Untitled Document
সাপ  সম্পর্কে ভুল ধারণা দূর করুন
- শাহরিয়ার কায়সার রহমান



সাপ দেখলেই মেরে ফেলো,” এই নীতিতে বিশ্বাসী আমরা বাংলাদেশীরা একে এমন এক স্তরে নিয়ে যাচ্ছি যে একসময় হয়তো এমন সময় আসবে যখন ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের টিভির পর্দা বা চিড়িয়াখানা ছাড়া সাপ আর কোথাও দেখা যাবেনা। মানুষের এবং প্রকৃতির এক অতি গুরুত্বপূর্ণ বন্ধু সাপ। প্রকৃতি থেকে সাপ হারিয়ে যাওয়ার পরিণাম কতটা ভয়াবহ হতে পারে তা আমরা অনেকই জানিনা। আচ্ছা, এখন হয়তো অনেকেই প্রশ্ন করবে যে সাপের কামড়ে প্রতি বছর অনেক মানুষ মারা যায়, তাহলে সাপ কিভাবে মানুষের বন্ধু হয়। প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের মাত্র কয়েক প্রজাতির সাপ ছাড়া বেশিরভাগ সাপই বিষহীন। বিষহীন সাপের কামড়ে মানুষ মারা যায়না। আর যেসব প্রজাতির বিষ রয়েছে, তাদের মধ্যে মাত্র দু-তিন প্রজাতি বেশি দেখা যায় মানুষের আশেপাশে। বিষধর আর বিষহীন –কোনও সাপই হিংস্র নয়। আসল কথা হচ্ছে, সাপ অত্যন্ত নিরীহ প্রাণী ।মানুষের উপস্থিতি পাওয়ামাত্র সাপ অন্যত্র পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। সাপ মানুষকে সাধারণত কামড় দেয় যখন সাপকে কোণঠাসা করা হয় কিংবা মানুষ যখন সাপকে পাড়া দেয়। আমরা যদি একটু সাবধানতা অবলম্বন করি তাহলে কিন্তু অনেকক্ষেত্রেই সাপের কামড় থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারি। যেমনঃ যারা গ্রাম গঞ্জে থাকে তাদের অবশ্যই আলো ছাড়া রাতের বেলা ঘরের বাহিরে বের হওয়া উচিত নয় এবং কোন ভাবেই কোন গর্ততে হাত বা পা দেওয়া উচিত নয়, যদি কখনো সাপ সামনে পরে অযথা মারতে না যাওয়া, ঘরের আশেপাশে পরিষ্কার রাখা। আমরা অনেকই মনে করি বিষাক্ত সাপের কামড় মানেই নিশ্চিত মরণ। তা আসলে ঠিক নয়। সাপে কাঁটা রোগীকে যদি দ্রুত হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয় তাহলে বেশীরভাগ ক্ষেত্রীই রোগীকে বাঁচানো সম্ভব। কিন্তু তা না করে গ্রাম গঞ্জের বেশীরভাগ মানুষ রোগীকে গ্রাম্য ওঝাদের কাছে নিয়ে যায়ে। ওঝাদের ভুল চিকিৎসা বাংলাদেশের সাপে কাঁটা রোগীদের মারা যাওয়ার অন্যতম কারন। আমরা নিজের সাবধান না হয়ে অযথা দোষ দেই সাপকে। সাপকে আমাদের রক্ষা করা উচিত নিজেরদের তাগিদেই। কারন সাপ তার নিজের বেঁচে থাকার জন্য, নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্যই প্রতিনিয়ত আমাদের অনেক উপকার করে দেয়। যেমন, অনেকেই হয়তো জানেননা যে সাপের বিষ দিয়ে বিজ্ঞানীরা তৈরি করছেন ক্যান্সার সহ অনেক জটিল রোগের ওষুধ। এছাড়া, সাপ ইঁদুর খায়। ফলে কৃষকের ফসলের ক্ষেতে ক্ষতির পরিমাণ কমিয়ে আনতে সাপ পালন করে এক বড় ধরনের ভূমিকা। কিছু সাপ আছে যারা অন্য সাপকে খেয়ে থাকে। ফলে প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা হয়। আবার কিছু সাপ আছে যারা মাটির নিচে থেকে মাটির উর্বরা শক্তি বাড়িয়ে থাকে। বাজ, চিল বা পেঁচার খাদ্য হয়ে জীবন যায় অনেক সাপের। এতে করে ভারসাম্য টিকে রয় প্রকৃতির। আর তাই সাপ যদি হারিয়ে যায়ে তাহলে প্রকৃতি তার ভারসাম্য হারিয়ে ফেলবে। আর ভুলে গেলে চলবেনা যে মানুষ প্রকৃতিরেই একটি অংশ। আমরা কোনও না কোন ভাবে প্রকৃতির উপর নির্ভরশীল। আমাদের পরিবেশ আর প্রকৃতি যদি ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ে তাহলে তার প্রভাব আমাদের উপরে পড়বে। আর তাই আমাদের অজ্ঞতার কারণে সাপ যদি আমাদের পরিবেশ থেকে হারিয়ে যায়, তাহলে আমরা হারাব আমাদের প্রকৃতির এক গুরুত্বপূর্ণ বন্ধুকে।
এ মাসের সাপঃ
অজগর সাপ



