্সো
বৃষ্টিতে শাহবাগে একা একা ভিজছে।

গাছঘড়ি

অনেক তাড়ার মধ্যে এক তারা
ঘরহীন, পথে পথে একা;
একা, কিন্তু একাকী নয়,
মানুষের নিঃশ্বাস তাকে সঙ্গ দেয়
সঙ্গ দেয় মানুষের ছায়া,
অপরের সাথে অপরের আলাপ।

আজ সন্ধ্যায় এক তরুণ,
টি-শার্টের নিচে যার পুরোটাই
সামাজিক চাপ, বেদনা-নহর
আর মানিয়ে নেবার দ্বৈততা।

নিজের মধ্যে বিভক্ত
সেই তরুণের সাথে
আলাপ হলো আজ।

বেদনা-নহরের এক বন্ধু ছিলো
বন্ধুটি হিজড়া ছিলো
হিজড়া মানুষটির ছিলো
এক মেয়ে ও ক’জন নিজস্ব পুরুষ ।

আমি তারা, নিজস্ব নারী বা পুরুষ নেই,
আমি নক্ষত্র, নিজের বীজে নিজেই
ফুলবতী, প্রবল বীর্যময়।

আজ আমার ফুল ফুটেছে,
লাল পাপড়িতে সোনালি আভা;
সোনালি-আভা ফুল হিজড়াকে দিলাম;
কানের পাশে, পুরুষালি ছাঁটে কাটা
ছোটো ছোটো চুলে সেই ফুল
গুঁজেছে সে ক্লিপ দিয়ে।

আজ আমার কেমন যেনো লাগছে
মায়ের কথা মনে পড়ছে শুধু
মা ছিলো মানবশিশু;
কিন্তু তার জন্ম ছিলো
এক নক্ষত্রের পেটে।

আমার মা মানুষ কিন্তু আমি তারা
আমার মা মানুষ কিন্তু তার মা তারা।

তাড়াহীন আজ সারাদিন
পথে পথে, কে আছো বেকার
অকর্মা লোক? আমার সঙ্গে
আসতে পারো ।
আজ গাছ হবো;
তারাজন্মে অনেক গতি,
তাড়াহুড়ো, ব্যস্ততা।
আজ আমার তাড়াহীন স্থির,
অনড় বৃক্ষ হবার উৎসব।
আজ সময় বা নিয়ম নেই,
যারা ঠকায় আমাকে রোজ
আজ তাদেরো নিমন্ত্রণ।

আমি অনড় গাছ; বৃক্ষঘড়ি;
আমার পাতায় সূর্যের রংবদল দেখে
বুঝে নিতে পারো সময়ের হিসেব।

     
Untitled Document

তিন পাপড়ির ফুল
প্রদর্শনী

চাঁপাইনবাবগঞ্জ ফটো ক্লাব
Copyright © Life Bangladesh
সাপলুডু মূলপাতা | মতামত Contact : shapludu@gmail.com