Untitled Document
এ্যালবাম
জন্ম ১৯২৫ বাংলাদেশের শ্রীহট্টের তাঁতিকোনা গ্রামে। ১৯৪৯ পূর্ববঙ্গে কমিউনিস্ট পার্টির সংস্পর্শে আসেন। ১৯৫০ এ কারাবরণ। জেল থেকে ছাড়া পেয়ে ১৯৫১ সালে কলকাতায়। চাকরি বেঙ্গল ইমিউনিটিতে। চাকরির সঙ্গে গান। ঋত্বিক ঘটকের মেঘে ঢাকা তারা, সুবর্ণরেখা, কোমল গান্ধার ও যুক্তি তক্কো ও গল্পে গান গেয়েছেন। এ ছাড়া শেখর চট্টোপাধ্যায়ের জন্মভূমি সিনেমায় প্লে ব্যাক। মৃত্যু ১৯৮৫ সালের ২৭ জুলাই।



কাঁচাসোনা

ঋত্বিক ঘটকের সঙ্গে আমার পরিচয় আকস্মিকই হয়েছিল, একদিন আমি হেমাঙ্গ বিশ্বাসের একটি চিঠি পাই তাতে তিনি লিখেছিলেন যে তুমি যদি একটি ভাটিয়ালি গাও ওর ছবিতে তাহলে আমার মান রক্ষা হয়। আজকে ওদের মিউজিক টেকিং। তুমি আমার চিঠি নিয়ে নিউ থিয়েটার্স স্টুডিয়োতে চলে যাও।

আমি যখন গিয়ে পৌঁছালাম তখন দুপুর তিনটে। শীতকালের বেলা। সব ফাঁকা, একজনকে দেখে জিজ্ঞাসা করলাম ঋত্বিক ঘটকের দেখা পাব? তখন ওই ব্যক্তি বললেন তিনি মিউজিক টেকিং এর ঘরে, আমি সেই ঘরে গিয়ে দেখি উনি একমনে পিয়ানো বাজাচ্ছেন। আমি দারজায় দাঁড়িয়ে বললাম, আসতে পারি, উনি বললেন, আসুন।

আমি ঋত্বিক ঘটকের কাছে হেমাঙ্গদার চিঠি দিয়ে বললাম হেমাঙ্গদা আমাকে পাঠিয়েছেন। উনি আমাকে বসতে বললেন। আমি বললাম বসব না। এখন কার্তিকের শেষ। গান যদি আমাকে গাওয়ান তাহলে আমাকে সন্ধের আগে ছেড়ে দেবেন, তা না হলে আমার গলাটা নষ্ট হয়ে যাবে কাল আমার রেডিয়োর প্রোগ্রাম আছে। তারপর কন্ট্রোল রুমে গিয়ে বসে বলল, আপনি গান। আমি গান গাইলাম, যে গানটি নির্মলেন্দু চৌধুরীর গাইবার কথা ছিল। তারপর শুনে বললেন, হবে। তারপর রেডিয়োতে যে গানটা আমার গাওয়ার কথা সে গানটা শুনতে চাইলেন। সেটা মুসলমান সুফি সম্প্রদায়ভুক্ত, গানটা শোনার পরে বললেন এই গানটা আমি নেব, তারপর চৌকির ওপর বসিয়ে একটার পরে একটা অনেক গান শুনলেন। আর প্রত্যেকটা গানের শেষে বলেন, এই গানটা আমি নেব। তারপর আস্তে আস্তে সময় হয়েছে দেবব্রত বিশ্বাস এসেছেন, এ টি কানন, তার স্ত্রী মালবিকা কানন এসেছেন। হটাৎ ঋত্বিকের খেয়াল হয়েছে আমি কিছুই কাইনি। সঙ্গে সঙ্গে খাবার আনার ব্যবস্থা করলেন। এদিকে এ টি কানন শুধু গারগেল করছেন আর রেওয়াজ করছেন। এই করতে করতে রাত তিনটে। আমার কথা ভুলে গিয়েছিলেন তাই ঋত্বিক ঘটকের উপর দারুন রাগ হয়েছিল, আমি বললাম, আমি যাচ্ছি। আমার আর গান গাওয়ার শখ নেই, গায়ে এমন শীতে একটি আদ্দির পাঞ্জাবি। তখন ঋত্বিক আমাকে ওর জহর কোট খুলে পরিয়েছিলেন, এদিকে ফাঁকে ফাঁকে আমার গান শোনে আর তোষামোদ করার চেষ্টা করে। সেই সময় এ টি কানন বললেন ঋত্বিককে , আমাকে দেখিয়ে- এই চেহারাটি কাজে লাগানোর চেষ্টা করুন। তারপর আমার প্রথম গানটা শেষ হল, তারপরে আরও চারটে সুফি ও একটি ভাটিয়ালি গান শোনাই আর প্রত্যেকটা গান শেষ হলে বলে, আহা শালা তো বেশ গায়। ওই এক রাত্তিরের মধ্যে আমার ও ঋত্বিকের আপনি থেকে তুমি, তুমি থেকে তুই, তুই থেকে শালা সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