রেটেকুলেটেড পাইথন (Reticulated Python)
অ তে অজগর
বাংলা ভাষার প্রথম অক্ষর অ। আমাদের ছোটবেলা থেকে শিখানো হয় “অ তে অজগর, অজগরটি আসছে তেড়ে।“ তাই আমরা অনেকেই ভেবে থাকি যে অজগর সাপ একটি হিংস্র প্রাণী, মানুষ দেখলেই এরা আক্রমণ করে। বাস্তবে, অজগর মোটেও হিংস্র নয়। এরা অত্যন্ত নিরীহ প্রাণী এবং এরা সাধারনত মানুষকে আক্রমণ করে না। এদের কামড়েও মানুষ মারা যায় না, কারন এরা সম্পূর্ণ নির্বিষ একটি সাপ। অজগর সাপ দৈর্ঘে ২৫ ফিট পর্যন্ত হয়ে থাকে। কিন্তু বেশীরভাগই ১০ থেকে ১৪ ফিটের মধ্যে হয়। মহিলা অজগর, পুরুষ অজগরের থেকে লম্বা এবং ওজনে বড় হয়ে থাকে। অজগর সাপ দক্ষীণ এবং দক্ষীণ পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে দেখা মেলে। অজগর সাপ পানি খুব পছন্দ করে। এরা সাধারনত পানির আশেপাশে, ভেজা, স্যাঁতস্যাঁতে বনে থাকে। অজগর সাপ গাছে উঠতেও ভীষণ পারদর্শী। এরা গাছের উপরে শিকার কিংবা রোদ পোহানোর জন্য অনেক সময় বেয়াএ করে। অজগর সাপ নিশাচর সাপ। এরা সাধারণত রাতের বেলা শিকারে বের হয়। কিন্তু শীতের সকালে প্রায়ই ওদেরকে রোদ পোহাতে দেখা যায়। বাংলাদেশে দুই প্রজাতির অজগর সাপের দেখা মেলে।

১। বারমিস পাইথন (Burmese Python)
২। রেটেকুলেটেড পাইথন (Reticulated Python)

এই দুই প্রজাতি প্রায় একি রকম দেখতে তবে রেটিকুলেটেড পাইথন বারমিস পাইথনের থেকে অনেকটা উজ্জল রঙের। আর রেটিকুলেটেড পাইথন বারমিস পাইথনের থেকে অনেক লম্বা হয়ে থাকে। বারমিস পাইথন, সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ বনে, সিলেট এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের বনাঞ্চলে বাস করে। চা বাগানে এদের প্রাই দেখা মেলে। আর রেটিকুলেটেড পাইথন শুধুমাত্র পার্বত্য চট্টগ্রামের বনাঞ্চলে পাওয়া যাই। অজগর সাপ গ্রীষ্মকালে ৩০ থেকে ১০০ টি পর্যন্ত ডিম পাড়ে ।মাটির গর্তে, গোপন জায়গায় এরা ডিম পাড়ে। ডিম গুলো হাসের ডিম থেকেও কিছুটা বড় হয়ে থাকে। ডিম থেকে বাচ্চা ফুটতে ৬০-৭০ দিন লেগে থাকে। এবং মজার ব্যাপার হল ডিম পাড়া থেকে বাচ্চা ফুটা পর্যন্ত,এই পুরোটা সময় মা অজগর ডিমকে তা দিয়ে যায় এবং কিছুই খায় না। অজগর মানুষকে অনেক উপকার করে থাকে। যেমন এদের প্রধান খাদ্য হচ্ছে ইদুর । এরা এদের জীবনে অসংখ্য ইদুর খেয়ে আমাদের লাখ লাখ টাকার ফসল নষ্ট হওয়ার হাত থাকে রক্ষা করে। তাই,অ তে অজগর, এবং অজগর আমাদের বন্ধু।
Untitled Document