তখন "মাঘে ঢাকা তারা"র শুটিং চলছে। আমি প্রতিদিন অফিসের পর হাজির হতাম এবং সেখানে চুপচাপ বসে থাকতে পারতাম না, গেলেই সবাই বলত একতা গান গা, তাও আবার সুফি সম্প্রদায় ভুক্ত। আমি ওই সময় একটা গান গাই- তুমি তো অন্তরযামী আমায় করলা ফানা। তখন সে প্রশ্ন রেখেছিল অন্য সকলের কাছে 'ফানা' শদটির অর্থ কী? তখন তিনি বললেন 'কথাটি হিন্দু ও বৈষ্ণব ধর্মের দশম দশা আর সুফি সম্প্রদায়ের ফানা অর্থ একই'। তারপর সে আমার কাছে যত সুফি সম্প্রদায়ের গান শুনল এবং তার ব্যাখ্যা করে দেখালো যে, বাউলতত্ত্ব ও সুফি তত্ত্ব একটা একই ভাব-ধারণার মধ্যে হিন্দুর বাউল মুসলমানের আউল মিলে মিশে রয়েছে। বুঝলাম সে সব মিথোলজি পড়েছে। তারই প্রকাশ বর্তমানে, ওর বক্তব্যের মধ্যে। ঋত্বিক প্রত্যেকটি বিষয় গভীরভাবে ভাবার চেষ্টা করত। 'শ্যাম বিচ্ছেদে প্রাণ বাঁচেনা/ মইল গো রাই কাঁচাসোনা...' এ গান শুনে ঋত্বিক আকুল হয়ে যেতেন। রাইয়ের অবস্থা বোঝাতে 'কাঁচাসোনা' শব্দের ব্যবহার তাঁকে মুখর করে তুলত। বলতেন দেখ, আমি অনেক বই পড়েছি; কোথাও এমন ব্যবহার দেখিনি।

আমি সময় পেলে দু'জনের বাড়ি যেতাম বিজনদা আর ঋত্বিকদা। বিজনদা গান শোনে আর বলে, শালা! বিড়ি খেয়ে খেয়ে গলার বারটা বাজিয়েছিস, আর একটা গা। আর ঋত্বিকদা বলত, শালা কী গাস! গলা ফাইড়া মনকে উজার করে গাস। গা, শালা, আর একটা গা। এই হল আমার গানের প্রশংসা। ভদ্র ভাষায় প্রশংসা শুনলে আমার ভয় করে।

- রণেন রায়চৌধুরী



সাপলুডুর অন্যান্য সংখ্যায় প্রকাশিত গানের সংগ্রহ
Untitled Document